| 15 জুলাই 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

বিজয় দিবস গল্প: বিভীষণের হাসি । ক্ষমা মাহমুদ

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

দোতলা থেকে এক এক লাফে দুটো করে সিঁড়ি টপকে নীচে নেমে খাবার ঘরে আসতেই দাদী তার ফোকলা দাঁতের ফাঁক দিয়ে যতটা সম্ভব গলা উঁচিয়ে আমায় ডাক দিল, ‘ও বিনি, শুনে যা তো….’

‘উফফ! গেল আমার বেশ খানিকটা সময় এবার…’ একটু বিরক্ত হয়েই ভাবলাম।

আমার গানের স্কুলে লিখিত পরীক্ষা আজকে, দুপুর তিনটা থেকে শুরু, হাতে আর ঘন্টা দুয়েক সময় আছে। দুপুরের খাওয়া তাড়াতাড়ি সেরে, পড়াটা আর একটু ঝালাই করে নিয়ে দৌড়বো পরীক্ষা দিতে, গানের স্কুল বাড়ীর কাছেই। মনের মধ্যে সারাক্ষণ প্রশ্নোত্তোর গুলো ঝালিয়ে নিচ্ছি, তবু পরীক্ষা বলে কথা, একটু টেনশনতো আছেই।

দাদীর ডাক শুনে এই ব্যস্ত সময়ে একটু বিরক্ত হলেও কাছে যেয়ে বসলাম। অনেক বয়স হয়েছে, মায়াও লাগে। নানান ব্যস্ততায় সবাই সবসময় তার দিকে যতটুকু মনোযোগ দেয়া উচিত তা হয়তো আমরা দিতে পারিনা, তবে আমার আব্বার মাতৃভক্তি কিংবদন্তীতুল্য! অনেক গুলো ভাইবোন থাকলেও আব্বা দাদীকে বেশীরভাগ সময় গ্রামের বাড়ী থেকে আমাদের এই মফস্বল শহরের বাসাতেই এনে রাখেন, হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও মায়ের প্রতি তার কর্তব্যে অবহেলা কখনই নয়। মা সারাদিন তার স্কুলের চাকরী নিয়ে আর আমরাও ভাইবোনেরা নানান তালে যার যার মত ব্যস্ত। ছুটির দিন ছাড়া সবাইকে বাড়ীতে একসাথে পাওয়া এক দুরূহ ব্যাপার। দাদীর কখন কি লাগবে তার জন্য অবশ্য আমাদের সুখি’র মা আছে। তবে সারাক্ষণ শুধু সুখি’র মার সাথে থাকতে দাদীর নিশ্চয়ই ভালো লাগেনা সেটা বুঝি, সেজন্যেই চোখের সামনে কাউকে দেখলে দাদী ডাকাডাকি করে অস্থির করে তোলে একটু কথা বলার জন্যে। কিন্তু দিনের এই সময়টায় সবাই যার যার কাজে বাড়ীর বাইরে, বাড়ীতে শুধু দাদী আর সুখি’র মা। আমিও আজকে এই পরীক্ষার কারণেই বাসায় নইলে অর্ধেকদিনই কেটে যায় কলেজে।

দিনের অধিকাংশ সময়, কুজোঁ হয়ে অর্ধেক ঝুঁকে, তার নীল-সাদা রঙের প্লাস্টিকের বেতের চেয়ারটায়, ব্লাউজ ছাড়া চিকন পাড়ের নরম সাদা সুতী শাড়ী পরে বসে থাকে দাদী।লোহার হামান দিস্তায় চুন, খয়ের, কাঁচা সুপারীসহ বেশ খানিকটা পান একসাথে টুকটুক করে বেটে রাখে।সারাদিনে নিজে এটুকু কাজই সে তার ক্ষীনকায় হাত দুটো দিয়ে করতে পারে। বেটে রাখা পানগুলো বিকাল পর্যন্ত হামানদিস্তার মধ্যেই থাকে আর দাদী সারাদিন ধরে একটু একটু করে সেই পান কিছুক্ষণ পর পর মুখে দিয়ে ফোকলা দাঁতে শুধু মাড়ি দিয়ে চিবোতে থাকে। দাদীকে দেখতে আত্মীয় স্বজনেরা বাড়ীতে এলে হামান দিস্তার সেই বাটা পান দাদী তাদের হাতেও একটু খানি করে তুলে দেয়। আমরা ছোটরাও কখনও কখনও বাটা পান খাওয়ার লোভে দাদীর কাছে যেয়ে হাত পাতি। ‘বেশী নেই,বেশী নেই’ বলেও একটুখানি করে তুলে দেয় আমাদের হাতে। সারাদিন এভাবেই কাটে দাদীর, যখন ক্লান্ত লাগে তখন সুখি’র মা ধরে ধরে বিছানায় শুইয়ে দেয়। সংসারের অন্যসব কাজের ফাঁকেও দাদীর সব কাজের প্রতি কড়া নজর সুখি’র মায়ের যদিও দাদীর সাথে তার অম্লমধুর সম্পর্ক। দীর্ঘদিন ধরে গোসল করানো থেকে শুরু করে খাওয়ানো, কাপড় পরানোসহ একজন বৃদ্ধ মানুষের যাবতীয় কাজ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত করতে করতে সে বেচারীও ক্লান্ত হয়ে গেছে। মাঝে মাঝেই দুজনের উচ্চগ্রামে চিল্লাচিল্লি শোনা গেলেও আমরা চুপ করে থাকি কারণ সুখি’র মা ছাড়া দাদীর ব্যাপারে আমরা অসহায়! সুখি নামে তার এক দুখি মেয়ে ছাড়া, যাকে নাকি খুব ছোট বয়সে বিয়ে দেয়ার পর মায়ের কাছে আর কখনও আসতেই দেয়নি তার শ্বশুর বাড়ীর লোকেরা, নেহায়েত দিন দুনিয়ায় তার তেমন কেউ নেই বলেই এত সহ্য করা!

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সময়টা আমরা দুষ্টুমি করে বলি, ‘দাদীর চাঙ্গা টাইম’, কারণ প্রতিদিন সকালের দিকে নাস্তা খাওয়ার পর আব্বা শক্তিবর্ধক কি যেন একটা বেশ দামী ওষুধ দাদীকে খাওয়ায়। সেটা খাওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই তার প্রচুর এনার্জি, একে তাকে ডেকে ডেকে গল্প করতে চায়। দুপুরের খাওয়া পর্যন্ত ওষুধের প্রভাবে সে একটা ঝরঝরে অবস্থায় থাকে আর বিকেল থেকে শুরু হয় একটা আচ্ছন্ন অবস্থা, আধো জাগরণ আর ঘুমে কেটে যায় বাকী রাতটা, এভাবেই চলছে অনেকগুলো বছর। জ্ঞান হওয়া থেকে এই কুড়ি বছর অব্দি তাকে আমি এভাবেই দেখে আসছি, হেটে চলে বেড়ানো দাদীর কোন স্মৃতি আমার নেই। পুরনো দিনের এ্যালবামে অবশ্য আমার দাদীর যেসব ছবি দেখি আর এখনও আশি ছুঁইছুঁই কুঞ্চিত দুধে আলতা ত্বক সাক্ষী দেয় যে ভারী ডাকসাইটে সুন্দরী সে একজন ছিল বটে। দাদীর নিজেরও সে ব্যাপারে অহংকার যে মোটে কম ছিলনা সেটাও আমরা বুঝি, যখন নিজের যৌবন কালের সৌন্দর্যের রসালো গল্পের ঝাঁপি মাঝে মাঝে আমাদের কাছে খুলে বসে। একটা ছড়া নিয়ে তো আমরা ভাইবোনেরা দাদীর সাথে মাঝে মাঝে খুবই হাসি তামাশায় মেতে উঠি। আমার দাদা নাকি তাকে আদর করে বলতো, ‘তুমি আমার শীতের কাঁথা, তুমি আমার মশারী, ওগো সুন্দরী!’ দাদীও ফোকলা দাঁতে খুব মিষ্টি মিষ্টি হেসে আমাদের সাথে এইসব খুনসুটিগুলো ভালোই উপভোগ করে।

আজকে এখন এই ভরদুপুরে দাদীর চেহারা দেখেই আমি বুঝতে পারছি তার সেই ফুরফুরে অবস্থা এখন চলছে, কিন্তু আমারতো এখন একফোঁটাও সময় নেই, পরীক্ষা দিতে যেতে হবে। তবু কাছে যেয়ে বসতেই ফোকলা দাঁতের ফাঁক দিয়ে বললো, ‘আজকে কি খাবি রে দুপুরে? সুখি’র মা তো আমারে কিছুই বলতি চায়না।’

বললাম, ‘দাদী সুখি’র মা বলেনা কারণ তোমাকে সবকিছু খেতে দেয়া যাবেনা, তোমার শরীর খারাপ করবে, তবে’ – খাবার টেবিলে রাখা খাবারের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আজ যা রান্না হয়েছে তা তুমি মোটামুটি সবই খেতে পারবে, ডিমের ঝোল, পেঁপে ঘন্টো, পাতলা ডাল আর ইলিশ মাছের ডিম ভুনে রাখা আছে।’

‘ইলিশ মাছের ডিম আছেরে আজকে?’ দাদীর মাখনের মত মোলায়েম ত্বকের মুখটা হাসি হাসি হয়ে উঠেই আবার কেমন যেন নিভে গেল। বিড়বিড় করে বলতে শুনলাম, ‘আমার হীরক যে ইলিশ মাছের ভুনা ডিম খাতি কি পছন্দ কইরতোরে বিনিতা।’

‘এইরে, এইবার শুরু হয়ে গেল!’ আমি প্রমোদ গুণলাম ! ছোটকাকুর কথা উঠলেই গোটা পরিবেশ একেবারে ভারী হয়ে যায়। ছোটবেলা থেকে এই একই ব্যাপার দেখতে দেখতে আর শুনতে শুনতে সব মুখস্থ আমাদের সবার। এই বৃদ্ধ বয়সে এসে আর সব কিছু প্রায় ভুলে গেলেও আমার দাদীমা ভুলতে পারেনা তার ছোট ছেলে হীরক কি কি খেতে ভালোবাসতো! আমার ছোট কাকু যখন যুদ্ধে যায় তখন সে ছিল তেইশ বছরের এক তাগড়া, টগবগে যুবা, দাদীর ছয় সন্তানের মধ্যে বড় আদরের সবচেয়ে ছোট ছেলে।

জ্ঞান হওয়া অব্দি আমাদের এই মফস্বল শহরের বাড়ীর ড্রইংরুমে দুটো ছবি পাশাপাশি সাজানো দেখে আসছি। আব্বার লেখালেখি করার বড় যে টেবিল তার ঠিক পাশেই বুকশেলফের উপরে দুটো ছবি আছে সুন্দর করে বাঁধানো, একটা মাওলানা ভাসানীর আর একটা ছোটকাকুর। তেইশ বছর বয়সেই থেমে যাওয়া, তরতাজা, শান্ত, সুন্দর মুখটা ছবি হয়েই থেকে গেল ভায়ের টেবিলের পাশে আর মায়ের ঘরের দেয়ালে টাঙানো অবস্থায়! দুজনের ছবিই আব্বা নিজের হাতে তাজা ফুলের মালা দিয়ে জড়িয়ে রাখে।

নিজের হাতে ধরে, সাথে করে যুদ্ধে নিয়ে যাওয়া ছোট ভাইটা এভাবে ছবি হয়ে যাবে আব্বা হয়তো ভাবেনি কিন্তু বাস্তবে তাই ঘটেছিল। অনেক চেষ্টা করেছিল ভাইকে ধরিয়ে দেয়ার পিছনে যারা দায়ী তাদের খুঁজে বের করতে। শহরের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ আব্বা, যুদ্ধের পরে সবই জানতে পেরেছিল আর জানার পর চিরদিনের মত এই ব্যাপারে চুপ হয়ে গিয়েছিল। যা জেনেছিল তা যে অন্যদের জানানো যায়না, বড় বেদনা সে সত্য সামনে আসলে!

মফস্বল শহরের আমেজ গায়ে লাগা একেবারে কাছের গ্রাম থেকে কলেজে পড়তে এসে খুব অল্পদিনের মধ্যেই হীরক একেবারে সবার মধ্যমণি, তার দরাজ গানের গলায় সবাই মাতোয়ারা। গান বাজনা আর লেখাপড়ার পাশাপাশি কখন যেন একটু একটু করে ছাত্র রাজনীতির সাথেও জড়িয়ে গেল। তারুণ্যের উচ্ছাসে ভরা জীবন তরতর করে যেন উড়ছিল। তবে সময়টাও ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ডামাডোলে উত্তাল হয়ে উঠছিল।

পঁচিশে মার্চের আগে থেকেই ঘরে বাইরে সবজায়গাতেই একটা চাপা উত্তেজনার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে সবাই। জাতীয় পরিষদ স্থগিত হয়ে যাবার খবরে পহেলা মার্চ থেকেই শহর জুড়ে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা আর সেই সাথে শুরু হয়ে গেল অসহযোগ আন্দোলন। সাতই মার্চ শেখ মুজিবের ভাষণের পর যেন আরো থমথমে অবস্থা। সবাই বুঝতে পারছে বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে। কলেজে ছাত্ররাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে এবং রাজনীতি করা বড় ভায়ের বাসায় থাকার কারণে ঘরে বাইরে সবখানেই দেশের উত্তপ্ত রাজনীতির আচঁ হীরক ভালোভাবেই টের পাচ্ছিল।

পঁচিশে মার্চের রাত থেকেই যেন শুরু হয়ে গেল মহাপ্রলয়। পাকিস্তানী আর্মিদের প্রতিহত করতে গোপন পরিকল্পনা অনুযায়ী হীরকের বড়ভাইরা গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে দিল। বড় ভাই তার দলবল নিয়ে অসীম সাহসিকতার সাথে পঁচিশে মার্চের রাতে শহরে পাকিস্তানী সৈন্যদের বিরুদ্ধে বোমা চার্জ করে তাদের শহরে ঢোকার পথ কঠিন করে তুললো। ভয়ংকর অনিশ্চিত এক একটা দিন ও রাত পার করছিল সবাই। হীরক সবকিছুতেই বড়ভায়ের ছায়া হয়ে পাশে পাশে থাকে। প্রতিদিনই তারা কোথাও না কোথাও গুপ্ত হামলা চালিয়ে পাকিস্তানী সৈন্যদের ব্যতিব্যস্ত করে রাখছে। পাকিস্তানী সৈন্যদের বিরুদ্ধে এভাবে মাস তিনেক ধরে অসহযোগ প্রতিরোধ চলতে থাকলো। বড় ভাইকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্যে পুরস্কার ঘোষনা হলে বড় ভাই আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হলো। তাতেও যেকোন মুহূর্তে ধরা পড়ে যাবার ভয় , প্রতিকূলতার মধ্যে আর টিকতে না পেরে অবশেষে বড় ভাই একটা দল নিয়ে বর্ডার পার হয়ে ভারতে গিয়ে ভারত সরকার, প্রবাসী বাংলাদেশী সরকার এবং প্রবাসী বাংলাদেশ আর্মির সিলেকশনে চীফ লিয়াজো অফিসার হিসাবে দায়িত্ব নিয়েজিত হলেন আর হীরককে যুদ্ধ করার জন্যে ট্রেনিংএ পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ট্রেনিং নিয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়িস, দেশটা বাঁচাতেই হবে।’

ভারতে গিয়ে আর্মির তত্ত্বাবধানে, মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে হীরক তিন মাসের ট্রেনিং শেষ করে পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের প্রথম অপারেশন চালানোর জন্য ফিরে এলো শহরে। সব পরিকল্পনা পাকা হলে দলের কমান্ডার আফসার ভাইকে বললো, ‘আমরা তো বাড়ির একেবারে কাছেই আছি। পাঁচ মাস হয়ে গেছে মায়ের মুখ দেখা হয়নি। অপারেশনে যাওয়ার আগে মায়ের সাথে রাতের অন্ধকারে যেয়ে চুপিচুপি একবার দেখা করে আসি। আফসার ভাই প্রথমে না করতে যেয়েও পরে কি মনে করে রাজী হলেন। হীরকের বাড়িতে তার মায়ের হাতে তারা কত যে খেয়েছেন সেই স্মৃতি মনে পড়ে গেল। বলেছিলেন, ‘খুব সাবধানে যাও আর জলদি ফিরে এসো।’

রাত একটু বাড়লে, দুজন সঙ্গী নিয়ে গ্রামের ভেতর দিয়ে নিস্তরঙ্গ বয়ে চলা নদীর ধার দিয়ে সাবধানে পা ফেলে ওরা এগোয়। মিশমিশে কালো অন্ধকার পথ, ছিটেফোটা বাতাসও নেই, আকাশ গুমোট হয়ে আছে। পাখ পাখালিও বুঝি ডাকাডাকি ভুলে গেছে পাকিস্তানী মিলিটারীর ভয়ে। নিঃশব্দে ওরা তিনজন এগোতে এগোতে হঠাৎ অন্ধকার ফুড়ে আপাদমস্তক সাদা কি যেন এসে পড়ে ওদের সামনে। হীরক ভালো করে তাকিয়ে দেখে তার আপন বড় দুলাভাই। সেও অন্ধকার ভেদ করে দেখার চেষ্টা করছে হীরকদেরকে। বুকের মধ্যে ধড়াস করে ওঠে হীরকের! বড় দুলাভায়ের তো এই মুহূর্তে এখানে থাকার কোন কারণই নেই, সেতো থাকে শহরে। একদম ছোট ভাই হিসেবে হীরক তার বড়বোনের কলিজার টুকরো কিন্তু দুলাভাই মানুষটা একটু অন্যরকম, তার সাথে দেখা না হলেই যেন ভালো ছিল, সাথে দুতিন জন লোকও আছে। হীরককে দেখে দুলাভায়ের চোখেও যেন কিসের একটা দ্যুতি খেলে গেল। শ্যালককে এতদিন পরে দেখে খুশি নাকি এই খুশীর পিছনে অন্য কোন কারণ আছে হীরক বুঝতে পারেনা।

মাথায় সাদা টুপি, আর ধবধবে সাদা পাজামা পান্জাবী পরা নুরানি চেহারায় হাসি দিয়ে দুলাভাই বলে ওঠে,

‘আরে শালাবাবু যে, হঠাৎ কোন জায়গা থেকে হাজির হলে কওতো? ভারতে ট্রেনিং করতে গেছিলা নাকি?’

হীরকের মনের মধ্যে ঘন মেঘ ঘনায়।

‘ভাই সাহেব আপনি এই রাতের বেলা এখানে! না, না, আমি কোন ট্রেনিং এ যাইনি, একটু আত্মগোপনে আছি, জানেনতো কলেজে আমি একটু গান বাজনা, এটা সেটা করি, তাতেই অনেকের চক্ষুশূল, কিন্তু এভাবে কতদিন আর পালিয়ে থাকবো, ভাবলাম মাকে দেখিনা অনেকদিন, একটু দেখা করে আসি।’

মিথ্যা কথায় অনভ্যস্ত হীরকের নিজের কানেই কথাগুলো কেমন বোকা বোকা শোনায়।

দুলাভাই এক রহস্যময় হাসি হাসতে লাগলো। লম্বা, এক বিঘত সাদা দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বললো, ‘তুমার সাথে এরা কারা? বন্ধু বুঝি?’ হীরক সম্মতি সূচক মাথা নাড়ে।

দুলাভাই পান চিবুতে চিবুতে লাল টুকটুকে ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে পিচ করে পিক ফেলে বলে, ‘আচ্ছা, যাও শালাবাবু, আম্মার সাথে দেখা করো, তিনি বড় অস্থির হয়ে আছেন তোমাদের দুই ভাইয়ের জন্য।’

যাওয়ার জন্যে উদ্যেত হয়ে আবার কি যেন মনে পড়াতে হীরকের দিকে একটু ঝুঁকে গলা নীচু করে বললো, ‘তা বড় জন কনে? সে তো দেহি উধাও হয়ে গেছে!’

হীরক বললো, ‘আমিও বড়ভায়ের কোন খোঁজ জানিনা অনেকদিন।’

হীরক বুঝলো তার দুর্বল মিথ্যা কথাটা দুলাভাই বিশ্বাস করেনি। একপলক হীরকের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবলো তারপর একটু হাসি দিয়ে বললো, আচ্ছা, যাও, যাও, আমিও যাই।’ বলে একটু তাড়াহুড়ো করেই যেন সামনে পা বাড়ালো। লম্বা দাড়ির মধ্যে লুকানো তার সে হাসির মাজেজা বোঝা গেলনা।

মনের মধ্যে একটা খুঁতখুঁতানি নিয়ে সঙ্গী দুজনকে বাড়ি থেকে একটু দূরে রেখে নিজে নিঃশব্দে মায়ের বাড়িতে ঢুকলো হীরক। এতো রাতে হঠাৎ ছেলেকে পেয়ে মা দিশেহারা হয়ে পড়লেন। প্রতিদিন ছেলের প্রিয় খাবার এটা সেটা তৈরী করে রাখেন, যদি আসে। মাসের পর মাস কেটেছে ছেলে আসেনি। গোপনে নানা রকম সংবাদ পেয়েছেন আর ছেলেদের জন্য জায়নামাজে বসে থেকেছেন দিন রাত্রি ভোর। অবশেষে ছেলে এসেছে। কি করবেন, কি খাওয়াবেন কিছুক্ষণ কিছুই বুঝতে পারেন না। হীরক যতদূর সম্ভব সংক্ষেপে বড়ভাই ও নিজের কথা খুলে বলে মাকে। মা অল্প কিছু খাওয়ার জন্যে পীড়াপিড়ি করলেও হীরক বাইরে সঙ্গীদের রেখে কিছুতেই খেতে চায়না। মায়ের করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আচ্ছা, দুধ থাকলে একটু দাও।’

মা পরম যত্নে ছেলেকে ঘন দুধের সরআলা এক বাটি দুধ এনে দেন, জানেন, ছেলে অত্যন্ত ভালো বাসে বাড়ীর গাভীর এই দুধ!

বড় দুলাভাইয়ের সাথে রাস্তায় দেখা হওয়ার কথা শুনে মাও একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন কারণ কানাঘুষায় বড় মেয়ের স্বামীর নামে কিছু কথা তার কানেও এসেছে। সে নাকি ইদানিং ঘনঘন গ্রামে আসে, কি এক শান্তি কমিটির মেম্বার হয়েছে, পাকিস্তানী সৈন্যদের সাথে সারাক্ষণ তার ওঠা বসা। হীরককে সেটা বলাতে সে আরো চিন্তিত হয়ে ওঠে।

হীরকের কত কথা মনে পড়ে যায়! ছোট থেকে এই বোন- দুলাভায়ের হাত ধরে বড় হয়েছে। বড়বোনের বাসায় বেড়াতে গেলে দুলাভাই কত আদর করেছে, এদিক ওদিক বেড়াতে নিয়ে গেছে! বড় ভাইও অল্প বয়সে গ্রামের বাড়ী ছেড়ে এই বড় বোন দুলাভায়ের আশ্রয়েই দীর্ঘকাল বাস করার পরে নিজের সংসারে থিতু হয়েছে। বড়ভায়ের জীবনে মায়ের পরেই এই বড় বোনের অবস্থান। জীবনের কি পরিহাস, নিজের স্বজনকেই এখন বিশ্বাস করা যাচ্ছেনা। হীরক তবুও বিশ্বাস করতে চায়, দুলাভাই নিশ্চয়ই তার নিজের বাড়ীর লোকের কোন ক্ষতি করবেনা। কিন্তু বিশ্বাসটা নিজের কাছেও ঠিক জোরালো হচ্ছেনা, মনের মধ্যে একটা আশংকার মেঘ হানা দিচ্ছে বারবার।

হীরক দুলাভাই মানুষটাকে চেনে ভালোভাবেই, খুবই একগুয়ে ধরণের মানুষ, নিজের মতামতের ব্যাপারে একেবারে স্বৈরাচার। নিজেকে মাওলানা হিসেবে পরিচয় দেয়, কায়েদে আজম যার পরম পূজনীয় ব্যক্তিত্ব। বড় ভাইয়ের সাথে হীরক তাকে অনেকবার অনেকসময় রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে তর্কাতর্কি করতে শুনেছে। শেখ মুজিব তার চোখে ষড়যন্ত্রকারী, যে পাকিস্তান ভেঙে দুটুকরো করে ফেলতে চায়। হীরক দুলাভাইকে অনেকবার বড়ভাইকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুনেছে,’ শামীম, তুমি ভুল পথে আছো, সময় আছে এখনও সঠিক রাজনীতির পথে আসো, দেশটারে ভাঙার কথা ভাববা না।’

সেই দুলাভাই যে এখন পাকিস্তানের পক্ষেই কাজ করবে সেটা তো তারা মনে মনে জানতোই! হীরক মাকে চিন্তা করতে নিষেধ করে বাড়ির বাইরে বের হয়ে আসে। সংগী দুজন গ্রামের স্টেশনের কাছে অন্ধকারে দাড়িয়ে অপেক্ষা করছে ওর জন্য। মা এক পুটুলি ভরে শুকনো খাবারও দিয়ে দিয়েছেন ওদের জন্যে।

কাছে আসতেই ওরা বললো’ ‘হীরক ভাই, চলেন আর দেরী করাটা ঠিক হবেনা।’

বেশ কিছুদুর হেটে যাওয়ার পরেই টের পেল কি যেন একটা সমস্যা হয়েছে, কারা যেন ওদের পিছন পিছন আসছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাত আট জন মুখোশ পরা লোক ওদের ঘিরে ফেললো। একজন বললো, ’আমাদের সাথে চল।’

হীরক ও অন্য কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর একজন সংগী তীরের বেগে দৌড় লাগালো কিন্তু হীরক ও অন্যজন পারলো না। মুখোশ পরা দুজন কিছুটা দৌড়ে তাকে ধরার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়ে ফেরত আসলো। হীরক কিছুতেই বুঝতে পারছেনা কিভাবে কেউ ওদের কথা জানলো! সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে ওরা এখানে এসেছে, দুলাভায়ের সাথে দেখা হওয়া ছাড়া অন্য কোন কাক পক্ষীও ওদের দেখতে পায়নি। খুব অল্প সময়ের জন্য এসেছে বলে সাথে কোন অস্ত্রও আনেনি ওরা আর তাছাড়া এতগুলো মানুষের সাথে ওরা দুজন পেরেও উঠবেনা। হীরক ভাবলো একটু আগানো যাক ওদের সাথে, তারমধ্যে কিছু করা যায় কিনা।

মধ্যরাতে ব্রাশফায়ারের শব্দে গোটা গ্রামটা কেঁপে কেঁপে উঠলে গ্রামবাসী আতংকিত হয়ে ভাবলো, ‘আজ না জানি কোন মায়ের কোল খালি হলো! কয়েকদিন পরপরই এমন শব্দে পুরো গ্রাম কম্পিত হয়ে ওঠে। জায়নামাজে বসে তসবিহ জপতে জপতে হীরকের মা অস্থির এক রাত পার করলেন।

ভোরের মধ্যেই পুরো গ্রামের মানুষের ঢল নেমেছিল গ্রামের একমাত্র নদীটির পাড়ে। নাম না জানা আরো কয়েকজনের সাথে হীরকের সংগীর ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া লাশটাও নদীর পাড়ে পড়ে ছিল। শুধু হীরকের লাশটাই কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

যুদ্ধের পর আব্বা সম্ভাব্য সমস্ত জায়গায় ছোটকাকুর খোঁজ করেছিল, যদি মৃতদেহটারও কোন খোঁজ পাওয়া যায়। অনেকে বলেছিল নদীর পানিতে ভেসে গেছে। ছোট কাকুর পালিয়ে আসা সঙ্গীর কাছ থেকে ঐ রাতের সব ঘটনা সকলে জানতে পারে। আব্বা দুলাভাইকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে পারতেন, ধরিয়ে দিলে বাঁচার কোন উপায় ছিলনা কিন্তু বড়বোন গোপনে মায়ের কাছে এসে পা ধরে কান্না কাটি করে আব্বাকে তার স্বামীর প্রাণভিক্ষা দেওয়ার জন্যে বললে আব্বা দাদীর মুখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু করতে পারেননি।

পুরোদস্তুর মাওলানা বড় দুলাভাই বিড়ালের হাগু ঢেকে রাখার মত নিজের সব অপকর্ম ঢেকে বহাল তবিয়তেই আছে, শুধু পরিচিতদের কাছে পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার জন্য তার গোপন আহাজারী যেন থামেইনা। আব্বা এই জীবনে আর কখনও তার প্রিয় বড় বোনের বাড়ীতে পা দেননি। আমাদের বাড়ীতে মুক্তিযুদ্ধ মানেই ছোটকাকু, দাদীর বোবা কান্না আর আব্বার চাপা কষ্ট, যা অনুভব করতে করতে আমরা বড় হয়েছি।

পরীক্ষা দেওয়ার জন্যে দরজার বাইরে পা দিতেই শুনতে পেলাম দাদী কাঁদছে আর বলছে, ‘ও বিনি, সুখি’র মাকে বলনা, হীরকের জন্যি এট্টু দুধির সর তুলে রাখতি। হীরক দুপরে খাতি আসলি ওর পাতে এট্টু দুধির সর না দিলি, বড্ড রাগ করবেনে ছেলেটা।’

কোথা থেকে যেন নোনা জলে চোখদুটো ঝাপসা হয়ে জ্বালা করে উঠলো আমার! কিন্তু এগুলো নিয়ে ভাবার সময় নেই এখন একদম, পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে, আমি হনহন করে হাঁটতে থাকি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত