| 16 এপ্রিল 2024
Categories
উপন্যাস ধারাবাহিক সাহিত্য

ধারাবাহিক উপন্যাস: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-১৮)

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

পড়ালেখা উদ্বেগ আশংকা বিরহ প্রেম আর আনন্দ বেদনার কাব্য রচনা করেই আমাদের দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল তরতরিয়ে।

দেখতে দেখতে এইচএসসির দোড়গোড়াটাকেও টপ করে উতরে গেলাম। আমার ফলাফল খুবই ভালো হলো। একেবারে আকাঙ্ক্ষিত। বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে মিশ্র ফলাফল। কেউ খুব ভালো করলো…কেউ ততোটা না। সবচেয়ে হতাশাজনক রেজাল্ট হলো সুমনের। ক্লাসের প্রথম সারির একটা ছেলে, অথচ কয়েকটা সাবজেক্টে এ প্লাস মিস করলো। একটাতে শুনলাম এ মাইনাস পেয়েছে।

সুরমার কাছে গল্প শুনেছিলাম ওর নাকি বুয়েটে পড়ার শখ। কিন্তু এই রেজাল্ট নিয়ে হয়ত বুয়েটে এডমিশন টেস্ট দেওয়ার সারিতেই আসতে পারবে না সুমন। খবরটা শুনে এত খারাপ লাগছিল! পুরনো দুঃখবোধটাতে কেন জানি না, আবারও আক্রান্ত হচ্ছিলাম আমি। ছেলেটার একটু একটু করে অধঃপতন তো সুরমার সাথে জড়িয়ে যাওয়ার পর থেকেই! সেটার জন্য পরোক্ষভাবে তো আমিই দায়ী!

আর সুরমার রেজাল্ট নিয়ে তো একটা ছোটখাট ঝড়ই বয়ে গেল বাসায়! পাশই করতে পারেনি সুরমা। অবশ্য সেটাই হওয়ার কথা ছিল। অন্য কেউ না জানলেও আমি ঠিকই জানতাম।

জেনে চুপচাপ বসেও থাকিনি। বিনা পয়সায় অনেক লেকচার ঝেড়েছি সুরমার কানের কাছে। ‘এভাবে সময়টা নষ্ট করিস না সুরমা। পরে কিন্তু তোকেই ভুগতে হবে! মেয়েদের পড়ালেখাটা ভালোমত করতে হয়। পরে যদি এটাকেই আশ্রয় করে বাঁচতে হয়…তখন কী করবি?’ এভাবেও বুঝিয়েছি অনেক।

কিন্তু কথায় বলে, ‘চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনি!’ আমার উপদেশবাণী সুরমার কানের পাশ দিয়ে সাঁই করে বেরিয়ে যেত… ওর টিকিটাকেও স্পর্শ করতে পারতো না। বিদ্রুপমার্কা হাসি ঝুলিয়ে সুরমা উত্তর দিতো, ‘পড়ালেখাকে আশ্রয় করে বাঁচবি তোদের মতো গুড গার্লরা। আমরা ছাপোষা সব অগাবগা ছাত্রী। আমাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য অনেক বটগাছ জুটে যাবে, তুই খামাখা এত চিন্তা করিস না!’

রেজাল্টের দিন বড়মামা ভীষণ হাঁকডাক করে বাড়ি মাথায় তুলে ফেললো।

‘বের করে দিব…ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিব এমন অকালকুষ্মাণ্ড মেয়েকে। ছি ছি ছি! আমার মেয়ে হয়ে কী না পরীক্ষায় ফেল করে! আমি সারাজীবন গাধা পিটিয়ে মানুষ করলাম। আর আমার মেয়ে কী না গাধার গাধা হয়েই থেকে গেল। স্কুলে গিয়ে মাস্টারদের বলেকয়ে পাশ করানোই ভুল হইছে আমার! তখনই দু’এক ক্লাস ড্রপ দেওয়ালে আজ এই দিন দেখতে হইতো না!

আমার মুখ দেখানোর আর জো রইলো না! ঐ দ্যাখ…নীরাকে দ্যাখ… তোর পাশে বসেই পড়েছে! তুই যা খাইছিস তাই খাইছে! তোর তো তবু মা-বাপ একই ছাদের নীচে বাস করছে! বেচারা মেয়েটার তো সেই সুখও নাই! ওর রেজাল্ট দ্যাখ আর তোরটা দ্যাখ! মুখপোড়া মেয়ে আজ তোকে আমি শেষই করে ফেলবো!’


আরো পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-১৭)


মারমুখো স্বামীকে দেখে বড়মামীও ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। ঠেকাতে গিয়ে নিজেও দু’কথা শুনলো।

‘হ্যাঁ এখন এসে আমাকে আটকাও! এর বেশি আর কী পারবা? মেয়ে যে ফেল করে বংশের মুখে চুনকালি মেখে দিলো তখন তুমি কী করতেছিলা? বসে বসে আমসত্ত শুকাচ্ছিলা? এমন গুণবতী মেয়ে তোমার! দিনরাত খালি মোবাইল ফেসবুক আর যখন তখন মুখেচোখে রঙ মেখে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ানো! তখন শাসন করতে গেলে বলছো…এই বয়সের মেয়ে একটু করতে না দিলে মনঃকষ্টে থাকবে। নাও এখন মনঃকষ্টের ল্যাঠা সামলাও! ফেল্টুশ মেয়েকে কোলে করে নিয়ে পাড়া বেড়ায় আসো! সবাইকে বলতে বলতে যাও…এই দ্যাখেন আমার গুণবতী রূপবতী মেয়ে…এবারে ফেল করে…’

মামা যা খুশি তাই বলে চেঁচামেচি জুড়ে দিলো। তার কথার আঁচ বেচারা বড়মামী একদমই সহ্য করতে পারলো না। ফ্যাচ ফ্যাচ করে কান্না জুড়ে দিলো।

সুরমাও মনে হলো বড়মামার মারমুখী ভাব দেখে একটু ভয় পেয়েছে। চোখেমুখে পরিষ্কার আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে। মার খেয়ে শরীরে যত না ব্যথা লাগবে, মনে ব্যথা লাগবে ঢের বেশি। তাছাড়া ছোট ছোট ভাইবোন আছে বাসায়। তাদের সামনে মারধোর খেলে মানইজ্জত বলে কিছুই থাকবে না। নইলে বকাঝকা খেয়ে ওর তেমন কোনো ভাবান্তর হয় না। আগেও বহুত খেয়েছে। এসব গুলি ওর কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। এতদিনে কিছু হয়নি যখন…ভবিষ্যতেও হবে না!

পরিস্থিতি বেসামাল দেখে নানীও চলে এসেছে বড়মামাকে সামলাতে, ‘ও পল্টু! ও বাবা আমার! শুন বাবা…এত বড় মেয়েরে কি কেউ মারে রে বাবা? তুই কি পাগল হইলিরে বাপ?’

‘হ্যাঁ মা…পাগলই হইছি আমি!’ বড়মামাও সমান তেজে উত্তর দেয়। কিন্তু আমার নানীও কম যায় না। তারও পালটা কথা বলা চাই। বড়মামার উত্তর কানে যেতেই নানী ঝাঁঝিয়ে উঠে বলে, ‘আচ্ছা…তাইলে এদ্দিন কী করছিলি? তখন দেখতে পারিসনি? এখন আসছিস সব রাগ একবারে ঝাড়তে!’

এভাবেই ধাওয়া পালটা ধাওয়া আর বাকবিতণ্ডার যুদ্ধে আমার শান্তশিষ্ট নানাবাড়ির পরিবেশ বলা চলে এই প্রথমবারের মতোই অশান্ত হতে দেখলাম।

আমার অনেক কষ্ট আর আকাঙ্ক্ষার ফলাফল হাতে নিয়ে আমিও অপরাধীর মতো মুখ চুন করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই ঝড় দেখলাম।

বড়মামার আক্রোশ যেন কিছুতেই ফুরাচ্ছিল না। একসময় দেখলাম সুরমার বইখাতা সব একত্র করে বাড়ির উঠানে স্তূপীকৃত করে রাখলো। তারপর গটগট করে ছুটে গেল রান্নাঘরের দিকে। আমরা কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে ছুড়ে ফেললো বইয়ের স্তূপের দিকে। বাড়ির সবাই স্তম্ভিত মুখে এই ঘটনা দেখলো। কারো মুখে কোনো কথাই সরলো না। আমি বিস্ময়ভরা চোখে দেখলাম, সুরমা এই দৃশ্য একেবারেই নির্বিকার মুখে দেখছে। এই দৃশ্য আমি নিজে সহ্য করতে পারছিলাম না। অথচ সুরমার যেন কোনো ভাবান্তরই নেই! বই পুড়িয়ে ফেলা যেন অতি মামুলি ব্যাপার। হরহামেশাই ঘটে!

শেষমেষ নানী বড়মামাকে ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিলো। বইটই পুড়িয়ে বড়মামার মাথাটা একটু বুঝি ঠান্ডা হয়েছে। নানী নিজেও সুস্থির হয়ে একটা চেয়ার টেনে বড়মামার পাশে বসলো। তারপর ধীরে ধীরে বললো,

‘পল্টু শোন। মাথা গরম করে বই পোড়ায়ে কাজটা তুই কিন্তু ভালো করলি না! তোর ছেলেমেয়েরা… বাড়ির অন্য ছেলেমেয়েরা এটা দেখে কী শিখলো তুই বল! রেগে গেলে সবকিছু পুড়িয়ে ফেলো…এইটাই শিখলো ওরা! এমন শিক্ষা দেওয়াটা কি তোর সাজলো? না না…এখন চুপ করে থাকলেতো হবে না! তুই নিজেই কাজটা করলি। উত্তরটাও তোকেও দিতে হবে!

তারচেয়ে আমি যেটা বলি মন দিয়ে শোন। বই পোড়ায়ে বা মেয়েরে মারধোর করে কিছুই হবে না। তোর মেয়ে পড়ালেখা করতে চায় না। ভালো দেখে একটা ছেলে খুঁজে নিয়ে মেয়েরে বিয়ে দিয়ে দে! ঘরসংসার করুক। চুলায় খড়ি ঠেলুক। বাচ্চাকাচ্চা পালতে পালতে জান কয়লা করুক। রঙ ঢঙের সুখ দুইদিনেই ফুরুত করে উড়ে যাবে!’

বড়মামা একেবারে চুপ। তবে নানীর কথাগুলো যে কান পেতে শুনছে, সেটাও বেশ বোঝা গেল। আমি নানীর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালাম। প্রবীণা এই নারীর কাছ থেকে অনেক কিছুই শেখার আছে আমার। তিনি তার প্রাচীনপন্থী জীবনদর্শন দিয়েও বাস্তবতার ধারটা কী চমৎকার ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন! আফসোস! এই নারীর সুগভীর চিন্তাধারার বিন্দুমাত্রও যদি সুরমার মধ্যে থাকতো!

রাতে খাওয়াদাওয়ার পর বড়মামা আমাকে তার ঘরে ডেকে পাঠালো।

আমি গিয়ে দাঁড়াতেই বড়মামা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে অনেকক্ষণ আদর করলো। তারপর ধরাগলায় বললো, ‘সুরমার খারাপ রেজাল্ট শুনে মাথাটা কেমন আউলাঝাউলা হয়ে গেছিলো রে মা! তুই কত ভালো রেজাল্ট করলি…তোকে ডেকে একটু আদরও করলাম না!’

তারপর কিছু সময় চুপ করে থেকে বললো, ‘তোর মা-বাবার সাথে কথা হয় রে মা? ফোন টোন করে?’

আমি মাথা নিচু করে বললাম, ‘না মামা…তারা করে না…আমিও করি না! শোধবোধ!’

কিছু সময়ের নীরবতা। তারপর বড়মামা আমাকে বেশ অবাক করা একটা তথ্য দিলো। মামা বললো, ‘তোকে বলা হয়নি নীরা। তোর বাবা কিন্তু আমার সাথে একবার যোগাযোগ করেছিল। তোর বাবার গলার স্বরটা খুব ক্লান্ত মনে হলো আমার কাছে। তোর পড়ালেখার খোঁজখবর নিলো। আর বললো, আমাকে কিছু টাকাপয়সা পাঠাতে পারবে কী না…তোদের পড়ালেখা ভরণপোষণের জন্য!’

আমি অবাক হয়ে গেলাম বড়মামার এই কথা শুনে। বললাম, ‘তুমি কী বললা?’

‘আমি আর কী বলবো? বললাম, আল্লাহ আমাকে যেটুকু সামর্থ দিছে তা দিয়েই ওদের দুজনের দেখভাল করবো আমি। যখন পারবো না তখন দেখা যাবে। আল্লাহ যেন সেই দিন কখনো না দেখায়। কীরে মা, ঠিক বলিনি?’

আমার চোখ ভরে পানি এলো। বর্ষণ কিছুতেই ঠেকাতে পারলাম না। অবশ্য সেই চেষ্টাও করলাম না। বড়মামা আমার মাথায় হাত দিয়ে স্থাণুর মতো বসে রইলো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত