| 1 মার্চ 2024
Categories
উপন্যাস ধারাবাহিক সাহিত্য

ধারাবাহিক উপন্যাস: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-১৯)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

ভর্তি পরীক্ষার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। আমি এবারে আরো আদাজল খেয়ে নামলাম। যে করেই হোক, আমার ভিত্তিটাকে মজবুত করতেই হবে। এইচএসসির ভালো ফলাফলের রেশ থাকতে থাকতেই ধারাবাহিকতাটাকে অটুট রাখতে হবে। জীবন বারে বারে সু্যোগ দেয় না কাউকে। আমার হাতের কাছে যে সুযোগ একবার ধরা দিয়েছে, তাকে কিছুতেই হেলায় হারাতে চাই না আমি।

সুরমার বিয়ের কথাবার্তা শুরু হয়েছে। আমি চুপচাপ বিষয়টা দেখছি। সুরমার সাথে সুমনের সম্পর্কের বিষয়টা এই বাসায় এখনো চাউর হয়নি। সুরমাও কেমন যেন নির্বিকার। সবাই যে জোট বেঁধে ওর জন্য ছেলে খুঁজে চলেছে, এই বিষয়টা যেন সে চোখেও দেখতে পাচ্ছে না! আমি একদিন না পেরে বলেই ফেললাম,

‘কীরে সুরমা, তোর মতলব কী?’

সুরমা অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলো, ‘মতলব কী মানে? আমার আবার কী মতলব থাকবে? কী বলতে চাইছিস খুলে বল!’

‘কেন তুই কিছু বুঝতে পারছিস না? তোর বিয়ের জন্য ছেলে খোঁজা চলছে। তুই খবর রাখছিস না?’

সুরমা রিল্যাক্স ভঙ্গিতে বললো, ‘ওহ এই কথা! আমি ভাবলাম কী না কী! ছেলে খুঁজছে খুঁজুক। সমস্যা তো কিছু দেখছি না! নানী তো সেদিন বলেই দিয়েছে, আমাকে দিয়ে আর পড়াশুনা হবে না। আমিও তো সেকথাই বলি। সবাইকে দিয়ে সবকিছু হয় না। বিয়ে দিবে…আমিও বিয়ে করবো। অসুবিধা তো কিছু দেখছি না!’

সুরমার ভাবভঙ্গি যতই দেখি ততই অবাক হই। আমার প্রশ্নের মূলসুরটা যেন সে বুঝেও বুঝলো না! কেমন যেন আলগোছে এড়িয়ে গেল। আমি এবারে স্পষ্টগলায় বললাম, ‘সুরমা, আমি সুমনের কথা বলতে চাইছি। তুই কি সুমনের ব্যাপারটা বাসায় বলেছিস?’

‘ওহ এই কথা! হুউম…না এখনো বলিনি। বলবো আস্তেধীরে!’

‘সেই আস্তেধীরেটা কখন শুনি? তোর জন্য ছেলে খুঁজে বের করার পরে তুই বলবি যে, তুই এদের কাউকে না… সুমনকে বিয়ে করবি?’

সুরমা কেমন যেন গা ছাড়া একটা ভাব দেখাচ্ছে। আমার একদম ভালো লাগছে না বিষয়টা। হঠাৎ একটা কথা মনে হতেই আমার ভেতরটা একেবারে বিদ্রোহ করে উঠলো। আমার জন্য সুমন অনেক ভুগেছে। এই সুরমার সাথে দিনরাত গল্পগুজব আর প্রেম করতে গিয়ে ওর লেখাপড়া শিকেয় উঠেছে। এখন সুরমার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে শুনলে না জানি ছেলেটা কী করে বসে!

আমি কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলতেই সুরমা বললো, ‘শোন, এত উতলা হওয়ার কিছু নাই। ছেলে খুঁজলেই বিয়ে হয়ে যায় না! বাবা-মা চাচু সবাই মহানন্দে ছেলেদের কুষ্টি যাচাইবাছাই করছে। আমি তাদের আনন্দে বাগড়া দিতে চাচ্ছি না। তার অর্থ এই নয় যে, আমাকে ধরেবেঁধে এখনই বিয়ে দিয়ে দিবে আর আমিও সুড়ুত করে তাতে রাজি হয়ে যাবো!’

সুরমার কথা শুনে তবুও কেন যেন ভরসা হলো না আমার। এই মেয়ে কখন কী করে বসে কে জানে! মাঝখান থেকে একটা ছেলের জীবন একেবারে যেন তছনছ না হয়ে যায়! নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে। কেন যে তখন বান্ধবীদের সাবধানবাণীতে কান দিইনি!

ভর্তিযুদ্ধে ভালোভাবে উত্তীর্ণ হয়ে মেডিক্যালে চান্স পেয়ে গেলাম। বড়মামা কাঁদতে কাঁদতে রেজাল্ট নিয়ে এলো। রেজাল্ট অনলাইনেই দিয়েছিল, কিন্তু আমার দেখার সাহস হয়নি। ভিন্ন এক জেলার মেডিক্যালে হলো, তবে মেধাতালিকা দেখে ভরসা পেলাম। সহজেই এই জেলার মেডিক্যাল কলেজে মাইগ্রেশন করিয়ে নিতে পারবো।

আমাদের দাদা কিংবা নানার পরিবারের কোনোদিকেই কেউ ডাক্তার হয়নি। চাচাদের সবাই হয় ব্যবসা নয়তো জেনারেল ক্যাডারে পড়ালেখা করেছে। আর দুইমামার একজন শিক্ষক। তাই পরিবারে প্রথম একজন ডাক্তারী পড়তে যাবে, এতে সবাই খুবই আনন্দিত হলো। নানী মাঝে মাঝেই চোখের পানিতে দিশেহারা হয়ে বলতে লাগলো, ‘এমনই অভাগা মেয়ে আমার! মেয়ের এমন খুশির দিনটাকে দেখতে পারলো না। কোন সুখ নিয়ে মত্ত হয়ে আছে…কে জানে!’

নয়নের খুশি দেখে কে! তার বোন ডাক্তার হবে…এটা শোনার পর থেকেই ধেই ধেই করে নাচছে। নয়ন এখন ক্লাস নাইনে পড়ছে। বড়মামার হস্তক্ষেপের পর ওর সেই সমস্যা অনেকটা কেটে গেছে। এখন অনেক মন দিয়ে পড়াশুনা করে…দেখে স্বস্তি পাই আমি।


আরো পড়ুন: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-১৮)


 

আমার বান্ধবীদের মধ্যেও দুজন একই মেডিক্যালে চান্স পেয়ে গেলাম। সুরমার কাছে ভয়ে ভয়ে সুমনের খবর জানতে চাইলাম। সুরমা নিস্পৃহ গলায় বললো, কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে নাকি হয়নি। মেডিক্যালেও হয়নি। সামনে আছে জেনারেল ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা। শুনে আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেল।

আরো কয়েক জায়গার ভর্তি পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পরে জানতে পারলাম, সুমন নাকি এই জেলারই ডেন্টাল কলেজে চান্স পেয়েছে। এখানেই নাকি ভর্তি হবে। তাই ইউনিভার্সিটিতে আর ভর্তি পরীক্ষা দিবে না। আমার ইচ্ছে করছিল ওর সাথে একবার কথা বলতে। কিন্তু কেন জানি না, সুরমাকে ওর ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করতেই মন চায় না। সুমনের প্রতি ওর কেমন যেন নিরাসক্ত একটা ভাব লক্ষ করছি ইদানিং।

তবে আশার কথা এই যে, সুরমা শেষমেষ ওর বিয়েটাকে ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছে। শুনতে পাচ্ছি, সামনের বার নাকি আবার পরীক্ষার হলে বসবে। এবারে আবার কী করতে বসবে কে জানে! পড়াশুনা তো কিছুই করতে দেখি না। বড়মামা কিংবা অন্য কাউকেও এই ব্যাপারে কিছু বলতে দেখি না। সবাই ওর ব্যাপারটা কেমন জানি ছেড়ে দিয়েছে। ভাবখানা এই…কিছু করলে ভালো, না করলেও কোনো অসুবিধা নেই!

একটা কথা বলা হয়নি। সুরমার ওপরে ভরসা করে না থেকে আমি সুমনের প্রসঙ্গটা ইনিয়ে বিনিয়ে বড়মামীকে বলে দিয়েছি।

সুমনের ইয়াব্বড় একটা কারেক্টর এবং ক্যাপাবিলিটি সার্টিফিকেট তৈরি করে অনেক সাহস নিয়ে বলেছি, ‘ মামী, সুমনের মতো ছেলে আমাদের কলেজের গর্ব। সুরমা আর সুমন দুজন দুজনকে পছন্দ করে। সুমন এবার ডেন্টালে চান্স পেয়েছে। তোমরা প্লিজ কষ্টেশিষ্টে আর পাঁচটা বছর অপেক্ষা করো! আর তাছাড়া সুরমাও যদি এর মধ্যে এইচএসসিটা পাশ করে ফেলতে পারে তাহলে তো খুব ভালো হয়। হাজার হোক…মেয়েদের শিক্ষাগত সার্টিফিকেটটাও কিন্তু বিয়ের বাজারে কম মূল্যবান নয়! পড়ালেখা জানা বউকে শশুরবাড়িতে কেউ সহজে ঘাঁটাতে যায় না, বুঝলে? কম শিক্ষিত মেয়ে হলে সবাই একেবারে পেয়ে বসে। রান্নাঘরের চৌহদ্দিতেই সীমানা নির্ধারণ করে দেয়!’

বড়মামী ভাতের মাড় গালতে গালতে নৈবৃত্তিক মুখে উত্তর দিয়েছে, ‘ঐ মেয়ের কপালে যদি রান্নাঘরের সীমানাই নির্ধারণ করা থাকে, তাহলে কে কী করতে পারবে? পড়ালেখাটা কই করলো ছেমড়ি? আর করবে বলেও মনে হয় না। আবার কী কথা শোনালি, একজনকে পছন্দও করে বসে আছে! আচ্ছা দেখি…তোর বড়মামাকে বলে! তোর বড়মামা মানবে বলে মনে করেছিস? কোনো একটা ছেলেকে ধরে এনে এখনই পারলে কালেমা পড়িয়ে দেয়! মায়ের সেদিনের কথা শোনার পর থেকে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে আছে!’

আমি জোর দিয়ে বললাম, ‘আরে বড়মামা ঠিকই মানবে। তুমি শুধু একটু কানে তুলে দিও কথাটা। বাকিটা আমিই সামলাবো!’

বড়মামী মনে হলো আমার কথা ঠিকমত শুনতে পেলো না। আপন মনেই বিড়বিড় করে বললো, ‘যে পাজি মেয়ে! কখন কী করে বসে কে জানে! মেয়ে তো না, শত্রু পেটে ধরছি!’

আমি মাইগ্রেশন প্রসেস শেষ করে একটু থিতু হলাম। নয়নের এসএসসি কাছাকাছি চলে এসেছে। এখন থেকেই মনোযোগী হয়ে ওঠা দরকার। তাই কিছুদিন ওর পড়ালেখা দেখে দেওয়ার ভার নিলাম।

ভেতরে ভেতরে সুমনের খোঁজখবর নিতাম। সুরমাকে জিজ্ঞেস করলে হুঁ হাঁ কিছু একটা বলে কাটিয়ে দিতো। এই ব্যাপারটাও ভালো ঠেকছিল না আমার। আবার কোনো এক জায়গায় না হওয়া অব্দি সুমনকেও ফোন দিতে মন চাইছিল না। ডেন্টালে চান্স পাওয়ার খবর শুনেই বহুদিন পরে ওর সঙ্গে ফোনে কথা বললাম।

সুমনের গলার স্বর ভাঙা ভাঙা, কেমন একটু দুর্বোধ্য শোনাচ্ছিল কথাগুলো। মনে হচ্ছিলো যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসছে ওর কথা। যে ঝড়টা গেল ওর ওপর দিয়ে! এমনটা হওয়া তো অস্বাভাবিক কিছু না! সুমন আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে বললো, ‘তুমি ফোন না দিলে আমিই তোমাকে খুব তাড়াতাড়ি ফোন করতাম। তোমার সাথে জরুরি কিছু কথা ছিল। তবে…কথাগুলো ফোনে বলাটা একটু অসুবিধাজনক। তুমি কি একদিন আমার সাথে কোথাও দেখা করতে পারবা?’

আমি খুব অবাক হলাম। কী এমন জরুরি কথা বলার দরকার পড়লো সুমনের যে, ফোনে বলতে পারছে না! আমার উৎকন্ঠা চেপে রাখতে পারলাম না। উদ্বেগমেশানো গলায় বলেই ফেললাম, ‘কী হয়েছে সুমন? সিরিয়াস কিছু?’

সুমনের কথা আবার বহুদূর অতিক্রম করে আমার কাছে এসে ধাক্কা খেলো। ক্ষীণসুরে বললো, ‘উম…হুউম…সিরিয়াস তো বটেই! আমার জীবনটা যদি খুব হাল্কা কোনো জিনিস না হয়…তাহলে এই কথাগুলোও সিরিয়াস কথাই বৈকি!’

কেমন হেঁয়ালিপূর্ণ কথা! আমি কিছুই বুঝতে না পেরে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া গলায় বললাম, ‘ইয়ে…সুমন, সুরমাকে কি সঙ্গে নিয়ে আসবো?’

সুমন আঁতকে উঠে বললো, ‘না না…তুমি প্লিজ একাই এসো। সুরমাকে সঙ্গে এনো না। কথাগুলো তোমার কাছেই বলা প্রয়োজন। সুরমাকে তো অনেক বললাম। এখন তোমার কাছে বলে দেখি, কিছু ফল হয় কী না!’

সুমন ফোন ছেড়ে দিলো। আমি গভীর এক অন্ধকারে তলিয়ে গেলাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত