| 19 এপ্রিল 2024
Categories
উপন্যাস ধারাবাহিক সাহিত্য

ধারাবাহিক উপন্যাস: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (শেষ পর্ব)

আনুমানিক পঠনকাল: 34 মিনিট

(৪৪)

সুমন কী বললো কিছুই আমার মাথায় ঢুকলোনা। মাথাটা কেমন যেন ঝিম মেরে গেছে। সুমনআমাকে কীসের ছবি পাঠাতে চাইলো মেসেঞ্জারে? আর ওর গলাটা এমন থমথমে শোনালো কেন? বিপ্লবের সাথে ফেসবুকে এ্যাড আছি কী না এটা কেন জিজ্ঞেস করলো?

আমার সামনে সুনেত্রা দাঁড়িয়ে আছে। অদ্ভুত চোখে দেখছে আমাকে। একটু পরে সুরমা ফিরবে। মামা মামী কিংবা নানীরও মুখোমুখি হয়ে পড়তে পারি। আমার এইরকম মানসিক অবস্থার মধ্যে কারো মুখোমুখিই হতে ইচ্ছে করছে না। তাই কোনোদিকে না তাকিয়ে হনহন করে ছাদের দিকে হাঁটা দিলাম। সিঁড়িতে উঠতে উঠতেই মোবাইলে টুং করে একটা আওয়াজ হলো। দেখলাম মেসেঞ্জারের নটিফিকেশন। সুমন পাঠিয়েছে।

আমার পা দুটো আপনা আপনিই থেমে পড়তে চাইছে। ইচ্ছে করছে এখুনি মেসেজটা দেখি। কিন্তু মন আমাকে স্থবির করতে চাইলেও মস্তিষ্ক তাতে সায় দিলো না। পা দুটোকে ছ্যাচড়াতে ছ্যাচড়াতেই ছাদের দিকে চললাম।

ছাদে উঠেই কাঁপা কাঁপা হাতে মেসেঞ্জার চেক করলাম। সুমন একটা ছবি পাঠিয়েছে।

এ কী! এই ছবি কোথায় পেলো সুমন? কলেজ ক্যাম্পাসে হুট করে আমাকে ধন্দের মধ্যে ফেলে বিপ্লব শয়তানটা যে ছবিটা তুলেছিল… সেই ছবি! সুমন একটা স্ক্রিনশট দিয়েছে। দেখলাম বিপ্লবের ফেসবুকের একটা পোস্টের সাথে ছবিটা জুড়ে দিয়েছে। আমার মাথা এবারে সত্যি সত্যি ঘুরতে লাগলো। মনে হচ্ছিলো পড়ে যাবো। বসেই পড়লাম আমি। ছাদের শুকনো মেঝেতে একেবারে ধপাস করেই বসে পড়লাম। কিছুক্ষণ চিন্তা করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেললাম।

ভালোভাবে সম্বিত ফিরে পেতেই আমি স্ক্রিনশটটা ফোনে সেভ করে নিলাম। তারপর পোস্টের ক্ষুদে ক্ষুদে লেখাগুলো পড়লাম। বিপ্লব লিখেছে, ‘পুরনো চাল ভাতে বাড়ে। আহা! পুরনো প্রেমও দিনে দিনে বাড়ে! কতদিন দূরে আছো সখী…’

উফ! অসহ্য! আরো কী কী যেন লিখেছে! আমি পুরোটা পড়তে পারলাম না। মাথার মধ্যে কেমন যেন যন্ত্রণা হচ্ছে এখন। ভালোভাবে কিছুই চিন্তা করতে পারছি না। মোবাইলটা বেজে উঠলো ঝন ঝন করে। কলার আইডি না দেখেও বুঝতে পারছি সুমনের ফোন। কী জানতে চাইবে সুমন? আমিই বা কী জবাব দিব?

‘হ্যালো! হ্যালো…হ্যালো… নীরা! কী ব্যাপার কথা বলছো না কেন? শুনতে পাচ্ছো? হ্যালো!’

‘হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি! বলো!’

‘আমি কী বলবো? আজকে তো তুমি বলবে! আমি শুনবো! ছবি তো দেখলে! এখন বলো তোমার বক্তব্য কী? নাকি বলবে এই ছবি তোমারই না! বাহ নীরা! এটাই দেখা বাকি ছিল আমার! সুরমার বোন তুমি, আমার তো মনেই ছিল না সেকথা!’

‘সুমন…চুপ করো! যা খুশি তাই বলার আগে একবার আমাকে কথা বলার সুযোগটা তো দাও। তুমি তো আমার কথা কিছু শুনলাই না! সিদ্ধান্তে চলে আসছো কীভাবে?’

‘এই ছবি দেখার পরেও আরো কিছু শোনানো বাকি আছে তোমার? আমি কি কোনো রহস্যরোমাঞ্চ গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়লাম নাকি? এক বোনের সাথে প্রেম করে তাকে জেলের ঘানি খাটানোর পরে উন্মোচিত হলো যে, আরেক বোনের সাথেও নায়কের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এতদিন জানতাম সে নায়ক না… সে হচ্ছে ভিলেন! আচমকাই অন্য রহস্য উন্মোচিত হলো! সেই প্রেম আবার এতদিনে নাকি বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে! নায়ক কিছুদিন রেস্টে ছিল। ফিরে আসতে না আসতেই প্রেমিকার ছবি দেখে পুরনো প্রেম চাগাড় দিয়ে উঠেছে! এ্যাঁ…আর কিছু বলতে বাকি আছে তোমার? নাকি আমারই আর কিছু জানার বাকি আছে?’

সুমন একের পর এক আজেবাজে কথা বলে চললো। আমি কিছুতেই ওকে থামাতে পারছি না। ইচ্ছে করছে গলা ছেড়ে কাঁদি! কখন কাঁদতেও শুরু করে দিয়েছি জানি না। একেবারে কাতরকণ্ঠে বললাম, ‘সুমন, প্লিজ চুপ করো! আল্লাহর দোহাই লাগে চুপ করো! যা জানো না তা নিয়ে এত বড় মিথ্যা কথা বলো না!’

‘হ্যাঁ নীরা… ঠিকই বলেছো তুমি! যা জানি না! কিন্তু আমি জানবো কীভাবে বলো তো? এত সুন্দর করে অভিনয় করে গেলা এতদিন! আমার জানার কি কোনো উপায় ছিল? আজ পার্কে ঐ পিচ্চিটা তাহলে বিপ্লবেরই প্রেমপত্র নিয়ে এসেছিল তোমার কাছে! আমি কত্তবড় গাধা দেখেছো? চোখের সামনে প্রমাণ পেয়েও কিছুই করতে পারলাম না। আমার চোখে এক নিমেষে ধোঁকা দিয়ে পুরো সাক্ষ্য প্রমাণই বেমালুম গায়েব করে দিলা! ওহ কত বড় এক্সপার্ট তুমি…তোমরা!’

আমি আর একটা কথাও বলতে গেলাম না। বুঝতে পারলাম, সুমন এখন এই মুহূর্তে আমার কোনো কথাই শুনতে প্রস্তুত নয়। তাই শুধু শুধু আর অপচেষ্টা করে লাভ নেই। বসে বসে ওর এসব অকথ্য ভাষণ শোনাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। চোখের পানিটুকু মুছে নিলাম। তারপর ফোনটা কেটে দেওয়ার আগে বললাম, ‘সুমন, তুমি তোমার বিশ্বাস নিয়ে বসে থাকো। যা খুশি করো। আমাকে যে এতগুলো দিনে চিনতে পারেনি, এটা আমারই অযোগ্যতা। খোদা হাফেজ!’

ফোনটা বন্ধ করে দিলাম। সুমন কলব্যাক করলেও যাতে ধরতে না হয়।

মনটা এখন একদম শূন্য হয়ে আছে। একটু আগে দমবন্ধ একটা অনুভূতি হচ্ছিলো। মাথার মধ্যে অদ্ভুত সূক্ষ্ণ একটা যন্ত্রণা টের পাচ্ছিলাম। কিন্তু এখন সব কেমন যেন ভোজবাজির মতো বন্ধ হয়ে গেছে। আমার মন আর মনোজগতের চারপাশ এখন শুনশান নিস্তব্ধ।

আমার এই ছাব্বিশ বছরের জীবনে কেউ আমাকে এতগুলো কটু কথা, ভুল কথা বলেছে কী না সেটা মনে করতে পারলাম না। মা-বাবা নানারকম আজেবাজে কথা বলতো নিজেদের মধ্যে। কিন্তু দুজনের কেউই আমাকে কোনো ব্যাপারে দোষারোপ করেনি কিংবা গালিগালাজ করেনি। আজ সুমন আমাকে যে কথাগুলো বললো, এমন অশ্রাব্যবচন আমি জীবনে এই প্রথমবারের মতো শুনলাম। সুমনের এই ভুল কি কোনোদিন ভাঙাতে পারবো আমি? জানি না! আমাকে কিছুমাত্র বলার সুযোগ না দিয়ে এই যে এতগুলো কথা ও আমাকে শোনালো, আগে তার কৈফিয়ত আমাকে কড়ায়গণ্ডায় চুকাতে হবে। ওর ভুল ভাঙানোর প্রশ্ন তো পরে আসছে!

কিন্তু এখন আমাকে জানতে হবে, বিপ্লব এই ছবি কোথায় পেল? ওর ফোন তো পুলিশস্টেশনে রেখে দেওয়া হয়েছিল! সেটা কি আবার ফেরত দিয়েছে? আমি অফিসারকে বলেছিলাম যে, বিপ্লব জোর করে আমার ছবি তুলে মোবাইলে রেখে দিয়েছে। তারপরেও সেই ছবি পুলিশস্টেশনে ডিলিট করলো না কেন? বিপ্লবকে ধরার জন্য আমাকে সেদিন যেতে হয়েছিল। যদিও আমি স্বেচ্ছায় গিয়েছিলাম, কিন্তু শেষমেষ পুলিশেরই তো কাজে এসেছিলাম! তাহলে পুলিশ আমার সম্মানের বিষয়টাকে আমলেই নিলো না কেন? এত সহজে বিপ্লবের ফোনটা আবার ওকে ফেরত দিলো কেন?

কেন? কেন? কেন? এত এত কেন’র উত্তর আমাকে কে দিবে? না… এত সহজে তো আমি হাল ছেড়ে দিব না! সুমনের মুখোমুখি হওয়ার আগে আমাকে তো এখন বিপ্লবের মুখোমুখি হতে হবে!

আমি মরিয়া হয়ে আবার ফোনটা অন করলাম। টং করে একটা শব্দ হলো একটু পরেই। সুমনের একটা মেসেজ এসেছে ফোনে। অন না করেও মেসেজটা পড়তে পারলাম। সুমন লিখেছে, ‘একেই বলে চোরের মায়ের বড় গলা!’

আমি সুমনের নাম্বারটা ব্লক করে দিলাম। বলুক যা খুশি! এখন ওকে পাগলা কুকুরে কামড়িয়েছে। বিষ না যাওয়া পর্যন্ত আমাকে দেখলেই কামড়াতে ইচ্ছে করবে। তাই আপাতত ওকে লিস্টের বাইরে রেখে দেওয়াই ভালো। আমি আগে বিপ্লবকে দেখে নিই।

ফেসবুকে ঢুকলাম। বিপ্লবের পুরো নাম লিখে সার্চ দিলাম। রাগে ক্ষোভে ঘৃণায় সারাশরীর রি রি করে উঠলো আমার। পাবলিক পোস্ট দিয়েছে বদমাশটা! এক ঘন্টাও হয়নি পোস্ট দিয়েছে, এর মধ্যেই প্রায় পাঁচশোর কাছাকাছি লাইক, হা হা রিয়াকশন। ইচ্ছে না করলেও দু’চারটা কমেন্ট পড়লাম।

‘দোস্ত, ওহো খাসা মাল! পুরনো হোক তাতে কী!’

‘এত টসটসে প্রেমরে গাছেই ঝুলাইয়া রাখলা বন্ধু! ছিঁড়ে আনো তাড়াতাড়ি! নইলে যে গাছেই শুকিয়ে যাবে!’

আমার আর রুচি হলো না পড়ার। আমি চুপচাপ ঠান্ডা মাথায় সাড়ে তিন বছর আগের সেই দিনের কথা ভাবতে বসলাম।

ঠিকঠাক মনে করার চেষ্টা করতে লাগলাম। কী কী হয়েছিল সেদিন? বিপ্লব ছবিটা তোলার সাথে সাথেই আমি আপত্তি জানিয়েছিলাম।ছবিটা ডিলিট করতে বলেছিলাম বিপ্লবকে। বিপ্লব বলেছিল, ছবিটা সে মোবাইলে সেভ করেনি। ফেসবুকে ‘অনলি মি’ করে রেখে দিবে। একটা স্মৃতি রেখে দিবে…এই টাইপ কিছু বলেছিল। তারপর পুলিশ এসে ধরলো বিপ্লবকে। পরে পুলিশ অফিসার আমাকে জানালো বিপ্লবের মোবাইল নিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমি ছবির কথাটাও উনাকে জানিয়েছিলাম। উনি বলেছিলেন চিন্তার কিছু নাই। এমন ছবি পেলে সরিয়ে ফেলা হবে।

যদ্দুর মনে পড়ে, এরকম কিছুই হয়েছিল। হঠাৎ মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ খেলে গেল। তাহলে তো ঠিকই আছে! বিপ্লব যদি ফেসবুকে ‘অনলি মি’ করে রাখে ছবিটা, তাহলে সেটাকে পরবর্তীতে পাবলিক করে পোস্ট করা এমন কি কঠিন ব্যাপার! মোবাইলে ছবি থাকুক বা না থাকুক, এমনকি মোবাইলও যদি হাপিস হয়ে যায় তাতেও তো সমস্যার কিছু নাই! ছবি তো ফেসবুকেই সেভ করা হয়ে আছে!

চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে এখন। এত সহজ বিষয়টা আমার মাথায় ঢুকতে এত দেরি লাগলো! আমি এই সম্ভাবনাটা নিয়ে একেবারেই ভাবিনি! আসলে ফেসবুক জিনিসটাও আমি তেমন একটা ব্যবহার করি না। এজন্যই এই ব্যাপারে তেমন একটা জ্ঞানও রাখি না।

প্রকৃতিতে সন্ধ্যা নামছে। চারপাশ আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে আসছে। বাসার সামনের মসজিদে আযান ভেসে এলো… আল্লাহু আকবর আল্লা…হু আকবর…

নীচে নেমে এলাম। ততক্ষণে মনের সাথে শক্ত একটা বোঝাপড়া হয়ে গিয়েছে আমার। এত সহজে কিছুতেই হাল ছাড়বো না আমি। কোনো অপরাধ না করেই বিপ্লবের মতো একটা কালসাপের কাছে কিছুতেই নিজেকে হেরে যেতে দিব না। এজন্য যা যা করতে হয় আমি করবো।

সুরমা ফিরে এসেছে। আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো। বললো, ‘কীরে এই অসময়ে ছাদে গিয়েছিলি যে!’ আমি হেসেই প্রত্যুত্তর দিলাম। বেশি কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। অযু করে নামাজে দাঁড়ালাম। এই বিপদে আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কারো কাছেই আশ্রয় চাইবার কোনো মানে হয় না। তিনি যদি সাহায্য করেন, একটা না একটা উছিলা আমাকে ঠিকই বাতলে দিবেন। তাই তার কাছেই নিজেকে উজাড় করে সাহায্য কামনা করলাম।

নামাজ থেকে উঠতে না উঠতেই মোবাইল বেজে উঠলো আবার। আমার অসহ্য লাগছে। এখন কিছুতেই কারো সাথে কথা বলার অবস্থায় নেই আমি। তবু দেখতেই হলো কে ফোন করেছে!

ফোন করেছে মিথিলা, আমার কলেজের বান্ধবী। আমি ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশে মিথিলার উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ‘হ্যালো নীরা…ফেসবুক দেখেছিস? বিপ্লব কী করেছে দেখেছিস?’

আমি স্তম্ভিত। খবরটা তাহলে কারোরই আর জানতে বাকি নাই! অবশ্য তাই তো হওয়ার কথা! বিপ্লব পোস্টটা পাবলিক করে দিয়েছে। সবাই তো জানবেই!

আমার কলেজের বান্ধবীরা মোটামুটি সকলেই সুমনের সাথে আমার রিলেশনশিপের ব্যাপারটা জানে। সুমন যে আমাকে সন্দেহ করে বসে আছে, আর আমি যে তার মাধ্যমেই এই মহার্ঘ্য খবরটা জেনেছি…এটা আর মিথিলাকে জানাতে গেলাম না। এক রাশ তিতকুটে স্বাদে মুখটা ভরে গেল আমার। কুঁকড়ানো অনুভূতি নিয়ে বললাম, ‘হুম জানি!’

‘জানিস? কী বলছিস? একের পর এক আজেবাজে ছবি পোস্ট করে যাচ্ছে আর তাতে কী সব নোংরা কথাবার্তা! সবগুলো দেখেছিস?’

আমার মাথায় আবার বাজ ভেঙে পড়লো। একের পর এক ছবি মানে? আমি তো শুধু একটা ছবির কথাই জানি! মিথিলাকে সেটা বলতেই বললো, ‘শিগগিরই ওর প্রোফাইলে ঢুকে দ্যাখ! তোর যেখানে যত ছবি পেয়েছে সবগুলোর সাথে নিজেকে জুড়ে দিয়ে এডিট ফেডিট করে কী সব আজেবাজে ছবি বানিয়েছে দ্যাখ শুধু!’

মাথাটা একেবারে ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে আবার। আমার এত ছবি বিপ্লব কই থেকে পেল? আমি তো ফেসবুকে তেমন একটা ছবি টবি দিই না! বললাম, ‘এই দাঁড়া দাঁড়া! আমার ছবি বিপ্লব কোথা থেকে পাবে? আমি কি ফেসবুক তেমন ব্যবহার করি নাকি? ব্যবহারই করি না…ছবি দিলাম কখন?’

‘আহা…তুই না দিলে কী হবে? আমাদের বান্ধবীদের গেট টুগেদারের ছবি অনেকসময় পোস্ট করা হয় না? এই তো গতবার সুপ্তির বাসায় যে গেট টুগেদারটা হলো সুপ্তি তো কতগুলো ছবি দিলো ফেসবুকে! সেখানে তোর কিছু সুন্দর সিঙ্গেল ছবিও ছিল। বিপ্লব সেই ছবিগুলোই তো নিয়েছে দেখলাম। সেগুলোর পাশে নিজের মুখটাকে কী যে বিশ্রিভাবে জুড়ে দিয়েছে বদমাশটা, খালি দ্যাখ একবার!

আমার রাগে গা জ্বলে গেল এবার। চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম, ‘আমি নিজে নিজের ছবি দিই না, সুপ্তিকে কে বলেছে আমার ছবি দিতে?’

মিথিলা আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললো, ‘শোন এখন এক জায়গার রাগ আরেক জায়গায় দেখিয়ে কাজ নেই। তুই এক কাজ কর! আচ্ছা…ভালো কথা, সুমন জানে এসব?’

আমি এই দুঃখেও করুণ হাসি হাসলাম। বললাম, ‘এতক্ষণে এই কথা জিজ্ঞেস করছিস? জিজ্ঞেস কর যে, আমার বালুতে গড়া খেলাঘরটা এখনো টিকে আছে কী না! জগতে যত গ্লানি যত অপমান সবকিছুর কালি নিজের গায়ে লাগানোর জন্যই তো মেয়েমানুষের জন্ম হয়! পুরুষদের কাজই তো হচ্ছে, হয় সেসব কালি নারীর গায়ে লাগিয়ে দেওয়া… নয় তো আঙ্গুল উঁচিয়ে বলা…ছি! তোমার গায়ে এত ময়লা!’

মিথিলা কিছু সময় চুপ করে থাকলো। তারপর বললো, ‘তুই কি সাইবার ক্রাইম সম্পর্কে জানিস কিছু?’

আমি অল্প অল্প শুনেছিলাম এটা সম্পর্কে। খুব ডিটেলে কিছু জানি না। বললাম, ‘তেমন ভালো জানি না। কেন হঠাৎ এই কথা?’

‘আমাদের সুপ্তির বাবাই তো পুলিশের বড় অফিসার। সুপ্তির কাছে শুনেছি উনি নিজেই নাকি সাইবার ক্রাইমের দুটো কেস ইনভেস্টিগেট করেছেন। তুই একবার আংকেলের সাথে কথা বল। আংকেল তো ঢাকায় আছেন। ফোনে কথা বলতে হবে। তার আগে সুপ্তির সাথে কথা বল।’

সুপ্তির বাবা নিয়াজ মোরশেদ পুলিশের বেশ উচ্চপদস্থ অফিসার। উনার পোস্টিং এখন ঢাকায়। ফ্যামিলি এখানে থাকে।

প্রস্তাবটা বেশ মনে ধরলো আমার। মনে মনে আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা জানালাম। এই তো! তিনি আমাকে উপায় বাতলে দিয়েছেন!

(৪৫)

এর পরের কয়েকটা দিন ভীষণ ব্যস্ততায় কাটলো।

মিথিলা ফোন রাখার পরপরই সুপ্তিকে ফোন দিলাম। একবার রিং হতেই সাথে সাথে ফোনটা ধরলো সুপ্তি। ফোন ধরেই বললো, ‘হ্যাঁ বল নীরা। কেমন আছিস তুই?’

সুপ্তির গলা একটু একটু কাঁপছে। এই কম্পন সবার টের পাওয়ার কথা না। আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলেই ব্যাপারটা  ধরতে পারলাম। বেশ বুঝতে পারলাম, আমার আর বিপ্লবের ছবি নিয়ে ফেসবুকীয় ঝড়ের হাওয়া ওর কাছেও চলে গিয়েছে। আমি এখনো জানি কী না…কী চিন্তাভাবনা করছি এসব নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তোলার জন্য মুখিয়ে আছে সুপ্তি। আমি বললাম, ‘সব তো জানিস তাই না? আমার আর বিপ্লবের যুগলবন্দি ছবির ব্যাপারে?’

‘হ্যাঁ জানি মানে! এ্যাই এসব কীরে? বিপ্লব হারামজাদার এত্ত বড় সাহস! নীরা সরিরে তোর কয়েকটা সিঙ্গেল ছবি আমিই দিয়েছিলাম ফেসবুকে। হারামজাদা শয়তান গিরগিটিটা সেই ছবিগুলো নিয়ে যে এরকম একটা কান্ড করবে কল্পনাও করতে পারিনি!’

‘হুম, এবারে বুঝেছিস তো কেন আমি ফেসবুকে ছবি দিতে চাই না! আর দিয়েছিস ভালো কথা, সেই ছবি কেউ পাবলিক করে পোস্ট করে?’

‘পাবলিক করিনি তো রে! ছবি কাস্টমস করাই ছিল! আমার ফ্রেন্ডলিস্টের বন্ধুরা ছাড়া আর অন্য কারো সেই ছবি দেখতে পারার কথা না!’

‘আচ্ছা, তাহলে বিপ্লব তোর বন্ধু হলো কবে থেকে? বিপ্লবকে তো তুই কলেজে একদমই দেখতে পারতি না!’

‘দূর! ঐ শালা আমার লিস্টে ঢুকবে এত ক্ষ্যামতা!’

‘তাহলে ঐ শালার অন্য কোনো শালা তোর ছবি বিপ্লবের কাছে সাপ্লাই করেছে, বুঝতে পেরেছিস?’

‘হুম…সেটাই হবে! কী ডেঞ্জারাস! ঘরের শত্রু বিভীষণ!’

‘আচ্ছা বাদ দে এসব। ঘর থাকলে তাতে বিভীষণও থাকবে। তুই আমাকে বল, আংকেল কি এর মধ্যে বাসায় আসবেন? খুব রিসেন্টলি?’

‘বাবা তো প্রতি মাসেই আসে। কখনো দু’বার কখনো তিনবার। তবে কাজের চাপ তো অনেক বেড়ে গেছে। এখন ঘন ঘন আসতে পারে না। কেন বলতো কী ব্যাপার?’

‘মিথিলা বলছিল, আংকেল সাইবার ক্রাইমের দুটো কেস নাকি তদন্ত করেছিলেন! আমি সেই ব্যাপারে একটু জানতে চাইছিলাম। আমি তো তেমন কিছু জানি না এসব ব্যাপারে! কীভাবে অভিযোগ দাখিল করবো…কার কাছে কতদিনের মধ্যে করতে হবে… এসব একটু জিজ্ঞাসা করতাম আংকেলের কাছে।’

‘মিথিলা তো ভালো কথা মনে করেছে রে! আমার নিজেরই তো ব্যাপারটা মাথায় ছিল না! হ্যাঁ আব্বু তো এরকম দুটো ইম্পর্টেন্ট কেস ইনভেস্টিগেট করেছিল। একটা ভিডিয়ো ভাইরালের বিষয় ছিল আর আরেকটা সম্ভবত ছিল ফেসবুক আইডি হ্যাকিং রিলেটেড।ম্যারিড একটা মেয়ের একটা ভিডিয়ো ভাইরাল করেছিল তার বয়ফ্রেণ্ড। মেয়েটা বাপ-মায়ের পছন্দে বিয়ে করে ফেলাতে ছেলেটা তার ওপরে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। তাই ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের একটা ভিডিয়ো ফেসবুকে ছেড়ে দিয়েছিল। ভিডিয়োতে মেয়েটার মুখ বোঝা যাচ্ছিল না। ছেলেটা লিখেছিল তার প্রাক্তন গার্লফ্রেণ্ড এভাবেই নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে তার কাছে! যদিও মেয়েটা দাবী করেছিল ভিডিয়োর মেয়েটি সে নয়। এটা অন্য কেউ। ছেলেটা তার ক্ষতি করার জন্য অন্য কারো সাথে কুকাজ করে তার নামে ছড়িয়েছে।

মেয়েটা সাইবার ক্রাইম ইউনিটে রিপোর্ট করেছিল। আব্বু এটার ইনভেস্টিগেশনের দায়িত্বে ছিল। তবে এই কেস সাইবার ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় লেগেছিল। কারণ মামলা চলাকালীন সময়ে মেয়েটার অভিভাবক অর্থাৎ তার মা-বাবা বেঁকে বসেছিলেন। তারা কেসটা চালাতে চাইছিলেন না। কারণ এই কেসের বিষয় সামনে এলে মেয়েটার সামাজিক সম্মান বলে কিছুই থাকবে না। শশুরবাড়িতে জানাজানি হয়ে যাবে, স্বামী আর ঘরে নিতে চাইবে না… ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু মেয়েটা খুব স্ট্রং ছিল। তার জেদেই শেষমেষ মামলা চলেছিল এবং মেয়েটার সেই এক্স বয়ফ্রেন্ডের সাজা হয়েছিল।’

আমি গল্পে ডুবে গিয়েছিলাম। সুপ্তি থামতেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর মেয়েটার স্বামী… শশুরবাড়ি? তারা মেনে নিয়েছিল সবকিছু?’

‘এত কিছু আর শোনা হয়নি আমার। তবে মেনে নিয়েছিল হয়ত পরে। যাকগে, এখন তুই শোন। বাবা কবে আসবে সেই অপেক্ষায় থেকে কাজ নেই। তুই বাবার সাথে ফোনে কথা বল। ইন্ট্রোডাকটরি পার্টটা আমিই বলে দিব। ওটা তোর বলার দরকার নাই। আমি ফোনে কথা বলার পরে তুই নিজের পরিচয় দিয়ে বাদবাকিটা বলবি। মানে তুই কী করতে চাইছিস। তুই তো নিশ্চয়ই শয়তানটাকে ছাড়বি না, তাই না? তাহলে অতি শিগগিরই তোকে সাইবার ইউনিটে অভিযোগ জানাতে হবে। দেরি করিস না। অলরেডি দেরি করে ফেললি কী না কে জানে! আব্বুর কাছে শুনেছিলাম, সাইবার ক্রাইম সংঘটিত হলে যত দ্রুত অভিযোগ জানানো হবে তত ভালো।’

‘কেন?’

‘কারণ যে ডিভাইস থেকে বিপ্লব এই ছবিগুলো পাঠিয়েছে সেটাকে সে পাল্টে ফেলতে পারে। তাহলে ইনভেস্টিশনে সময় লেগে যাবে। অনেক সময় প্রমাণ করতেও পারা যায় না। অর্থাৎ আসামী ফাঁকি মেরে কেটে পড়তে পারে। কাজেই দেরি করিস না। তুই ফোন রাখ। আমি আগে আব্বুর সাথে কথা বলে নিই। তারপর তোকে জানাচ্ছি!’

সুপ্তি ফোন রেখে দিলো। ওর শেষের কথাগুলো আমার মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগলো। এতকিছু তো ভেবে দেখিনি! ডিভাইস পালটে ফেললে অভিযোগ প্রমাণ করা ঝামেলা হতে পারে? যে চালবাজ কুচক্রী ছেলে! অলরেডি পালটে ফেলেছে কী না কে জানে! ফেললে ফেলুক। আমি এত সহজে ওকে ছাড়ছি না! নিশ্চয়ই সেরকম কিছু হলেও উপায় একটা না একটা থাকবেই!

আমি আজ ফোনে কথাবার্তা বলার জন্য একটু পর পরই ছাদে চলে যাচ্ছি। বুঝতে পারছি কাজটা ঠিক হচ্ছে না। বাসার কেউ লক্ষ করলে ধন্দে পড়ে যাবে। কিন্তু বাসায় অন্য কোথাও তো আর এসব আলাপ চালানো যায় না! সুপ্তির সাথে কথা শেষ করে এসে ঘরে ঢুকলাম।

সুনেত্রা নিজের বিছানায় শুয়ে শুয়ে কীসের যেন একটা বই পড়ছে। ওকে সানজিদার বাসায় নিয়ে যাওয়ার কথাটা আজকেই বললাম। এদিকে আমি নিজেই তো ফ্যাসাদে জড়িয়ে গেলাম! এই ফ্যাসাদ থেকে কবে যে মুক্তি পাই কে জানে! তবু সুনেত্রার ব্যাপারটাতেও দেরি করা যাবে না। বেশি দেরি করলে সুনেত্রার অসুস্থতা বাড়তে বাড়তে কোথায় যাবে কে জানে!

সুরমা টেবিলে বইখাতা গোছাচ্ছে। আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই মুখ তুলে চাইলো। চোখেমুখে একটু কি চিন্তার ছাপ দেখলাম? বুঝতে পারছি না।

আমি আমার টেবিলে মোবাইল ফোনটা রেখে বিছানায় একটু কাত হলাম। সুরমার দিকে তাকিয়ে অবাক হচ্ছি।  কেমন একটু যেন ইতঃস্তত করছে। মনে হচ্ছে কোনো ব্যাপারে বুঝি দ্বিধায় ভুগছে।আমিই বললাম, ‘কীরে সুরমা কিছু বলবি?’

সুরমা অবশেষে এই দোটানা থেকে মুক্তি পেল। খলবলিয়ে বলে উঠলো, ‘না…মানে ইয়ে…তুই তো দেখেছিস তাই না বিপ্লব কী করেছে?’

আমি অবাক। বললাম, ‘তুইও দেখেছিস? বিপ্লব আছে নাকি তোর ফ্রেন্ডলিস্টে?’

‘মাথা খারাপ! আবার ওর মতো শয়তানকে ফ্রেণ্ড বানাতে বলছিস? আমি ব্লক করে রেখেছিলাম ওকে। আজ শয়তানটা আমাকে ফোন করেছিল। নাম্বারটা চিনতে পারিনি। পারলে কিছুতেই ফোন ধরতাম না। ফোন করেই বললো, আমাকে নিয়ে ও মাথা ঘামাচ্ছে না। কিন্তু তোর জীবনটা নষ্ট করতে না পারলে নাকি ওর মরেও শান্তি নাই। আর তার মাস্টারপ্ল্যান নাকি সে করেও ফেলেছে অলরেডি! ফেসবুকে সেই প্ল্যান এখন সবার হাতে হাতে চলে গেছে!

কথাটা শুনেই তাড়াতাড়ি ওকে আনব্লক করলাম। আর করে যা দেখলাম তাতে তো আমার মাথাই খারাপ হয়ে গেল!’

আমি কী আর বলবো! চুপ করে শুনছি সুরমার কথা। সুরমা ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বলে চলেছে।

‘কিন্তু একটা জিনিস বুঝতে পারলাম না! বিপ্লব কেন তোর পেছনে লেগেছে? ও কি তোকে লাইক করতো? পাত্তা টাত্তা না পেয়ে এসব করছে?’

আমি কাঁধ ঝাঁকালাম। বললাম,‘পাত্তা না পেয়ে যা টিকা টিপ্পনী দেওয়ার ছিল তা বহুত আগেই দিয়ে দিছে। সেই কলেজ লাইফের কথা! এতদিনেও সেই ছ্যাকার জ্বালা ভুলতে পারবে না এত নিষ্ঠাবান আশিক কবে ছিল বিপ্লব?’

তারপর একটু চুপ করে থেকে এতদিনের লুকিয়ে রাখা রহস্যটা এই প্রথম কারো কাছে উন্মোচিত করলাম। সংক্ষেপে জানালাম কীভাবে বিপ্লবকে ধরার কাজে পুলিশকে সাহায্য করেছিলাম। পুলিশকে না জানিয়েই কীভাবে একা একা চলে গিয়েছিলাম কলেজ ক্যাম্পাসে। সেদিনের কথা…মোবাইলে জোর করে তোলা ছবি…হঠাৎ ঘটনাস্থলে পুলিশের নাটকীয় আগমন…সব একে একে বর্ণনা করলাম।

সুরমা চোখ গোল গোল করে পুরোটা শুনলো। তারপর অশ্রুসিক্ত চোখে আমার হাতদুটো ধরে গভীর আবেগে বললো, ‘নীরা, যদি আরেকটা জীবন পেতাম বাঁচার জন্য, তাহলে আমিও তোর মতো ভালো একটা মেয়ে হতাম! অন্যের উপকারের জন্য কীভাবে নিজেকে এতটা ঝুঁকির মুখে ফেলা যায়…কখনো কল্পনাও করতে পারতাম না… বিশ্বাস কর।’তারপরে চোখ মুছে শক্ত গলায় বললো, ‘তুই বিপ্লবকে ছাড়বি না! কিছুতেই না! আবার ধরায়ে দে শয়তানটাকে! এবারে আমি আছি তোর সাথে মনে রাখিস!’

আমি সুরমার হাতদুটোতে মৃদু চাপ দিলাম। কী করতে যাচ্ছি, আপাতত আর সেই ব্যাপারে কাউকেই কিছু বলার দরকার নেই। এই যুদ্ধটাও আমার একার। তবে এবারে আমি একা নই, এটা ভেবে স্বস্তি পাচ্ছি।

সুনেত্রার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সে বই পড়া ছেড়ে কানে হেডফোন গুঁজে কী জানি শুনছে। সেজন্যই আমাদের এই দীর্ঘ ব্যক্তিগত আলাপচারিতা ওর কানে ঢোকেনি। এটা একদিক দিয়ে খুব ভালো হয়েছে।

সুরমার সাথে কথা শেষ করে আবার নিজের কাজে মন দিলাম। মোবাইল ঘেঁটেঘুটে বিপ্লবের সবগুলো পোস্টের স্ক্রিনশট নিলাম। প্রতিটি কমেন্টেরও স্ক্রিনশট নিলাম। বিপ্লব একা কেন দোষী হবে? যারা আমার দুর্দশার মজা চাখছে, তাদেরকে আমি ছেড়ে দিব নাকি? মজা চাখার জন্য দুই এক রাতের হাজতবাস করাতে পারলেও তো আমার কিছুটা কষ্ট উসুল হয়!

এসব করতে করতেই সুপ্তির ফোন পেলাম। বললো, ‘হ্যাঁ, নীরা আব্বুর সাথে কথা হলো। আমি ইন ডিটেল প্রায় পুরোটাই বলেছি। এখন তুই তোর পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে যদি কিছু বলতে চাস তো বল। আব্বুর নাম্বার টেক্সট করে দিচ্ছি। আর শোন, আব্বুও বললো তাড়াতাড়ি রিপোর্ট করতে হবে। দেরি কিছুতেই করা যাবে না!’

আমি প্রায় সাথে সাথেই আংকেলকে ফোন দিলাম। ব্যস্ত মানুষ উনি। হয়ত পরে ফোন দিলে কথা বলার সুযোগ পাবো না।

একটু সংকোচ হচ্ছিলো কথা বলতে। আগে আংকেলের সাথে কথা হয়নি। এত বড় পোস্টে আছেন! মেয়ের বান্ধবী হিসেবে প্রথম আলাপেই এসব কথা বলছি, তাও আবার টেলিফোনে! কেমন যেন লজ্জা পাচ্ছিলাম।

ওপাশ থেকে গুরুগম্ভীর গলায় হ্যালো শুনে আরো কুঁকড়ে গেলাম। আঙ্কেলকে নিজের পরিচয় দিতেই উনি কিন্তু খুব সহজ স্বাভাবিক কথায় আমার সব সংকোচ দূর করে দিলেন। প্রথমে আমার পড়াশুনার কথা জিজ্ঞেস করলেন। খুব ভালো ছাত্রী আমি, এটা বলেও খুব এপ্রেসিয়েট করলেন।

তারপর বললেন, ‘শোনো আমি সুপ্তির কাছ থেকে ব্যাপারটা জেনেছি। তুমি এটা নিয়ে একদম দুশ্চিন্তা করবে না বুঝেছ? আমাদের দেশে বাইরের দেশে মানে পুরো ওয়ার্ল্ডেই এখন সাইবার ক্রাইম খুব পরিচিত একটা শব্দতে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, সেই সাথে বাড়ছে প্রযুক্তি রিলেটেড অপকর্ম। কেউ যদি এই সাইবার ক্রাইমের শিকার হয়, তাহলে তার কাজ হচ্ছে একটুও দেরি না করে নিকটবর্তী পুলিশ স্টেশনের সাইবার ইউনিটে গিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসা।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আংকেল সব জেলাতেই কি পুলিশস্টেশনে এই সাইবার ক্রাইম ইউনিট থাকবে?’

‘থাকার তো কথা! ঐ যে বললাম, এই রিলেটেড ক্রাইম বাড়ছে। আর ক্রাইম যেহেতু বাড়ছে, সেটাকে প্রতিরোধ করার জন্য বেড়া দেওয়ার তো ব্যবস্থা করাই হবে! তাই না? আর তুমি যদি ফিজিক্যালি না যেতে চাও তাহলেও ব্যবস্থা আছে। তুমি দেশের যেকোন প্রান্ত থেকেই এই অভিযোগ জানাতে পারবে। ইমেইলের সাহায্যে অভিযোগ জানাতে পারো। পুলিশ সদরদপ্তরের নির্দিষ্ট একটা নাম্বারে ফোন করে অভিযোগ জানাতে পারো। হটলাইনে ফোন করেও অভিযোগ জানাতে পারো। আরেকটা উপায় আছে। এটাও বেশ কার্যকর। ফেসবুকে Police Cyber Support for Women PCSWনামে একটা পেজ আছে। এখানে অভিযোগ জানাতে পারো নিজের নাম পরিচয় গোপন করে। এটা খুবই এক্টিভ একটা সেবাদান ইউনিট। এখান থেকে তুমি আইনি সেবার ব্যাপারেও পুলিশের সহযোগিতা পাবে।’

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে শুনছিলাম। আংকেল আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখন তুমি বলো তুমি কী চাও? কীভাবে অভিযোগ জানাতে তুমি সবাচ্ছন্দবোধ করবে?’

আমি এত এত উপায়ের কথা শুনে থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম। এতক্ষণ উপায়ই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এখন কতদিকে রাস্তা খুলে গেল! বললাম, ‘আংকেল আমার তো মনে হচ্ছে আগে ফিজিক্যালিই চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।’

‘খুব ভালো কথা। যাও তাহলে। এখনই যাও। যদিও রাত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই কাজে দেরি করলে অপরাধী সতর্ক হয়ে যেতে পারে। সে পোস্ট ডিলিট করে ফেলতে পারে। ডিভাইস চেঞ্জ করে ফেলতে পারে। ডিভাইস চেঞ্জ করে ফেললে ফরেনসিক পরীক্ষায় কিছুই প্রমাণ করা সম্ভব হবে না।’

আমি বললাম, ‘আংকেল আমি স্ক্রিনশট নিয়ে রেখেছি!’

আংকেলের হাসি শুনলাম। বললেন, ‘আজকাল সবকিছুই বানানো যায়। স্ক্রিনশট বানানো এমন কী কঠিন ব্যাপার! অপরাধী দাবী করে বসতে পারে তুমি স্ক্রিনশটটা বানিয়েছো। তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁসানোর জন্য। তখন তুমি এটার সত্যতা দাবী করতে কী প্রমাণ দিবে?’

আমি থ! এসব কী শুনছি? এতকিছু কি জানি নাকি? আমি তো ভেবেছিলাম, এই স্ক্রিনশট দিয়েই বাজিমাত করে দিব! আর এদিকে কত কঠিন ফাঁক ফোকড়…খানাখন্দ!

‘আচ্ছা সে যাক! এখন তুমি রওয়ানা দাও। কাউকে সাথে নিয়ে যেও। বিশ্বস্ত কাউকে। কারণ যে অনলাইনে তোমার ক্ষতি করতে পারে, সে সামনাসামনিও ক্ষতি করতে পারবে! আমি ওখানকার সাইবার ইউনিটে দায়িত্বরত অফিসারের সাথে কথা বলে নিচ্ছি। তুমি কোনো চিন্তা করো না। যা হেল্প দরকার হয়, সরাসরি আমাকে বলবে!’

আংকেলকে ধন্যবাদ দিয়ে সুরমাকে সব বললাম।

সুরমা বললো, ‘আমার মনে হয় তোর অন্য কাউকে সাথে নিয়ে যাওয়া দরকার। পুলিশের কাছে যাওয়ার ব্যাপার না হলে আমিই যেতাম। কিন্তু আমি হলাম জেলখাটা আসামী। আমি সাথে গেলে তোর অভিযোগই পাতলা হয়ে যাবে! সুমন…সুমন কোথায়? ওকে আসতে বল! ওকে নিয়ে যা!’

‘মরছে সুমন! তুই সাথে চল, একপাশে সরে থাকবি!

‘ওহ…আচ্ছা…না না আমি না…চাচুকে নিয়ে যা!’

‘কিন্তু ছোটমামা তো একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকবে! এত প্রশ্নের জবাব কে দিবে?’

‘তুই রেডি হতে থাক। আমি সংক্ষেপে জানাচ্ছি চাচুকে। বাবাকে আপাতত কিছু বলার দরকার নেই। পরে সময়সুযোগ মতো বললেই হবে!’

সুরমা ছোটমামার ঘরের দিকে রওয়ানা দিলো। আমি নিজের আইডিকার্ড, স্টুডেন্টকার্ড সব সাথে নিলাম। মোবাইলটা ভরে নিলাম সযত্নে। প্রায় পনের বিশ মিনিট পরে সুরমা ঘরে ঢুকলো। সাথে ছোটোমামা। ছোটোমামার চোখমুখ বিস্ফোরিত হয়ে আছে। আমি বললাম, ‘মামা প্লিজ, এখন একশো একটা প্রশ্ন করে মাথা গরম করে দিও না। এমনি সারাদিনে বহুত প্যারার মধ্যে আছি! তুমি জাস্ট আমার সঙ্গে চলো!’

ছোটোমামা বলল, ‘হ্যাঁ চল চল! চিন্তা করিস না…সব ঠিক হয়ে যাবে!’

রিক্সায় উঠে মনে মনে ভাবলাম, ‘সুমন…তোমার সব অবহেলা মেনে নিলাম! কিন্তু মনেও রেখে দিলাম জেনে রেখো…’

(৪৬)

পুলিশস্টেশনে যেতে যেতে কম করে হলেও চারজনের ফোন পেলাম। চারজনই আমার কলেজ আর মেডিক্যাল কলেজের বন্ধু। রিক্সায় বসে কথা বলতে সমস্যা হচ্ছিলো। এক পর্যায়ে ভাবলাম আপাতত ফোনটা বন্ধই করে রেখে দিই। এখন আমার একটু বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন। পুলিশের কাছে গুছিয়ে বলতে হবে সবকিছু।

আমি সবসময়ই মনে করতাম, আমি চুপচাপ অন্তর্মূখী স্বভাবের মানুষ। সেজন্য আমার বন্ধুবান্ধবও কম। স্কুলে থাকতে তো তেমন একটা মিশতামই না কারো সাথে। অন্যরা ভাবতো আমি মুডি। ধীরে ধীরে নিজেও সেটাই বিশ্বাস করতে শুরু করে দিয়েছিলাম। কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে, আমি আসলে মেশার টেকনিকটাই জানতাম না। আমার অন্য সহপাঠীরা নিজেদের মধ্যে হাসি আনন্দ আর গল্পে মশগুল হয়ে সময় কাটাতো। একে অন্যের গায়ে হাসতে হাসতে ঢলে পড়তো। আমারও ইচ্ছে করতো বন্ধুদের সাথে ওরকম আনন্দময় সময় কাটাতে।

কিন্তু পারিবারিক হীনমন্যতা আর মা-বাবার পরষ্পরের প্রতি বিদ্বেষ আমাকে ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে রাখত সবসময়। চাইলেও নিজের খোলশ খুলে বের হতে পারতাম না আমি।

মামাদের পরিবারে এসে প্রথমবারের মতো সুস্থ সুন্দর একটা পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছি। ধীরে ধীরে হয়ত নিজেরই অজান্তে আমার শরীরের সাথে আটকে থাকা জড়তা নামের খোলশটাকে ছুঁড়ে ফেলতে পেরেছি। দু’একজন করে বাড়তে বাড়তে এখন আমারও বেশ ভালোই বন্ধুবান্ধব হয়েছে। আর তারা যে শুধু নামেই আমার বন্ধু তা নয়। ছোটখাট বিভিন্ন ইস্যুতে আমার পাতে ঝোল টেনে নিয়ে অনেক সময়ই ওরা আমাকে সমর্থন করেছে। আমি কৃতজ্ঞ আমার বন্ধুদের কাছে…সৃষ্টিকর্তার কাছে।

মিথিলা আর সুপ্তির কথা তো ফুরোতেই চাইছে না। দুজনেই পারলে আমার কাছে চলে আসে। আমার মেডিক্যালের বন্ধু ইমনও একবার ফোন করেছে। গতকাল সুমনের দেওয়া ট্রিটে ইমনও উপস্থিত ছিল। কাজেই সে ধরেই নিয়েছে, আমি সুমনের সাথেই পুলিশস্টেশনে যাচ্ছি।

ফোন করেই বলেছে, ‘নীরা, যা বলার তোমাকেই কিন্তু বলতে হবে বুঝেছো? সুমন যাচ্ছে তো সাথে? সুমন তো বিপ্লবকে তোমাদের কলেজ লাইফ থেকেই চিনতো, কাজেই এটা একটা পজিটিভ ব্যাপার হবে। বিপ্লব কেমন ছেলে সেই ব্যাপারে সুমনের ক্লারিফিকেশনটা কাজে লাগবে। সেও যেন কথা বলে বুঝতে পেরেছো?’

আমি সুমনের ব্যাপারে কিছু বলিনি ইমনকে। এই ঝামেলার মধ্যে সুমনের ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।

বিপ্লব আমাকে ট্যাগ করতে পারেনি। কিন্তু প্রতিটা ছবিতে মেনশন করতে পেরেছে। কাজেই আমার পরিচিত অনেকের কাছেই এই ছবির খবর পৌঁছে গেছে!

পনের মিনিটের মধ্যেই আমরা পুলিশস্টেশনে পৌঁছে গেলাম। ছোট শহরের এই এক সুবিধা। ট্রাফিক জ্যামে বসে দিন পার করতে হয় না।

রিক্সাভাড়া মিটিয়ে পুলিশস্টেশন ঢোকার আগে ছোটমামা একটু দুঃখ করেই বললো, ‘আমাদের দুই মেয়েকে নিয়ে পুলিশস্টেশনের চক্কর কাটতে হলো! সুরমাকে নিয়ে তো সেই চক্কর একেবারে ধারাবাহিক হয়ে গিয়েছিল। তোর বেলাতে তেমনটা না হলেই হয়!’

আমি কিছু বললাম না। সত্যিই তো! ভাগ্য কেন বারবার আমাদেরই এমন পিছু ধাওয়া করবে?

ভেতরে ঢুকে ভাবছিলাম, সাইবার ক্রাইম ইউনিট আছে কী না। আমি কেন যেন ধরেই নিয়েছিলাম যে, এরকম কোনো ইউনিট আদতে এখানে নেই। সুপ্তির বাবা হয়ত ঠিকমত না জেনেই বলেছেন। এই ছোট শহরে ক্রাইমও হয়ত খুব বেশি একটা হয় না, সেখানে এদের কীসের দায় পড়েছে অনলাইনের ক্রাইম নিয়ে ইউনিট খুলে বসার?

গেটের কাছে একজন হাবিলদার গোছের লোক টুলে বসে কান খোঁচাচ্ছিল। তার কাছেই জিজ্ঞেস করলাম সাইবার ক্রাইম ইউনিট কোথায়! ভাবছিলাম, এখনই হয়ত সে বিস্ময়ভরা চোখে আমার দিকে তাকাবে। জিজ্ঞেসও করে বসতে পারে, কী সেটা? কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে লোকটা বিরসমুখে একটা দরজা দেখিয়ে দিলো। তারপর এদিকে ওদিকে চেয়ে খুবই আপত্তিকর ভাবে জিজ্ঞেস করলো, ‘কী ভিডিয়ো ছাড়ছে নাকি ট্যাকা চায়?’

উত্তরে ছোটমামা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো, আমি হাত ধরে হিড় হিড় করে ছোটমামাকে সেই দরজার দিকে টেনে নিয়ে চললাম। যেতে যেতে হাবিলদার ব্যাটাকে বললাম, ‘যাওয়ার সময় ভিডিয়োটা আপনাকে দেখাবো!’

ছোটমামা চোখ পাকিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এটা তুই কী বললি?’

‘বাহ! দেখছো না, লোকটা কত আশা করে আমার দিকে তাকিয়েছিল। বেচারাকে নিরাশ করি কীভাবে?’

সাইবার ক্রাইম ইউনিটের পুলিশ অফিসারটিকে আমার বেশ পছন্দ হলো। অল্পবয়সী স্মার্ট একজন অফিসার। আমরা ভেতরে গিয়ে ঢুকতেই আমাদেরকে সামনের দুটি চেয়ার দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ‘প্লিজ হ্যাভ আ সিট। বলুন কী করতে পারি? কোনো অভিযোগ জানাতে এসেছেন?’

যথেষ্ট আন্তরিক। সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকে নিয়ে তো অভিযোগের সীমা নেই। কাজেই এমন উষ্ণ অভ্যর্থনায় একটু হকচকিয়েই গেলাম। অফিসারটি সোজা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অভিযোগ কি আপনার?’

বললাম, ‘জি আমার। উনি আমার মামা। আমার সঙ্গে এসেছেন।’

‘ওহ আচ্ছা! আপনি কি আমার কাছেই বলবেন নাকি কোনো লেডি অফিসারকে পাঠাবো?’

‘না না আপনার কাছেই বলতে পারবো অসুবিধা নেই।’

বললাম তো, কিন্তু ছোটমামার সামনে বিপ্লবের ছ্যাঁচড়ামির কথাগুলো বলতে হবে ভেবে একটু অস্বস্তি হতে লাগলো। ইতঃস্তত করতে লাগলাম। বার বার ছোটমামার দিকে তাকাচ্ছিলাম। মামাও এক পর্যায়ে বুঝতে পারলো। বললো, ‘ আচ্ছা নীরা, আমি একটু বাইরে গিয়ে বসি। তুই উনার কাছে সব কথা খুলে বল। কিছুই বাদ দিবি না বুঝলি?’

আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। অফিসারের কাছে আদ্যোপান্ত সব কথা খুলে বললাম। কলেজে বিপ্লবের পিছে লেগে থাকা থেকে শুরু করে মাদক কেসে ওকে ধরার ব্যাপারে পুলিশকে সহযোগিতা করা…বিপ্লবের সেই হুমকি…সুমনের সাথে আমার সম্পর্ক…আর শেষমেষ এই ছবি এডিটিং কেলেঙ্কারি।

অফিসার চুপ করে সব কথা শুনলেন। স্ক্রিনশটগুলো দেখলেন। তারপর উনার ল্যাপটপে ফেসবুক ওপেন করে বিপ্লবের নাম লিখে সার্চ দিলেন। ল্যাপটপের মুখ আমার দিকে ঘুরিয়ে রেখেছিলেন। আমি রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিলাম। ভয়ে ভয়ে দোয়া ইউনুস পড়ে যাচ্ছিলাম। ইস! আল্লাহ! পোস্টগুলো যেন ডিলিট না করে দেয়!

আল্লাহ্‌ আমার দোয়া শুনলেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দেখলাম, প্রতিটা পোস্টই এখনো বহাল তবিয়তে ফেসবুকে জ্বলজ্বল করছে। লাইক কমেন্ট একেবারে যেন উপচে পড়ছে! আহা! মানুষ কতই না খুশি হয় একজন মেয়েকে এভাবে অপদস্ত আর লাঞ্ছিত হতে দেখলে!

পুলিশ অফিসার আমাকে দেখিয়ে বললেন, ‘এই পোস্টগুলোর কথাই তো বলছেন?’

‘জি, এগুলোই। চার পাঁচটা ছবি দিয়েছে। প্রথম ছবিটা বিপ্লব আমার সাথে চিট করে জোর করে তুলেছিল। আর পরেরগুলো কোনোটাই আমি ওর সঙ্গে তুলিনি। এগুলো সব আমার সিঙ্গেল ছবি। সে আমাকে হেনস্থা করার জন্য সবগুলো ছবি এডিট করে নিজের ছবি আমার সাথে জুড়ে দিয়েছে। আর পোস্টের ভাষাটা দেখুন প্লিজ। আমাকে অসম্মান করার জন্য কী নোংরা ভাষা ব্যবহার করেছে!’

‘এগুলো আপনার সিঙ্গেল ছবি থেকে নেওয়া হয়েছে তার কি কোনো প্রমাণ আছে?’

আমি এই ব্যাপারে রেডি হয়েই এসেছিলাম। সাথে সাথে সুপ্তির পোস্ট বের করে আমার ছবিগুলো দেখালাম। অফিসার দেখে মাথা ঝাঁকালেন। সম্মতির ঝাঁকুনি। আমি বললাম, ‘আমার…আমার…ফ্রেণ্ড আমার ওপরে সন্দেহ করে দূরে চলে গেছে। বিপ্লব এটাই চাইছিল যাতে আমি সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হই আর আমাকে সবাই খারাপ ভাবতে শুরু করে।’

‘ফ্রেণ্ড মানে বয়ফ্রেণ্ড?’

‘জি।’

‘আচ্ছা তাহলে আপনি একটা ফর্ম ফিলাপ করুন। এটা ফরমালিটিজ। আমাদের ইনভেস্টিগেশন শুরু হয়ে যাবে আজকে… এখন থেকেই। আশাকরি তদন্ত চলাকালে আপনার সহযোগিতা আমরা পাবো। সাইবার ট্রাইবুন্যালে মামলা চললে পিছু হঠবেন না তো আবার? মানে আমাদের দেশে অনেক মেয়েই এই চাপটা নিতে পারে না। পরবর্তীতে আরো হেনস্থা হওয়ার ভয়ে মাঝপথে মামলা থামিয়ে দেওয়া খুব কমন প্র্যাক্টিস।’

আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে বললাম, ‘আমার সাথে এমন কিছু হবে না আশা করছি। পারিবারিক চাপ এলেও আমি সেটাকে আটকাতে পারবো। তবু বিপ্লব যাতে কিছুতেই পার না পায়!’

‘নিশ্চয়ই। ওকে আমরা দেখবো!’

আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা এ ধরণের অপরাধে কী রকম শাস্তি হতে পারে?’

‘অভিযোগ প্রমাণিত হলে অপরাধের ধরণভেদে সর্বনিম্ন দুইমাস এবং সর্বোচ্চ দশ বছর কারাদন্ড হতে পারে। এছাড়া সর্বোচ্চ দশ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। কখনো আবার উভয় দন্ডই হতে পারে। অর্থাৎ কারাদণ্ড এবং জরিমানা দুটোই!’

আমি মনে মনে আশা করতে লাগলাম, অভিযোগ যাতে শক্তমতো প্রমাণিত হয়!

বাসায় ফিরে এসেই দেখি, বড়মামা আর নানী উদ্বিগ্নমুখে ড্রইংরুমে বসে আছে। সুরমাকেও দেখলাম সেখানে। বুঝতে পারলাম, ঢোল ফেটে গেছে। এখন গড় গড় করে সব উগরাতে হবে আমাকে। বড়মামা আমাদের ঢুকতে দেখেই তড়বড়িয়ে বললো, ‘এ্যাই এ্যাই নীরা আর ছোটন তোরা কাউকে কিছু না বলে এভাবে পুলিশস্টেশনে চলে গেলি? কিছু একটা হলেই কি পুলিশের কাছে সটান চলে যেতে হবে? আমরা আগে শুনি বুঝি…তারপর ভেবে দেখি কী করা যায়? সেই ছেলেকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বলেও তো ওসব ছবিটবি সরিয়ে ফেলা যায়!’

আমি এই কথা শুনে বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেলাম। বড়মামা এসব কী বলছে? বড়মামা লেখাপড়া বা নিয়ম নৈতিকতার ব্যাপারে কড়া মানুষ হলেও ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড ভীতু আর খুঁতখুঁতে। সিদ্ধান্ত নিতে খুব দুশ্চিন্তায় ভোগে। সুরমার কেস চলাকালীন সময়ে দেখেছি বড়মামা কতটা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতো। উকিলসাহেব একটা বোঝাতেন, বড়মামা সেটাকে নানারকম ভাবে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে আরেকরকম বুঝে বসে থাকতো। শেষমেষ শেষ মুহূর্তে একটা তাড়াহূড়া বেঁধে যেত।

অন্যদের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম আমার মতো অন্যরাও বড়মামার এই কথাটাকে পছন্দ করেনি।

নানী তো  একটু গম্ভীর গলাতেই বললো, ‘ঐ যে শুরু হয়ে বাবুর উলটারথ! এ্যাই তুই চুপ কর! তোর যুগ শেষ হয়ে গেছে বুঝছিস? যখন যে যুগ আসে সেই যুগের সাথেই তাল মেলাতে হয়! ছোটোবেলায় পড়ছিস না…অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে! কী বুঝছিস পড়ে? খালি পরীক্ষার খাতায় গিয়া উগলাই দিছিস তাই না? নীরা যা করছে ঠিক করছে! তুই ভুলে গেছিস, এই পোলাটার জন্যই সুরমা খারাপ কাজ করছিল? ওর জীবন থেকে কতগুলা বছর হাপিস হয়ে গেল! অই পোলা আবার আমার আরেক নাতিনের পিছে লাগছে! আর তুই বলিস, চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিতে? ঐ পোলাকে বুঝায় বলবি আর সে এক্কেরে সুড়সুড় করে ছবি সরায়ে ফেলবে!

এই বুদ্ধি নিয়া তুই মাস্টারী করছিস এতগুলান বছর?’

ঘরের মধ্যে বাজ পড়ছে যেন। বড়মামা একেবারে চুপ। মেয়ের সামনে নানী যে তাকে এমনভাবে ডলাটা দিলো, এজন্য আমার খুব ইচ্ছা করছে নানীকে একটু বকা দিয়ে দিই। আবার সেই সাথে খুব খুব ইচ্ছা করছে এত সুন্দরভাবে আমাকে সমর্থন করার জন্য দৌঁড়ে গিয়ে নানীর গলা জড়ায়ে ধরি। সৃষ্টিকর্তা আমাকে মা দিয়েও দেয়নি। কিন্তু তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নাই যে, তিনি আমাকে এমন একটা নানী দিয়েছেন!

সবাই চলে যাওয়ার পর বড়মামা আমাকে ডেকে নিজের পাশে বসালো। তারপর মাথায় হাত বুলায়ে বললো, ‘মায়ের সামনে কিছুই বলতে পারলাম না। কিন্তু একজন অভিভাবক কেন ভয় পায় সেটা কি বোঝানো যায় রে মা? তুই মা-বাবার স্নেহ মমতা না পেয়ে আমাদের কাছে এসেছিস। এখন চোখের সামনে তোকে বিপদের মধ্যে ঝাঁপ দিচ্ছিস দেখে চুপ করে থাকবো? সেই বাজে ছেলেটা যদি তোর আরো ক্ষতি করে? আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপরে কি এত ভরসা করা যায়? যদি তাই যেত তাহলে তো কোনো অপরাধীই বাইরে থাকতো না! থানায় জিডি করে এসেছিস ভালো কথা। এখন দ্যাখ কিছু হয় কী না!’

আমি আর কিছু বললাম না। বড়মামার কথাগুলোও এক অর্থে ভুল না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করে চরম মূল্য দিতে হয় কতজনকে! সবসময় অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায় না একথা শতভাগ ঠিক। কিন্তু আমাদের ভীতিটাকেও নিজেদের প্রধান অস্ত্র বানায় বিপ্লবদের মতো কিছু কাপুরুষের দল! এরা সবাই যে আদতে বাঘ তা মোটেও না। কিন্তু ভয়ের চশমা চোখে থাকায় আমরা বুঝতে পারি না, কে বাঘ আর কে বিড়াল!

রাতটাও চরম উত্তেজনার মধ্যে কেটে গেল। সবসময় মনে হচ্ছিলো এই বুঝি বিপ্লব ফোন দেয়, কিছু একটা বলে! কিন্তু রাত পার হলো কোনো ফোন এলো না। সারাদিনের উত্তেজনায় মাথাটা টিপ টিপ করে ব্যথা করছিল। দুইচোখে অসহ্য জ্বালা। তাই রাতে ঘুমের আগে একটা নাপা খেয়ে ফোনটাকে বন্ধই করে দিলাম। আমার একটা সাউন্ড স্লিপ দরকার। নইলে কাল মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারবো না!

বিছানায় শুয়ে তবুও ঘুম আসতে চায় না। এপাশ ওপাশ করছি। সারাদিনের ঘটনাপ্রবাহ ঘেঁটে চলেছি। পাশে তাকিয়ে দেখি, সুরমাও জেগে আছে। আর কেমন অদ্ভুতচোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম, ‘কীরে তুই কেন জেগে আছিস? তোরও কি আমার মতো ঘুম আসছে না? বিপ্লব তোর সাথে খেলাধুলা শেষ করে এবার আমাকে পার্টনার বানিয়েছে দেখেছিস?’

একটা দুর্বল জোক করার চেষ্টা করলাম। ডিম লাইটের আলোতে সুরমার ম্লান হাসিটা নজর এড়ালো না। কিন্তু এই প্রসঙ্গটাকে একেবারে পাশ কাটিয়ে সুরমা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা কথা পাড়লো।

‘আচ্ছা নীরা, তুই কি সুমনকে ক্ষমা করতে পারবি?’

আমি চুপ। এক সেকেণ্ড দুই সেকেণ্ড…এভাবে প্রায় দশ সেকেণ্ড পার হয়ে গেল। কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। সুরমা অপেক্ষার পর বুঝতে পারলো আমি কোনো উত্তর দিব না।

তখন সুরমাই আবার বললো, ‘তুই যদি কিছু না মনে করিস আজ তোকে একটা কথা বলি। আমি জানি আমার কুকর্মের কোনো কৈফিয়ত হয় না। আর আমি কৈফিয়তও দিতে চাচ্ছি না। শুধু নিজের মনের অনুভূতিটুকু তোর কাছে তুলে ধরছি মনে করতে পারিস।

সুমনকে আমার কখনোই শতভাগ ব্যক্তিত্ববান মানুষ বলে মনে হয়নি। হতে পারে সুমনের বাবার মৃত্যুর পরে ওর মা প্রখর নিয়মতান্ত্রিক ভাবে সংসারটাকে বেঁধে রেখেছেন। এই নিয়মতান্ত্রিকতা বজায় রাখতে গিয়ে তিনি হয়ত অনেক বেশি কড়াকড়ি করেছেন একটা সময়। তার প্রখর ব্যক্তিত্বের কাছে ধামাচাপা পড়ে গেছে সুমনের ব্যক্তিত্ব। অবশ্য এটা সে নিজে কখনো বুঝতে পারেনি। শুধু বুঝতে পেরেছে ওর কাছাকাছি অবস্থান করা মানুষেরাই!

সুমন নিজে কড়া নিয়মকানুনে বড় হয়েছে। হয়ত মায়ের অধিকারবোধের ছায়ার নীচে সুমনের ইচ্ছা অনিচ্ছা অনেকসময়েই পরিস্ফূট হতে পারেনি। তাই যাকে সে ভালোবাসে, তার প্রতিও অধিকারবোধটা তীব্রভাবে ধারণ করে। সেই অধিকারবোধে আরেকজন হাঁসফাঁস করলেও তার মুক্তি মেলে না।

সুমনকে কখনো কখনো খুবই বুদ্ধিমান বিবেচক একজন মানুষ বলেই মনেহয়। কিন্তু যখন এই অধিকারবোধটা ওর মধ্যে চাগিয়ে ওঠে তখন ওর স্বাভাবিক বুদ্ধিবিবেচনা হারিয়ে যায়। ও তখন একেবারেই অন্য মানুষ!

তুই আজ এত বড় একটা বিপদ একা সামলাচ্ছিস! তুই কি সুমনের কাছে একটু সহযোগিতাও আশা করতে পারিস না?’

আমি সুরমার দিক থেকে পেছন ফিরে শুয়ে আছি।

সুরমার প্রতিটা কথা আমার কানে ঢুকেছে। ওর শেষের প্রশ্নটা আমার মগজে গিয়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, ‘অনেক রাত হয়েছে সুরমা। ঘুমা এখন! আর আমরা কেউ কারো বাস্তবতা জানি না। সুমন কোন পরিস্থিতিতে কী করেছে…আমরা তা কীভাবে আন্দাজ করতে পারি বল তো?’


আরো পড়ুন: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-৪০-৪৩)


(৪৭)

টুকটুকি বাসা থেকে ফোন দিয়েছে। খুবই আদুরে আদুরে গলায় ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে টুকটুকি বললো,

‘মা…তুমি নাকি আদ দেলি কলে বাছায় আছবা?’

আমার ভেতরে স্নেহের রিনরিনে স্রোত খুব মিহি একটা কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে গেল। রক্তকণিকায় বয়ে চলা ভালোবাসার নির্যাসটুকু চিপে নিয়ে বললাম, ‘এট্টু দেরি হবে আম্মু! তুমি না আমার লক্ষ্ণী সোনাপাখি! আজ সুন্দর হয়ে থেকো। রাঙা ফুপির হাতে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো! কেমন? আজ অনেকগুলো চকলেট নিয়ে আসবো তোমার জন্য!’

ওপাশ থেকে ফোঁপানোর মৃদু আওয়াজ পেলাম। ছোট্ট আরেকটা জিজ্ঞাসা ভেসে এলো, ‘আব্বুলও দেলি হবে?’

আমি জবাব দিতে ইতঃস্তত করতে লাগলাম। কচি মনটাকে আর আঘাত দিতে ইচ্ছে করলো না। কিন্তু মিথ্যে প্রবোধ দিতে এখনো কেমন জানি বাধো বাধো ঠেকে। তাই আমিও ছোট করে কোনোমতে বললাম, ‘না আম্মু। আব্বু একটু পরেই তোমার কাছে চলে যাবে! একটু রাঙা ফুপিকে দাও তো ফোনটা!’

‘আচ্ছা’ বলে তিনি ডাকতে গেলেন তার রাঙা ফুপি অর্থাৎ আমার ননদ মৌটুসিকে। ফুপু ভাস্তি মিলে সারাদিনে নানারকম খেলাধুলা গল্প আর মান অভিমান চলে। বাবা-মা কাজে এলেই ফুপিকে ক্ষণে ক্ষণে চোখেহারায় আমার মেয়ে। আবার ওদিকে বাবা-মা বিশেষ করে মা বাসায় ফিরে গেলেই ফুপিকে আর চেনে না তখন! মৌটুসি গাল ফুলিয়ে বলে, ‘দেখেছো এই বয়সেই তোমার মেয়ে কেমন ধড়িবাজ হয়েছে! সারাদিন আমার সাথে কত ভাব দেখায়! যেই মাকে কাছে পায়, ওমনি আমাকে আর চেনেই না! আল্লাহ্‌ গো না জানি বড় হলে কী হবে?’

আমি হাসতে হাসতে বলি, ‘আমি কিছু জানি না বাপু! মেয়ে তো আমার তার রাঙা ফুপির কাছ থেকেই সব শিখছে! এখন তুমি ধড়িবাজি শেখাচ্ছো কী না আমি কীভাবে জানবো?’

মুখে মজা করলেও মনে মনে আমি শতমুখে কৃতজ্ঞতা জানাই আমার এই ননদটিকে। ইনি আছেন বলেই আমার মেয়েটিকে কাজের বুয়ার কাছে ফেলে রাখতে হচ্ছে না!

ঝটপট হাতের কাজগুলো শেষ করতে করতেই লাঞ্চের সময় হয়ে গেল। আড়াইটাতেই আবার ওটি আছে। প্রতিদিনই চেষ্টা করি আরেকটু আগে বের হওয়ার। কিন্তু সেটা একদিনও সম্ভব হয় না। ব্যাগ থেকে লাঞ্চ বক্সটা বের করে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম।

বৃষ্টিমুখর একটা দিন আজ। যদিও এখন বর্ষাকাল নয়। কাঠফাটা বৈশাখের খরতাপে দগ্ধ হওয়া দিন। কিছুদিন ধরে দুর্বিষহ গরম পড়েছে। তাই হঠাৎ পাওয়া এক চিলতে আনন্দের মতোই বৃষ্টিটা যেন খুশির উচ্ছ্বাস ছড়াচ্ছে। আমার রুমের বাইরের ফুলেভরা জারুল গাছটা শরীরে সদ্য তারুণ্য ফুটে ওঠা কিশোরীর মতোই বৃষ্টিতে দাপাদাপি করছে। ঝকঝকে লন জুড়ে ফুটে আছে রঙ বেরঙের ফুল। এই প্রাইভেট মেডিক্যাল ইন্সটিটিউটটার বয়স খুব বেশিদিন না। তার ওপরে মালিকের সম্ভবত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বাতিক আছে। সকাল বিকাল এমনকি দুপুরেও ঝাড়মোছ, সাবান ডেটল পানিতে ফ্লোর পরিষ্কার…এসব চলতেই আছে! মাঝে মাঝে পরিষ্কারের বাতিকে কাজকর্মেও ব্যাঘাত ঘটে। তখন বিরক্ত লাগে ঠিকই, কিন্তু অবসরে বসে যখন ঝকঝকে তকতকে চারপাশটা দেখি তখন কিন্তু খুব ভালো লাগে!

এই ইন্সটিটিউটের মালিক যথেষ্ট আধুনিকমনাও বটে। ভাবনাচিন্তায় অভিনবত্ব আছে। সিনিয়রদের চেয়ে উনি জুনিয়রদের প্রতি বেশি আস্থাশীল। নিত্য নতুন জুনিয়র ডাক্তার নিয়োগ দিচ্ছেন। আমার মতো মিড লেভেল ডক্টরের সংখ্যাও কম। আর আরেকটু সিনিয়র ডক্টর তো একেবারে হাতেগোনা। তরুণদের কাছ থেকেই তিনি সেরা সেবাটা বের করে আনতে চান। সেই প্রতিশ্রুতি নিয়েই এই ইন্সটিটিউটের জন্ম। আমি অবশ্য আরো দু’জায়গায় চাকরি করে এখানে থিতু হয়েছি।

সরকারী চাকরির প্রতি খুব বেশি মোহ ছিল না আমার। বেছেও নিয়েছি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং স্থান, রেডিওথেরাপি। সঙ্গের বান্ধবীরা প্রায় সবাই গাইনিতে পটাপট ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাদের সাথে আমিও এই জায়গাটিকেই বেছে নিতে পারতাম। ওদের শুরুর দিকের যুক্তিগুলোও অকাট্য না হলেও ফেলনা নয়। প্রায় সবগুলোই ভেবে দেখার মতো।

মেয়েদের কাজ মেয়েরাই তো করবে! বাচ্চা জন্মদান ছেলেরা করবে কেন? দেশে এত মহিলা ডাক্তার থাকবে একজন নারী কেনপুরুষ গাইনোকলজিস্টের কাছে যাবে? সেটা কি একজন নারীর জন্য খুব সম্মানের কিছু?

একটি শিশুর পৃথিবীতে আগমন প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারাটা কি কম আনন্দের বিষয়? একটি নারীকে মাতৃত্বের স্বাদ আস্বাদন করানোর চেয়ে আনন্দদায়ক কি আর কিছু হতে পারে? ইত্যাদি ইত্যাদি…

আমি জানি যুক্তিগুলোর কোনোটাই অগ্রাহ্য নয়। তবু কেন যে রেডিওথেরাপি বেছে নিয়েছি তার সত্যিকারের কারণটা জানি আমি। যেদিন চোখের সামনে বড়মামাকে তিল তিল করে ক্যান্সারে চলে যেতে দেখলাম…বড়মামীর অসহায় দু’চোখ দেখে যখন বলার মতো কিছুই খুঁজে পেতাম না… সেদিন থেকেই প্রতিজ্ঞা করেছি এই ‘ফিরে না আসতে পারা’র মিছিলটাকে রুখতে যারা দিনরাত এক করে লড়াই করছে, আমি তাদের সারথি হবো! ভবিষ্যতে টেকনিকালের চেয়ে এ্যাকাডেমিক লাইনে কিছু করার ইচ্ছে আছে আমার। আস্তে আস্তে সেই দিকেও এগুতে শুরু করেছি। ক্যান্সারের কার্যকর প্রতিষেধক আবিষ্কারের গবেষণা কাজে আমি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে চাই। অলরেডি বিদেশ থেকে ভালো একটা অফারও পেয়েছি। আমার স্বামীও নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছে। কাজেই দুজনের একসাথে ব্যাটেবলে মিলে গেলেই আমরা উড়াল দিব। দিনের পর দিন বিদেশের মাটিতে পড়ে থাকতে চাই না বলেই এতদিন সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করছিলাম। আমাদের দেশেও এখন আইসিডিডিআরবি সহ কয়েকটি জায়গায় নানারকম গবেষণা কাজে উত্তরোত্তর সাফল্যের দেখা মিলছে। কিন্তু স্বীকার না করে তো উপায় নেই যে, সেরা কাজটি এখনো দেশের বাইরেই হচ্ছে! তাই দেশকে দেশের মানুষকে কিছু দিতে হলে যদি এই পরবাস বরণ করতে হয়, তাহলে তো তাই সই!

এছাড়া নয়ন তো কবে থেকেই আমার মাথার পোকাই বের করে ছেড়েছে! ‘আপু, প্লিজ এবারে চলে আয়! কতদিন তো আমরা দুজন দু’জায়গায় থাকলাম। এখন থেকে তো চাইলেই ভাই-বোন আবার আগের মতো একসাথে থাকতে পারি! টুকটুকিটাও জানুক যে ওর একটা মামা আছে!’

আমি দোনোমোনো করেই চলছিলাম তবু। শেষমেষ আমার স্বামীই আমাকে আশ্বাস দিলো। ওর আশ্বাস পেয়েই আবার নতুন করে ভাবতে শুরু করলাম। যদিও কখনো চিন্তা করিনি বিদেশে থাকবো…সেখানেই সেটল করবো…আমার সন্তান বড় হবে বিজাতীয় পরিবেশে। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি বাস্তবতা…এসবকিছুই মানুষকে অনেকভাবেই চিন্তা করতে শেখায়।

আমি ডাক্তার সায়েমা সুলতানা নীরা, এই চল্লিশোর্ধ বয়সে এসে তাই নতুন করে চিন্তা করতে শিখেছি। ইতিমধ্যেই নামের শেষে অনেক রকম এ্যালফাবেট যুক্ত করে ফেলেছি। তবু এখনো আমার শিখে চলার প্রয়াস থেমে যায়নি। ইচ্ছেটাও মরেনি। কত কী জানার আছে এই রহস্যময় পৃথিবীতে! স্রষ্টা কত না আলোকমালা সুপ্ত করে সাজিয়ে রেখেছেন দিকে দিকে! মানুষ হয়ে শুধু সেই আলোকমালাকে সামনে আনাটাই তো কাজ! সেটাকে জ্বালিয়ে দিয়ে তার আলোকচ্ছটায় নিজেদের জীবনকে উদ্ভাষিত করতে পারলেই তো এই নশ্বর জীবনটা সার্থক!

আমি কেন সেই ছোট্ট ইচ্ছাটুকুকে সাথে নিয়ে বাঁচবো না? অনেক তো পেলাম জীবনের কাছ থেকে! অনেক কিছুকে হারিয়ে এই অনেকখানি পাওয়া আমাকে প্রতি মুহূর্ত উদ্দীপ্ত করে চলে। আমি নিজেই নিজের কাছে আওড়ে চলি… মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ…

ভাবনার জগতে ডুবে ডুবেই লাঞ্চ শেষ করলাম। লাঞ্চে তেমন বেশি কিছু খাই না আমি। একটা মাঝারিমানের স্যান্ডউইচ, সাথে অনেকখানি সালাদ আর টকদই। স্বাস্থ্য নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে পারছি না। রক্তে সুগার ধরা পড়েছে। বয়স দৌঁড়াচ্ছে উদ্ধগতিতে।

টুকটুকি আমার অনেকটা বেশি বয়সেই হয়েছে। আমরা দুজন তো ধরেই নিয়েছিলাম, হয়ত নিঃসন্তান হয়েই বাঁচতে হবে! তখন সৃষ্টিকর্তার কাছে থেকে এই অমূল্য উপহার পেয়েছি। অথচ কাজের চাপে সেই অমূল্য উপহারকে রেখে দিয়েছি অনেকটা অযত্নে, নিজের সঙ্গ থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে। এই ব্যাপারটা আমাকে প্রতি মুহূর্তে পোড়ায়। এসবের কারণেও এ্যাকাডেমিক সাইডে চলে যেতে ইচ্ছে করে। শুনেছি তখন সময়টাকে নিজের মতো করে সাজানো যায়।

লাঞ্চ করে উঠতে না উঠতেই আমার রুমের ল্যাণ্ডফোনটা বেজে উঠলো। একটু ব্যস্তসমস্ত হয়ে ফোনটা ধরলাম। আড়াইটা বাজতে বেশি দেরি নেই। আজ ভাবনার জগতে ডুবে অনেকটা সময় কাটিয়ে দিয়েছি। তাড়াতাড়ি ওটির প্রস্তুতি নিতে হবে। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে আমার এনার্জি লেভেল বৃদ্ধিকারক আরেকজনের আওয়াজ পেলাম,

‘হ্যালো ডক। বিজি নাকি?’

‘হুম, ওটি আছে। মাত্র লাঞ্চ করলাম। তুমি কী করছো? কাজকর্ম নাই?’

‘নেই আবার! সকাল থেকে দু’দফা রাউণ্ড দিয়েছি সবগুলো ওয়ার্ডে। আজ বেশ কয়েকজন সিরিয়াস পেশেন্ট ছিল। ক্লান্ত লাগছে। ভাবলাম একটু আড্ডা মারি তোমার সাথে। তা তুমি তো নিজেই ব্যস্ত! কীইই আর করা! দেখি ফেসবুকে কাউকে জোটাতে পারি কী না!’

‘আচ্ছা, ফেসবুক থেকে আজকাল ভাড়ায় কথা বলারও সঙ্গী জোটে বুঝি?’

‘ইয়েস! ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না বুঝেছো?’

‘তা এই ভাতের জায়গায় তুমি কী ছড়াবে? মিষ্টি কথার ফুলঝুরি?’

‘কাস্টমারের চাহিদা বুঝে জিনিসপত্র ছড়ানো হবে!’

‘কী!!’ বলেই দেওয়াল ঘড়িতে চোখ চলে গেল আমার। সর্বনাশ দুইটা পনেরো বেজে গেছে! তাড়াতাড়ি বললাম, ‘এ্যাই এখন রাখবো। আমার একটু প্রিপারেশেনের ব্যাপার আছে!’

‘আচ্ছা…আমাদের এই ব্যস্ততাভরা জীবনে টুকটুকির কী হবে বলো দেখি?’ হঠাৎ ওপাশের আওয়াজটা একটু যেন গাঢ় শোনালো।

‘হুউম…চাকরি ছেড়ে দিতে বলছো?’

‘এ্যাই দেখো…ঘুরে ফিরে খালি সেই কথা! আমি বলেছি তোমাকে চাকরি ছাড়তে? নিজেই মাঝে মাঝে এই প্রসঙ্গ নিয়ে এসে হা হুঁতাশ করো। আজ আমি বললাম দেখেই মনে হলো চাকরি ছেড়ে দিতে বলছি!’

‘আচ্ছা আচ্ছা রাখি এখন! এই ডিসকাশন বাসায় গিয়েও করা যাবে!’

ফোন ছাড়তে ছাড়তে মনে মনে দুঃখিত হচ্ছিলাম। বেচারা আজ একটু কথা বলার জন্য ফোন দিয়েছিল! অথচ আমিই কথা বলার সময় পেলাম না! কী যে মারদাঙ্গা ব্যস্ততা যাচ্ছে! পতিদেব যদি বুঝদার না হতেন, তাহলে হয়ত এতদিনে সত্যি সত্যিই চাকরিবাকরি ছেড়ে দিয়ে পিওর হাউজওয়াইফের জীবন বেছে নিতে হতো! ইমনকে সত্যিই ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করা যাবে না! সেই সেদিনের সন্ধ্যাটা থেকেই আজ অব্দি আমার পাশে পাশেই থেকেছে ইমন। এক মুহূর্তের জন্যও আমার হাতটাকে ছেড়ে দিতে চায়নি! শুধু এই একটিমাত্র কারণেও মনে হয়, আমার জীবনে যদি বিপ্লবের মতো শয়তানের আবির্ভাব না হতো, তাহলে কি ইমনের মতো একজন জীবনসঙ্গী পেতাম আমি?

হ্যাঁ ইমন। ডাক্তার ফয়জুল ইসলাম ইমন, আমার মেডিক্যাল কলেজের সহপাঠী। আজ সুদীর্ঘ পনেরোটা বছর ধরে যার সঙ্গে আমি হাসি আনন্দ আর শোকে ছায়ায় বাস করছি। আমার জীবনের অনেকগুলো সুন্দর প্রাপ্তির মধ্যে যার অবস্থান প্রায় প্রথমদিকে!

বুঝতে পারছি, জীবনের যে গল্প আপনাদের কাছে বলতে বসেছি তাতে আজ একটা জবরদস্ত টুইস্ট এসে আঘাত হেনেছে। আপনারা হয়ত পুরোপুরি হকচকিয়ে বসে ভাবছেন, কে এই ইমন? এ কোথা থেকে এলো তোমার জীবনে? বলছি বলছি! এদিকে ঘড়ি তো সোজা সম্মূখপানে দৌঁড়ে চলেছে। আমার আর বসে বসে গল্প করার মতো অবস্থা নেই। ছুটতে হবে ওটিতে। ডাক্তার শিল্পী আমার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছেন। দুজনের আজ অনেকটা সমান ভূমিকা। সেখানে আমি কী না গল্প করতে বসে গেছি!

তারচেয়ে বরং আমার ডায়েরিটাকে খুলে রেখে যাই আপনাদের সামনে। বাকিটুকু আপনারা নিজেরাই পড়ে নিন।

পুলিশস্টেশনে জিডি করে আসার পরদিন সকাল থেকেই খুব উৎকণ্ঠায় ছিলাম। উৎকণ্ঠা হচ্ছিলো বিভিন্ন কারণে। পুলিশের ভূমিকা কতদূর কী হবে, নিশ্চিত ছিলাম না। বিপ্লবের হাত আরো কতদূর লম্বা হয় সেটাও বুঝতে পারছিলাম না। এদিকে বড়মামার মাথায় তো চিন্তার ঘুনপোকা বাসা বেঁধে বসেই ছিল! সারাদিন সেটা কুটকুট করে কামড়ায় তাকে। নানী মাঝে মাঝে ধমক দিয়ে সেটাকে কিছুক্ষণের জন্য থামালেও একেবারে মেরে ফেলতে পারে না। আমাকে দেখলেই বড়মামা জিজ্ঞেস করে, ‘এ্যাই নীরা, ঐ ছেলেটা কি রাস্তাঘাটে দাঁড়িয়ে থাকে? তোকে কিছু বলেটলে না তো? দেখিস অনেকসময় কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝট করে এটা ওটা ছুঁড়ে মারে! সাবধান থাকতে হবে বুঝেছিস?’

বড়মামার চিন্তাগুলো খুব ধীরে ধীরে আমার মধ্যেও জট পাকাতে শুরু করে দিয়েছে। আমিও একা চলাচল খুব কমিয়ে দিয়েছি। কলেজ যাওয়ার সময় চোখমুখ ভালোভাবে ঢেকে রিক্সার হুড তুলে গুটিসুটি মেরে যাই। যাতে রাস্তাঘাটে দেখলেও আমাকে চেনা না যায়। তবু ভয় কাটতে চায় না কিছুতেই। বিপ্লব কি এত বোকা নাকি? আমাকে চেনার জন্য ওকে মোটেও তেমন কাঠখড় পোড়াতে হবে না।

এদিকে পুলিশের কাছ থেকেও কিছু জানতে পারছি না। একবার ভেবেছিলাম গিয়ে একটু খবর নিয়ে আসি। পরে বহুকষ্টে সেই ভাবনাকে সরাতে পেরেছি।

বন্ধুবান্ধবরা যথেষ্ট সাহায্য সহযোগিতা করে চলেছে। মানসিক সহযোগিতাটাই বেশি কাজে লাগছে এই মুহূর্তে। সুপ্তি আর মিথিলা দুদিন বাসায় এসেছে। দুজনেই আমাকে ধরেছে সুমনের ব্যাপারটা কী সেটা জানার জন্য। আমি জানি ওদের হাত থেকে এত সহজে নিস্তার পাবো না। তাই যা ঘটেছে তাই জানিয়েছি। শুনে ওরা দুজনই থ হয়ে বসে থেকেছে কিছুক্ষণ। সুপ্তির আবার সহজেই রাগ চড়ে যায়। সে পারলে বিপ্লবের অদৃশ্য উপস্থিতিকেই উদ্দেশ্য করে কয়েকটা কিল থাপ্পড় লাগিয়ে দেয়। দাঁত কিড়মিড় করে বলে, ‘এ্যাই নীরা শোন, তুই খবরদার এই মিনমিনা ছেলের সাথে আর কক্ষনো কথা বলবি না বুঝলি? তোর মতো মেয়ের কি ছেলের অভাব হবে নাকি? আরে ছেলেদের লম্বা লাইন লেগে যাবে তোর পেছনে! ওসব সুমন টুমন না থাকলেও কিছু আসবে যাবে না!

ইস! আমির খানমার্কা চেহারা আছে দেখে একেবারে ধরাকে সরাজ্ঞান করে বসেছে তাই না? তোর কথা শুনেই দেখলো না? সোজা ডিসিশন জানিয়ে দিলো!

আজ মিথিলাও কম গেল না। সেও সুপ্তির সাথে একমত। ‘তাই তো! একটাবার শুনে তো দেখবে আসল ব্যাপারটা কী! তোর মতো এত ব্যক্তিত্বসম্মন্ন একজন মেয়েকে এতগুলো আজেবাজে কথা শুনিয়ে দিলো! এটা বিপ্লব মোটেও ঠিক করেনি!’

আমি হেসেই বাঁচি না ওদের উদ্বেগে। হাসতে হাসতেই বলি, ‘আরে থাম থাম! কী শুরু করলি তোরা! সুপ্তি, আমি এমন কিছু রসগোল্লা না যে, আমার পেছনে ছেলেদের লম্বা লাইন লেগে যাবে। অর্থবান বাপ দূরে থাক, আমার বাপই নেই! রূপ নামক যে দারুণ একটা জিনিস থাকে মেয়েদের, সেটাও সৃষ্টিকর্তা আমাকে অনেক ভেবেচিন্তে দিয়েছেন। যথেষ্ট টানাটানি। একদিকে ঢাকতে গেলে আরেকদিকে টান পড়ে। আর কথাবার্তাতেও চৌকষ নই। স্টাইল জানি না। কত কত খামতি! ছেলেদের কি খেয়েদেয়ে কাজ নেই যে আমার পেছনে লাইন দিবে? তোর মতো ডাকসাইটে পুলিশ অফিসারের মেয়ে হলে কি আর এত চিন্তা করতাম?’

‘এ্যাই শোন নীরা, এত ঢঙ করবি না বুঝলি? তোর মধ্যে কী আছে আমরা জানি। আর ছেলেপেলেরে আন্ধা আরএ ঠসা মনে করবি না। তারাও সব দেখে এবং শোনে!’

যাহোক, অবশেষে অচিরেই সুসংবাদ পেলাম। জানতে পারলাম, সাইবার ক্রাইমের সুস্পষ্ট প্রমাণ প্রমাণিত হওয়ায় বিপ্লব পুলিশ কাস্টডিতে। তার নামে সাইবার ট্রাইবুনালে শিগগিরই মামলা গঠন হবে।

আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। বাসার অন্যরাও স্বস্তি পেল খবরটা শুনে। আমার কলেজে আসা যাওয়ার সময়কার সেই ধকলটাও কমে গেল। জীবনটা আবার একটুখানি সহজ হওয়ার সুযোগ পেল।

আমি মনে মনে খুব সঙ্গোপনে একজনের ক্ষমা প্রার্থনাপূর্বক একটা টেলিফোনের প্রত্যাশা করি। আমি জানি ফোন আসবে। অথবা সরাসরি সাক্ষাতও হতে পারে। মনে মনে প্রস্তুতি নিতে থাকি, সেদিন আমি কী কী বলবো। আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সে আমাকে কতখানি আঘাত দিয়েছে সেসব বার বার আবৃত্তি করে রিহার্সাল দিতে থাকি। সেদিন কতটা ভাব নিব, কতখানি আঘাত ফেরত দিব, নাকি ক্ষমা চাওয়ামাত্রই মোমের মতো গলে গিয়ে স্তুপাকার হয়ে পড়ে থাকবো…ভেবে ভেবে একসা হতে থাকি।

কিন্তু দিনের পর দিন পার হতে থাকে, আমার কাঙ্ক্ষিত মানুষের কাছ থেকে কোনোরকম ফোন মিসডকল…কিচ্ছু আসে না। আমিও অভিমানে গ্যাসবেলুনের মতো ফুলে থাকি। না…সে নিজে থেকে ক্ষমা না চাইলে আমি কিছুতেই তাকে ক্ষমা করব না! অর্থাৎ আমার মনের ভেতরে যে আরেকটা মিনিমন বাস করে, যাকে আমরা অবচেতন মন বলে থাকি…সে ততদিনে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে। চাহিমামাত্রই ক্ষমা করে দেওয়া হবে। নিজের এই হ্যাংলাপনায় নিজেই অবাক হয়ে যাই। তবু মনের কাছে হার মেনে বসে থাকি।

দেখতে দেখতে তিন চার মাস কেটে যায়। এদিকে সাইবার ট্রাইবুন্যালে বিচারকাজ শুরু হয়ে গেছে। আমি কিংবা আমার পরিবারের কেউই পিছু হটিনি। দাপটের সাথেই মামলাকার্যে সহযোগিতা করে যাচ্ছি। ট্রাইবুন্যাল খুব দ্রুতই রায় দিয়ে দিবে। অভিযোগ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আমার উকিলসাহেব আশা করছেন, সর্বোচ্চ দশ বছরের জেল না হলে অন্তত পাঁচ বছরের জন্য বিপ্লবের জেলগমন নিশ্চিত!

কিন্তু এত সব খবরাখবরগুলোও নীরবে নিভৃতে আমার জীবনে ঘোরাঘুরি করে যাচ্ছে। সুমন সেদিনের সেই তিক্ত ফোনের পর থেকে আর কোনোরকম যোগাযোগই রাখেনি আমার সাথে।

আমার জীবন কিছুটা নিস্তরঙ্গ তালেই প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে একটা ভালো কাজে হাত দিতে পেরেছি। তা হলো সুনেত্রার কাউন্সিলিং। শেষমেষ সবাইকে রাজি করানো গেলেও আমার কাছ থেকে পুরো টাকা নেওয়ার ব্যাপারটা মামাকে কিছুতেই রাজি করানো যায়নি। মামা কোনোভাবেই এই কাজের জন্য আমার বাবার দেওয়া টাকায় হাত দিতে দেয়নি। অবশ্য সানজিদার মাধ্যমে সুনেত্রার কাউন্সিলিং ফি অনেকখানি কনসিডার করানো গেছে। এত কমে তিনি নাকি কিছুতেই রাজি হন না!

তবে তার যে হাতযশ ভালোই আছে, সেটা সুনেত্রার প্রতিদিনের আচার আচরণেই ফুটে উঠতে শুরু করেছে। সুনেত্রার মধ্যে হঠাৎ ইদানিং আগের সেই সহনশীল নমনীয় সুনেত্রার ঝলক দেখতে পাওয়া যায়। এই তো সেদিন ওর কাছে কী একটা যেন চাইতেই একেবারে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়ে সেটা নিয়ে এলো। ঠিক সেই আগের সুনেত্রা…নিজের যথাসর্বস্ব পণ করে যে অন্যের জন্য কিছু করতে পারলে বর্তে যায়।

আমার জীবনে বন্ধু বান্ধবদের জায়গাটা আস্তে আস্তে অনেক বেশি ফুলেফেঁপে উঠেছে। সুমনের সাথে আমার সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার দিনেই অনাহুত ঝড় নেমে এসেছে জীবনে। বন্ধুদের কারোরই সেটা অজানা নয়। সহানুভূতির ছলে কেউ অন্যরকম কোনো সুবিধা নিতে আসেনি, এজন্য অন্তত ছেলেবন্ধুদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ ছিলাম।

কিন্তু তবুওএকদিন অনাহুত অতিথির মতোই আরেকবার বসন্ত আসে জীবনে। এই বসন্তের রঙ গতবারের মতো কাঁচাহলুদ নয়…একটু বুঝি কাঁঠালি বর্ণা সেই বসন্ত। অভিজ্ঞতা আর বোঝাপড়ার ঝুলিতে ততদিনে তার অনেক প্রাপ্তি জমে গেছে। তাই সে অবুঝের মতো কাঁচা হলুদ রঙ গায়ে মেখে নিজেকে মিথ্যে প্রবোধ দেয়নি।

একদিন ইন্টার্ণির ডিউটি শেষে ফেরার পথে ইমন সাথে সাথে অনেকদূর এলো। আমার অন্য বান্ধবীরা সবাই ছেলেদের তুই তোকারি করলেও আমি এখনো সেটা রপ্ত করতে পারিনি। ইমনের হাবভাবে মনে হচ্ছিল কিছু যেন বলতে চাচ্ছে। অথচ মুখের কোনো ভাষা নেই। রাস্তাটা বাঁক ঘোরার মুখ থেকেই প্রতিদিন রিক্সা নিই আমি। সেটুকু আসতেই ওকে বললাম, ‘আচ্ছা…ঠিক আছে ইমন। চলি তাহলে!’

ইমন একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। কিছু একটা বলার জন্য মুখটা খুলতে গিয়েও বন্ধ করে ফেলেছিল সেদিন। আজ মনে মনে ভাবি, ভাগ্যিস সেদিন নিজেকে সংযত করতে পেরেছিল ইমন। নইলে হয়ত কোনোদিনই আমার গল্পটা আমাদের গল্প হয়ে উঠতো না!

নানীর শরীরটা ইদানিং ভালো থাকে না। ছেলেমেয়ে নাতিপুতিদের দুর্দশা দেখতে দেখতেই বুঝি দিনকে দিন একেবারে অথর্ব জড়বস্তুতে পরিণত হয়ে যাচ্ছে নানী। হঠাৎ করেই যেন অসুস্থতাটা শুরু হলো। কিংবা হয়ত আগে থেকেই শুরু হয়েছে, আমাদের চোখে পড়তে পড়তে এতগুলো দিন পেরিয়ে গেছে। নিজেদের জীবন আর যন্ত্রণা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে আমরা কেউই নানীর দিকে সেভাবে লক্ষ করতে পারিনি। এখন আর আগের মতো সব কথা মনে রাখতে পারে না। কথা বলতে বলতে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। পুরনো দিনের কথা খুব বেশি বেশি গল্প করে। মা মামাদের ছোটবেলার গল্প আর নানার কথা বলতে বলতে নানী শিশুদের মতো খলবল করে ওঠে। এত পুরনো কথা মনে করতে পারে, অথচ গতকাল কী হয়েছে সেটাই ভালো করে মনে করতে পারে না।

নানীর অবস্থা দেখে কেন যেন ভালো লাগছিল না আমার। আমার স্বল্প সময়ের মেডিক্যাল বিদ্যা বলে যে, এসব লক্ষণ খুব বড় কোনো অসুস্থতার দিকে নির্দেশ করছে। নানী কি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হতে চলেছে?

বেশ অনেকদিন ধরেই লাঠি ছাড়া আর হাঁটতে পারে না। একদিন বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে হঠাৎ তাল সামলাতে না পেরে কেমন যেন ধড়মড়িয়ে নীচে পড়ে গেল। ব্যস, সেদিন থেকেই নানী শয্যাশায়ী। এভাবে বিছানায় পড়ে থাকার জীবনটাকে নানী খুব ভয় পেত। কতদিন আমার কাছেও গল্প করেছে, ‘দোয়া করিস বুবু, বিছানায় জানি পড়তে হয় না!’

সেই মনোবাঞ্ছা তার পূর্ণ হলো না! বিছানায় পড়ে থেকেই আস্তে আস্তে ক্ষয়ে গেল তার নশ্বর শরীর। দীর্ঘ দুই বছর বিছানায় পড়ে থেকেই নানী একদিন ঐ জগতে পাড়ি জমালো। নাতনিকে পুরোপুরি ডাক্তার দেখে যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল মনে। সেই ইচ্ছেটা অবশ্য সৃষ্টিকর্তা অপূর্ণ রাখেনি। আমি আমার চাকরির প্রথম বেতন দিয়ে নানীর জন্য একটা ম্যাক্সি কিনে এনেছিলাম। ততদিনে শাড়ি পরার অবস্থা থেকে অনেকদূর চলে গিয়েছিল আমার নানী। শেষেরদিকে কাউকেই চিনতে পারতো না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো অপরিচিতের দৃষ্টিতে।

নানীর মৃত্যুর পর বেশকিছুদিন মাতৃবিয়োগ শোকে আচ্ছন্ন পড়ে রইলাম।

আমার জীবনে তো মায়ের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। নানীই অবচেতনে সেই জায়গাটা পূরণ করে বসেছিল। একমাত্র ভাইটাও সমুদ্রের নোনাজলের সাথে জীবনের মিষ্টতাকে জুড়ে নিলো। আমার পাশে যারা আছে তারাও একে একে সব চলে যাবে যার যার গন্তব্যে। আমি তখন কী নিয়ে বাঁচবো? এই বোধ আমাকে মাঝে মাঝেই কেমন যেন আচ্ছন্ন করে ফেলতো।

এরমধ্যে একে একে বেশ অনেকগুলো সুখের সংবাদ ধরা দিলো আমাদের জীবনে। বিপ্লবকে ট্রাইবুনাল পাঁচ বছরের জেল ও চার লাখ টাকা জরিমানা করেছে। পাঁচ বছর পরে বিপ্লব আবার বেরিয়ে আসবে…এই চিন্তা আর করিনি আমি। একবার যখন ওকে গরাদের ওপারে পার করতে পেরেছি, তখন বারে বারেই পারবো! কোথা থেকে জানি অদ্ভুত এই আত্মবিশ্বাস জমা হয়েছে আমার মনে।

সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হচ্ছে, আমাদের সুরমা এইচএসসি পাশ করে একটা কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়েছে। শুনতে পাচ্ছি, সেই কলেজের একজন অধ্যক্ষ নাকি ওর প্রতি কিঞ্চিত দুর্বল। সুরমাকে জিজ্ঞেস করলে হ্যাঁ না কিছুই বলে না! খালি মুচকি মুচকি হাসে! আমি সতর্ক করে দিয়েছি, যা কিছুই করিস না কেন…নিজের অতীতটাকে সাথে নিয়েই পথ চলবি। সেটাকে কখনো লুকাতে যাবি না বুঝলি? সুরমা নীরব সম্মতি দিয়েছে। এতদিনে এসে আমার কথাকে এখন অনেকখানি সম্মান করে সুরমা।

সুজন খুব বেশি এগুতে পারেনি পড়াশুনায়। এইচএসসির ধাপ পার হতে পারেনি সুজন। পরে ছোটমামা ওকে একটা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে ভর্তি করে দিয়েছিল। কিন্তু সেখানেও বেশিদূর যেতে পারেনি। পরে বন্ধুদের সাথে আইটি রিলেটেড ব্যবসা শুরু করে সুজন। ছোটমামা সুজনকে কিছু টাকা পয়সা দিয়ে ধরেই নিয়েছিল যে টাকাগুলো নির্ঘাত পানিতে পড়তে যাচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সুজনদের বন্ধুরা কিন্তু টুকটুক করে ওদের ব্যবসাকে বেশ ভালোই এগিয়ে নিয়ে চলেছে আর সুজনও নাছোড়বান্দার মতো সেটার হাল ধরে আছে।

ছোটমামা এতেই খুশি। বগল বাজাতে বাজাতে বলে, ‘যাক ছোকরাটার একটা হিল্লে হয়ে গেলরে নীরা! বাপে পড়েনি, ছেলে পড়ে উলটে ফেললে তো আমিই ভিমড়ি খেয়ে যেতাম!’

নয়নের মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হতে এখনো বেশ কয়েক বছর বাকি আছে। নিয়মিতই ফোন দেয় নয়ন। দুই ভাইবোনে প্রাণ খুলে গল্প করি। আমার চোখের কোল ভিজে ওঠে। বুকের চাপা কষ্ট বুকেই বেঁধে রেখে জিজ্ঞেস করি, ‘দেশে কবে আসবি নয়ন? পাশ করে একেবারে দেশে ফিরবি তো?’

নয়ন কিছুটা রহস্য ধরে রেখে বলে, ‘তুই থাকলে তো যেতেই হবেরে আপু!’

‘আমি থাকলে মানে? এই যে মামারা আমাদের জন্য এত কিছু করলো, তাদের জন্য তোর কোনো দায়িত্ব নেই?’

নয়ন চুপ করে থাকে! আমি মনে মনে ভয় পাই। নয়ন কি তবে এই কৃতজ্ঞতার মূল্য দেবে না?

আমার সেই ভয় অবশ্য পরে অমূলক প্রমাণিত হয়েছে। মামাদের ঋণকে আমরা কখনোই কোনোকিছু দিয়েই শোধ করতে পারতাম না। কিন্তু প্রকৃতি এমন কিছু ঘটনা ঘটিয়ে দিলো আমার মামাদের জীবনে, যেটাতে খুব অল্প হলেও আমাদের দুইবোনের ভূমিকা ছিল। সেই গল্পে পরে আসছি। আগে ইমনের গল্পটা করে নিই।

ইমনের এই লুকোচুরি লুকোচুরি গল্পটা নিয়ে আমার বান্ধবীরা বেশ সরব হলো। তাদের চাপাচাপিতেই ইমন হুট করে আমাকে একদিন প্রপোজ করে বসলো। একেবারে বিয়ের প্রপোজাল। ততদিনে আমরা দুজনেই চাকরি পেয়েছি।

ইমনের প্রপোজালে আমি হতচকিত হয়ে বসে রইলাম। আমার জীবনে সুমন তখন না থেকেও নেই। কেন আমার সঙ্গে এমন করলো সে, এই প্রশ্নের জবাব পেতে আমি তখন রীতিমত মরিয়া। ইমনকে হ্যাঁ কিংবা না কিছুই তখনো বলতে পারিনি। আমার বান্ধবীরা তখন রীতিমত ক্ষুব্ধ। যে ছেলে আমাকে এভাবে মাঝরাস্তায় বিপদে ফেলে দূরে চলে গেল, তার পথ চেয়ে আমি কেন এখনো বসে আছি…এটা নিয়ে তারা আমাকে শুধু মারতে বাকি রেখেছিল।

আমি ওদের বলতে পারিনি…আমি মোটেও সুমনের পথ চেয়ে বসে নেই। আমি শুধু আমার প্রশ্নটার জবাবের আশায় পথ চেয়ে আছি।

একদিন সেই ইচ্ছেটাও পূর্ণ হয়ে গেল। হঠাৎ একদিন রাস্তায় দেখা হয়ে গেল সুমনের আম্মার সাথে। সেই ভদ্রমহিলা…যার ব্যক্তিত্ব আমাকে মুগ্ধ করেছিল। আমি উনাকে দেখেই স্ট্যাচু হয়ে গেলাম। কিছু বলবো নাকি পাশ কাটিয়ে চলে যাবো…কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। উনিও যে আমাকে দেখে কথা বলতে এগিয়ে আসবেন তা আমি মোটেও আশা করিনি। কাছে এসে মৃদু হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেমন আছো নীরা?’

আমি উত্তর দিব কী! হাঁ করে তখনো উনাকে দেখছি। উনি কিন্তু থেমে গেলেন না। সুন্দর করে হেসে হেসে অনেক কথা বললেন। সব কথা ভালোভাবে পরে আর মনেও করতে পারিনি। তবু কিছু কথা গেঁথে গিয়েছিল মনে। সেগুলোই পুঙ্খানুপুঙ্খ বলে যাওয়ার চেষ্টা করছি।

‘নীরা, আমি জানি সুমন তোমাকে খুব আঘাত দিয়েছে। তোমার সাথে কী হয়েছে আমি জেনেছি। নিজের গরজেই জেনেছি বলতে পারো। সুমনও সব জানে। সে অনুতপ্ত। অনেকবার তোমার কাছে ফিরেও যেতে চেয়েছে। কিন্তু আমিই ওকে নিষেধ করেছি তোমার কাছে ফিরতে! এটা শুনে নিশ্চয়ই আমাকে ডাইনি মনে করছো! আমি যা করেছি তাতে তোমাদের কোনো অমঙ্গল ছিল না। বরং এই সিদ্ধান্ত অনেক ভেবেচিন্তেই নিয়েছি আমি!

সুমন অনেক মেধা নিয়ে জগতে এসেছে। কিন্তু তাতে কী হবে, ওর চলার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে জটিল মুহূর্তগুলোতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারা আর আরেকটি সমস্যাও খুব প্রকট ওর মধ্যে। মা হয়ে বলতে কষ্ট হলেও বলবো আমি। ও তোমাকে নিয়ে ইনসিকিউরিটি কমপ্লেক্সে ভুগতে শুরু করেছিল। আমি সুরমার সাথেও ওর সম্পর্কের ব্যাপারটা পরে জানতে পেরেছি। খুব সম্ভবত সেখানেও এটাই কাজ করেছিল। তুমি কিংবা সুরমা তোমরা কেউই আসলে সুমনের জন্য পারফেক্ট নও। তোমরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে ওর চেয়ে বেশি যোগ্যতাধারী। সুরমা অনেক বেশি স্মার্ট ছিল আর তুমি এখন পেশাগত দিক দিয়ে ওর চেয়ে এগিয়ে গিয়েছো। এমন একজনকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে পেলে সুমন ঠিক সুখি হতে পারবে না কখনো। একটা না একটা জটিলতা আজীবন ওর পিছু ধাওয়া করেই চলবে। মা হয়ে আমি এটা মেনে নিতে পারিনি। তাই ওকে আটকিয়েছি।

আমি জানি তুমি জীবনে অনেক কষ্ট পেয়েছো। কিন্তু সুখি তুমি হবেই হবে নীরা! সুখ তোমাকে আর কখনোই ফাঁকি দিয়ে থাকতে পারবে না। আমাকে আমার দুর্বল ছেলেটাকে সম্ভব হলে ক্ষমা করে দিও!’

এরপর ইমনের সাথে গাঁটছড়া বাঁধার গল্পটা আর নতুন করে নাই বা করলাম!

সেই গাঁটছড়া বাঁধতে বাঁধতে বার বার চোখে পানি এসে গিয়েছে। তবু নিজেকে প্রবোধ দিয়েছি, আমার এই খেলাঘর আর কখনো ভাঙবে না। প্রয়োজনে আমি ভেঙে যাবো। কিন্তু এটাকে আমি কক্ষনো ভাঙতেই দিব না!

বিয়ের পর পনেরোটা বছর ধরে আগলে রেখেছি আমি এই খেলাঘর। মাঝে মাঝে হিসেব করি, আর কতদিন বাঁচবো আমি? পারবো তো আমার খেলাঘরটাকে এভাবে আগলে রাখতে?

বড়মামার প্যানক্রিয়াসের ক্যান্সারটা যখন ধরা পড়লো, তখন টুকটুকি আমার পেটে। বহু বছরের সাধনার পরে আমি সন্তান ধারণ করতে পেরেছি। সুরমারও সেই অধ্যক্ষের সাথে বিয়েটা হয়ে গেছে। ওর ফুটফুটে দুটো বাচ্চাও হয়েছে।

আমার এই পরম সুখের দিনে একদিন ছোটমামা ফোনে এই মারাত্মক খবরটা দিলো। ক্যান্সার প্রায় ছড়িয়ে পড়েছে। বাঁচার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ভালো চিকিৎসা পেলে হয়ত মৃত্যুটা একটু দীর্ঘায়িত হবে…এই যা!

নয়ন তখন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবেবেশ ভালোই উপার্জন করছে। ছুটিছাটায় দেশে আসে। বিদেশেও ঘুরতে যায়। প্রায়ই বলে, অন্যকোনো জব নিয়ে আমেরিকায় সেটল করবে। এভাবে জাহাজে জাহাজে ঘুরতে আর ভালো লাগে না। আমি কিছু বলি না। ভাই আমার হতে পারে…কিন্তু জীবনটা তো ওর নিজের। আমি আর কতদিন সেটাকে আগলে ধরে বসে থাকবো?তাছাড়া বয়স হয়েছে। এখন তো বিয়েশাদীও করা দরকার!

মামার চিকিৎসার মূল ব্যয়ভার নয়নই বহন করলো। ডাক্তারের কথাকে ঠিক প্রমাণ করে মামা এই ক্যান্সার নিয়েই আরো দু’বছর আমাদের মাঝে বেঁচে থাকলো। শেষের দিকে মামার কষ্ট চোখে দেখতে পারতাম না। কতদিন যে আল্লাহকে বলেছি… ‘ইয়া আল্লাহ! তুমি এই কষ্ট কমিয়ে দাও…’

আমার গল্পটা আজ এতদিন পরে প্রায় শেষ করেই এনেছি। আরেকজনের কথা কি জানতে মন চাইছে?

আমি তার কথা বলতে চাইছিলাম না! তবু না বলে থাকতে পারলাম না। হাজার হলেও জন্মদাত্রী…জন্মের জন্যই তার কাছে ঋণ! তাকে কীভাবে মুছে ফেলবো আমার এই জীবন অধ্যায় থেকে?

আমার সেই সাইকোলজিস্ট বন্ধু সানজিদার কথা মনে আছে? সানজিদাও আমার মতো এখন ঢাকাতে সেটল করেছে। মাঝে মাঝে ঢাকাতে আমাদের আড্ডা আর গল্পগুজব হয়।

একদিন সানজিদাই আমাকে একজন পেশেন্টের ব্যাপারে বললো, যার সাথে নাকি আমার চেহারা খুব মিলে যায়। ভদ্রমহিলার বয়স প্রায় পঁয়ষট্টির কাছাকাছি। ডিপ্রেশন ও স্কিজোফ্রেনিয়ার শিকার। কথা বলতে বলতে কেমন যেন অন্য জগতে চলে যায়। পাশে কাল্পনিক কারো অস্তিত্ত কল্পনা করে ভুলভাল বকে। নিজের স্বামীকে খুন করে ফেলতে চায়। একদিন নাকি ঘুমের মধ্যে সত্যি সত্যিই গলা চেপে ধরেছিল। ভদ্রমহিলার হাজবেণ্ড আর পাগল সাথে রাখতে চায়নি। মানসিক হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছে। ভদ্রমহিলা নিঃসন্তান কী না সেটা জানা যায়নি। তবে তার নাকি আগে একবার বিয়ে হয়েছিল।

আমি ভেতরে ভেতরে চমকে উঠেছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এমন অবস্থা কীভাবে হয়েছে তার?’

সানজিদা বলেছিল, ‘ভদ্রমহিলার স্বামী নাকি তাকে বিশ্বাস করতো না। মারধরও করতো। কথায় কথায় খারাপ মেয়েমানুষ বলে গালি দিত। এসব থেকেই ট্রমার শিকার হয়েছে ভদ্রমহিলা!’

আমি বললাম, ‘একদিন নিয়ে যেতে পারবি আমাকে…উনার কাছে?’

সানজিদা অবাক হলেও রাজি হয়ে যায়। ঢাকার মানসিক হাসপাতালের একটি কক্ষের সামনে সানজিদা আমাকে নিয়ে আসে।

কক্ষের ভেতরের স্বল্প আলোতে পক্ককেশী এক ভদ্রমহিলা ভ্রু কুচকে সোজা আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। তার পরনের বেশবাস আলুথালু। মাথার চুল মোটেও সুসজ্জিত নয়। চেহারাতে অজস্র বলিরেখা। তবু কোথায় যেন…ভীষণ একটা মিল সেই চেহারার সাথে আমার! আমি অশ্রুসজল চোখে কক্ষের জানালার শিকে হাত রাখি।  সানজিদা অবাক চোখে আমাকে দেখছে। বললাম, ‘একটু খুলে দিতে পারবি দরজাটা? আমি উনার সাথে একটু কথা বলবো!’

সানজিদা এখন স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চাবি এনে দরজাটা খুলে দিলো ও। আমি বলার পরেও আমার পাশ থেকে সরলো না। স্কিজোফ্রেনিয়ার রোগী, কী করে বসে বলা যায় না!

আমি সামনে গিয়ে উবু হয়ে বসলাম তার কাছে। এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। তিনিও চেয়ে রইলেন। বেশ অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরে হঠাৎ হাত নাড়িয়ে বলে উঠলেন, ‘এই সর সর…যা যা ভাগ! ভাগ এখান থেকে! ধরবো তোর গলাটা ধরবো?’

সানজিদা আমাকে হ্যাঁচকা টান মেরে সরিয়ে আনলো সেখান থেকে। একটা কথাও আমাকে জিজ্ঞেস করলো না।

আমি তখন চোখের পানিতে আকুল হচ্ছি। কাঁদতে কাঁদতে আপনমনেই বলছি…

‘কী পেলে মা… এসব করে কী পেলে জীবনে? কোন খেলাঘর বাঁধতে চেয়েছিলে তুমি?’

সানজিদার কাছ থেকে ফিরতে ফিরতে বৃষ্টিতে পড়লাম। অসময়ের বর্ষণ। সঙ্গে ছাতাও নেই।

আজ গাড়ীটা সঙ্গে আনিনি। পাশ দিয়ে হুশ হুশ করে রিক্সা ছুটে যাচ্ছে। আমি কাউকে ডাক দিলাম না। আজ আমার বৃষ্টিতে ভেজার দিন। অসময়ের প্রবল ধারায় আজ আমি শুদ্ধ হবো! আমি গুনগুন করে এগুতে লাগলাম,

‘…যা আমার   সবার হেলাফেলা   যাচ্ছে ছড়াছড়ি

পুরোনো    ভাঙা দিনের ঢেলা,  তাই দিয়ে ঘর গড়ি।

যে আমার  নতুন খেলারজন  তারি এই  খেলার সিংহাসন,

                ভাঙারে  জোড়া দেবে সে  কিসের মন্তরে॥‘

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত