| 5 মার্চ 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

ঈশাবাস্য দিবানিশা

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

পৃথিবী শেষ, পৃথিবী বিকৃত, পৃথিবী রুদ্ধ এবং এটাই চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছে আমাদের আখ্যানের কেন্দ্রীয় চরিত্রটিকে।

ঠিক ষাট বছরের মাথায়, পরনের পোশাকটা বেশ ভারী, সিঁড়িগুলোও খুব কষ্টকর এবং তোমার হৃদয় দিন-রাত সর্বদা তোমার সঙ্গে আছে। তুমি পথ হেঁটেছ পাহাড় থেকে পাহাড়ে, ধিকিধিকি অতীতের হ্রদে, উজ্জ্বল বিগতের ব-দ্বীপে, মাথার উপর সাদা পাখি — উড়ে গেছে, পায়ের নিচ দিয়ে চলে গেছে সন্ত্রস্ত সাপের দল এবং অতঃপর তুমি পৌঁছাও এখানে; এই সেই জায়গা যেখানে তোমাকে শেষত থামতে হয়েছে; এই অন্ধকারময় নির্জন স্থানে, তোমার শার্টের কলার শ্বাসরোধী হয়ে ওঠে এবং তোমার শিরা-উপশিরায় শোনা যায় ছলাৎছল রক্তের আন্দোলন : এটাই ষাট বছরের গপ্পো।

এখানেই শেষ। এখানে নতুন ঘাস গজায় না আর। মাটি জমে যায়, পৃথিবী সংকীর্ণ ও প্রস্তরবৎ পড়ে থাকে, এবং সামনে একটিমাত্র স্বাক্ষরই প্রতীয়মান হয়ে ওঠে : মুক্তি।

যদিও আমাদের আখ্যানের কেন্দ্রীয় চরিত্রটি─তার একটা নাম দেওয়া দরকার, ধরে নেওয়া যাক তার নাম ‘অ-বাবু’ তাতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছুক নয়।

অ-বাবু একটি পোস্টমডার্ন শপিংমলে বসে অপেক্ষা করে তার স্ত্রীর জন্য। খোলা দরজার পাল্লা দিয়ে দেখতে পায় ভিতরের জনাকীর্ণ ঘরটিকে, বিউটি-পার্লার, মাঝে কাচের দেওয়াল, যেখানে তিন-তিনজন সুসজ্জিতা নারী, তারই বয়সি─হয়তো অথবা হয়তো নয়, কারণ যেহেতু মহিলাদের বয়স বোঝা যায় না উজ্জ্বল চুলের একঘেয়ে দলা পাকাচ্ছে। সে কি এই আয়নায় প্রতিফলিত তাদের প্রতিবিম্বগুলিকে ‘নারী’ বলতে পারে? পোশাকের ভিতর থেকে ঠেলে-বেরুনো স্তনযুগলের উপস্থিতি এবং আড়াল থেকে বোঝা-যাওয়া কিংবা বোঝা-না-যাওয়া ইংরেজি ভি-অক্ষরের আদলে যোনিদেশের নিশ্চিত সম্ভাব্যতা সত্ত্বেও? সভয়ে অ-বাবু তাকায় তার পাশে বসে-থাকা জনের দিকে; কোঁকড়া চুলের এক কুহকিনী তার পায়ের পাতা দু’টি জড়ো করে বসে আছে এবং মাথাটি টেনে ধরে রেখেছে একটি বেসিনের মধ্যে: গরম জলের প্রভাবে বাষ্প উঠছে এবং সে ভালো করে চুল থেকে ফেনা ধুয়ে ফেলছে। আরও বাষ্প, ফলত, বেরোচ্ছে দেখে অ-বাবু চিৎকার করতে যাবে তার আগেই সাদা তোয়ালে দিয়ে মহিলাটি চুল দস্তুরমতো বেঁধেছে। সে অন্য চেয়ারের দিকে তাকাল। অন্য চেয়ারগুলোয় রঙিন চুলের ভিড়। তৃতীয় চেয়ারটা ঈশার বলে চিনতে পেরে সেটার কাছে গেল। ঈশার চুলগুলো চুড়ো করে পাকানো, পার্লারের এক মহিলা কিছু-একটির মিশ্রণে ব্রাশ ডুবিয়ে রেখেছে─মিশ্রণের গন্ধটা শ্বাসরোধকর।

‘ঈশা, আমি বাইরে একটা চক্কর মেরে আসি’, অ-বাবু হাত নেড়ে বলল। সে অনুভব করছে, সকাল থেকেই পায়ে ব্যথা, হৃদয়ও অবাধ্য এবং সর্বোপরি, সে তৃষ্ণার্ত।

 প্রবেশ পথের কাছে ঔপনিবেশিক আমলের ব্রিটিশ ভাস্কর্য─বেশ কিছু─কাচের বড়ো ঘেরাটোপে রাখা, এছাড়াও অদ্ভুত সব ছবি তেল রং, হরেক কিসিমের জানোয়ারের ছবি যাদের চোখ দৃষ্টি তৈরি করেছে কিম্ভুত লোমশ দেওয়াল। এছাড়াও আছে ডিম, কলাই, পাঁঠার নলি, বেগুন-ভর্তার রেস্তোরাঁ। ঈশা বস্তুত এমনই কিছু চেয়েছিল।

ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেলে আকাশে স্ফুলিঙ্গ জাতীয় কিছুর দেখা মিলল। দিনটা ছিল ঘনঘোর অমাবস্যা, তবু মনে হল যেন ভোর নেমেছে সন্ধ্যা নামার সঙ্গেই। উজ্জ্বল আলোয় ছোটো-ছোটো দোকানগুলি আরও স্বচ্ছন্দ, সপ্রতিভ। ছোট্ট উজ্জ্বল একটি মিঠাইঘর, কিন্তু তুমি প্রবেশ করতে পারবে না: মানুষজনের গাদাগাদিতে তিল ধারণও অসম্ভব। মোটা এক মহিলা আটকে গিয়েছিল সেই দরজায়─আসলে লাফাতে চেয়েছিল─তাকে টেনে বাইরে আনা হচ্ছে। ‘আমাকে বাইরে টানো, আমাকে বাইরে টানো।’

‘কী হয়েছে?’ অ-বাবু ওই ভিড়ে ভিরে যায়। মহিলাটিকে জরিপ করে। অতঃপর তার মনে হয়: আপনার জুতো দেখে গোরুও সন্তান প্রসব করতে ভয় পাবে, আপনার পোশাকটির জন্য কত-না রেশমকীটকে মরতে হয়েছে যন্ত্রণায়, আপনার ফরসা গাল দু’টি এসেছে গঙ্গার সাদা বালি পাচারের লরি থেকে, আপনার দৃষ্টি এসেছে ওয়াইপার-ভাঙা বৃষ্টিস্নাত গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন থেকে…।

সবকিছুই পূর্বনির্ধারিত এবং তুমি এর গতি পরিবর্তন করতে পারো না─এটাই অ-বাবুকে উত্যক্ত করে। তুমি ইচ্ছেমতো মেয়েদের তুলে আনতে পারো না, তারা কোথা থেকে যেন অতিসাধারণভাবে তোমার পাশে বসে যায়; তুমি মানিয়ে-নেওয়ার চেষ্টা করো, হাত-পা বেঁধে রাখো, জবুথবু হয়ে যাও, কণ্ঠরোধ হয়ে আসে তোমার, তুমি শিখে যাও হাজার-হাজার বার অস্থায়ী জীবনকে বজ্রমুঠিতে বেঁধে-ফেলার পথ; তুমি হাঁটু মুড়ে বসে পড়ো এবং তোমার ডানাগুলি ছেঁটে দেওয়া হয়। অন্ধকার হয়ে আসে এবং চন্দ্র-সূর্য একে অপরকে চক্রাকারে তাড়া করে চলে।

একই সময়ে অ-বাবু কল্পনা করে যে, সে পূর্বাশ্রমিক জীবন ছেড়ে নতুন এক ছবির সঙ্গে আরম্ভ করেছে নতুন জীবন। সাততাড়াতাড়ি সে বেছে নেয় তার বয়স, পছন্দসই একটা যুগ এবং মনোমতো চেহারা। এক-একসময় তার মনে হয়, আগের জীবনই বোধহয় ভালো, কিংবা উনিশ শতকী বাবুজীবন, অথবা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতার উত্তরাংশে কোনও বনেদি বাড়ির অসূর্যম্পশ্যা, বা আড়ালে-থাকা কোনও কবির গড়ে তোলা বিড়াল। অ-বাবু গণনা করে, তুলনা করে, ইচ্ছা করে, শর্ত তৈরি করে উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে পড়ে এবং সম্ভাব্য প্রস্তাবগুলির প্রতিটিই খারিজ করে দেয়; আরামকেদারায় শরীর ছেড়ে দিয়ে চিন্তায় ডুব দেয় এবং একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে শুধুমাত্র নিজের প্রতিবিম্বের দিকে─যে সততই একা।

এবং কিছুই ঘটে না যদিও। অ-বাবু কোনও মহার্ঘ্য বস্তুর সাক্ষাৎ পায় না, স্বর্গ থেকেও কোনও ডাক আসে না। ত্রিস্তরীয় অস্তিত্ববাদের শেষ ধাপটি ক্রমশ এগিয়ে আসে, শ্বাসরুদ্ধ করে অ-বাবুকে, সে চেষ্টা করে পরিত্রাণের পথ খুঁজতে, গর্ত করে আকাশের গায়ে, তারপর বৈঠকখানার দরজা গলে বেরিয়ে যায়। লন্ড্রিতে দেওয়ার জন্য বিছানার চাদরগুলো পড়ে আছে, তার নজর যায় সাতটি স্বরলিপির উপর যা তার একটি টেলিফোন নম্বরের মতো লাগছে এবং সে নাগাড়ে একঘেয়ে হয়ে পড়ছে বাস্যা নামের একটি নারীর সঙ্গে এক নিরানন্দ সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়ে। বাস্যার ঘরটা অ-বাবুর মতোই; যেই সে বাস্যার শয়নকক্ষে ঢুকল, সে দেখল, কোণের বালিশগুলোর কাছে পড়ে আছে একটি টেলিফোন নম্বর, সে সন্দেহ করে, ভাবে, তার বরাতে হয়তো এটিই অপেক্ষমাণ; যদিও সে বাস্যার প্রতি বিরক্ত হয়ে খোঁজ নিয়ে দেখে, এটি দিবা নামের এক মহিলা ও তার ছয় বছরের ছেলের; প্রকৃত প্রস্তাবে এটি ছিল দিবার অন্তর্বাস রাখার খোপে, আর ভাঁজ-করা অন্তর্বাসটি ছিল বালিশের নিচে।

ঈশা আঁচ করে কিছু-একটা হয়েছে; সে চেষ্টা করে প্রমাণ সংগ্রহের, অ-বাবুর পকেট হাতরায়, কিছু কাগজ─খোলামকুচি─পায়; বস্তুত, সে জানতই না যে, সে ঘুমিয়ে আছে একটি টেলিফোন ডিরেক্টরির উপর, যে-টেলিফোন ডিরেক্টরিতে শুধুমাত্র বাস্যার টেলিফোন নম্বর ছাপা হরফে লেখা। ওদিকে বাস্যা স্বপ্ন দেখে দিবার টেলিফোন নম্বরের, অন্যদিকে দিবা ভাবে, এগুলি আসলে সমাজ-সুরক্ষা দপ্তরের নম্বর।

অ-বাবুর নারীরা কখনওই একে অপরের অস্তিত্বের ব্যাপারে জানে না, এমন-কি অ-বাবুও নিজের সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য তাদের দেয় না। কোথাও-কোথাও শুধু পদবি, পেশা, ঠিকানা, পিনকোড প্রভৃতি রেখে যায়─যখন যেমন দরকার।

অ-বাবু তার পরীক্ষা বন্ধ রাখে, সমাজ-সুরক্ষা দপ্তরের জন্য নয়, সে মনে করে এদের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানো মানে ব্যর্থতা। এটা নতুন নয় যে, দমবন্ধ করে-দেওয়া সম্ভাবনাগুলো তার সামনে খোলা, অথবা দূরের কোনও উন্মুক্ত নির্জন পথও নয়, সে স্পষ্টত বুঝতে পারে যে, সে একটা তমসাবৃত ভাগ্যচক্রে আটকে গেছে এবং যদি সে ভিতরে প্রবেশ করে, তবে ঘটনা পরম্পরায় নিজেকে অন্যদিক থেকে শেষ করা ছাড়া উপায়ন্তর নেই।

যাক, শেষ পর্যন্ত এই কোলাহল মুখরিত জনতার মধ্যে এক নামহীন নারী এক-ব্যাগ ব্যবহৃত অন্তর্বাস নিয়ে চলেছে। অ-বাবু এমন অদ্ভুত কোনও নারীকে চায়নি, সে ভয় করে তার পা দু’টিকে, তার পায়ের পাতাকে, তার গা থেকে উঠে-আসা দুর্গন্ধকে; এবং সে নিশ্চিত মহিলাটি ঘরে, চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে, বয়ামের ভিতর মাশরুম চাষ করেছে।

কিন্তু এমন একজন যে ভাগ্যের ধ্বজা ধরে আছে, তার যাত্রা আদতে বীজগাণিতিক। তার মনে হয়, তাকে সে আগে দেখেছে শখের বাজারে; চোখ দু’টি তার কেমন যেন ধোঁয়াটে। ওই মহিলার জন্য দরজা বন্ধ করতে সমস্যা হওয়ায় সে দোকান থেকে সরে মিশে যায় ছায়াতে─নভেম্বরের সকালের মেঘ যখন বয়ে চলে, দূরাগত শিস্ শোনা যায়।

অ-বাবু নিশাকে হাত ধরে নিয়ে আসে এবং অল্প সামান্য মদ দেয়, তার কথাগুলো ঝলসে ওঠে মদের মতোই। অতঃপর অ-বাবুকে যুবকের মতো ঠেকে প্রায়, আর নিশা যেন জ্যোৎস্নারাতের এক রূপালি বিদ্যুৎপ্রভা।

 ঈশা আঁচ করতে পেরেছে নিশার ছায়াটিকে; সে গর্ত খুঁড়তে শুরু করে, খুরপি বের করে আনে। দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধে অ-বাবুর হাত-পা; ঈশার পাশে শুয়ে বুক ধড়ফড় করে অ-বাবুর। খোলা জানলা দিয়ে সে চেয়ে থাকে রাতের রাস্তার শীতল, উজ্জ্বল ল্যাম্পপোস্টের সোডিয়াম ভেপারের দিকে। অন্যত্র নিশাও নিদ্রাহীন শুয়ে আছে নিষ্পলক, মনোযোগ সহকারে কিংবা মনোযোগহীনভাবে দেখে যাচ্ছে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো ঘিরে তৈরি হওয়া রাতপোকাদের বলয়। অন্ধকারকে আশ্রয় করে অ-বাবু অতঃপর তার আত্মাকে পাঠিয়ে দেয় নিশার কাছে, এটা জানা সত্ত্বেও যে, এই আত্মা শেষতক সেই বক্ররেখা পর্যন্তই পৌঁছবে, এই জনপদে যা তাদের পরস্পরকে জুড়ে রেখেছে; অদৃশ্য অথচ অনায়াস।

অ-বাবু দড়িটা ছিঁড়ে পালিয়ে যায় ঈশার কাছ থেকে; আপাতত সে আর নিশা হাত ধরাধরি করে বসে আছে এবং সে তার হৃদয়সম্পদের প্রকোষ্ঠ উন্মুক্ত করে দেয়─বুঝি-বা মহান আলিবাবা, কিংবা চল্লিশ চোর─নিশা, অবাক, কেঁদে ওঠে। সে কিছুই জিজ্ঞাসা করে না, চায় না প্রসাধন, চায় না উনিশ শতকের মহারানি ভিক্টোরিয়ার তুল্য উপঢৌকন, সে শুধুই সুখী হতে চায় তার পাশে বসে, অনির্বাণ জ্বলতে চায় বিবাহের প্রদীপশিখার মতো, যা জ্বলবে বিরামহীন।

যত দ্রুত সম্ভব, অ-বাবু তাকে যা বলার, বলল। এবার নিশার সুযোগ : সে তার দুর্বল, অ্যানিমিক হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল এবং এগিয়ে গেল এক নবদিগন্তের দিকে; যে-আলো জ্বলছিল, অতএব, তা একবার উজ্জ্বল হল, যেন মনে হল, ডিমের খোলার মতোই এ-বিশ্ব চরাচর তাদের কাছে স্তব্ধ। অথচ তেমন কিছুই ঘটে না। নিশা শুধু কেঁপে ওঠে এবং অ-বাবু ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

‘ঠিক আছে, নিশা?’ হাই তুলতে-তুলতে জানতে চায় সে।

অ-বাবু জুতো পরেই ঘরে ঢোকে, জানলার কাছে গিয়ে ধূমপান করে, ফুলদানির কিছু আগে দাঁড়ায় ঠেস দিয়ে, সুটকেসের খোপে গুছিয়ে রাখে দাড়ি-কাটার নিজস্ব ব্লেডখানা। সে ভাবে, ফিরে যাবে ঈশার কাছে। ঘড়ি টিকটিক করে, নিশা ককিয়ে ওঠে, কিছু না-বুঝেই মরে-যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, জানলায় লেগে-থাকা শিশির জল হয়ে নামে।

ঈশা আনন্দে পায়েস বানায়, চুলে শ্যাম্পু করে, এমন-কি, বাড়ির আনাচকানাচ পরিষ্কার করে। সে তার চল্লিশতম জন্মদিনটা রেস্তোরাঁর বদলে বাড়িতে উদযাপনের কথাই মনস্থির করে। তারা না-খাওয়া মাছ এবং দিন কয়েকের পুরোনো মাংস প্ল্যাস্টিকে ভরে নেয় এবং আগামীকাল দুপুরের জন্য পর্যাপ্ত খাবার মজুত করে নেয়। ভালো-ভালো উপহারও পায় সে : বই, রেডিয়ো, অ্যান্টিক দেওয়াল-ঘড়ি, ক্যামেরা। ঈশা স্বপ্ন দেখে, সমুদ্রতটে ফটো তোলার। এসবে নিশা নিজেকে আর সামলাতে পারে না, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বসে। সে একটা কাগজে খসখস করে, নিজস্ব ছেলেমানুষি হাতের লেখায়, লিখে ফেলে একটি কবিতা; ঠিক কবিতা নয়, কবিতার মতো অনেকটা :

তোমার প্রেমের উদ্দেশে এই উপহারটুকু অন্তত থাকল :

মোমবাতির অনিবার্য ক্ষয়ে-যাওয়া,

ঝুঁকে পড়ে, ভালোবেসে দেখো

যতক্ষণ-না মরে আসে তোমার প্রেম, এই প্রেমার্তি

বেঁচে নেবে সেই সমানুপাতিক সময়।

এরপর সে আর বাঁচেনি।

এবং এখন অ-বাবু, ষাট বছরের উপান্তে, ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপট তার জামার হাতাটা তুলে দেয় হৃদয় পর্যন্ত, যদিও তার পা যেতে অস্বীকার করে। কোনও কিছুই ঘটে না, শুয়ে-থাকাও যায় না আর; সত্যি, কিছুই আর পিছনে পড়ে থাকে না। ষাট বছরে সে যেন অপেক্ষা করে আছে কারও আসার, তাকে ডাকার এবং তাকে রহস্যের রহস্যগুলি দেখিয়ে দেওয়ার। শুধুমাত্র রক্তিম ভোর গোটা পৃথিবীটাকে অর্ধেক ঢেকে ফেলার জন্য, শুধুমাত্র আলোকরশ্মির উঠে-আসার জন্য আস্বর্গপৃথিবী দেবদূতের দল, যারা তাদের বাদ্যযন্ত্র থেকে অপার্থিব শব্দঝংকারের সৃষ্টি করে তাদের পছন্দের মানুষকে আমন্ত্রণ জানাতে। কেন তারা এত সময় নেয়? সে জীবনভর অপেক্ষায় থাকে।

সে অলৌকিকের কাছে যাচ্ছে মনে হয়, সমস্ত বন্ধ দরজা পিছনে রেখে, হয়তো একটা দরজার মধ্যে প্রবেশ করেছে, এসে পড়েছে অন্য এক জগতে, শ্বাস নিচ্ছে জীয়ন্ত আঁধারে। অচেনা সেই জগতে উপস্থিত ব্রাহ্মণীটি আজ বয়সের ভারে ন্যুব্জ এবং ঈষৎ খ্যাপাটে। অ-বাবু তার বিছানার দিকে তাকায়, চেয়ারগুলোর পাশের দেওয়ালে যে-ছবিগুলো ব্রাহ্মণীর ফ্যাকাসে হয়ে-যাওয়া সৌন্দর্যবোধের প্রমাণ। ছবিগুলির মধ্যে একটায় একটি ঘোড়া পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে, গুপ্তচর এক যুবক, মুখটায় অনেকটা অ-বাবুর অল্পবয়সি মুখের আদল, আতসকাচ নিয়ে সময়ের পর সময় ধরে কী যেন খুঁজে চলেছে। অ-বাবু কিছুই আর মনে করতে চায় না, সে কেবল ভাবে, এই ব্রাহ্মণীর যুবতীদশার কথা, এমন-কি, এই ব্রাহ্মণীকে বিয়ে করা যায় কিনা এবং যদি সে গুপ্তচরের কারণে জেলেও যায়, তবে সেই জেলখানাটি হবে তার জন্য একটা বড়ো লড়াইয়ের জায়গা, প্রতিটা ইঁদুরকে যেখানে ঘোড়ার মতো ঠাহর হবে; সে কল্পনা করতে পারে, গুপ্তচরটিকে জেল খাটতে হয়েছিল একটা অন্ধকার চোরকুঠুরিতে, যেখানে পেঁচা আর চামচিকে ছাড়া কেউ ছিল না।

অ-বাবুর হাতে-থাকা সময় গলে যাচ্ছে মুঠো থেকে। পিছনে সমুদ্র আর অজানা ভূখণ্ড তার পথ আটকেছে, নতুন দেশ ভেসে বেড়াচ্ছে না আর কুয়াশার ভিতর। হতাশ সে বুঝতে পারছে দক্ষিণ ভারতীয় নারকেলগাছ ও পরিচিত মিনারগুলিকে, যেগুলির গায়ে লেগে আছে ভাস্কো দ্য গামার পর্তুগিজ ছটফটানি এবং অ-বাবুর কাছে যার অর্থ : পথ শেষ। তার ভ্রমণ এবার শেষ হতে চলেছে; সে ঘুরেছে এক দ্বীপ থেকে আর-এক দ্বীপে। পরিচিত সুরক্ষা দপ্তর যেখানে ষাটোর্ধ্ব বয়সের পেনসন পতাকার মতো ঝুলে থাকে, যেখান থেকে বঙ্গীয় রঙ্গালয় দেখা যায়, যেখানে দিবার পুত্র─মঞ্চের উপযুক্ত ভ্রূ এঁকে─ঈশার সাধুবাদ সঙ্গে করে গলা চড়ায় তোলে; বোবা ব্যথা থেকে উঠে আসে জীবনের মধুর সঙ্গীত।

‘যদি আমি নিশার কাছে যেতাম’, অ-বাবু ভাগ্যের সঙ্গে আলাপে মাতল : ‘আমার পথ শেষ।’ যদিও অ-বাবু স্বয়ং প্রতারিত : নিশা অনেক আগেই মারা গেছে।

কখনও-সখনও কোনও-এক তরঙ্গ অনুভূত হয় এবং সে বোঝে : তুমি একা নও। চারপাশের সবুজের মধ্যে সন্ন্যাসীদের পর্ণকুটির দেখা যায়, এরই মাঝে একজন পালানোর পথ খুঁজে চলেছে।

খবর এল: অদ্ভুত বস্তুগুলি দৃশ্যমান হচ্ছে, প্রথমে তাৎপর্যহীন চাহনি, অনর্থক। কী যেন খোঁজার তাগিদে অ-বাবু, উদ্ভ্রান্ত, ছটফট শুরু করে; ঢাউস বইটার পৃষ্ঠা উলটে যায়, যেখান থেকে যদি-বা সে শিখে নিতে পারে মানসিক সক্ষমতা বাড়ানোর পদ্ধতি; ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে কাটিয়ে দেয় কারও বাড়ির সামনে, মাথা নিচু করে, অথবা রেলস্টেশনে বসে, ট্রেনের পর ট্রেন ছুটে যায় বাড়ি-ঘর পেরিয়ে, দূরে─দিগন্তের দিকে।

সামনেই বাজার, একপাশে দুধের বুথ। গোধূলি ঘনায়। অ-বাবু গলির ভিতর সেঁধিয়ে যায়। ওখানে নিশা ছিল, পা দু’টি ছড়ানো, কাপড়ে কফের জমা-দাগ, বীভৎস, মাথার খুলিটা ফেটে গিয়েছিল, মুখে কালশিটে, চোখের কোণে রক্ত। প্রথমে তারারা জ্বলে উঠেছিল, তারপর নিয়ন আলোরা; হিমশীতল একটা হাওয়া আকাশগঙ্গা থেকে ভেসে এসেছিল পৃথিবীতে; জমে-যাওয়া রক্তের সঙ্গে আটকে গিয়ে কয়েক গাছি চুল লেপটে ছিল তার গালের উপর। অন্ধকার দরজাটির দিকে এগিয়ে গেল অ-বাবু।

অ-বাবু দেখল, নিশা গান গাইছে─চোখ বন্ধ। সেই গানের, যে-গানের শব্দগুলো তার অচেনা, সুর শুনতে-শুনতে ভাবতে থাকল : এ-নারী কখনওই নিশা হতে পারে না, সে তো আগেই মারা গেছে।

তখনও সে বেঁচে আছে, তার হৃৎপিণ্ডের শব্দ তখনও শোনা যাচ্ছে; যদিও তার কোনও চিহ্ন নেই। অন্ধকার তার বুকে চেপে বসেছে। বিদায়ের মুহূর্ত বুঝি-বা আসন্ন; পলকে সে পিছনে ফিরল, দেখল, একটি দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথ ও প্রশস্ত একটি দেওয়াল এবং সে নিজে একটা হাত বাড়িয়ে হামাগুড়ি দিচ্ছে, নীরব ক্ষমাহীনতায় স্ফুলিঙ্গেরা পথ দেখিয়ে দিল। স্মৃতি এবং সম্ভাবনার সারি তাকে সামান্য ঠেলে দিল, তাড়াতাড়ি আর-একটু এগিয়ে গেল সে, পায়ে আর কোনও ব্যথাবোধ নেই এবং সে, সকৃতজ্ঞ, অতঃপর বিনম্র হাত থেকে গ্রহণ করল তার অর্জিত এক পেয়ালা হেমলক।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত