Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,bangla sahitya reza ghatak

ইরাবতী এইদিনে গল্প : তেইল্যা বোয়াল । রেজা ঘটক

Reading Time: 4 minutes

 

আজ ২১ এপ্রিল কবি, কথাসাহিত্যিক ও চিত্র পরিচালক রেজা ঘটকের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


স্রেফ বোয়ালমাছের কারণে আমাদের খালেক মাতবর পাগোল হয়ে গেল। খালেক মাতবরের পাগোল হতে কতদিন লাগলো? না, হুট করেই খালেক মাতবর পাগোল হয় নাই। খালেক মাতবরের পাগোল হবার পেছনে প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে অনেকেই কারণ হিসেবে মনে করেন। কিন্তু খালেক মাতবরের পাগলামীর পেছনে আরো অন্তত একাধিক কারণ আছে। আর সেই কারণের অন্তরালের কারণে-অকারণে ব্যকরণ সংমিশ্রণে শরীরের হেডকোয়ার্টারের সার্কিটে স্রেফ ভারসাম্য হারিয়ে আমাদের চোখের সামনেই খালেক মাতবর পাগোল হয়ে গেলেন। 

খালেক মাতবরের এমনিতে ঘাড়ের রগ একটা অন্তত ৪৫ ডিগ্রি ত্যারা।সহজ সরল ঘটনার মধ্যেও খালেক মাতবর মস্তবড় ঝামেলা আবিস্কার করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র নিউটন ও আইনস্টাইনের পর আমাদের খালেক মাতবরের খুব বড় বিজ্ঞানী হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, খালেক মাতবর বিজ্ঞানী না হয়ে সামান্য সৌখিন মাছ চাষী থেকেই কিনা পাগোল হয়ে গেলেন!

যদিও শুধুমাত্র গ্রামের হাটে তালিব চেয়ারম্যানের কাছে একবার বাজিতে হেরে হাটের সবচেয়ে বড় বোয়ালমাছ কিনতে না পারার কঠিন বেদনা থেকেই অনেকটা হুট করেই পাটের ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে খালেক মাতবরের সৌখিন মাছ চাষী হিসেবে আর্বিভাব। যদিও ঘটনা সামান্য। কোজাগরী পূর্ণিমায় সে বছর অনেক বোয়ালমাছ পেলো জেলেরা।

ভরা জোয়ারের পদ্মায় সেদিন যারাই মাছ ধরছিল, তারা কেউ আর একদম খালি হাতে ফেরেনি। প্রচুর পরিমাণে শৌলমাছ আর বোয়ালমাছ ধরা পরেছেিল। যথারীতি খাসেরহাটের বাজার সেদিন মাছে মাছে সয়লাব। হাটের সবচেয়ে বড় মাছটি ছিল কদম আলীর আনা তেইল্যা বোয়াল। পাক্কা সাড়ে এগারো কেজি ওজনের বোয়ালমাছ। বোয়াল মাছটি কেনার জন্য মেছোহাটে তখন একটা ডাক উঠলো। স্রেফ জুয়ার মতো ডাক। মাছের সবচেয়ে বেশি দাম যিনি হাঁকবেন, তিনিই মাছটি কিনতে পারবেন।

হয়তো আমাদের পাট ব্যবসায়ী খালেক মাতবরের খুব গোপনে একটা লালসা তৈরি হয়েছিল ওই তেইল্যা বোয়ালের উপর। কিন্তু তিন হাজার পাঁচশো টাকা হাঁকিয়েও খালেক মাতবর বোয়ালমাছ কিনতে পারলেন না। তালিব চেয়ারম্যান পানহাটে কেনাকাটা করে কাসেমের চায়ের দোকানে বসে বসে চা খাচ্ছিলেন। বাতাসের বেগের চেয়ে গুজবের বেগ হাজারগুণ বেশি। মুহূর্তে কাসেমের চায়ের দোকানে তালিব চেয়ারম্যানকে ঘিরে যে জটলা ছিল, সেখানে খবর পৌঁছালো যে হাটে বিশাল এক তেইল্যা বোয়াল উঠছে। খালেক মাতবরের মতো তালিব চেয়ারম্যানের জিভ কী তখন সবার অজান্তে একবার লকলকিয়ে উঠেছিল?

নইলে খালেক মাতবর যখন আড়াই হাজার টাকার বোয়ালের উপর সাতে তিন হাজার দাম হাঁকালেন, তখন তো তালিব চেয়ারম্যানের চুপসে যাবার কথা। এর আগে যেখানে খাসেরহাট বাজারে সবচেয়ে বেশি দামে যে বোয়াল মাছ বিক্রি হয়েছিল, সেটির দাম ছিল দুই হাজার টাকা। এটা আগের রেকর্ড। তালিব চেয়ারম্যানের আড়াই হাজার হাঁকানোর পর খালেক মাতবর এককাঠি বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার হাঁকালেন। আর যায় কোথায়? তালিব চেয়ারম্যানের দুই-একজন চেলাচামুণ্ডা তাঁর কানেকানে কী যে কইলো, অমনি মাথা গরম করেই তালিব চেয়ারম্যান বোয়ালের দাম হাঁকালেন চার হাজার টাকা।

তালিব চেয়ারম্যানের মতিগতি বুঝতে পেরে আম-ছালা দুটো হারানোর ভয়ে খালেক মাতবর বাজিতে তখন ইস্তফা দিলেন। আর তেইল্যা বোয়ালমাছ কেনার হক দাবিদার হতে পারলেন তালিব চেয়ারম্যান। খাসেরহাটের মাছবাজারের ওই ভিড়ের মধ্যে খালেক মাতবরের মুখটা কী তখন এক মুহূর্তের জন্যে হলেও আমচুরের মত চুপসে যায়নি? খালেক মাতবর সেই মনকষ্ট ভোলার জন্য পরের বছরই পাটের ব্যবসা গুটিয়ে সৌখিন মাছচাষে নামলেন।

বাড়ির ঠিক দক্ষিণপাশে দেড়শো হাত লম্বা আর একশো হাত চওড়া বিশাল এক পুকুর কাটালেন খালেক মাতবর। জনশ্রুতি হলো, পরের বছর নাকি ভেতরে ভেতরে খালেক মাতবরের চেয়ারমানি ইলেকশানে লড়াই করার খায়েস তখন প্রায় তুঙ্গে। খাসেরহাটের মেছোহাটে তালিব চেয়ারম্যানকে ভোটের লড়াইয়ের আগেই একবার হারানোর উদ্যোগ ছিল সেটা! তাই আড়াই হাজার টাকার বোয়ালমাছের দাম সাড়ে তিন হাঁকিয়েছিলেন খালেক মাতবর।

তালিব চেয়ারম্যান দীর্ঘ পয়ত্রিশ বছরের পুরানো ঘাগু চেয়ারম্যান। খালেক মাতবরকে তার পাত্তা দিলে চলে? তাই চার হাজার হাঁকিয়ে খালেক মাতবরকে একটা উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন তালিব চেয়ারম্যান। যদিও সেই রাতে তালিব চেয়ারম্যান নিজে খালেক মাতবরকে দাওয়াত দিয়ে সেই তেইল্যা বোয়ালের ঝোল খাইয়েছিলেন। কিন্তু ওই ঘটনার পর হঠাৎ পাটের ব্যবসা গুটিয়ে পুকুর কাটায় মন দিলে তালিব চেয়ারম্যান নিজে এসে একবার খালেক মতবরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন- মাতবরের মাথা-টাথা ঠিক আছে তো?

কিন্তু পাগোলে না শোনে মানুষের বুদ্ধি! তালিব চেয়ারম্যান কোন ছার! খালেক মাতবর নিজ উদ্যোগে বিশাল আকারের পুকুর কাটালেন। সেই পুকুরে বোয়াল মাছ ছাড়লেন। পুকুরের সবচেয়ে বড় বোয়ালের ওজন পনের কেজি হলেই তারে আর পায় কে? তালিব চেয়ারম্যানের রেকর্ড তো ভাঙা যাবেই। খাসেরহাটের বাজিতে হারের একটা উচিত জবাবও হবে। কোথায় সাড়ে এগারো কেজি আর কোথায় পনেরো কেজি।

দেখতে দেখতে চোখের পলকে খালেক মাতবরের পুকুরের বোয়াল লাফিয়ে লাফিয়ে বড় হতে লাগলো। পুকুরের পাড়ের নারকেল গাছের ছায়ায় বেঞ্চিতে বসে বসে খালেক মাতবর তখন খুশিতে দাড়িতে হাত বোলান আর মিটমিট করে রহস্যময়ভাবে হাসেন। বোয়ালমাছ আর চেয়ারমানি ইলেকশান, দুটোতেই সে প্রকাশ্যে যেন তালিব চেয়ারম্যানকে চ্যালেঞ্চ জানিয়ে দিয়েছেন! চারিদিকে তখন একটাই আলোচনা- খালেক মাতবরের পুকুরের বোয়ালমাছ!

ঠিক এক বছর আগে কোজাগরী পূর্ণিমায় খাসেরহাটে তেইল্যা বোয়ালমাছ কিনতে না পারার কারণে খালেক মাতবর বছর ঘুরতেই তখন সত্যি সত্যিই বড় বড় বোয়ালমাছের মালিক। কিন্তু রেকর্ড না করে খালেক মাতবর কিছুতেই পিছু হাঁটবেন না। পূর্ণিমার জোগায় পদ্মায় তখন ভরা জোয়ার। বন্যার একটা আভাস দেখে খালেক মাতবর কিছুটা চিন্তিত। কিন্তু বাঁশের মাচা বানিয়ে প্রস্তুতি নিলেন। কোনো বোয়ালের সাধ্য নাই খালেক মাতবরের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোথাও যায়!

বাঁশের মাচা বানিয়ে পুকুরের চারপাশ খুব ভালো করে বেড়া দিলেন। বাঁশের মাচা পোতায় পাক্কা একশো টাকার কিষাণ ছিলো সোনামিঞার দামরা পোলা আউয়াল। আউয়ালের মনে কী শয়তানি ছিল কে জানে! নাকি গোপনে তালিব চেয়ারম্যানের কাছের শিষ্য সাজতে গিয়ে কারো গোপন ইসারায় আউয়াল সেই অপকম্মটি করেছিলো, কেউ বলতে পারে না। বাঁশের মাচা পোতার সময়ে কিছুদূর পরপর ইচ্ছা করেই মাচার নিচে ফুটো রেখে দিয়েছিল আউয়াল।

অবশ্য সেই রাতে বন্যার যে তেজ ছিলো, এমনিতেই ওই বাঁশের মাচা ভেসে যেতো। আউয়ালের শয়তানি কোনো কাজে আসতো না। ভেড়ি বাঁধ ভেঙে যেখানে পদ্মার পাড়ের বাঁইশ গ্রাম নিশ্চিন্ন। সেখানে খালেক মাতবরের পুকুর কী আর পুকুর থাকে? স্রেফ বন্যার মাঠ হয়ে যাবার কথা। পরে অবশ্য বাস্তবে হয়েছিলোও তাই! দেখতে দেখতে বিকাল নাগাদ বাঁশের মাচা অর্ধেক ডুবে গেল! খালেক মাতবরের তখন খালি হায় হুতাস।

কিছু বোয়ালমাছ আশে পাশে ছুটে গেল। আমাদের ক্লাশের রাতুল আর আমি মিলে দুই ছোকরা তখন বরষি নিয়ে সেই মাছ ধরার চেষ্টায় ব্যস্ত। সূর্য তখন ডুবিডুবি। রাতুল হঠাৎ বরষি একা সামলাতে পারছিলো না। হঠাৎ চিৎকার দিলো- শান্ত আমারে ধর!

দুইজন মিলে বহুত কষ্টে বরষি টেনে রাখলাম। কখনো আমরা কোমড় পানিতে কখনো আমরা হাটু জলে। প্রায় আধাঘণ্টার চেষ্টায় আমরা বিশাল এক বোয়াল তুলে আনলাম। রাতুলের মা সেই মাছ রান্না করলো। সেই রাতে আমারও রাতুলের সাথে সেই মাছ খাওয়ার দাওয়াত রাতুলদের ঘরে। সাজুগুজু করে বড় বোয়াল মাছ খাওয়ার জন্য রাতুলদের উঠানে যেতেই দেখি সেখানে বিশাল কাইজা!

স্বয়ং খালেক মাতবর সেখানে উপস্থিত। তার পুকুরের মাছ রাতুল কেন ধরলো? তার বিচার চায় সে। অথচ বন্যায় ভেসে আসা বোয়ালের গায়ে কোথাও লেখা নাই- এটা খালেক মাতবরের পুকুরের বোয়াল। পদ্মা নদী থেকে বন্যায় ভেসে আসা বড় বোয়ালও হতে পারে সেটা। কিন্তু কে শোনে কার কথা? শেষ পর্যন্ত খালেক মাতবর সেই রান্না করা মাছ গামলায় ঢেলে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। আমার আর রাতুলের আর আয়েস করে সেই রাতে বোয়া্ল খাওয়া হলো না।

ভগবানের মাইর দেখার বাইর। সেই রাতেই বন্যার তোপে খালেক মাতবরের বাঁশের মাচা ভেঙ্গে সেখানে পুকুরের নামচিন্থ আর একটুও অবশিষ্ট রইলো না। বরং খালেক মাতবরের বসতবাটির টিনের ঘরও তখন বন্যায় ভেসে যাওয়ার মতো দশা। পদ্মাপাড়ের বাঁইশ গ্রামের সাথে এক রাতেই খালেক মাতবরের সাধের পুকুরও একেবারে নিশ্চিন্ন হয়ে গেল!

না। বন্যার পানি শুকানো পর্যন্ত আমাদের খালেক মাতবর দেরি করেন নাই। তার আগেই তিনি পুরোপুরি পাগোল হয়ে গেলেন।রাস্তা শুকালে আমরা যখন ইশকুলে যাওয়া শুরু করলাম, তখন উলঙ্গ খালেক মাতবর রাস্তায় খাঁড়ায়ে খাঁড়ায়ে কেবল একটাই ডায়লগ দিতেন- তেইল্যা বোয়াল!

 

 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>