| 21 এপ্রিল 2024
Categories
জীবন যাপন

জামদানীর ইতিকথা

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

তানিয়া চ্যাটার্জী


বাঙালির ঐতিহ্য, বাঙালির পোশাক অর্থাৎ শাড়ী। বাঙালিরা বলে থাকেন শাড়ীতে নারী, অর্থাৎ নারীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায় শাড়ীর আবরণেই। নারীর পরনে এই পোশাকের ইতিহাস ১০০০ বছরের পুরোনো।

আদিকাল থেকে এখন পর্যন্ত যদি দেখা যায় তবে বোঝা যাবে নারীদের জীবনে শাড়ীর বা কাপড়ের চাহিদা বরাবর। এদের মধ্যে মসলিন এবং জামদানি বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়। জনপ্রিয়র তালিকায় ছিল বেনারসিও। জামদানি শাড়ির নাম মাথায় আসলে প্রথমেই মাথায় আসে বাংলাদেশের নাম। কারন এই জামদানির বাড়বাড়ন্ত ওই দেশ থেকেই। বাংলাদেশের ঢাকাই জামদানি ঐতিহ্য এবং গাম্ভীর্য বলার অতীত। দিন বদলেছে, বদলেছে সময়। আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বদলেছে শাড়ীর বৈশিষ্ট। তবে চাহিদা, জনপ্রিয়তা বা মর্যাদা কোনো অংশেই কমেনি। আলোচনা করবো জামদানি শাড়ীর ইতিহাস বা নানা অজানা তথ্য নিয়ে। জামদানি কেনার আগে জামদানি সম্পর্কে জানতে কিন্তু বেশ লাগবে। জামদানি কথাটি এসেছে ফারসি থেকে। ‘জাম’ কথার অর্থ হলো ‘শাড়ী’ এবং ‘দানা’ কথার অর্থ হলো ‘বুটি’। একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় এমন নামের মানে। সেখান থেকেই ‘জামদানি’।



১৮৫০ সালে নীল বিদ্রোহ জয় আনলেও এর প্রতিশোধ ইংরেজরা নিয়েছিলেন ভয়ঙ্করভাবে!ইউরোপীয় পোশাক শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে মসলিন তাঁতীদের বুড়ো আঙুল কেটে ফেলা হয়। যাতে তারা এই মসলিন বুননে অক্ষম হন। ফলত মসলিন-এর অভাব বাজারে পড়তে থাকে। তখন একচেটিয়া বাজারে জায়গা নেই ‘জামদানি’-র। তবে থেকে এখন পর্যন্ত নানা পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে এবং জনপ্রিয় পোশাক হয়ে আজও রয়ে গেছে ‘জামদানি’। ২০১৩ সালে আজারবাইজান ইউনেস্কোর একটি সভায় বাংলাদেশের জামদানিকে ঢাকাই জামদানি নামে আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য-র তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। জি.আই.এ-এর পণ্য হিসাবে নিবন্ধীকরণ করা হয়েছে এই জামদানিকে। অর্থাৎ কোনো দেশে জামদানি উৎপাদন কিংবা বিক্রি করতে গেলে অনুমতি নিতে হবে বাংলাদেশ-এর কাছে।

বাংলাদেশের পুরাতন সোনার গাঁ অঞ্চলটি হলো আসলে জামদানি উৎপাদন ক্ষেত্র। বর্তমানে রূপগঞ্জ এবং সোনার গাঁ অঞ্চগুলিতে প্রায় ১৫৫ টি গ্রাম জুড়ে গড়ে উঠেছে এই শিল্প। প্রতিবছর শুধু এই অঞ্চল থেকে প্রায় ৫০-৬০ কোটি টাকার জামদানি রপ্তানি হয়ে থাকে। এই শিল্পের সাথে যুক্ত প্রায় ৭০ হাজার মানুষ। যদিও এখন দক্ষ কারিগরের অভাবে ধুঁকছে বাঙালির গর্ব জামদানি শিল্প। এই জামদানি বুনন কিন্তু মোটেই সহজ কথা নয়। হতে হয় রীতিমত দক্ষ। তাই ছোট থেকে শুরু হয়ে যায় তার বুনন শিক্ষা। হাত যত নরম হবে বুনন এবং ছোট ছোট বুটির কাজ ততই সুন্দর এবং নিখুঁত হবে। এই জামদানি শাড়ি বুনন নিছক-ই শেখা নয়, এ যেন এক সাধনা।



 

তাঁতীরা মূলত মা বাবা কিংবা পরিচিত দের হাত ধরেই আসে শিখতে। ১ বছরের অগ্রিম টাকার বিনিময়ে এদের শেখানো হয়। তবে মাসে মাসে কোনো বেতন দেওয়া হয় না তাদের। শাড়ী বাবদই টাকা পান তারা। অনেকে এই শিক্ষা শিখে ফিরে যান নিজের গ্রামে। সেখানেই শুরু করেন বুনন। জামদানি মূলত ৪ ধরনের হয়। ফুল সিল্ক, হাফ সিল্ক, ফুল কটন, হাফ কটন। জামদানির রঙের উপর ভিত্তি করে জামদানির প্রকারভেদ আছে। যেমন – শাপলা ফুল, মরিচ ফুল, ঝুমকা ফুল, বেল ফুল, আঙ্গুরলতা, কলমিলতা, পান্নাহাজার, চন্দ্রপাড়, ময়ূরপ্যাচ পাড় এবং জলপাড়। নাম অনুযায়ী এক একটি বুননের ধরন এবং বৈশিষ্ট এক এক রকম। এবং তার বুননের উপর নির্ভর করে তার দাম। একটি ভালো এবং আদর্শ জামদানি হলো নরম, ১২ হাত লম্বা এবং ৪৬ ইঞ্চি চওড়া।


একজন তাঁতীর দক্ষতা, মেধা, বুদ্ধি, শ্রম, ধৈর্য্য এই সব কিছুর ফল একটি সুন্দর আদর্শ জামদানি শাড়ির। তবে অল্প পারিশ্রমিকের জন্য এই শিল্প দুর্গম হয়ে উঠেছে যা সমস্যার কারণ বটেই। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ত্ব সকলের। সব শেষে নারীর পরণে শাড়িই একমাত্র বাঙালির বিশেষ ঐতিহ্য গুলির মধ্যে একটি।

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত