| 19 এপ্রিল 2024
Categories
ইতিহাস

বাংলার মুঘল সুবাদার শায়েস্তা খাঁ

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

সাইফ ইমন

 

টাকায় ৮ মণ চাল কথাটি শুনলেই আমাদের দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে বাংলার এক মহান শাসক সুবেদার শায়েস্তা খাঁর কথা। তার সম্পর্কে আমরা কতটুকুই বা জানি! শুধু কি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণেই তার কৃতিত্ব সীমাবদ্ধ? একদমই নয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পর্তুগিজ জলদস্যুদের বিতাড়িত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণ, আরাকানদের কাছ থেকে চট্টগ্রাম জয় প্রভৃতি সাফল্য অর্জন করেছিলেন শায়েস্তা খাঁ। শায়েস্তা খাঁ ৬৩ বছর বয়সে প্রথম বাংলায় আসেন। আর যখন ফিরে যান তখন তার বয়স ৮১ বছর। তিনি বাংলার মানুষের মন জয় করেছিলেন। শায়েস্তা খাঁ কতটা চতুর এবং দক্ষ ছিলেন তা বিখ্যাত ইউরোপীয় পর্যটক জ্যাঁ ব্যাপ্টিস্ট ট্যাভার্নিয়ারের লেখে থেকে পাওয়া যায়। তিনি তার দিনলিপিতে লিখেছিলেন, ‘শায়েস্তা খাঁ সম্রাট আওরঙ্গজেবের মাতুল এবং রাজ্যের সবচেয়ে চতুর লোক। ঢাকা আগমনের পরদিন তাকে সালাম দিতে গেলাম। তাকে সোনার বুটিদার ও সোনালি ফিতা জড়ানো একটি জমকালো লম্বা জামা এবং পান্নাখচিত একটি চাদর উপহার দিলাম।’ পর্যটকরা প্রায় সবাই শায়েস্তা খাঁর আমলকে সোনালি সময় বলে উল্লেখ করেন।

শায়েস্তা খাঁর ছয়জন দক্ষ পুত্র শাসনকাজে তাকে সহায়তা করেছেন। তাদের প্রত্যেকেই এক বা একাধিক সরকারের ফৌজদারের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। এর ফলে একই পরিবার বাংলার সব বিভাগ কার্যকরভাবে শাসন করেছিলেন। সমসাময়িক ঐতিহাসিকগণ তার প্রশাসনিক সংস্কারগুলো, কর্মচারীদের দুর্নীতি দমন এবং অন্যায় কর বিলোপ করে জনগণকে স্বস্তিদানের জন্য শায়েস্তা খাঁর প্রশংসা করেছেন। মুঘল সম্রাটের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং শায়েস্তা খাঁর ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক সততার ফলে অসৎ কর্মকর্তা ও অবাধ্য জমিদাররা ভীত হয়ে পড়েছিলেন। যার ফলে প্রশাসনের সব শাখায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন শায়েস্তা খাঁ। রাজস্ব আদায়ে শায়েস্তা খাঁ ছিলেন কঠোর। কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বছরে তিন হাজার টাকা কর আদায় করেছিলেন তিনি। জনগণের কাছ থেকেও কর আদায় বৃদ্ধি পায় তার আমলে। শায়েস্তা খাঁর শাসনামলে মোট জাতীয় উৎপাদের ৪৩.৮ থেকে ৬৪ শতাংশই সংগ্রহ করা হয়েছিল রাজস্ব থেকে। অনেকেই বলে থাকেন, এর ফলে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় এবং জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। তবে শায়েস্তা খাঁ কোম্পানির ব্যাপারে কঠোর হলেও জনগণের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর আদায় না করার লক্ষ্যেও ব্যবস্থা নিয়েছিলেন এবং জনগণের সুযোগ- সুবিধাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েছিলেন। শায়েস্তা খাঁর পিতামহ খাজা গিয়াস উদ্দিন ছিলেন তাতারিস্তানের বাসিন্দা। বর্তমানে এটি রাশিয়ার অন্তর্গত একটি এলাকা। সেখান থেকে তারা তখন ভারতে চলে আসেন। মুঘল সম্রাটদের দরবারে চাকরি করে অনেকে ভাগ্যের পরিবর্তন করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্ত্রী মেহেরুন্নিসার ভাই আসফ খাঁর মেয়ে হলেন মমতাজ। এই মমতাজের বিয়ে হয় সম্রাট শাহজাহানের সঙ্গে। আর এই আসফ খাঁর পুত্রই ছিলেন শায়েস্তা খাঁ। তার আসল নাম ছিল মির্জা আবু তালিব বেগ। শেষ সময়ে শায়েস্তা খাঁ ঢাকা ছেড়ে দিল্লিতে ফিরে যান। যাওয়ার আগে তিনি ঢাকাকে স্থানীয় বাণিজ্য, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে যান। তার কল্যাণে ঢাকা একটি ছোট দাফতরিক কেন্দ্র থেকে বৃহৎ ও উন্নত শহরে পরিণত হয়।

টাকায় আট মণ চাল পাওয়াই একমাত্র সফলতা নয়

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বিরোধ

শায়েস্তা খাঁর শাসনামলের শেষ দিকে এসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বিরোধ বাধে। ইংরেজরা মাত্র তিন হাজার টাকা শুল্কের বিনিময়ে সমগ্র বাংলায় বাণিজ্য করত। আওরঙ্গজেব ক্ষমতায় এসে ইংরেজদের এই বিশেষ সুযোগ তুলে নেন এবং শতকরা ৩.২৫ টাকা  ধার্য করেন। এর পরই আরও কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইংরেজদের সঙ্গে শায়েস্তা খাঁর দ্বন্দ্ব লেগে যায়। ১৬৮৬ সালে ইংরেজরা শক্তি বৃদ্ধিকল্পে সৈন্যসহ কয়েকটি জাহাজ ভারতে আনয়ন করে।

চতুর মানুষ শায়েস্তা খাঁও তার বিরুদ্ধে জবাব দিতে উদ্যত হন। ইংরেজরা এগিয়ে আসে কিন্তু শায়েস্তা খাঁর সৈন্যরা প্রতিরোধ করে কুঠিতে আগুন লাগিয়ে ইংরেজদের বিতাড়িত করেন। তাদের জাহাজেও গোলাবর্ষণ করে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

লালবাগের কেল্লা

শায়েস্তা খাঁ ঢাকায় এসে লালবাগের কেল্লার নির্মাণকাজ শেষ করেন। তবে শায়েস্তা খাঁর কন্যা পরী বিবির মৃত্যুর পর এ দুর্গ অপয়া মনে করা হয় এবং শায়েস্তা খাঁ ১৬৮৪ খ্রিস্টাব্দে এর নির্মাণ বন্ধ করে দেন। এই পরী বিবির সঙ্গে শাহজাদা আজম শাহের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। পরী বিবিকে দরবার হল এবং মসজিদের ঠিক মাঝখানে সমাহিত করা হয়। শায়েস্তা খাঁ দরবার হলে বসে রাজকাজ পরিচালনা করতেন। ১৬৮৮ সালে শায়েস্তা খাঁ অবসর নিয়ে আগ্রা চলে যাওয়ার সময় দুর্গের মালিকানা উত্তরাধিকারীদের দান করে যান। লালবাগ দুর্গের ভবনটি শায়েস্তা খাঁর প্রিয় কন্যা পরী বিবির সমাধি নামে পরিচিত। বাংলাদেশে এই একটি মাত্র ইমারতে মার্বেল পাথর, কষ্টি পাথর ও বিভিন্ন রঙের ফুল-পাতা সুশোভিত চাকচিক্যময় টালির সাহায্যে অভ্যন্তরীণ নয়টি কক্ষ অলংকৃৃত করা হয়েছে। কক্ষগুলোর ছাদ কষ্টি পাথরে তৈরি। কৃত্রিম গম্বুজটি তামার পাত দিয়ে আচ্ছাদিত।

ছোট কাটারা

ছোট কাটারা শায়েস্তা খাঁর আমলে তৈরি একটি ইমারত। নানা কারণে ইতিহাসে এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মনে করা হয়, ১৬৬৪ সালের দিকে এ ইমারতটির নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং তা ১৬৭১ সালে শেষ হয়েছিল। এটির অবস্থান ছিল বড় কাটারার পূর্বদিকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। ইমারতটি দেখতে অনেকটা বড় কাটারার মতো হলেও এটি আকৃতিতে বড় কাটারার চেয়ে ছোট এবং এ কারণেই হয়তো এর নাম হয়েছিল ছোট কাটারা। তবে ইংরেজ আমলে এতে বেশ কিছু সংযোজন করা হয়েছিল। বর্তমানে শুধু একটি ভাঙা ইমারত ছাড়া ছোট কাটারা বলতে কিছুই বাকি নেই। ইমারতটি বিশাল তোরণের মতো সরু গলির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে অসংখ্য দোকান এমনভাবে ঘিরে আছে যে, দেখে বোঝার উপায় নেই এটি একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা।

কুচবিহার বিদ্রোহ ও চট্টগ্রাম জয়

কুচবিহারের বিদ্রোহ দমন শায়েস্তা খাঁর আরও একটি অর্জন। শায়েস্তা খাঁ এসে রাজা নারায়ণকে সম্রাটের আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য করেন এবং রাজা পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে শায়েস্তা খাঁকে সন্তুষ্ট করেন। পরে অবশ্য শায়েস্তা খাঁ আবার কুচবিহার আক্রমণ করতে বাধ্য হন। শায়েস্তা খাঁ যখন বাংলায় আসেন তখন মিরসরাই অঞ্চলসহ প্রায় সমগ্র চট্টগ্রাম আরাকানিদের শাসনে ছিল। শায়েস্তা খাঁ আরাকান রাজাকে প্রচ- হুমকি হিসেবে গণ্য করেছিলেন। কেননা তিনি সেনা ও নৌশক্তিতে সমৃদ্ধ ছিলেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মুঘল নৌবাহিনীর উন্নয়ন শুরু করেন। এক বছরে নৌবহরের সংখ্যা প্রায় ৩০০-এ পৌঁছে। তিনি ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও সেই সঙ্গে পর্তুগালের সমর্থন অর্জনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালান। ডাচ সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় শায়েস্তা খাঁ আরাকানের দখলে থাকা সন্দ্বীপ আক্রমণে মুঘলদের নেতৃত্ব দেন। ১৬৬৫-এর ডিসেম্বরে শায়েস্তা খাঁ এক গুরুত্বপূর্ণ সেনা প্রচারণা চালু করেন চট্টগ্রামের বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম তখন ছিল আরাকানের রাজধানী। সেখানে সাগরে এবং পরে কর্ণফুলী নদীতে প্রচন্ড নৌযুদ্ধ হয়, যাতে পর্তুগিজদের সহায়তায় মুঘলরা জয়লাভ করেন।

মসলিনের পৃষ্ঠপোষক

শায়েস্তা খাঁর আমলে ঢাকা ছিল মসলিনের জন্য প্রসিদ্ধ। ওলন্দাজ বণিকরা ঢাকা থেকে এই বস্ত্র ইউরোপ আর এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করতেন। তবে সবচেয়ে ভালো মসলিন তিনি রাজপরিবার এবং শাসনকর্তাদের ব্যবহারের জন্য রাখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং এই লক্ষ্যে একজন কর্মচারীও নিয়োগ করেছিলেন। মসলিন বিশেষ একপ্রকার তুলার আঁশ থেকে প্রস্তুতকৃত সুতা দিয়ে বয়ন করা অতি সূক্ষ্ম কাপড় বিশেষ। এটি ঢাকাই মসলিন নামেও সুবিদিত। সে সময় গোটা বিশ্বে এই মসলিনের ব্যাপত সুনাম ছিল। সুবেদার শায়েস্তা খাঁ বাংলার মসলিনকে সবখানে ছড়িয়ে দিতে নানা প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। ফুটি কার্পাস নামক তুলা থেকে প্রস্তুত অতি চিকন সুতা দিয়ে মসলিন তৈরি করা হতো, যা ছিল এক কথায় অনন্য। চরকা দিয়ে কাটা, হাতে বোনা মসলিনের জন্য সর্বনিম্ন ৩০০ কাউন্টের সুতা ব্যবহার করা হতো। যার ফলে মসলিন হতো কাচের মতো স্বচ্ছ। এই মসলিন রাজকীয় পোশাক নির্মাণে ব্যবহার করা হতো। মসলিন প্রায় ২৮ রকম হতো যার মধ্যে জামদানি এখনো ব্যাপক আকারে প্রচলিত। শায়েস্তা খাঁ-পরবর্তী সময়ে মসলিন উৎপাদন ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে। আঠারো শতকের শেষার্ধে বাংলায় মসলিন বয়ন বন্ধ হয়ে যায় একেবারে।

ভয়ঙ্কর পর্তুগিজ জলদস্যু দমন

বাংলার মহান শাসক সুবেদার শায়েস্তা খাঁ ভয়ঙ্কর হার্মাদ জলদস্যু দমন করেছিলেন। এটিও তার জীবনে একটি অনন্য সফলতা। সময়টা তখন ১৭ শতাব্দীর প্রায় শেষ দিকে। পর্তুগিজ হার্মাদ জলদস্যুদের অত্যাচারে তখন জনজীবন বিপর্যস্ত। ইউরোপীয়দের মধ্যে পর্তুগিজরাই প্রথম বাংলায় আগমন করেন। মগ ও ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা হার্মাদ নামে অভিহিত হতো। এই জলদস্যুরা এতটাই হিংস্র ও বর্বর ছিল যে বহু বাঙালি নারী, পুরুষ ও শিশুকে বলপূর্বক ধরে চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপে নিয়ে যেত। এরা এতটাই হিংস্র ছিল যে, বাঙালি বন্দীদের হাতে ছিদ্র করে তার মধ্য দিয়ে বেত ঢুকিয়ে অনেককে একসঙ্গে বেঁধে নৌকার পাটাতনের নিচে ফেলে রাখত। পরবর্তীতে দাস হিসেবে ইউরোপীয় বণিকদের কাছে বিক্রি করে দিত। ইউরোপীয় বণিকরা পণ্য হিসেবে বিভিন্ন দেশে পাঠাত। মগরা অনেককেই আরাকানে নিয়ে যেত এবং ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীর মতো ব্যবহার করত। এ রকম পরিস্থিতিতে বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁ মগ ও ফিরিঙ্গি  জলদস্যুদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত হন।

শায়েস্তা খাঁ হার্মাদ দুর্র্ধর্ষদের অত্যাচার এবং নির্যাতনের হাত থেকে জনগণকে রক্ষার উদ্দেশ্যে ১৬৬৫ সালের ২৪ ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম অভিমুখে রওয়ানা হন এবং প্রচ- যুদ্ধ হয়। এক সময় জলদস্যুরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এরই মধ্য দিয়ে হার্মাদ বাহিনীর ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটে। মানুষজন অত্যাচার থেকে রক্ষা পায়। প্রায় দুই হাজার জলদস্যু বন্দী হয়।

কৃতজ্ঞতা: বাংলাদেশপ্রতিদিন

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত