| 2 মার্চ 2024
Categories
ইতিহাস

সাঁওতাল কৃষকদের নাচোল বিদ্রোহ । মণি সিংহ

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোলে সংঘটিত আদিবাসী সাঁওতাল কৃষকদের নাচোল বিদ্রোহ তেভাগা আন্দোলনেরই একটি অংশ। দীর্ঘদিন দানা বেঁধে ওঠা অসন্তোষের আগুনে এই বিপ্লবের সূচনা হয় ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারী নারী নেত্রী ইলা মিত্রের নেতৃত্বে। সাথে আরো ছিলেন আজহার শেখ, অনিমেষ লাহিড়ী, বৃন্দাবন সাহা প্রমুখ। জমি ও ফসলের ওপর সাঁওতাল কৃষকদের অধিকারের দাবিতে নাচোলে বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়। একই জমি বংশ পরম্পরায় চাষাবাদ করা সত্ত্বেও ঐ জমির ওপর সাঁওতালদের কোনো অধিকার ছিল না। উপরন্তু ধান কাটার সময় প্রতি কুড়ি আড়া ধানের জন্যে ক্ষেতে কর্মরত সাঁওতাল কৃষক মাত্র তিন আড়া ধান পেত। সেই সাথে খাজনা হিসেবে জোতদারদেরকে দিয়ে দিতে হতো ফসলের অর্ধেক অংশ। এই অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে সাঁওতাল কৃষকদের সচেতন করার জন্যে এগিয়ে আসে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা। তাঁরা কৃষক সংগ্রাম কমিটি গঠন করেন। উৎপাদিত ফসলের দুই তৃতীয়াংশ এবং প্রতি কুড়ি আড়া ধানের জন্যে সাত আড়া ধানের দাবিতে তাঁরা কৃষকদের সচেতন করে তোলে। প্রথম পর্যায়ে নাচোলের চণ্ডীপুর, রাউতারা, ঘাসুরা, ধারোল, কেন্দুয়া, নাপিত পাড়া প্রভৃতি গ্রামের চাষিরা কৃষকদের খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ এবং জোতদারদের ঘরবাড়ি লুঠ হয়। ইলা মিত্র সহ সকল সংগ্রামী ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীসময়ে পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের আওতায় সাঁওতাল চাষীদের জমির ওপর অধিকার দেওয়া হয়। ইলা মিত্র সহ সকল বন্দি মুক্তি লাভ করেন।


পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মালদহ জেলার পাঁচটি থানা-নবাবগঞ্জ, ভোলাহাট, শিবগঞ্জ, নাচোল ও গোমস্তাপুর রাজশাহী জেলার সঙ্গে যুক্ত হয়। এই আন্দোলনের সঙ্গে সাঁওতাল, হিন্দু, মুসলমান-এই তিন সম্প্রদায়ের মানুষ যুক্ত থাকলেও মূল সংগ্রামী শক্তি ছিল সাঁওতাল কৃষকদের মধ্যে। গত শতাব্দিতে সাঁওতালরা বিদ্রোহ করেছিল। সাঁওতাল পরগনায় সাঁওতাল বিদ্রোহকে ব্রিটিশ সরকার স্তব্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু তাঁদের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন কখনো নিভে যায়নি। উত্তরবঙ্গের মতো এখানেও বিরাট বিরাট জোতদার ছিল, তাঁরা এক একজন দুই তিন হাজার বিঘা জমির মালিক ছিল। এখানে কৃষকদের নিজস্ব জমি ছিল খুব কম। সব জমিই ছিল জোতদারদের দখলে। হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই জোতদার ছিল।

উত্তরবঙ্গের ভাগচাষিদের তে-ভাগা আন্দোলন, ময়মনসিংহের পাহাড়ি অঞ্চলে টংক আন্দোলন সমগ্র বাংলাদেশের কৃষক সমাজের ওপর এক ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করেছিল। সেই প্রভাব এখানকার গরিব ও নির্যাতিত কৃষকদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছিল। উত্তরবঙ্গের তে-ভাগা আন্দোলনের কথা শুনে এই অঞ্চলের চিরকালের শোষিত ভাগচাষিরা এক নতুন সংগ্রামী প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠল। তাঁরা আন্দোলনে এগিয়ে এলো। এই আন্দোলনে হিন্দু, মুসলমান কৃষক অংশগ্রহণ করলেও, সাঁওতাল কৃষকরাই ছিলেন অগ্রগামী বাহিনী। অন্যান্য জেলার মতো দেশ বিভাগের পূর্বে মালদহ জেলায়ও কৃষক সমিতি ছিল।

মালদহ জেলার কৃষক সমিতির সম্পাদক ছিলেন রমেন মিত্র। তিনি নবাবগঞ্জ থানার রামচন্দ্রপুর গ্রামের এক জমিদার পরিবারের সন্তান ছিলেন। রমেন মিত্র মনে-প্রাণে সমাজতন্ত্রের আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৪৮ সালে নাচোল ও নবাবগঞ্জ থানায় কৃষকদের মধ্যে তে-ভাগা আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই সময় গণ-আন্দোলনের সামান্য প্রচেষ্টা গ্রহণ করলেই সরকার কমিউনিস্টদের গ্রেপ্তার করে বিনা বিচারে আটক করছিল। যাঁরা কৃষক-শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করছিলেন, তাঁদেরকে আত্মগোপন থেকেই কাজ করতে হতো। এখানে কাজ করার জন্য অন্যান্য এলাকা থেকেও কর্মীরা এসেছিলেন। যেমন : অনিমেষ লাহিড়ী, ফণী, শিবু, কোরামুদ্দীন, বৃন্দাবন সাহা প্রমুখ। এখানে সাঁওতাল সর্দার মাতলার বিশিষ্ট ভূমিকা ছিল। প্রধানত তাঁকেই অবলম্বন করে এই অঞ্চলের আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল। তিনি সমাজতন্ত্রের আদর্শে দীক্ষিত হয়েছিলেন। সাঁওতালদের মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রথম পার্টি সভ্য। সাঁওতালদের মধ্যে তাঁর ব্যাপক প্রভাব ছিল।

প্রাথমিক প্রচারের পরে সংগঠন গড়ে আন্দোলন শুরু হলো। এই এলাকায় সীমাবদ্ধ স্থানজুড়ে অতর্কিতে এই আন্দোলন জ্বলে উঠল। সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ ভাগ হলেও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প তখনো এখানে তত বিস্তৃত হয়নি। এখানে সাঁওতাল, হিন্দু ও মুসলমান ভাগচাষি সকলেই ঐক্যবদ্ধ ছিল। ফসল কাটার সময় রমেন মিত্র এবং তাঁদের জমিদারির অন্যান্য হিস্যার মালিকদের ৫০০ বিঘা জমির ওপর লাল ঝাণ্ডা তুলে দেওয়া হলো। তারপর অন্য জোতদারদের জমিতে তে-ভাগা কায়েম করা হলো। অল্প সময়ের মধ্যে তে-ভাগার নীতি কার্যকর হয়ে গেল।

নাচোলের সংগ্রামে আরেকটি জনপ্রিয় ও স্মরণীয় নাম হচ্ছে ইলা মিত্র। তিনি শুধু রমেন মিত্রের সহধর্মিণীই ছিলেন না, সহকর্মীও বটে। তিনি তখন ছিলেন একটি শিশুপুত্রের জননী। তিনি সব মায়া কাটিয়ে সাঁওতালদের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সাঁওতালরা তাঁকে নিজেদের মধ্যে পেয়ে উজ্জীবিত হয়ে উঠল। তিনি এঁদের নেতৃত্ব দিয়েছেন তেজস্বিতার সঙ্গে। সাঁওতালদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল শীর্ষে। তাঁকে সবাই ‘রাণীমা’ বলে ডাকত। তিনি সাঁওতালী ভাষাও শিখেছিলেন। তাঁদের তে-ভাগার দাবি অবশেষে সকলেই মেনে নিয়েছিল। এই সাফল্যে কৃষকরা আশা করেছিলেন, তাঁদের যে সব জমি ইতিপূর্বে হস্তচ্যুত হয়েছিল, সেগুলোর অধিকারও তাঁরা পাবেন। এক শক্তিশালী সংগঠন গড়ে ওঠার ফলেই দরিদ্র-নিপীড়িত কৃষকদের মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল। এখানকার এসব ঘটনার খবর সরকারের কাছে গেল। কিন্তু এখানকার অবস্থা, আন্দোলনের ব্যাপকতা সম্পর্কে তারা ভালোভাবে জানতে পারেনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাত্র পাঁচজন পুলিশ ও একজন দারোগা পাঠানো হলো। পুলিশের প্রত্যেকের হাতেই রাইফেল। এদিকে পুলিশের আগমনে কৃষকরা বিক্ষুব্ধ হলো। বল্লম, তীর-ধনুক প্রভৃতিতে সজ্জিত হয়ে কৃষকরাও অগ্রসর হতে লাগল এবং চারদিক থেকে পুলিশকে ঘিরে ফেলল। পুলিশও বেপরোয়া গুলি ছুড়তে লাগল, কিন্তু ফল হলো উল্টো। ওই সংঘর্ষে পাঁচজন পুলিশ ও দারোগা সবাই মারা পড়ল। যখন ওই খবর গিয়ে ওপর মহলে পৌঁছুল, তখন সরকারি কর্মচারীরা ক্ষুব্ধ ও তৎপর হয়ে উঠলেন। এবার পুলিশ নয়, সশস্ত্র সৈন্য আমদানি করা হলো। শোনা যায়, হাজার দুয়েক সৈন্য আমনুরা রেলস্টেশনে নেমেছিল। স্টেশন থেকে নাচোল আট মাইল। তারা জেনে এসেছে এবং তাদের বোঝানো হয়েছে এখানকার সব নারী-পুরুষ তাদের শত্রু-পাকিস্তানের শত্রু। কাজেই তারা যাকে পেল তাকেই হত্যা করল। দুর্জয় সাহস থাকলেই বর্শা, বল্লম আর তীর-ধনুক নিয়ে সৈন্যদের আধুনিক রাইফেল মেশিনগানের সঙ্গে সংগ্রাম করা যায় না। কৃষকরা ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল। তার জন্য মাত্রাতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়। সৈন্যরা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। ওইসব পাকিস্তানি পাঞ্জাবি পাঠান হিংস্র সৈন্যদের হাত থেকে বাঁচার জন্য যে যেদিকে পারল পালিয়ে যেতে লাগল। রমেন মিত্র ও ইলা মিত্র সেই সময় দুজন দুই স্থানে ছিলেন। কয়েকশ জঙ্গি সাঁওতাল রমেন মিত্র ও মাতলা সর্দারকে নিয়ে সীমান্তের দিকে ছুটলেন। সীমান্তের নিরাপদ পথঘাট মাতলা সর্দারের জানা ছিল। মাতলা সর্দারের নেতৃত্বে একদল সীমান্তের অপর পারে মালদহে চলে গেল। ওপারে গিয়ে মাতলা সর্দার কপালে করাঘাত করে বিলাপ করতে লাগলেন। অনেকেই মারা পড়েছে। কিন্তু সেটাও মূল কারণ নয়। বিলাপের মধ্যে শোনা গেল-“রানীমা এখনো এলেন না! মা কি তবে শত্রুর হাতে ধরা পড়লেন?” সকলেই উদ্বিগ্ন, চিন্তায় দিশেহারা। তাঁদের আশঙ্কা সত্যে পরিণত হয়েছিল। ইলা মিত্র ধরা পড়েছিলেন। তিনি চারশ লোক নিয়ে সীমান্ত পার হতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথ দেখাবার উপযুক্ত লোক ছিল না। তাঁরা যেতে যেতে রহনপুর রেলস্টেশনের কাছে পৌঁছুলেন। সেই স্থানটি ছিল বিপজ্জনক। তার কাছেই ছিল সৈন্যদের ক্যাম্প। তাঁদের দেখে সৈন্যরা দ্রুত এসে ঘেরাও করে ফেলল। এরই মধ্যে রমেন মিত্র, ইলা মিত্র, মাতলা সর্দারসহ কয়েকজনের নামে হুলিয়া বের হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে সৈন্যরা পেয়ে গেল। ইলা মিত্র সাঁওতাল মেয়ের পোশাক পরে ছিলেন। সাঁওতাল ভাষায় কথা বলছিলেন! কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ধরা পড়ে গেলেন।

যাঁদের গ্রেপ্তার করা হলো প্রথম থেকেই তাঁদের সকলের ওপর সৈন্যরা পৈশাচিক উল্লাস ও হিংস্রতায় যন্ত্রণা দিয়ে নির্যাতন শুরু করল। সেই নিষ্ঠুর নির্যাতনের কাহিনী ভাষায় অবর্ণনীয়! রক্তে রক্তে তাঁদের দেহ লাল হয়ে গেল। জ্ঞানহারা হলো, তবুও বর্বর সৈন্যরা নিপীড়নে ক্ষান্ত হলো না। ইলা মিত্রকেও তারা নির্মমভাবে অত্যাচার করল। সে অত্যাচারের কৌশল ভয়ঙ্কর, অমানুষিক এবং বর্বর। তারপর সবাইকে নাচোল আনা হলো। ‘হরেক’কে তারা টানতে টানতে নিয়ে এলো। তর্জন গর্জন করে তারা বলল, “বল ইলা মিত্র পুলিশকে মারবার জন্য হুকুম দিয়েছিল।” কিন্তু হরেক একটি কথাও বলল না। তাঁকে বলা হলো, “যদি তুই এ কথা না বলিস, তবে তোকে একেবারে মেরে ফেলব।” এই কথা বলে তারা হরেকের পেট-বুকে সজোরে বুট দিয়ে লাথি মারতে লাগল। হরেকের মুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল, কিন্তু হরেকের মুখ দিয়ে তাদের শেখানো একটি কথাও বের করা গেল না। এর ফলে হরেককে শেষ পর্যন্ত মরতে হলো। এভাবে তারা সবাইকে নির্দয়ভাবে প্রহার করেও কারো মুখ থেকে একটি কথাও বের করতে পারল না। মামলা সাজানোর জন্য তারা এভাবে কয়েকজনকে মারতে মারতে মেরে ফেলেছে, কিন্তু কারো মুখ থেকে একটি কথাও বের করতে পারেনি। ইলা মিত্রের ওপর যে পৈশাচিক ও বীভৎস অত্যাচার করা হয়েছিল, তা একমাত্র নাৎসি ফ্যাসিস্টদের অত্যাচারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তাঁকে কেবল মারপিট করে শয্যাশায়ীই করা হয়নি, তাঁর যৌনাঙ্গে গরম ডিম ও লোহার ডাণ্ডা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমন কি তাঁকে ধর্ষণ পর্যন্ত করা হয়েছিল। সভ্য জগতে এর তুলনা বিরল। তিনি যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন, তাতে এসব কথা স্পষ্টভাবে লিখে আদালতে পেশ করা হয়।

ওই সময়ে মামলা পরিচালনার উকিল পাওয়া ছিল দুষ্কর। পুলিশের হয়রানি ও সাম্প্রদায়িকতার কারণে অনেকেই পিছিয়ে গিয়েছিলেন। অবশেষে এদেশের লব্ধ-প্রতিষ্ঠ উকিল (প্রয়াত) কামিনী দত্ত ইলা মিত্রের মামলা পরিচালনা করেন। তিনি অনেক রাজনৈতিক মামলা পরিচালনা করেছেন। কোনোদিন পিছপা হননি। ওই মামলা বেশ কিছুদিন চলেছিল। শেষে মামলায় আসামিদের যাবজ্জীবন কারাদ- হয়। আপিলে দ- হ্রাস পেয়ে প্রত্যেকের ১০ বছর কারাদন্ড হয়েছিল। অতঃপর ১৯৫৪ সালে শের-ই-বাংলা ফজলুল হক মন্ত্রিসভার আমলে চিকিৎসার জন্য বন্দী অবস্থায় ইলা মিত্রকে কলকাতায় পাঠানো হয়। নির্মম অত্যাচারে তাঁর দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল।

ইলা মিত্র আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যে বিবৃতি দিয়েছিলেন তার হুবহু অনুলিপি নিম্নে দেওয়া হলো :

“কেসটির ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। বিগত ৭-১-৫০ তারিখে আমি রহনপুরে গ্রেপ্তার হই এবং পরদিন আমাকে নাচোল নিয়ে যাওয়া হয়। যাওয়ার পথে পুলিশ আমাকে মারধর করে এবং তারপর আমাকে একটি সেলের ভেতর নিয়ে যাওয়া হয়। হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সবকিছু স্বীকার না করলে আমাকে উলঙ্গ করে দেওয়া হবে-এই বলে এসআই আমাকে হুমকি দেখায়। আমার যেহেতু বলার কিছু ছিল না, কাজেই তারা আমার সব কাপড়-চোপড় খুলে নেয় এবং সম্পূর্ণ উলঙ্গভাবে সেলের মধ্যে আমাকে বন্দি করে রাখে। সেদিন আমাকে কোনো খাদ্য দেয়া হয়নি, একবিন্দু জল পর্যন্ত না। সে দিন সন্ধ্যাবেলাতে এসআই-এর উপস্থিতিতে সিপাইরা তাদের বন্দুকের বাঁট দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করতে শুরু করে। সে সময় আমার নাক দিয়ে প্রচুর রক্ত পড়তে থাকে। এরপর কাপড়-চোপড় ফেরত দেওয়া হয় এবং রাত্রি প্রায় বারটায় সময় আমাকে সেল থেকে বের করে সম্ভবত এসআই-এর কোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এ ব্যাপারে আমি খুব নিশ্চিত ছিলাম না।

যে কামরাটিতে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো, সেখানে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তারা নানা রকম অমানুষিক পদ্ধতিতে চেষ্টা চালাল। দুটো লাঠির মধ্যে আমার পা দুটো ঢুকিয়ে চাপ দেওয়া হচ্ছিল এবং সে সময় আমার চারধারে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা বলেছিল যে, আমাকে ‘পাকিস্তানি ইনজেকশন’ দেয়া হচ্ছে। এই নির্যাতন চলার সময় তারা একটি রুমাল দিয়ে আমার মুখ বেঁধে দিয়েছিল। জোর করে আমাকে কিছু বলাতে না পেরে তারা আমার চুলও উপড়ে ফেলেছিল। সিপাইরা আমাকে ধরাধরি করে সেলে ফিরিয়ে নিয়ে গেল; কারণ সেই নির্যাতনের পর আমার পক্ষে আর হাঁটা সম্ভব ছিল না। সেলের মধ্যে আবার এসআই সিপাইদেরকে গরম সিদ্ধ ডিম আনার হুকুম দিল এবং বলল, এবার সে কথা বলবে। তারপর চার-পাঁচজন সিপাই আমাকে জোরপূর্বক ধরে চিত করে শুইয়ে রাখল। একজন আমার যৌনাঙ্গের মধ্যে একটি গরম সিদ্ধ ডিম ঢুকিয়ে দিল। আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন পুড়ে যাচ্ছিলাম। এরপর আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। ৯/১/৫০ তারিখে সকালে যখন আমার জ্ঞান ফিরে এলো, তখন উপরোক্ত এসআই এবং কয়েকজন সিপাই আমার সেলে এসে তাদের বুট দিয়ে আমার পেটে লাথি মারতে শুরু করল। এরপর আমার ডান পায়ের গোড়ালিতে একটি পেরেক ফুটিয়ে দেওয়া হলো। সে সময় আধা-সচেতন অবস্থায় পড়ে থেকে আমি এসআই-কে বিড়বিড় করে বলতে শুনলাম, “আমরা আবার রাতে আসছি এবং তুমি যদি স্বীকার না কর তাহলে সিপাইরা একে একে তোমাকে ধর্ষণ করবে।” গভীর রাতে এসআই এবং পুলিশরা ফিরে এলো, তারা আমাকে সেই হুমকি দিল। কিন্তু আমি যেহেতু তখনো কাউকে কিছু বলতে রাজি হলাম না, তাদের মধ্যে তিন-চারজন আমাকে ধরে রাখল এবং একজন সিপাই সত্যি সত্যিই আমাকে ধর্ষণ করতে শুরু করল। এরপরই আমি আবার অজ্ঞান হয়ে পড়লাম। পরদিন ১০/১/৫০ তারিখে যখন জ্ঞান ফিরে এলো, তখন আমি দেখলাম যে আমার দেহ থেকে দারুণভাবে রক্ত ঝরছে, আর আমার কাপড়-চোপড় রক্তে সম্পূর্ণ ভিজে গিয়েছে।

সেই অবস্থায় আমাকে নাচোল থেকে নবাবগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হলো। নবাবগঞ্জের জেলগেটের সিপাইরা জোরে ঘুষি মেরে আমাকে অভ্যর্থনা জানাল। সেই সময় আমি একেবারেই শয্যাশায়ী ছিলাম। কাজেই কোর্ট ইন্সপেক্টর ও কয়েকজন সিপাই আমাকে একটি সেলের মধ্যে বহন করে নিয়ে গেল। তখনো আমার রক্তপাত হচ্ছিল এবং খুব বেশি জ্বর উঠেছিল। সম্ভবত নবাবগঞ্জের সরকারি হাসপাতালের একজন ডাক্তার সেই সময় আমার জ্বর দেখেছিলেন ১০৫ ডিগ্রি। যখন তিনি আমার কাছে আমার প্রচণ্ড রক্তপাতের কথা শুনলেন, তিনি আমাকে আশ্বাস দিলেন যে মহিলা নার্সের সাহায্যে আমার চিকিৎসা করা হবে। আমাকে কিছু ওষুধ ও কয়েক টুকরো কম্বলও দেওয়া হলো। ১১/১/৫০ তারিখে সরকারি হাসপাতালের নার্স আমাকে পরীক্ষা করলেন। তিনি আমার সম্পর্কে কী রিপোর্ট করেছিলেন আমি জানি না। তিনি আসার পর আমার পরনে রক্তমাখা কাপড় ছিল, সেটা পরিবর্তন করে একটি পরিষ্কার কাপড় দেয়া হলো। এই পুরো সময়টা আমি নবাবগঞ্জ জেলের একটি সেলে একজন ডাক্তারের চিকিৎসাধীন ছিলাম। আমার শরীরে খুব বেশি জ্বর ছিল; তখনো আমার দারুণ রক্তপাত হচ্ছিল এবং মাঝে মাঝে আমি অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলাম। ১৬/১/৫০ তারিখে সন্ধ্যাবেলায় আমার সেলে স্ট্রেচার নিয়ে আসা হলো এবং বলা হলো যে পরীক্ষার জন্য আমাকে অন্য জায়গায় যেতে হবে। খুব বেশি খারাপ থাকার জন্য আমার নড়াচড়া করা সম্ভব নয়-একথা বলায়, লাঠি দিয়ে আমাকে একটি বাড়ি মারা হলো এবং স্ট্রেচারে উঠতে আমি বাধ্য হলাম।

এরপর আমাকে অন্য এক বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। আমি সেখানেও কিছুই বলিনি, কিন্তু সিপাইরা জোর করে একটি সাদা কাগজে আমার সই আদায় করল। তখন আমি আধা-চেতন অবস্থায় খুব বেশি জ্বরের মধ্যে ছিলাম। যেহেতু আমার অবস্থা ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছিল, সে জন্য আমাকে নবাবগঞ্জ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরপর আমার শরীরের অবস্থা আরো সংকটাপন্ন হলো। তখন ২১/১/৫০ তারিখে নবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে এসে সেখানে আমাকে জেল হাসপাতালে ভর্তি করে দেওয়া হলো। কোনো অবস্থাতেই পুলিশকে আমি কিছুই বলিনি এবং ওপরে যা বলেছি তার বেশি আমার বলার কিছু নেই।”

ইলা মিত্রের ওপর যে পৈশাচিক অত্যাচার হয়েছিল, আর কোনো রাজনৈতিক কর্মী বা নেতার ওপর এরূপ বীভৎস অত্যাচার হয়নি। শুধু ইলা মিত্র নয়, সে সময় যাঁরা ধরা পড়েছিলেন তাঁরা পৈশাচিক নির্যাতনের মুখেও এবং নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও কোনো স্বীকারোক্তি করেননি। আন্দোলনের ভেতর দিয়ে সকলের মধ্যে যে বিপ্লবী দৃঢ়তা সৃষ্টি হয়েছিল এটা তারই জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। কিন্তু টংক আন্দোলনের মতো এই আন্দোলনের কৌশলও ছিল ভুল। সারা দেশের ব্যাপক কৃষক-জনতাকে সংগঠিত না করেই শুধু একটি এলাকার কৃষকের সংগঠিত শক্তির ওপর নির্ভর করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রথমদিকে এরূপ জঙ্গি আন্দোলনের কৌশল নেয়া ঠিক হয়নি। প্রথম বিজয়ের পরে আন্দোলন বন্ধ করা উচিত ছিল। কিন্তু এই আন্দোলন দমন করার জন্য মুসলিম লীগ সরকার যে বর্বর অত্যাচারের আশ্রয় নিয়েছিল, তাও তুলনাহীন। মুসলিম লীগ যে শোষক, জোতদার, মহাজন ও ধনিকের সরকার, তাদের স্বার্থরক্ষায় তারা যে নৃশংস হতে পারে তা সেদিন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

 

 

 

 


ইতিহাস বিষয়ক লেখা পাঠানোর ঠিকানা- [email protected] । লেখার সঙ্গে আপনার পছন্দের একটি ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পাঠাতে ভুলবেন না।


কমরেড মণি সিংহের ‘জীবন-সংগ্রাম’ গ্রন্থের অখণ্ড সংস্করণ থেকে প্রকাশ করা হলো, কৃতজ্ঞতা: একতা

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত