| 3 মার্চ 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

কামড়

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

‘শেফালির মা, শেফালির মা? কি হইল, কথা কানে যায় নাই? কহন থেক্যা কইতাছি আমারে দুগা ভাত দ্যাও। পাটের বীচন কিনবার যামু, জো বইয়া যায়।’

‘অত তাড়াতাড়ি করলে আমি পারুম না, তুমি বয়ো আমি দিতাছি। তরকারিতে বলক উঠছে, আর দুই ফোট্ উঠলে হইয়া যাইবো।’

‘কি কইলা? আমি অহন ভাতের লগে বইয়া থাকুম? কহন থেক্যা কইতাছি অহন ও রান্ধা হইল না। তুমি ভালো কইরা ব্যান্নন রাইধ্যাঁ বইয়া বইয়া খাও।’

জলের গ্লাস ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হনহন করে হাঁটা দিল গঙ্গা। পেছন থেকে শেফালির মা কাতরাতে কাতরাতে একটু এগিয়ে ডাকতে লাগলো 

‘আমার মাথা খাও মাঝি, যাইও না।’

নাতনিকে নিয়ে সকালবেলায় পাড়া বেড়াতে গিয়েছিল গঙ্গার মা। বাড়ি ঢোকবার সময় শেফালির মায়ের কথা কানে যেতে ঝাঁঝিয়ে উঠল, ‘এত ডাহাডাহি কিসের? পোলারে পিছন ডাহো ক্যান?’

‘এ আপনে কি কন মা ? ডাকুম না! আপনের পোলায় যে ভাত না খাইয়া বীচন আনবার গেল।’

ছেলে ভাত না খেয়ে চলে গেছে শুনে গঙ্গার মা শেফালির মায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ‘তা তো যাইবই, মাঝি কি  নাও লইয়া ঘাটে খাড়াইয়া থাকব ? দুগা ভাত সময়মত দিবার পারো না?’

শেফালির মা উত্তর দেবার জন্য মুখ বাড়িয়ে ও সবটা ঠিক করে বলে উঠতে পারলো না।পেটের ব্যথায় সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পেরে বসে পড়ল। শেফালি ছুটে এলো মায়ের কাছে। মা ওকে জড়িয়ে ধরে কোনরকমে বললো, ‘আপনেও তো ভাত ফুটাইয়া পোলারে দিবার পারতেন?’

জ্বলন্ত আগুনে ঘি পড়ল। গঙ্গার মা চীত্কার করে পাড়া মাথায় তুলবে বলে গলা চড়াতেই শেফালির কচি গলা শোনা গেল। ‘মায়ে তো সকালে তুমারে কইল, মায়ের প্যাট বেদনের কথা। তুমি সে কথা না শুইনা আমারে লইয়া পাড়ায় গেলা?’ তারপরে একটা ছোটখাটো কুরুক্ষেত্র বেঁধে গেল নাতনি আর ঠাকুমার মধ্যে।

‘এতটুক পোলাপান, তার মুহে এত বড় কথা? মায়ে কুশিক্ষা দিতাছে, আইজ এর একটা বিহিত করুম। আসুক গঙ্গা, চেলা কাঠ দিয়া বৌয়ের ঠ্যাং যতক্ষণ না ভাংতাছে আমি জল খামুনা।’ ঠাকুমার সাথে থেকে  নাতনি ও ভালোই কথা শিখেছে। সে ও খরখর করে বললো, ‘ও ঠাকুমা আইজ আর তুমার জল খাওন লাগব না। বড় পিসির বাড়িত যাইয়া এক কাশি ভাত আর দুই ঘটি জল খাইয়া আইলা।’

‘এই ছেঁড়ি চুপ যা কইতাছি, খালি মুহে মুহে কথা। হইবো না! যেমুন কোলা তেমুন তো পোলা হইবো।’

ঠাকুমার আদরের পাঁচ বছরের নাতনি অমনি শুনিয়ে দিল,’ আ-হা-হা তুমি আমার মায়েরে গাল পাড়তাছ, আর আমি কিছু কমু না?’

উঠোনের পাশে এদের ঝগড়া দেখতে বেশ ক’জন বউ, ঝি জড়ো হয়ে গেছে। যদিও এ নিত্য ঘটছে, তবুও পরের বাড়ির ঝগড়া দেখার মজাই আলাদা। তারপর মাঝে মাঝে সলতে উস্কে দিতে পারলে তো কথাই নেই। তাদের মধ্যে থেকেই একজন অল্পবয়সী বউ এসে নাতনি ঠাকুমাকে থামতে বলে শেফালির মাকে জড়িয়ে ধরে দাওয়ায় শুইয়ে দিয়ে পেটে তেল জল মেড়ে মালিশ করে দিতে লাগলো।

আর শেফালিকে পাঠালো কবরেজ বাড়ি। শেফালির মা লক্ষ্মী ব্যথায় এমন কষ্ট পাছে বেশ কিছুদিন ধরে, শিকড় বাকড় বাটা খায়, দুদিন ভালো থাকে আবার হয়। এমন হলে পাশের বাড়ির পরেশের মা এসে দেখে, শ্বাশুড়ি ফিরেও তাকায় না। বরং কাজ করতে না পারলে ঝংকার দেয়, অলক্ষ্মী, অলক্ষ্মী আমার সংসারটারে ছারেখারে দিল।

শেফালির মা’র চোখে জল আসে। কতবার শুনেছে মায়ের কাছে, বৃহস্পতিবারে জন্মেছিল বলে দিদিমা আদর করে নাম রেখেছিল লক্ষ্মী। সত্যি লক্ষ্মী প্রতিমার মত মুখের গড়ন ছিল ওর! চুল ও তেমনি। কোমর ছড়ানো কুচকুচে কালো কোঁকড়ানো চুলের ঢল। বন্ধুরা যখন সাতলার বিল থেকে লাল শাপলা তুলে চুলে গুঁজে দিত তখন লক্ষ্মীর দিক থেকে চোখ ফেরানই যেত না। মাত্র দশ এগারো বছরেই হয়ে উঠেছিল রূপের ডালি।

বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার শাপলা গ্রাম সাতলাতে লক্ষ্মীদের বাড়ি। দূর দূরান্ত থেকে বহু মানুষ ওই গ্রামে আসে শাপলা দেখতে। শাপলার বিলে ফুটে থাকা লাল, বেগুনি, সাদা ফুলের শোভা দেখার জন্য অনেক লোকই গৃহস্থের বাড়ি রাত্রে থেকে ভোরবেলা সাতলার বিল দেখতে যায়।লক্ষ্মীর বাবা গৌরাঙ্গর ছিল আট চালা ঘর।অবস্থা ভালো, মানুষও ভালো। অন্য অনেকের বাড়ির মতো ওদের বাড়িতেও দূরের মানুষ থাকতো। খাজুরিয়া গ্রামের গঙ্গাধর ওর বন্ধুকে নিয়ে একদিন শাপলার বিল দেখতে সাতলাতে এসেছিল তবে ওদের বাড়িতে ছিল না। ছিল গঙ্গার এক আত্মীয়র বাড়িতে তবুও গঙ্গা লক্ষ্মীকে দেখে ফেলল। আর সেই দেখা লক্ষ্মীর জীবনটাকে তছনছ করে দিল। তারপর থেকে মাঝে মাঝেই গঙ্গাকে দেখা যেত লক্ষ্মীদের গ্রামে।

অন্য অনেকের মতোই লক্ষ্মীর বাবার জীবিকা শাপলা চাষ। শাপলা তুলে বিক্রি করে সবাই। সাদা শাপলা পুষ্টি গুনে ভরা সবজি। লাল শাপলা ব্যবহার হয় ওষুধ তৈরিতে আর শাপলা ফুল যেহেতু সূর্যের তেজ বাড়লে পাপড়ি ছোট হয়ে যায় তাই শাপলা তুলতে হয় ভোরবেলায়। যারা দেখতে আসে তারাও রাত্রে থেকে ভোরবেলা  নৌকো চেপে লাল শাপলার সৌন্দর্য্য উপভোগ করে।

সেদিন ছিল বেশ ঘন কুয়াশা। অন্য দিনের মতই লক্ষ্মী বাবার সাথে শাপলা তুলতে গিয়েছিল বিলে তবে বাবার সঙ্গে না এসে একা একা বাড়ি ফিরে আসছিল; ঠিক তখনই কে যেন পিছন থেকে জাপটে ধরে মুখে গামছা পুরে নৌকোয় তুলে নেয়। হাত পা বেঁধে নৌকোর গলুইয়ের মধ্যে শুইয়ে লাল শাপলা দিয়ে ঢেকে নৌকো চালিয়ে দেয় জোরে। লক্ষ্মীর বেশ মনে আছে একজন গান গাইছিল,

‘ও গাঙরে… তর কি মায়া দয়া নাই

তর কি মনের মানুষ নাই…

তুই একা বইয়া যাস…

ও গাঙরে…এ…’

লক্ষ্মীর গোঙানি চাপা পড়ে যায় সেই গানে। সকলেই ভাবে শাপলা তুলে মনের আনন্দে গান গাইতে গাইতে চলেছে ওরা। তারপরে যে কি হয়েছিল, কিছুই জানেনা লক্ষ্মী। যখন জ্ঞান ফেরে দেখে মাথা কপাল সিঁদুরে মাখামাখি। মা কালীর মন্দিরে শুয়ে আছে।সামনে হাঁড়িকাঠ। কিছুই বুঝতে পারেনি লক্ষ্মী। শূণ্য চোখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েছিল হাঁড়িকাঠের দিকে। তাহলে কি ওকে বলি দেবার জন্য নিয়ে এসেছে এখানে?

একটু একটু করে চেতনা ফিরতে থাকে। মনে পড়ে কে যেন পিছন থেকে জাপটে ধরেছিল, কে সে? তাকে তো দেখতে পায়নি লক্ষ্মী।তারপর…তারপর… নাহ! আর কিছুই মনে করতে পারছে না। তার মধ্যে শুনলো একটা পুরুষ কন্ঠ বলছে, ‘এই তো জ্ঞান ফিরছে দেহি! ওডো, বাড়ি চলো।’ বাড়ি? কোথায় ওর বাড়ি? এখানে? না, না এখানে নয়, এ গ্রাম ওদের নয় কিন্তু ছেলেটাকে চেনা চেনা লাগছে। কোথায় যেন দেখেছে… হ্যাঁ, মনে পড়েছে এইতো সেই ছেলেটা যে ওর দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকতো। তাই দেখে ওর সই বিশাখা বলেছিল, ‘এই ছ্যামড়াডা জানি ক্যামন, মনে হয় ত’রে চোখ দিয়া গিলতাছে।’ বাড়ি এসে চুপিচুপি বলেছিল ঠাকুমাকে।ঠাকুমা নাতনির থুতনি ধরে আদর করে বলেছিল, তরে যে দ্যাখবো তারই চোখের পাতা পড়বো না। তুই আর একা একা বিলে যাইস না। ভালোমন্দ কতরকম মানুষ আহে।কার মনে কি আছে, সে কি কওন যায়?’

তার পরদিনই ঘটে গেল এই ঘটনা। কিন্তু এখন কি শুনছে লক্ষ্মী? ওই কালো মোটা গুন্ডা ছেলেটার সাথে ওর বিয়ে হয়ে গেছে! না-না-না এইড্যা হইতে পারে না। কিছুতেই না। চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে পরণের কাপড় দিয়ে কপালের সিঁদুর ঘষতে লাগলো লক্ষ্মী। ঠিক তখনই একজন মোটা কালো মত মেয়েমানুষ এসে গুম গুম করে ওর পিঠে কিল বসিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠলো। ‘ওরে গঙ্গারে এইডা তুই কি করলি বাপ? কইয়া গেলি তুমার ল’গে জ্যান্ত লক্ষ্মী আনবার যাইতাছি, কিন্তু এ মাইয়া দেহি ঘোর অলক্ষ্মী। সোয়ামীরে জ্যান্ত খাইবার চায়। ওরে গঙ্গারে তোর একি সর্বনাশ হইলো রে?’

লক্ষ্মীর মনে আছে, অনেক মুরুব্বি গোছের লোক জড়ো হয়েছিল মন্দিরে। লক্ষ্মী ভাবছিল, কেউ যদি এসে বলে এইডা অন্যায্য কাজ। মাইয়াডারে ফিরাইয়া দিতে হইবো বাপ মায়ের কাছে! কিন্তু না, তা হল না। এই গাঁয়ের মোড়ল গঙ্গার পিসা। সে সব মিটমাট করে দিল। গঙ্গা লক্ষ্মীকে নিয়ে চললো বাড়ি, কাঁধে করে আসলে লক্ষ্মীর হাঁটার ক্ষমতা ছিল না তখন। ঘরের ভিতর তক্তপোষের উপর লক্ষ্মীকে ফেলে দরজা দিয়ে দিল। বাইরে থেকে গঙ্গার মা চেঁচাতে লাগলো, ‘গঙ্গারে এইডা কি করস, অমঙ্গল হইবো।’ ভেতর থেকে হুঙ্কার ছাড়ে গঙ্গা।

তারপর বাঘ যেমন করে হরিণ শিশুর ঘাড় কামড়ে ধরে তেমন করে গঙ্গা কামড় বসায় লক্ষ্মীর ঘাড়ে। চেতন অবচেতনের মাঝে ক্ষীণ স্বরে লক্ষ্মী বলতে থাকে তুমি আমার শরীলে কামড় দিতাছ ক্যান? আমারে ছাইড়া দ্যাও। আমি বাড়ি যামু। বাঘটা তখন অনাঘ্রাতা অর্ধস্ফুট লাল শাপলার পাপড়িগুলোকে দাঁত দিয়ে নখ দিয়ে একটা একটা করে ছিঁড়ছে।

জ্ঞান ফিরতে লক্ষ্মীর নিজের শরীরটাকে কেমন অচেনা ঠেকলো। শাপলার পাপড়ির মতো নরম মসৃণ শরীরটা হাল চষা ক্ষেতের মতো রুক্ষ, এবড়ো খেবড়ো। তারপর থেকে প্রতিটি রাতে বাঘ হরিণকে তাড়া করে, ক্লান্ত হরিণ হাঁপিয়ে গেলে ঘাড় কামড়ে তুলে নিয়ে আসে বিছানায়। লাল শাপলায় সাজানো সাতলার বিল মোটর লাগানো নৌকো চালিয়ে তছনছ করে।

হরিণ এখন আর ভয় পায় না বাঘকে। ভাবে বাঘেরও তো বয়স হবে। দাঁত, নখের জোর কমবে। ততদিন হরিণকে বেঁচে থাকতে হবে। শুধু বেঁচে থাকা নয়, শক্তিশালী হয়ে উঠতে হবে। যাতে একদিন না একদিন পাল্টা কামড় দিতে পারে বাঘটাকে। তাই কবরেজের দেওয়া বড়ি খেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠে লক্ষ্মী। ভাত রান্ধে, ছেলে মেয়ে মানুষ করে, শ্বাশুড়ির সাথে চোপা করে কিন্তু ভোলে না প্রতিশোধের কথা। তাই খড়কে ডুরে শাড়ি পরে, চুলে গন্ধতেল মেখে সোহাগী খোঁপা বেঁধে অপেক্ষা করে সেই দিনটার জন্য।যেদিন বাঘটার দাঁত, নখ, থাবা অসাড় হয়ে যাবে, সেদিন লক্ষ্মী ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঘটার ঘাড় কামড়ে ধরবে।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত