পথের জার্নাল 

রবীন্দ্রনাথের ছবির দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে দুষ্টুমির হাসি হাসে শ্রাবণী ;কী হে ঠাকুর মশাই! দিলাম তো ফাঁসিয়ে।রোজ রাতে আমার আলুথালু বেশ দেখে  মজা নেওয়া, হৃদয়ের মাঝখানে ঘাঁটি গেরে বসে থেকে  অন্যকারো প্রবেশ আটকে দেওয়া- এসব কাজের প্রতিদানে এটাই তোমার ন্যয্য প্রাপ্য, বুঝলে? শ্রাবণী মল্লিকের কুড়িয়ে পাওয়া ছেলের বাবা হবে তুমি ..হ্যাঁ তুমিই রবীন্দ্রনাথ, তুমি ছাড়া আর কে-ই বা আছে এ ভার নেবার? নেই তো কেউ! 
বিছানা ঘেঁষা দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের ছবিটা শ্রাবণী  এমনভাবে সেঁটে রেখেছে যেন শুয়ে শুয়েই হাত বাড়িয়ে ছোঁয়া যায়। বিছানায় শুয়ে ছবির দিকে পাশ ফিরে গল্প করা,মুখোমুখি বসে গালভর্তি সিগারেটের ধোঁয়া নিয়ে কায়দা করে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়া,চিয়ার্স বলে পানপাত্র উঁচিয়ে ধরা- এসব তার নৈমিত্তিক রাতের খেলা। একলা ঘুমাতে ভীষণ ভয় বলে নিরন্তর একলা চলা জীবনের ঘুম-ঘোরের সঙ্গী হিসাবে রবীন্দ্রনাথকেই বেছে নিয়েছে সে। খাটের পাশে দেয়াল জুড়ে প্রাণবন্ত তরুণ রবি যেন তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিশেষ কেউ। পাঁচ বছর আগে যেদিন বিচ্ছু আর তার মাকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিল সেদিনও এভাবে কথা বলে নিয়েছিল,
—-ঠিক করলাম তো ,কী বল ?
জবাব পেয়েছিল নিজের ভিতর,ঠিক..ঠিক,সব ঠিকই আছে। এতে ভুল নেই কোনও। সেই থেকে শ্রাবণী বিচ্ছুর মা আর আজ আচমকা খেলে যাওয়া বুদ্ধিতে রবীন্দ্রনাথ বিচ্ছুর বাবা হয়ে উঠলেন।
সময় যেন এক পলকা হাওয়া,মূহুর্তে মানুষকে উড়িয়ে নিয়ে ফেলে জীবনের এক একটা বাঁকে! মানুষ কখনও  তার হিসাব রাখে কখনও বা রাখেও না। খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরলেই কেবল দেখতে পায় কতটা পথ পেরিয়ে এসেছে সে।শ্রাবণীও সবিস্ময়ে দেখে এরই মাঝে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে ,অথচ এইতো সেদিন! নেলির বাসায় বৃহস্পতিবার রাতের নিয়মিত আড্ডা শেষে ফিরছিল সে। প্রতি সপ্তাহের তুলনায় ঐদিন একটু বেশিই রাত হয়ে গিয়েছিল।নেলি আর সাজ্জাদ ওদের এনিভার্সারি উপলক্ষে হেভি খানা- গানা বিশেষ করে শেষ পাতে জিন, ভদকার আয়োজনটা যা করেছিল তা ছেড়ে কারোরই বাড়ি ফিরতে মন সায় দিচ্ছিল না। সারাদিন অফিস করে সবাই খানিকটা ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত ছিল বলে মোটামুটি ভারী নাস্তা সেরে,হাসি ঠাট্টায় আসর জমিয়ে পান পর্বটা শুরুই হয়েছিল একটু দেরি করে।রাত বাড়তেই বিবাহিত বন্ধুরা সংসারের নামে গজগজানি তুলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও একে একে বেরিয়ে যায়। শ্রাবণী সেসবে ভ্রুক্ষেপ না করে গ্লাস নিয়ে এক কোণে বসে ফিলিংসটা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছিল। ক্যালরি কম বলে এমনিতেই জিন তার পছন্দের তারউপর আজকে টনিকটা বানিয়েছে  ফরাসি স্টাইলে।জিন সাথে বর, সোডা, সামান্য এলাচ গুঁড়া,লেবু, শুকনো জবা ফুল, কমলার খোসা আর পুদিনা পাতায় সাজানো গ্লাসের যে কী দারুণ রিফ্রেশিং টেস্ট তা যে না খেয়েছে তাকে বলে বোঝানো সম্ভব না। জবা ফুলের রংটা যখন আস্তে আস্তে ছড়িয়ে যায় তখন গন্ধ-রং-স্বাদ মিলে এটা হয়ে ওঠে সাক্ষাৎ অমৃত সুধা!ফরাসি দূতাবাসে কিছুদিন  কাজ করার সুবাদে এক সহকর্মীর কাছে এই দুর্দান্ত টনিক বানানোর রীতি শিখেছিল শ্রাবণী। অলরেডি  দুইপেগ শেষ করে তৃতীয় পেগ চলছে। থামার কোন লক্ষণ নেই,ফেরারও তাড়া নেই। লিমিট ছাড়িয়ে ফেলার আশংকায় নেলীই ওর হাত থেকে গ্লাস টেনে নিয়ে ঠেলে বাসায় পাঠিয়েছিল। এ অবস্থায় গাড়ি চালানো ঠিক হবে না দেখে পৌঁছেও দিতে চেয়েছিল কিন্তু সে রাজি হয়নাই। অগত্যা গাড়ি রেখে সাজ্জাদের বাইসাইকেলটা দিয়ে দিয়েছিল। এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল সব। ঘটনাটা ঘটে আরো খানিকক্ষণ পর। ফার্মগেট পেরিয়ে মানিকমিয়া এভিনিউ দিয়ে সোজা তার গন্তব্য মহম্মদপুরের দিকে যাচ্ছিল শ্রাবণী। রাতের হিমেল হাওয়া, নির্জনতা,সড়ক বাতির নিয়ন্ত্রিত আলোর সহযোগে নেশাটা জম্পেস জমিয়ে ধরেছিল শরীর, মনে। হঠাৎ করে ভেসে আসা সদ্যজাত শিশুর কান্নায় খটকা লাগে। প্রথমে ভেবেছিল পেটে একটু বেশি পরায় ভুলভাল শুনছে, তাই পাত্তা না দিয়ে সাইকেলের গতি খানিক বাড়িয়ে দেয়।কিন্তু না, শব্দটা সত্যি এবং খুব কাছাকাছিই মনে হচ্ছে। একটু কেমন ভয়ও হল,অবশ্য পরক্ষণেই সাইকেল থেকে নেমে শব্দ ধরে এগিয়ে গিয়ে দেখতে পায় রাস্তার পাশে আমগাছের গা জড়িয়ে অদ্ভুতভাবে ঝুঁকে আছে এক নারী ,সম্ভবত অজ্ঞান। পাশে রক্তমাখা শিশু সুতীব্র চিৎকারে জানান দিচ্ছে তার আগমনী বার্তা ।ঘটনার আকস্মিকতায় শ্রাবণীর নেশা ছুটে যায়। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে রাত তিনটার কিছু বেশি বাজে ।আশেপাশে কোন মানুষ কিংবা নৈশ পুলিশও নেই। অগত্যা ডাক্তার বন্ধু নীতুকে ফোন দিয়ে এম্বুলেন্স ব্যবস্থা করে বাচ্চা আর মাকে নীতুর  ক্লিনিকেই নিয়ে যায়। ভর্তির সব ফর্মালেটিজ সেরে বাসায় ফিরতে ফিরতে সকাল হয়ে আসে। ছুটির দিন হওয়ায় গরম জলে লম্বা শাওয়ার নিয়ে নাস্তা সেরে ঘুমিয়ে পড়েছিল শ্রাবণী। সন্ধ্যায় ক্লিনিকে ফোন দিলে জানতে পারে যে,নরমাল ডেলিভারির কেইস তাছাড়া শারীরিক দূর্বলতা ছাড়া অন্য কোনো জটিলতাও নেই। তাই আগামীকালই মেয়েটিকে রিলিজ দিয়ে দেবে। 
এমনিতে শ্রাবণী শিশুদের ছুঁয়ে আদর টাদর করা এভয়েড করে। বন্ধুদের বাচ্চা কাচ্চাদেরও দূর থেকে দু এক কথা বলার পর আর কোন শব্দ খুঁজে পায়না।জন্মদিন বা বিশেষ কোন উপলক্ষে উপহার পাঠানো পর্যন্তই তার সীমানা।কিন্তু পরদিন ক্লিনিকে গিয়ে ফুটফুটে বাচ্চাটাকে দেখে তার কেন জানি কোলে নিতে ইচ্ছা করেছিল।তবে সে অনর্থক ইচ্ছাটাকে সংবরণ করে ক্লিনিকের বিল মিটিয়ে মেয়েটাকে বিদায় জানিয়েছিল।মেয়েটার অসহায়ত্বের কথা ভেবে তার হাতে কিছু টাকাও দিয়েছিল। অতঃপর সার্বিক সহযোগীতার জন্য ধন্যবাদ জানাতে নীতুর চেম্বারে ঢুকে চা-টা খেয়ে দীর্ঘক্ষণ পর বেরিয়ে এসেও দেখে মেয়েটা সিঁড়ির কাছে কাচুমাচু হয়ে বসে আছে।
—– এখনও বসে আছো? কী সমস্যা? কোথায় যাবে তুমি? 
অপ্রত্যাশিত স্নেহের প্রশ্রয় পেয়ে কেঁদে ফেলে সে।
—–আফা ,এই দুনিয়ায় আমার যাওয়ার কুনু জায়গা নাই।মানিগোঞ্জের এক বাসায় কাম করতাম। বাড়িওলার ভাইগ্না এই সব্বোনাশ করছে। দুই মাস আগে একদিন রাইতের বেলা আইনা রাস্তায় ফালাই দিয়া গেছে।মাইনষের কাছে আত পাইতা যা পাইছি খাইছি আর ঐ গাছতলায় ঘুমাইছি।তারপর হেইদিন রাইতে মরার ঘর থিকা আপনে ফিরাই আনলেন।আফাগো, বাঁচাইলেনই যহন আর এট্টু দয়া করেন।পোলাডারে এতিমখানায় দিয়া আমারে একখান কামের ব্যবস্থা কইরা দ্যান।
মেয়েটার কথা শুনে চোখ বন্ধ করে মুহূর্তকাল চিন্তা করে শ্রাবনী ,বলে,শোন,আমি তোমাকে সাহায্য করবো।আশ্রয় এমনকী সন্তানের দায়িত্বও নেবো কিন্তু একটা শর্তে,তোমার ছেলেকে তুমিই লালন পালন করবে তবে ছেলে তোমাকে খালা ডাকবে আর আমাকে ডাকবে মা।রাজি?তাহলে চলো আমার সঙ্গে। এভাবেই শ্রাবণী জড়িয়ে যায় নিয়তির এক নিষ্ঠুর জালে অথবা বলা ভাল, নিয়তি তার সাথে একই খেলা দু’বার খেললো দু’রকমভাবে; কুড়ি বছর আগে ও পরে।
চৌদ্দ বছরের কিশোরী শ্রাবণী যখন বুঝতে পেরেছিল তার শরীরে প্রবেশ করেছে আরেক প্রাণ তখন সে ভয়,
লজ্জায় দিশেহারা! লম্পট চাচার কুকীর্তির কথা কাউকে বলেনি এতোদিন, এখন সে কী করবে? নির্জন দুপুরে বাড়ির পুকুর ঘাটের বেঞ্চিতে বসে পায়ের আঘাতে জলে মৃদু ঢেউ তুলে ভেসে থাকা কৃষ্ণচূড়া, জারুল ফুলেদের দূরে সরিয়ে দেওয়ার খেলায় অভ্যস্ত  বোকা কিশোরী সেদিন বোঝেনি তার জীবন থেকে সহজ সরল যাপন শৈলীটা আসলে চিরতরে দূরে সরে গেল।আরও কিছুদিন পর মা-বাবা টের পেয়ে তাকে ঢাকার খালার বাসায় রেখে এসেছিল। একরাতে তীব্র ব্যথায় জ্ঞান হারানোর মুহূর্তে কানে আবছা মতো শুনেছিল শিশুর কান্নার আওয়াজ। জ্ঞান ফিরে দেখে সবার মুখ থমথমে ,খালা জানায় মৃত মেয়ে হয়েছিল। কিন্তু তার বিশ্বাস এটা সত্য নয়,সত্যটা তাহলে কী? সবাই মিলে নবজাতককে হত্যা করেছে? নাকি আগে থেকে ঠিক করে রাখা কোনও এতিম খানায় দিয়ে দিয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর তাকে কেউ দেবেনা, সে জানতেও চায়নি। তবে অন্তহীন এক অপেক্ষা বয়ে চলেছে, হয়তো কোনও দিন কেউ তাকে সত্যটা জানাবে।এরপর আর গ্রামে ফেরা হয়নি । ঢাকায় হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি ,এই একলা জীবন, রবীন্দ্রনাথের সাথে ঘরবসতি —এও একরকম ভালোই চলছিল। হঠাৎ করে সেই রাতে মেয়েটার ঘটনা জীবনের পথে যেন এক অদ্ভুত ইউটার্নের মতো। বাচ্চার নাম বিচ্ছু রাখাতে মেয়েটা একটু গাঁইগুঁই করেছিল,
—–মাইনষের বাচ্চার নাম বিচ্ছু! ক্যামন হুনায়? 
অইন্য কিছু রাখলে বালো অইতো না আফা?
—–চুউপপপপ !ছেলে আমার, আমি ওর নাম বিচ্ছু দিলে বিচ্ছু, কেউটে দিলে কেউটে। কারো কিচ্ছু বলার নেই এতে।
শ্রাবণীর ধমক খেয়ে চুপসে গিয়েছিল মেয়েটা।আর কোন রা করেনাই।
পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ায় ছেলের জন্য উপযুক্ত স্কুলের খোঁজ খবর করছিল শ্রাবণী,সেই সূত্রেই দার্জিলিং এর একটা নামী বোর্ডিং স্কুলের সন্ধান পায় আর সেখানে ভর্তির ফর্ম পূরণ করতে গিয়েই বাবার নামের ঘরে আটকে যাওয়া, রবীন্দ্রনাথের কাঁধে ভর দিয়ে এভাবে উদ্ধার পাওয়া। তাৎক্ষনিক এই অভিনব বুদ্ধিটা মাথায় আসায় নির্ভার লাগছে খুব।
নাম:বিচ্ছু মল্লিক ঠাকুর 
মা:শ্রাবণী মল্লিক 
বাবা:রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 
ফর্মটা আরেকবার দেখে নিয়ে ভাঁজ করে রেখে দেয় সে।তারপর দেয়ালের ছবির সাথে পিঠ লাগিয়ে বসে পা দুটো সটান বিছিয়ে দেয় সামনে, যেন রবীন্দ্রনাথকেই শোনায় গুনগুনিয়ে, 
‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু,
পথে যদি পিছিয়ে পরি কভু।’

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত