| 22 মে 2024
Categories
উপন্যাস ধারাবাহিক সাহিত্য

ধারাবাহিক উপন্যাস: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-২৯)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

ফোনটা পেয়ে ধড়মড়িয়ে বিছানায় উঠে বসলাম।

মোবাইলে সময় দেখলাম। রাত বাজে একটা সাতচল্লিশ মিনিট। এত রাতে বিপ্লব ফোন করেছে? কোথায় আছে সে এখন? পুলিশ তাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজছে, আর সে আমার সাথে মশকরা করছে!

অবশ্য মশকরা করলো না কী করলো কিছুই তো বুঝতে পারলাম না! কাঁচা ঘুম ভেঙে ফোনটা ধরেছি। প্রথমে তো বুঝতেই পারছিলাম না কে কথা বলছে! দুই একটা কথার পর আওয়াজটা কানে এসে ধাক্কা মারলো। কিন্তু পাল্টা কিছু বলার সুযোগই পেলাম না। ঐ কয়টা কথা বলেই ফোনটা কেটে দিলো বিপ্লব।

আমি বেকুবের মতো হাঁ করে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। বিপ্লবের এত সাহস? পুলিশ হন্যে হয়ে আছে ওর পেছনে, আর সে নিজের ইতরামি চালু রেখেছে! আমি পুলিশকে বলে দিতে পারি, এই সম্ভাবনাটা তার মাথাতেই আসছে না! কত বড় সাহস! আর কী বললো এসব? ওর কাছে যাবো? কীভাবে আশা করে ইতরটা? মাথার মধ্যে সূক্ষ্ণ একটা যন্ত্রণা বোধ করছি। মাথা ধরার পূর্ব লক্ষণ।

ঘুম ভেঙ্গে গেছে পুরোপুরি। বাকি রাত যে আর ঘুম আসবে না তা বলাইবাহুল্য। পাশের বিছানায় সুনেত্রা ঘুমাচ্ছে। ওর চোখেমুখে একটা অব্যক্ত যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট। হয়ত নিচ্ছিদ্র ঘুম ঘুমাতে পারছে না বেচারি। ছাড়া ছাড়া দুঃস্বপ্নের সাথে আধো ঘুম আধো জাগরণ। ওকে খুব চোখে চোখে রাখা হচ্ছে। কারো সাথেই তেমন একটা কথাবার্তা বলছে না। আগে শুধু লেখাপড়া নিয়ে মেতে থাকতো। এখন সেটাও ঠিকমত করছে না।

বড়মামা আর মামীর দিনরাত এখন স্থবির। কাজকর্ম খাওয়াদাওয়া সবকিছু মাথায় উঠেছে। বড়মামী তো একরকম অপ্রকৃতিতস্থের মতো আচরণ করছে। কিছু একটা করতে করতে কেমন জানি খেই হারিয়ে ফেলছে। কোথায় কী রাখছে ঠিকমত মনে করতে পারছে না। বড়মামার অবস্থাও খুব একটা ভালো না। মামাকে স্কুল থেকে কয়েকদিন ছুটি নিতে বলা হয়েছে। মামা মনের জোরে স্কুলের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এই জোরটা শুধুমাত্র অন্যের কাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ না করার জন্য।

যেখানে মামা-মামীরই এই অবস্থা সেখানে সুনেত্রার অবস্থা দেখা কিংবা বোঝার মতো মানসিক জোর এখন তাদের নেই। এক মেয়ের চিন্তায় আরেক মেয়ের কথা ভাবারও ফুরসত পাচ্ছে না তারা। সুনেত্রাকে নানী সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখছে। যদিও সুনেত্রা সেটা সবসময় এলাউ করছে না। কিন্তু নানীও নাছোড়বান্দার মতো পিছে লেগে আছে।

আমি সাবধানে বিছানা থেকে নামলাম। সুনেত্রার ঘুম ভাঙানো যাবে না কিছুতেই। যা ঘটছে, তা আমাকেই সামলাতে হবে। ডাইনিং রুমের টেবিল থেকে হাতড়ে হাতড়ে একটা গ্লাস নিলাম। এই বাসায় প্রত্যেকেই নিজের নিজের গ্লাসে পানি খায়। আমি কার গ্লাস নিলাম জানি না। কিন্তু অতকিছু দেখার সময় নেই। তৃষ্ণায় যেন ছাতি ফেটে যাচ্ছে আমার। সম্ভবত ভয় থেকেই তৃষ্ণা পেয়েছে। ঢক ঢক করে পানি খেয়ে আবার নিজের বিছানায় গেলাম। বিছানায় গায়ে বালিশ লম্বালম্বি করে রেখে চেয়ারের মতো বানিয়ে তাতে স্থানুর মতো বসে রইলাম।


আরো পড়ুন: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-২৮)


ভাবছি আমি। বিপ্লব কেন ফোনটা করলো, এটা আমাকে বুঝতে হবে। সুরমার জামিন পাওয়া নিয়ে নিশ্চয়ই কোনো মাথাব্যথা নেই বিপ্লবের। সে মনে হয়, আমার কাছে নিজের কৃতিত্ব জাহির করতে চাইছে। কিংবা বীরত্ব। কিছু মানুষ সবরকম পরিস্থিতিতেই সেটা করে থাকে।

সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা কঠিন। তবু করতে হবে উপায় নেই। কী কাজগুলো করবো সেগুলো মনে মনে ঠিক করে নিলাম।

প্রায় সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে একেবারে শেষরাতের দিকে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙল ফজরের আজানের শব্দে। অগাঢ় ঘুম। ঘুম না বলে তন্দ্রাও বলা যায়। আজানের আওয়াজ কানে যেতেই সেটা ভেঙে খান খান হয়ে গেল। আজ আমাকে অনেক কাজ করতে হবে। ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করার কোনো মানে নেই।

আমি কান পেতে আজানের কথাগুলো শুনলাম। কী সুন্দর লাগলো কথাগুলো! এই বাসায় আসার পর থেকে নানী প্রথমদিকে খুব তাগিদ দিত নামাজ পড়ার। আমি পড়ি ঠিকই, কিন্তু খুবই অনিয়মিত। ফজরের ওয়াক্তে একদিনও ওঠা হয় না। আজ উঠতে পেরে প্রথমেই ওজু করে নামাজটা পরে নিলাম। তারপর দরজা খুলে খুব ধীরে পা ফেলে ছাদে উঠে গেলাম। বাসার কেউ কেউ জেগে আছে। আমি নিজের উপস্থিতি জানাতে চাইলাম না।

ছাদে গিয়েই মোবাইলে রিসেন্ট কললিস্টে গিয়ে গতকাল রাতের নাম্বারটা বের করলাম। তারপর সাত পাঁচ অতকিছু না ভেবেই নাম্বারটাতে কল করলাম। এত সকালে ঘুম থেকে জাগেনি সেই চিন্তা আমার মাথাতেই এলো না। বুকের মধ্যে দড়াম দড়াম করে কে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে! বিপ্লব ফোন ধরলে তাকে কী বলবো সেসব চিন্তা মাথার মধ্যে জট পাকিয়ে তুলছে। তবু ফোন করা থেকে কিছুতেই নিজেকে সম্বরণ করতে পারলাম না আমি।

বারকয়েক রিং হলো কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ ধরলো না। সেটাই স্বাভাবিক। বিপ্লবের মতো ধূর্ত শেয়াল এত ভোরে উঠে কী করবে? তাদের কাজকর্মের জন্য তো রাতের অন্ধকারই সেরা সময়!

আমি ফোনটা বন্ধ করে কিছুক্ষণ ছাদে পায়চারি করলাম। চাচ্ছিলাম না বিপ্লব আমাকে কল ব্যাক করুক। ঝোঁকের মাথায় কলটা দিয়ে ফেলেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে আমার কিছুটা প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

কী করবো বা করা উচিত এটা ভাবতে গিয়ে একটা চিন্তাই মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো। পুলিশের কাছে যাবো আমি। সব কথা বলে দিব পুলিশকে। বিপ্লব ধরা পড়ুক। ওর সাঙ্গোপাঙ্গরাও বেরিয়ে আসুক। এই কুকর্মের মূল হোতারা বের হলেই কেবল সুরমাকে বাঁচানো সম্ভব। আমাদের উকিলও সেই কথাই বলছেন। তাহলে কেসটাকে তিনি একদিকে ঘোরাতে পারবেন। কিন্তু এখন এই পরিস্থিতিতে সুরমার পক্ষে কিছুই প্রমাণ করা সম্ভব নয়। আদালত তার সমস্ত দাবীই নাকচ করে দিবে।

সুরমা আদালতে বলছে যে, সে আরেকজনের ফাঁদে ফেঁসে গেছে। কিন্তু এই কথার ভিত্তি নেই কোনো। যখন মূল হোতারা বের হবে, তখন তাদের মাধ্যমে আসল সত্যটার কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব। যদিও সেই পথও খুব সুগম নয়, কিন্তু সেই পথে চললে গন্তব্যের দিশা পেলেও পাওয়া যেতে পারে। তা নইলে কিছুতেই গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। সুরমাকে কত বছর জেলে পচতে হবে তা কেউ জানে না!

ছাদ থেকে নামতেই দেখি বাসার মূল দরজার কাছে ছোটমামী দাঁড়িয়ে আছে। ছোটমামী আমাকে আপদমস্তক দেখে নিয়ে বললো, ‘এই সাতসকালে ছাদে কী করছিলে? তুমি কি প্রতিদিনই এই সময়ে ছাদে যাও?’

আমি ছোট করে একটা কিছু উত্তর দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেলাম। ছোটমামী পেছন থেকে হাঁ করে আমাকে দেখছে বুঝতে পারছি। এত অবাক হওয়ার কী হয়েছে বুঝতে পারছি না। মনে মনে কী যে ভাবছে কে জানে!

ভাবুক গে যা খুশি! প্রত্যেকের ভাবনায় জিন পরানোর দায়ভার কেন একা আমারই হবে? আর তাছাড়া এসব নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার সময় নেই এখন। পুলিশস্টেশনে যেতে হবে। বিপ্লবের এই কলের ব্যাপারে পুলিশকে জানাতে হবে। হয়ত নাম্বারের লোকেশন ট্রেস করতে পারলে বিপ্লবকে ধরতে পারা যাবে। আমি ঝটপট বাথরুমে ঢুকে গেলাম। দ্রুত রেডি হয়ে সকাল সকালই বেরিয়ে পড়বো। যদিও দশটার আগে কাজ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবু হাতে কিছু সময় রাখা দরকার।

নাকে মুখে কিছু একটা গুঁজে নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। আজকেও ক্লাসে যাবো না। এই মুহূর্তে সবার্থপরের মতো নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকা যায় না।

মাঝে মাঝেই নিজেকে একটা প্রতিজ্ঞার কথা মনে করিয়ে দিই আমি। একটা ভেঙে পড়া সংসারের প্রতিটা দুমড়ে যাওয়া ভাঁজ নিজের চোখে দেখেছি আমি। সেই দৃশ্য আমার পক্ষে দ্বিতীয়বার দেখা সম্ভব নয়। সংসারের ঐক্য, ভালোবাসা, বন্ধন…এগুলোর অস্তিত্ব যখন হারিয়ে যায় তখন শ্বাস নেওয়াটাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। আমার সাধ্য দিয়ে যতটুকু সম্ভব, সেই ভাঙনকে আটকাবো আমি! একটি কাঁচকেও আমি ভাঙতে দিব না!

আমি যে প্রায়ই ক্লাস বাদ দিচ্ছি এটা আমাদের কলেজের টিচারদেরও অবগতিতে এসে গেছে। সেদিন একজন টিচার ক্লাসের মাঝখানেই আমাকে দাঁড় করিয়ে বিষয়টা জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি মাথা নিচু করে থাকতে বাধ্য হয়েছি। পুরো ক্লাসের কাছে এমন একটা চাঞ্চল্যকর খবর ফাঁস করে দেওয়া যায় না। আমার নীরবতাকে অবহেলা মনে করে পুরো দশ মিনিট লেকচার ঝাড়লেন সেই টিচার।

‘তোমরা কি মনে করেছো যে, মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছ বলেই তোমরা এখনই ডাক্তার বনে বসে আছো? এত সহজ নয় কিন্তু! এখানে তোমাদের পাঁচ পাঁচটি বছর নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সেজন্য সবার আগে চাই শৃঙ্খলা…’

ভাগ্য ভালো ছিল, পুলিশ অফিসারকে সিটে পেয়ে গেলাম। সুরমার কেসটা উনিই দেখছেন। আমি আদ্যোপান্ত গতকালের বিপ্লবের ফোনের বিষয়টা খুলে বললাম। নড়েচড়ে বসলেন অফিসার। উত্তেজিত ভাবে বললেন, ‘কই দেখি? কোন নাম্বার থেকে ফোন করেছে? সেই নাম্বারে কল দিয়ে কথা বলুন। লোকেশনটা এখনই ট্রেস করে ফেলা দরকার! মঞ্জু…শিগগির ট্রেসিং মেশিন অন করো…’

আমি ফোনটা অন করলাম প্রথমে। সেই তখন থেকে বন্ধ করে রেখেছি ফোনটা। কললিস্ট থেকে নাম্বারটা বের করে কল দিতেই হোঁচট খেলাম। ওপাশ থেকে বলছে, ‘আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি বন্ধ আছে!’

ভস করে হতাশার একটা আওয়াজ বেরিয়ে এলো পুলিশ অফিসারের কন্ঠ থেকে,

‘যাচ্চলে! বন্ধ করে ফেলছে! ইস! হলো না! তবে একবার যখন যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে তখন আবারও করবে। হয়ত এই নাম্বার থেকে অথবা অন্য কোনো নাম্বার থেকে। আপনি তো আর সেই সময়ই আসতে পারবেন না। কাজেই…এক কাজ করবেন! কিন্তু তার আগে বলুন দেখি, আপনাকে এমন কথা বললো কেন বিপ্লব?’

আমি চিরতার পানি পান করার মতো করে এই দুর্গন্ধযুক্ত তেতো গল্পটা বললাম। শুনে নিয়ে অফিসার বললেন, ‘ওহ আচ্ছা! এই কথা! সে আপনার ক্লাসমেট ছিল! আপনাকে পটাতে না পেরে আপনার কাজিনকে পটিয়েছে! আচ্ছা ইন্টারেস্টিং! যাহোক তাহলে এক কাজ করতে হবে আপনাকে। আপনাকে বিপ্লবের ফাঁদে পা দিতে হবে!’

‘তার মানে? কী বলছেন আপনি?’

‘হুম! এছাড়া আর কোনো পথ পাচ্ছি না। বিপ্লবকে ধরার এটাই একমাত্র উপায়। তবে চিন্তার কোনো কারণ নেই। পুলিশ প্রটেকশন থাকবে। সাদাপোশাকে পুলিশ ঘিরে থাকবে আপনাকে। আপনি জানতেও পারবেন না। আর আরেকটা কথা। আপনি যখন তখন এখানে চলে আসবেন না। আমার সাথে ফোনে যোগাযোগ রাখবেন। কিন্তু সেটাও খুবই লিমিটেড পর্যায়ে। আর কাউকে…আই মিন…কোনো একজনকেও এই ব্যাপারটা বলবেন না! এমন ভাব করবেন যেন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। কাউকে কিচ্ছু জানতে বা বুঝতে দিবেন না! বুঝতে পেরেছেন?’

আমি ভীষণ অনিশ্চয়তা নিয়ে মাথা কাত করলাম। অফিসার আবার বললেন, ‘নেক্সট দিন ফোন করলেই আপনি দেখা করার লোকেশন জানতে চাইবেন। আর আপনার ফোনটা আমরা ট্রেস করবো। বিপ্লবের সাথে কথা হলেই আমরাও জায়গামত পৌঁছে যাবো!’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত