বাংলা মঞ্চ ও অভিনয়ের বিবর্তন রেখা

[প্রবন্ধটি শম্ভু মিত্রের প্রবন্ধ সংকলন ‘সন্মার্গ সপর্যা’ গ্রন্থ থেকে পুনর্মুদ্রণ করা হলো। ]

শম্ভু মিত্র

দশ কি বিশ বৎসর আগে ‘থিয়েটার’ বললেই লোকে বুঝতো প্রসিনিয়ামমঞ্চে প্রদর্শিত কোনো নাট্যাভিনয়। কিন্তু বর্তমানে ‘এরীনা থিয়েটার’ বা ‘থিয়েটার ইন দি রাউন্ড’ বিষয়ে অনেক প’ড়ে-শুনে আমরা অনেক বুদ্ধিমান হয়ে গেছি। তাই এখন আমরা থিয়েটার বলতে বুঝি অভিনয়ের জন্য একটি মঞ্চ, যেখানে ঝালর, পর্দা, পট, সবই থাকতে পাবে, কিন্তু সব অভিনয়ে সবকিছু ব্যবহৃত নাও হ’তে পারে।

আর ‘যাত্রা’ বা ঐধরনের অনেক নাট্যভঙ্গীকে আমাদের সরকারি/ শিক্ষিত পরিভাষায় বলা হয় ‘লোকনাট্য।’

এতে একটি কৌতুকাবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। যাত্রা, যেটা দর্শকদের মাঝখানে একটি আসরে চিরদিন অভিনীত হোত, সেটা, কিছুদিন আগে পর্যন্ত মাত্রই একটা ‘লোকনাট্য’ ছিল। অর্থাৎ খুব পুরানো ও অমার্জিত একটা ফর্ম, যেটা আমরা, আধুনিক ও বিদগ্ধজনেরা, অনেক পিছনে ফেলে এগিয়ে এসেছি। কিন্তু হঠাৎ সাহেবরা যখন আবার এটাকেই ‘থিয়েটার ইন দি রাউন্ড’ নাম দিয়ে গ্রহণ করেন তখন আমরাও হঠাৎ বিগলিত চক্ষে একেই আবার সবচেয়ে আধুনিক ও বৈপ্লবিক রীতি ব’লে স্বাগত জানাই।

আমি অবশ্য জানি যে আমার এই টিপ্পুনিটা এমন কিছু নতুন বা অরিজিন্যাল নয়, তবু আপনাদের সামনে আমার আলোচনার শুরুতেই এইটুকু ভণিতা আমার করার দরকার ছিল। যাতে আমরা আমাদের দেশের পটভূমিকাতেই আমাদের থিয়েটারকে বোঝবার চেষ্টা করি, কোনো পশ্চিম-থেকে-আমদানি-করা পরিভাষায় বিভ্রান্ত না হয়ে।

বাঙলায় বহু প্রাচীনকাল থেকেই নাট্যাভিনয়ের প্রচলন ছিল, যদিও সে নাট্যের রূপ সম্পর্কে বা নাটকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে আমরা বিশেষ কিছুই জানি না।

ভারতের নাট্যশাস্ত্রে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত বিভিন্ন অভিনয়রীতির উল্লেখ আছে। এরই মধ্যে একটি রীতির নাম ‘ওড্র মাগধী।’ নাট্যশাস্ত্রের ত্রয়োদশ অধ্যায়ে বলা আছে যে এই রীতি বিহার, ওড়িষ্যা, বাংলা ও নেপালে প্রচলিত ছিল। সেই রীতির কতোটুকু অংশ এখনো এই অঞ্চলে জীবিত আছে, বা পুরানো নথিপত্র ও অন্যান্য সূত্র অনুসন্ধান ক’রে সেই রীতির কিছু বর্ণনা উদ্ধার করা যায় কিনা, এ সমস্তই গবেষকের কাজ।

জন্ম বিবাহ বা বিভিন্ন ঋতুর পার্বণ উপলক্ষে এই বাংলায় এখনো কতকগুলি আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়ে থাকে। এই ব্রত বা আচারগুলির উদ্ভব প্রাক-আর্য সভ্যতায়। এই আর্য-পূর্ব সংস্কৃতির প্রভাবই হয়তো ভরতমুনি বর্ণিত ‘ওড্র মাগধী’ রীতির মূল।

এ.বি. কীথ তাঁর সংস্কৃত নাটক সম্পর্কে লেখা গ্রন্থে বলেছেন- [‘নাটকের] জনপ্রিয় শাখাটি’ যা বাঙলা সাহিত্যে যাত্রা নামে বহুল পরিচিত, সেটি কিন্তু অনেক যুগ পেরিয়েও অস্তিত্ব বজায় রেখেছে; অথচ মার্জিত এবং পুরোহিত-শাসিত বৈদিক নাটক কোনো উত্তরপুরুষ না রেখেই লোপ পেয়ে গেল।’ তিনি আরো বলেছেন যে, ফন শ্রয়ডারের মতে ‘যাত্রা ও বৈদিক নাটকের মূল এক হলেও পরে ভিন্ন ধারা অবলম্বন করেছে।’

এর ফলে কতকগুলি সমস্যার উদ্ভব হয়। প্রথমে যাত্রার নামকরণ সম্পর্কে। কিছু পণ্ডিত মনে করেন রথযাত্রা স্নানযাত্রা সংযাত্রা ইত্যাদি পার্বণের মধ্যেই নাট্যাভিনয়ের উৎপত্তি। অন্যদিকের পণ্ডিত বললেন, বাংলার পশ্চিমসীমান্তে কোনো-কোন উপজাতির মধ্যে যাত্রা নামে অনুষ্ঠানের নাকি প্রচলন আছে। অবিবাহিত তরুণ-তরুণীরা এই পার্বণ উপলক্ষে একটি খুঁটিকে ঘিরে নাচগান করে।

শ্রীআশুতোষ ভট্টাচার্য তাঁর ‘বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস’ গ্রন্থে বলেছেন যে তিনি দাক্ষিণাত্যে ‘মারীযাত্রা’ নামে এক ধরনের অনুষ্ঠান দেখেছেন। এবং পূর্ব সমুদ্রের তটবর্তী এলাকায় জেলেদের মধ্যে ‘যাত্রে’ নামে একটি পার্বণ নাকি এখনও প্রচলিত।

সুতরাং এসব তথ্য সঠিক হ‘লে একথা মনে করা যেতে পারে যে নাট্যাভিনয় অর্থে যাত্রা শব্দটির উৎস হয়তো সংস্কৃত নাও হ’তে পারে, সংস্কৃতপূর্ব আঞ্চলিক ভাষা থেকেও এটা গৃহীত হয়ে থাকতে পারে। কিংবা এমনও কেউ কেউ অনুমান করেন যে নাট্যাভিনয়ের এই রূপটি প্রাক-আর্য যুগের, কিন্তু এর নামের আর্যীকরণ ঘটেছে পরে। এবং এই বিশেষ ধরনের নাট্যরীতিই হয়তো নাট্যশাস্ত্রে নির্দেশিত হয়েছিল। তাছাড়া মৌর্যযুগে আমরা বাংলার কতকগুলি সমৃদ্ধ নগরের উল্লেখ পাই। সেখানেও নিশ্চয় কোনো এক ধরনের নাট্যাভিনয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করা হোত। তবে এখনও আমরা এ-বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য পাই না।

প্রাচীনতম বাঙলার নিদর্শন বৌদ্ধ চর্যাগীতিতে আমরা পাই:

নাচন্তি বাজিল, গান্তি দেবী
বুদ্ধনাটক বিসমা হোই।।

বজ্রচার্য নৃত্য করছেন আর দেবী (অভিনেত্রী) গাইছেন। এর বেশি কোনো বর্ণনা নেই। নাটক সম্বন্ধে কোনো ব্যাখ্যা নেই, বা আসরে বা মঞ্চে কোথায় যে এ অভিনয় হোত তারও কোনো বিবরণ নেই। শুধু অভিনেতা নাচছে ও অভিনেত্রী গাইছে, -বাস এই হোল বুদ্ধনাটক।

যিনি এটা লিখেছেন সেই কবি বাঙালী ছিলেন এটা ভেবে আরো আশ্চর্য হতে হয়। কেননা তাঁর আধুনিক উত্তর-পুরুষদের মধ্যে অনেকেই এরকম সংক্ষিপ্ত ভাষণের মোটেই অনুরক্ত নই।

সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাঙালীর দেশে তিন ধরনের ভাষা প্রচলিত ছিল ব’লে পণ্ডিতেরা বলেন : (১) সংস্কৃত (২) প্রাকৃতের বিভিন্ন রূপ, (৩) সৌরশেনী অপভ্রংশ। অল্প যে-কয়েকটি নাটক আমাদের কাছে এসে পৌঁচেছে সেগুলি সংস্কৃতে লেখা। কিন্তু চর্যাগীতির ভাষায় লেখা সাধারণ ব্যক্তিদের জন্য অভিনীত কোনো নাটকের কথা এখনো আমরা জানি না।

দ্বাদশ শতাব্দীতে জয়দেবের ‘গীত গোবিন্দ’ রচিত হয়। এই কাব্যে, এবং সে-যুগে রচিত অন্যান্য সাহিত্য থেকে, তৎকালীন বিদগ্ধ সমাজের জীবন-বিষয়ক-দৃষ্টিভঙ্গী কী ছিল তা আমরা জানতে পারি। তখন বাংলার প্রায় অর্ধভাগ পাঠান বিজেতাদের অধিকারে অথচ সেনবংশীয়দের রাজসভা তখনো বৃন্দাবনলীলার তীব্র শৃঙ্গাররসে আবিষ্ট।

পরে চৈতন্যযুগে অবশ্য রূপ গোস্বামী গীত গোবিন্দের এক নতুন ব্যাখ্যা করেন, এবং জয়দেবকে সাধক কবিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেন।

সে যাই হোক, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে ‘গীত-গোবিন্দ’র মধ্যে তৎকালনি লৌকিক নাট্যরূপের অনেকগুলি লক্ষণ স্পষ্ট। এবং এ-ও জানা যায় যে জয়দেবের পত্নী পদ্মবতী গীতে পারদর্শিনী ও নৃত্যে পটীয়সী ছিলেন।

ক্ষিতিমোহন সেন বলেছেন যে বিশ্বভারতীর ভূতপূর্ব সংগীতশিক্ষক মহারাষ্ট্র দেশবাসী পন্ডিত ভীমরাও শাস্ত্রী জয়দেবের মূল ঘরানা থেকে সুর এবং তাল শিখে পন্ডিত ভাতখন্ডেকে শোনান। আচার্য ভাতখন্ডে শুনে অবাক হ’য়ে বলেন, ‘আরে, এ তো মালাবার থেকে নেওয়া’। -প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে ডক্টর নীহারঞ্জন রায় শিখদের শ্রীগুরু গ্রন্থে জয়দেবের দুটি গান পেয়েছেন। এই গান দুটি গুর্জরী এবং মারু রাগে গীত হয়। এ থকে বোঝা যায় যে যাকে আমরা গৌড়ীয় রীতি বলি, তাতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের নানা বৈশিষ্ট্যের প্রভাব আছে।

‘গীত-গোবিন্দ’ এবং পরবর্তীকালে রচিত ‘মনসামঙ্গল’, ‘চন্ডীমঙ্গল’, ‘কালিকামঙ্গল’ প্রভৃতি মঙ্গলকাব্যগুলি মূলতঃ বোধহয় নৃত্য সহযোগে গীত হ’তো। কিন্তু উক্ত কাব্যগুলিতে কোনো গদ্য সংলাপ থাকতো কিনা তার কোনো প্রমাণ নেই।

কিন্তু চৈতন্যযুগে এসে আমরা দেখলুম গানের সঙ্গে-সঙ্গে কিছু সংলাপও সংযোজিত হয়েছে। এবং এটাও স্মরণযোগ্য যে শ্রীচৈতন্য স্বয়ং ভালো অভিনেতা ছিলেন।

বৈষ্ণবধর্মের প্রসারের সঙ্গে-সঙ্গে নাট্যাভিনয়ও মনে হয় বিরাট প্রেরণা পেয়েছিল। এবং কৃষ্ণের নানা লীলা অবলম্বনে রচিত কৃষ্ণযাত্রা বিশেষ জনপ্রিয় হয়। তাছাড়া ছিলো রামযাত্রা, এবং মহামারীর সময়ে শীতলাযাত্রা বা ওলাবিবির যাত্রা।

চৈতন্যের পরের সময়টা আমাদের দেশের এক তমসাচ্ছন্ন যুগ, সংকীর্ণতা, গোঁড়ামি, ও কুসংস্কারে দেশ ছেয়ে গিয়েছিলো। তারপর এলো ইংরেজরা। ১৬৯০ খ্রীষ্টাব্দে চার্নক কলকাতা বন্দরের গোড়াপত্তন করেন। ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধ হয়। ১৭৭০ খ্রীষ্টাব্দে (১১৭৬ বঙ্গাব্দে) এই দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয় যার বর্ণনা বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে আছে। ১৭৭৪ খ্রীষ্টাব্দে কলকাতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসিত ভারত সাম্রাজ্যের রাজধানী হয়।

কলকাতা যখন গুরুত্বপূর্ণ নগর হিসেবে গ’ড়ে উঠছে, তখন বিষ্ণুপুর, বর্ধমান, বীরভূম, যশোহর এবং নদিয়া অঞ্চলের ‘যাত্রা’ বিশেষ প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিলো। এই প্রসঙ্গে পরমানন্দ অধিকারী, শিশুরাম অধিকারী, লোচন অধিকারীর যাত্রাদলের নাম উল্লেখযোগ্য। অধিকারী মানে মালিক। কিন্তু অধিকারীরা শুধু মালিকই ছিলেন না, তাঁরা একই সঙ্গে ছিলেন নির্দেশক, পালার লেখক, সঙ্গীতনির্দেশক, এবং কখনো কখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার অভিনেতা। তাঁরাই যাবতীয় ব্যবসায়িক ও প্রশাসনিক কার্য পরিচালনা করতেন।

এই পালাগুলির বিষয় ছিলো কৃষ্ণযাত্রা বা কালীদয়মন অথবা ভারতচন্দ্রের বিখ্যাত সাহিত্যসৃষ্টি ‘বিদ্যাসুন্দর’। বিদ্যাসুন্দর-এর রচনারীতি অসাধারণ। সভাকবিসুলভ ভঙ্গিতে লেখা এই কাব্যটির মেজাজ সম্পূর্ণরূপে নাগরিক, ছন্দের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে আছে সিনিকের ব্যঙ্গ-হাসি। ভারতচন্দ্রে বাক্যবিন্যাস অসামান্য। তাঁর অনেক পঙক্তি আজ প্রবাদে দাঁড়িয়ে গেছে। বহু সাধারণ নর-নারী দৈনন্দিন জীবনে তাঁরই পঙক্তি প্রবচন হিসেবে উদ্ধৃত করেন, যদিও তাঁরা কেউ ভারতচন্দ্রের নামই শোনেননি। ভারতচন্দ্র শৃঙ্গাররসেরও অকপট বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর সিনিকভঙ্গীতে।

অবশ্য মূলত এটি পালা হিসেবে রচিত হয়নি। কিন্তু পরে এটি পালারূপে গৃহীত হয় এবং বহু স্থানে অভিনীত হতো। সংলাপগুলি পয়ারে রচিত, কিন্তু কয়েকটি দৃশ্যে অভিনেতারা মুখে-মুখে সংলাপ তৈরি করে বলতেন , যেগুলি গদ্যে । বাকি অংশে থাকতো নাচ আর গান । মেয়েরা  অভিনয়ে অংশগ্রহণ করার যুগ তখন অতীত হয়ে গেছে । যাত্রায় বহু ছেলে ছিলো যারা স্ত্রী- ভুমিকায় অভিনয় করতো , নাচতো গাইতো । তবে নাট্যাভিনয়ের অন্যরূপে, যেমন ঝুমুরে, মেয়েরা থাকতো । তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কোনো এক উপন্যাসে এইধরনের একটি দলের কথা বর্ণনা করেছেন ।  কলকাতা গড়ে ওঠবার সঙ্গে- সঙ্গে এক শ্রেণীর বড়ো লোকেরও সৃষ্টি হয়। তাদের বাড়িতে তারা মাঝে- মাঝে এই যাত্রার আসর বসাতেন । তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এগুলি চলতো। কলকাতা ভারতের রাজধানী হবার একুশ বছর পরে রুশ – দেশীয় জনৈক ব্যক্তি একটি মঞ্চ নির্মাণ করেন এবং ১৭৯৫ খ্রীষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে তার প্রযোজনায় একটি বাঙলা নাটক মঞ্চস্থ হয়। এই ভদ্রলোক হলেন গেরাসিম লেবেডেফ। তিনি দি ডিসগাইজ নামক ইংরেজী নাটকের কাল্পনিক সংবদল নামে এক বাঙলা তরজমা করেন। এই অভিনয়ে স্ত্রী-ভূমিকায় মেয়েরাই অংশ নিয়েছিলেন এবং টিকিটের হার ছিলো চার টাকা এবং আট টাকা। ১৭৯৫ খ্রীষ্টাব্দের মুদ্রামূল্যের তুলনায়এই হার যে বেশ বেশি, সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই।  প্রথমবারের সাফল্যে উৎসাহিত  হয়ে লেবেডেফ পরবতী মার্চ মাসে পুনরাভিনয়ের ব্যবস্থা করেন। অভিনয়ের পূর্ব দিনে তিনি কাগজে বিজ্ঞাপন দেন -দর্শকদের সুবিধার জন্য বসিবার আসন দুই শত করা হইয়াছে যাহা শীঘ্রই পূর্ণ হইয়া যাইবে। দর্শন প্রার্থীদের লেবেডেফ এর নিকট এক স্বর্ণ মোহর দর্শনী সহযোগে আবেদন করিতে হইবে। প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আবেদনপত্র গৃহীত হইবে।’ একটি টিকিটের জন্য এক স্বর্ণ মোহর এই ১৯৭০ খ্রীষ্টাব্দেও চমকিত করবার মতো। অভিনয়ের শেষে তিনি ক্যালকাটা গেজেট পত্রিকায় দর্শকদের উদার পৃষ্ঠপোষকতার জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

এর অল্পকাল পরেই তিনি ইংল্যান্ডে যান। সেখানে ১৮০১ খ্রীষ্টব্দে অর্থাৎ বাঙলাদেশে তাঁর প্রযোজিত অভিনয়ের ঠিক পাঁচ বছর পরে ‘এ গ্রামার অব দি পিওর অ্যান্ড মিক্সড ঈস্ট ইন্ডিয়ান ডায়ালেক্টস’ প্রকাশিত হয়। বইটির ভূমিকায় তিনি লেখেন, দুটি অভিনয়েই প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ ছিলো।

কিন্তু বাঙলা থিয়েটারের এই আকস্মিক অভ্যুদয় লেবেডেফ-এর বিদায়ের সঙ্গে-সঙ্গে বন্ধ হ’য়ে যায়। অনেক ঐতিহাসিকের মতে ১৮৩৫ খ্রীষ্টাব্দে নবীনচন্দ্র বসুর গৃহে রঙ্গমঞ্চ স্থাপনের পূর্বে বাঙলা থিয়েটারের অস্তিত্ব পাই না। এখানে থিয়েটার বলতে যবনিকা-পট সমেত প্রসিনিয়াম মঞ্চের কথাই তাঁরা ধরছেন।

একথাও বলা হ’য়ে থাকে যে লেবেডেফ-এর একক প্রচেষ্টা এদেশে কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি, কেননা বাঙালীরা তখনও রঙ্গমঞ্চসচেতন হয়নি। এবং পরবর্তীকালে যে-থিয়েটার পাই, তা ইংরেজদেরই অনুকরণ।

প্রখ্যাত অভিনেতা শ্রীঅহীন্দ্র চৌধুরী পূর্বোক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কতকগুলি যুক্তিসঙ্গত আপত্তি তুলেছেন। তিনি লেবেডেফ-এর পূর্বোল্লিখিত ভূমিকা থেকে কয়েকটি মন্তব্য বিষয়ে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। লেবেডেফ লিখেছিলেন যে নাটকটির অনুবাদে তাঁর এই সাফল্যের কারণ এই যে, তিনি বিশেষ সৌভাগ্যবশত তাঁর শিক্ষকের মতো ব্যক্তির সহায়তা লাভ করেছিলেন। এই শিক্ষকের নাম শ্রীগোলকনাথ দাস। তিনি লেবেডেফ-কে বলেন যে তিনি যদি এই নাটকটি অভিনয় করাতে রাজি হন, তাহ’লে তিনি দেশীয় অভিনেতা-অভিনেত্রী সংগ্রহের দায়িত্ব নেবেন। এই কথায় উৎসাহিত হ’য়ে লেবেডেফ নিজস্ব পরিকল্পনায় একটি প্রশস্ত রঙ্গমঞ্চ নির্মাণ করেন এবং তিনমাসের মধ্যে মঞ্চ সম্পূর্ণ হয়, অভিনেতারাও প্রস্তুত হন।

অহীন্দ্রবাবুর মতে, লেবেডেফ স্বয়ং যখন স্বীকার করেছেন যে নাট্যপ্রযোজনার প্রথম পরিকল্পনা গোলকনাথ দাসের, তখন নিশ্চয় প্রমাণিত হয় যে শেষোক্ত ব্যক্তির এই বিষয়ে এক ধরনের অভিজ্ঞতা ও বোধ ছিলো। দ্বিতীয়ত- তিনি কোথা থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রী সংগ্রহ করলেন যাঁদের মাত্র তিন মাসের মহলায় তৈরি করা গিয়েছিলো? তাছাড়া এই তিন মাসের মধ্যে লেবেডেফ-কে নিশ্চয় রঙ্গমঞ্চ নির্মাণ, দৃশ্যপট-অঙ্কন ইত্যাদি ব্যাপারে অধিকাংশ সময়ে ব্যস্ত থাকতে হ’তো। সুতরাং অভিনেতাদের মহলা দেবার বেশির ভাগ দায়িত্ব ছিলো গোলোকনাথ দাসের ওপর। বিশেষত ঐসব অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ইংরেজি ভাষার দখল থাকা সম্ভব ছিল না। সুতরাং তাদের ভূমিকা ইত্যাদি বুঝিয়ে দেবার জন্য গোলোক দাসের মতো ব্যক্তির প্রয়োজন ছিলো। এবং বাঙলাদেশে যদি নাট্যাভিনয় সম্পর্কে একটা স্পষ্ট চেতন না থাকতো তাহ’লে কী-ক’রে একজন অজ্ঞাত গোলোক দাসের পক্ষে বোঝা সম্ভব হ’তো যে কোন নাট্যপ্রযোজনার কতখানি সম্ভাবনা আছে? কী-ক’রেই বা সম্ভব হ’তো অভিনেতা-অভিনেত্রী যোগাড় করা কিংবা তাঁদের শিক্ষা দেওয়া?

অহীন্দ্রবাবু আরেকটি যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন তুলেছেন। যদি অভিনয়ে অংশগ্রহণকারীরা অভিনয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ হতেন, তাহ’লে এতো স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ নতুন একটি শিল্পমাধ্যমের জন্য তাঁদের তৈরি করা যেতো? নাটকে তাদের অভিনয়ের সঙ্গে-সঙ্গে গানও গাইতে হয়েছিলো।

সুতরাং অহীন্দ্র চৌধুরী সিদ্ধান্ত করেছেন যে অভিনেত্রীদের সংগ্রহ করা হয়েছিলো ভ্রাম্যমাণ শারী-জারী-কীর্তনিয়াদের দল থেকে।

দুঃখের বিষয় লেবেডেফ এদেশ ছেড়ে যাবার পর তাদের কার্যাবলি বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। গোলোক দাসইবা লেবেডেফ আসার আগে পরে কী করতেন এবং কী করলেন সে সম্পর্কে আমরা অন্ধকারে। এটা দুর্ভাগ্যজনক। তবে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, এই ধারার ছেদ পড়েনি এবং প্রথম নাট্যপ্রযোজনার প্রভাব বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে পড়েছিলো।

এখন দেখা যাক এই অভিনয়ের কী-কী প্রভাব আমরা লক্ষ করি। তখনকার যাত্রার পালায় কোনো অঙ্ক বা দৃশ্য বিভাগ ছিলো না, দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে এমনিই চ’লে যেতো। দ্বিতীয়ত- অভিনেতাদের প্রবেশ-প্রস্থানের কোনো রীতি ছিলো না। অভিনেতারা তাদের পার্ট বলা বা গান গাওয়া হ’য়ে গেলে আসরের মধ্যেই ব’সে পড়তেন, আবার পরবর্তী দৃশ্যে প্রয়োজন হ’লে উঠে পড়তেন। লেবেডেফ প্রযোজিত নাট্যাভিনয়ের প্রভাবে এই রীতির পরিবর্তন শুরু হ’লো। এই প্রভাব অবশ্য প্রত্যক্ষ নয়, কেননা টিকিটের চড়া দামের জন্য কলকাতার অধিকাংশ লোকই তখন নিশ্চয় এই অভিনয় দেখার সুযোগ পাননি। এই প্রভাবটা এসেছিলো অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে এবং বোধহয় স্বয়ং গোলোক দাসের কাছ থেকে। সে যাই হোক, এই পরিবর্তনের প্রথম স্বাক্ষর পেলাম ১৮২১ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত কলিরাজার যাত্রা’য়। প্রকাশের অল্পকাল পরেই এটি অভিনীত হয়।

[বইটির নামকরণে] ‘যাত্রা’ কথাটি প্রচলিত নাট্যাভিনয় অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। এখানে ‘যাত্রা’ শব্দের অর্থ গমন। নাটকটির বিষয় কলিরাজের চট্টগ্রাম থেকে কলকাতায় গমন। এই ব্যঙ্গনাটকের কুশীলবের মধ্যে আছেন কলিরাজ এবং তাঁর পারিষদবর্গ। যেমন, একজন বৈষ্ণব, একজন সাহেব, আর সপরিচারক তাঁর স্ত্রী। এই নাটকে অভিনেতার মঞ্চে প্রবেশ করতেন, অভিনয় শেষে প্রস্থান করতেন। নাটকটির অভিনয় বিশেষ সফল হয়েছিলো এবং সেকালের পত্র-পত্রিকাগুলিতে খুব প্রশংসিত হয়।

এ থেকে অনুমান করা যেতে পারে সেযুগে পুরোনো যাত্রাকে নতুন রূপ দেবার আরো অনেক চেষ্টা হয়েছিলো। এরকম অনেক নতুন রীতির যাত্রাভিনয়ের খবর পাওয়া যায়। তার মধ্যে একটি ১৮২২ খ্রীষ্টাব্দে অভিনীত হয়-পালাটির নাম নলদময়ন্তী।

কিন্তু এর সঙ্গে-সঙ্গে ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতির [প্রত্যক্ষ] প্রভাবও শুরু হয়। ১৮১৭ খ্রীষ্টাব্দে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৩১ খ্রীষ্টাব্দে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৩১ খ্রীষ্টাব্দে প্রসন্নকুমার ঠাকুর ‘হিন্দু থিয়েটার’ স্থাপন করেন। এখানে জুলিয়াস সীজার নাটকের অংশবিশেষ এবং উইলসনকৃত উত্তররামচরিত- এর অনুবাদ অভিনীত হয়। হিন্দু কলেজের ছাত্ররা সাহেবদের মতো অভিনয় করতে পারার জন্য বিশেষ গর্ব অনুভব করতেন। বৈষ্ণবচরণ আঢ্য নামে এরকম একজন যুবক ‘সাঁ সুসি’ থিয়েটারে ওথেলোর ভূমিকায় প্রসিদ্ধি অর্জন করেন। ‘সাঁ সুসি’ নামটি ফরাশি। একজন পণ্ডিতের মতে ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত রঙ্গমঞ্চের ফরাশি নামকরণের মধ্যে এমন একটা হীনমন্যতাই প্রকাশ পায় যে, ফরাশিরা ইংরেজদের চেয়ে বেশি সংস্কৃত একথা যেন স্বীকৃত। ঠিক যেমন অনেক ভারতীয় স্নবদের কাছে পশ্চিমের জিনিস মাত্রেই- আপনারা তো জানেন, কী।

‘হিন্দু প্রেট্রিয়ট’ কাগজে লেখা হয় যে বাঙলা ভাষায় নাটক অভিনয়ের জন্য বাঙালীদের একটা মঞ্চ থাকা উচিত, যেমন আছে বোম্বাইতে গ্র্যান্ট রোড থিয়েটার।

যাই হোক, ১৮৩৫ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ধনী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে রঙ্গমঞ্চ গ’ড়ে উঠতে লাগলো। এই থিয়েটারে প্রসিনিয়াম মঞ্চ ছিলো, অঙ্কিত প্রেক্ষাপট ছিল, আর পোশাক-পরিচ্ছদগুলিও খুব দামী ছিলো। নাটকগুলি হয় ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর’ এর নাট্যরূপ কিংবা সংস্কৃত নাটকের বাঙলা তরজমা অথবা সংস্কৃত নাটকের রীতিতে রচিত কোনো পৌরাণিক নাটক।

১৮৫৪ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম সামাজিক নাটক কুলীনকুলসর্বস্ব (পণ্ডিত রামনারায়ণ তর্করত্ম রচিত) প্রকাশ হবার পর সেটাই প্রথম মৌলিক বাংলা নাটক ব’লে বিখ্যাত হয়। উনিশ শতকের অধিকাংশ মনীষীই সমাজসংস্কারে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন, সেই চিন্তাধারার প্রভাব থিয়েটারেও লক্ষ করা যায়। সামাজিক কুসংস্কার ও কুপ্রথাকে আঘাত করার জন্য থিয়েটার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হ’য়ে উঠে।

এই সময় থেকে ‘যাত্রা’ নাটকীয় তীব্রতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ক্রমশ অপেরার ধরন ত্যাগ ক’রে সংলাপপ্রধান হ’য়ে উঠেছিলো। কিন্তু নাটকীয় সংলাপের ভাষা তখনো তৈরি হয়নি। কুলীনকুলসর্বস্ব নাটকের সংলাপ কথ্যভাষা থেকেই নেওয়া হয়েছিলো, কিন্তু যে-তীক্ষ্ণতা কথ্য ভাষায় টেনশন সৃষ্টি করতে পারে, অথবা আবেগের তীব্রতার জন্য দৈনন্দিন ভাষার মধ্যে শব্দচয়নের যে-গুণ আনা দরকার তা এখানে নেই।

সেই অনুসন্ধান শুরু হ’লো ১৮৫৯ খ্রীষ্টাব্দে মাইকেল মধুসুদন দত্ত থেকে। ১৮৫৮ খ্রীষ্টাব্দে মধুসুদন কলকাতার উত্তরাঞ্চলে রত্নাবলী নাটকের অভিনয় দেখে আক্ষেপ ক’রে বলেন, ‘রাজারা এই তুচ্ছ নাটকের জন্য কী বিপুল অর্থব্যয় করেছেন’। তাঁর বন্ধুরা তখন তাঁকে একটা নাটক লেখার জন্য অনুরোধ করেন এবং তিনি কথা দেন যে তিনি লিখবেন। ১৮৫৯ খ্রীষ্টাব্দে তাঁর প্রথম নাটক শর্মিষ্ঠা প্রকাশিত হয়। পরের বছর বেরুলো তাঁর দুটি প্রহসন একেই কি বলে সভ্যতা এবং বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ। এই প্রহসনের একটির বিষয় তৎকালীন নব্যবঙ্গ এবং অন্যটি হ’লো রক্ষণশীল সমাজ প্রসঙ্গে। দুটো নাটকই ঝরঝরে কথ্যভঙ্গিতে লেখা এবং নাটক দুটি ভাষার গুণে এখনও উপভোগ করা যায়। শর্মিষ্ঠা যাত্রার ধরনে অভিনীত হয় এবং নাটকটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিলো। কিন্তু মাইকেল অনুভব করলেন পদ্যাংশ অভিনয়ের জন্য অমিত্রার ছন্দের দরকার। তাঁর পরবর্তী নাটক পদ্মাবতী-তে এই ছন্দ প্রবর্তিত হ’লো। আমার মনে হয় পুরোনো ছন্দ এবং নতুন ছন্দ থেকে বাংলায় আবৃত্তি ক’রে এখানে কিছু দৃষ্টান্ত দিলে ভালো হয়। কাশীরাম দাসের মহাভারতের ছন্দ এইরকমভাবে বলা হোত :

মহাভারতের কথা       অমৃত সমান
কাশীরাম দাস ভনে     শুনে পুণ্যবা- ন।।

এই পাঠের ধরন অনুসৃত হ’তো। পুরোনো যাত্রার রীতির মধ্যে। সুর ক’রে অনেকটা গানের মতো ক’রে বলা হ’তো। কিন্তু সাধারণ চরিত্রগুলো অভিনয়ে বানিয়ে বলবার সময়ে একবারে গদ্য ব্যবহার করতো।

কিন্তু আঠারো-উনিশ শতক থেকে এই ধারা বিবর্তিত হ’য়ে এমন একটা রীতির উদ্ভব হ’লো যেটা গদ্যের অনেক কাছাকাছি। মধ্য-উনিশ শতক থেকে একটা দৃষ্টান্ত নেওয়া যাক যেটা বলার ধরন একটু পৃথক :

কে হরিল সরোরুহ হইয়া নির্দয়।
শোভাহীন সর্বোবর অন্ধকারময়।
হেরি সব শবময় শ্মশান সংসার।
পিতা মাতা ভ্রাতা দারা মরেছে আমার।

কিন্তু মাইকেল পদ্মাবতী নাটকে যে- প্রবহমাণতা আনলেন, সেটা এই রকম :

একি? ওই না সে পদ্মাবতী
আয় লো কামিনী
এইরূপ কুরঙ্গিণী নিঃশঙ্কে অভাগা
পড়ে কিরাতের পথে; এইরূপে সদা
বিহঙ্গী উড়িয়া বসে নিষাদের ফাঁদে।

এই রীতির সূত্রপাত পদ্মাবর্তী’ তে, পরে মেঘনাদবধ কাব্য এবং কৃষ্ণকুমারী নাটকে বিকাশ লাভ করে। বিখ্যাত মেঘনাদবধ কাব্য পাঠককে চমকে দিয়েছিলো, তার কারণ এর ধরনটাই সম্পূর্ণ অন্যরকম। যেমন :

সম্মুখ সমরে পড়ি বীরচূড়ামণি
বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে
অকালে, কহ, হে দেবি অমৃতভাষিণি
কোন বীরবরে বরি সেনাপতিপদে
পাঠাইলা রণে পুনঃ রক্ষকূলনিধি
রাঘবারি?

বাঙলা কাব্যের এই শক্তি, এই ঐশ্বর্য আগে কখনো লক্ষ করা যায়নি। আর অহীন্দ্রবাবু বলেন, মধুসূদনের ওপর থিয়েটারের দাবি তুলনায় বেশি, কেননা নাটককার রূপেই তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ এবং নাটকেই তিনি প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন।

একই বছরে অর্থাৎ ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দে দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ প্রকাশিত হয়। নীলকর সাহেব এবং রায়তদের নিয়ে লেখা এই নাটকটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের জন্য পাদ্রি লঙের জরিমানা হয়েছিলো। এসব কাহিনী তো বহুপরিচিত, বর্তমানে তার বিস্তৃত আলোচনায় যাবার দরকার নেই। কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ করা প্রয়োজন। কথাভাষা এখানে নাটকীয় সংলাপের উপযোগী তীক্ষ্ণতা এবং সুক্ষ্মতা পেয়েছে। এবং এখন থেকে আসরে-ঘেরা যাত্রার চেয়ে মঞ্চে অধিষ্ঠিত থিয়েটার অনেক বেশি প্রধান্য পেলো। বাস্তবের যে-প্রতিফলন প্রথম লক্ষ করা গেলো মধুসূদন-দীনবন্ধু প্রমুখ শক্তিশালী নাটককারদের রচনায় সেই সমসাময়িকতা যাত্রার পালায় ছিল না। মধুসূদন সম্পর্কে বিশেষভাবে বলা যায় যে তিনি তাঁর প্রহসনে শুধু সহজ সাবলীল কথাভাষা এনে তাঁকে গতি দেননি, অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা রচনাতেও কথারীতির প্রয়োগ ক’রে এর সম্ভাবনাকে আরো বিস্তৃত করেছেন।

সে-সময়ের রঙ্গমঞ্চের কথা মনে রাখতে হবে। তখন শুধু ধনীদের পৃষ্ঠপোষকতায় কয়েকটি ব্যক্তিগত নাট্যশালা ছিলো। মধুসূদন যখন প্রহসনগুলি লিখেছিলেন, তাঁর আশা ছিলো যে পাইকপাড়ার রাজারা এগুলোও মঞ্চস্থ করবেন। যেমন এর আগে তাঁরা শর্মিষ্ঠা নাটক অভিনয় করিয়েছিলেন। কিন্তু রটনা এই যে, নকল সাহেবদের চাপে একেই কি বলে সভ্যতা’র অভিনয় রাজারা বন্ধ রাখেন, কেননা প্রহসনটির আক্রমণের লক্ষ ছিলো নকল আধুনিকিপনা। আরেকটি প্রহসন, যার বিষয় হ’লো রক্ষণশীল সমাজ, সেটাও কিনা বন্ধ হ’লো রক্ষণশীলদের চাপে।

আসল কথা, থিয়েটার যখনই গুরুত্বপূর্ণ হ’য়ে ওঠে, যখনই সমাজে তার ভূমিকা বিষয়ে সচেতন হবার চেষ্টা করে, তখনই প্রতিরোধ আসে বিভিন্ন কায়েমি স্বার্থের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে, তা তাঁর প্রাচীনপন্থী না আধুনিক সেজেছেন তাতে কিছু এসে যায় না। অবশ্য ভারতের তৎকালীন বৃটিশ সরকারও ১৮৭৬ খ্রীষ্টাব্দের পর থেকে থিয়েটারের কন্ঠরোধে সক্রিয় হলেন। তবে একথা ভুললে চলবে না যে, প্রথম বিরোধিতা এসেছিলো আমাদের সমাজের মধ্য থেকেই। এই কায়েমি স্বার্থের প্রতিনিধিরা আজও স্বার্থে ঘা লাগলে রঙ্গমঞ্চকে নিশ্চিহ্ন করতে চেষ্টার ত্রুটি করে না। যেমন রবীন্দ্রনাথের কোনো-একটি নাটকের বিশ্বস্ত কিন্তু প্রথাবহির্ভূত অভিনয়-প্রযোজনা আমাদের সমাজের কোনো-একটি সম্প্রদায়ের এমন ক্রোধের কারণ হয়েছিলো যে তাঁরা সাধ্যমতো নানা চাপ সৃষ্টি ক’রে অভিনয়টি বন্ধ করবার চেষ্টা করেছিলেন। অনুরূপভাবে থিয়েটার যদি কোনো ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক দলের কাছে আত্মবিক্রয় না করে, যদি থিয়েটার শুধুই বৈষয়িক সাফল্যের জন্য প্রমোদের উপকরণ না হ’তে চায়, তবে তাকে কঠোর ধিক্কার এবং বিদ্বেষের সম্মুখীন হ’তে হবে, ঝুঁকি নিতে হবে নিশ্চিত হবার। এইভাবেই শতাধিক বছর ধ’রে আমাদের বাঙলা দেশে রঙ্গমঞ্চের ইতিহাস আবর্তিত হচ্ছে।

যাই হোক, ইতিহাসের আলোচনায় ফিরে যাওয়া যাক। একদল তরুণ অভিনেতা, যাঁদের পৃষ্ঠপোষকরূপে কোনো রাজা-মহারাজা ছিলেন না, নাটকের টানে মিলিত হলেন। এই তরুণ সম্প্রদায় দীনবন্ধু মিত্রের একটি নাটক বেছে নিলেন, কেননা এতে জমকালো মঞ্চসজ্জা বা পোশাকের জন্য বহু-অর্থব্যয়ের প্রয়োজন নেই। নাটকটির নাম সধবার একাদশী- রঙ্গব্যঙ্গের সঙ্গে ট্র্যাজিক গভীরতা এই নাটকে অপূর্বভাবে মিশেছে। ১৮৬৮ খ্রীষ্টাব্দে [দুর্গা] পূজার সময়ে এটি অভিনীত হয়। এই নাটকে অভিনয় ক’রে গিরিশচন্দ্র ঘোষ নামে চব্বিশ বছরের একজন যুবক রাতারাতি বিখ্যাত হ’য়ে ওঠেন। সমসাময়িক তথ্য থেকে প্রমাণ হয় যে অভিনয়ের এরকম মান আগে কখনো দেখা যায়নি। প্রধান চরিত্র নিমচাঁদের ভূমিকায় গিরিশচন্দ্রের অভিনয় এমন একটি ট্র্যাজিক গভীরতা স্পর্শ করেছিল যে, তাঁর দর্শকদের মনে হয়েছিল যে সে-যেন জীবনের এক পরম অভিজ্ঞতা।

কী-ক’রে এটা হ’লো? বড়োলোকেরা অভিনয়ের জন্য জলের মতো টাকা খরচ করতেন, আর এঁরা সামান্য সংগতি নিয়ে এ নাটক প্রযোজনা করেছিলেন। ইংরেজ শিক্ষকরা হিন্দু কলেজ এবং অন্যান্য অনেক জায়গায় শিক্ষিত বাঙালী তরুণদের কতো অভিনয় শেখাতেন,- শেখানো হ’তো বাচনপদ্ধতি, আঙ্গিক অভিনয়, এবং মূক অভিনয়ের কলাকৌশল। এঁদের মধ্যে অনেকেই কয়েকটি ইংরেজি-বাঙলা নাটকে অংশ্রগ্রহণও করেছিলেন। কিন্তু সধবার একাদশী নাটকের অভিনেতারা পূর্বোক্ত সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন না। এঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা যিনি সেই গিরিশচন্দ্র ঘোষের কোনো কলেজি শিক্ষা পর্যন্ত ছিলো না। তিনি নিজের চেষ্টায় শিক্ষালাভ ক’রে দেশী-বিদেশী সাহিত্য ও রঙ্গমঞ্চ বিষয়ে প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেন বটে, কিন্তু শুধু পাশ্চাত্য রীতির অনুকরণ ক’রেই তিনি বড়ো অভিনেতা হননি। ছেলেবেলা থেকেই তিনি যাত্রা কীর্তন এবং কথকতার অনুরাগী ছিলেন। কথকতায় কথক পুরাণ বা মহাকাব্য থেকে গৃহীত কাহিনী বর্ণনা করেন, তিনি নিজেই বিভিন্ন চরিত্রের ভূমিকা অভিনয় ক’রে দেখান, গান গেয়ে শোনান, এবং আবৃত্তি করেন। গিরিশচন্দ্রের অসামান্য অভিনয় প্রতিভার বিকাশ এই মূল থেকে শক্তি আহরণ ক’রে। তার মানে ঊনবিংশ শতাব্দীর ঐ আধুনিক বাঙলা থিয়েটার দেশের মূল অভিনয়ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একদিক থেকে বোধহয় তার সম্প্রসারণ। একথা আরো স্পষ্ট হবে পরবর্তীকালে গিরিশচন্দ্রের কার্যাবলি লক্ষ করলে।

এখানে বলা দরকার যে বাঙলা থিয়েটার গিরিশচন্দ্র ছাড়াও তাঁর কয়েকজন সহযোগীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, কিন্তু এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনার প্রলোভন আমাকে সংবরণ করতে হচ্ছে। কেননা বাঙলা থিয়েটারের বিবর্তনের একটি মোটামুটি রেখাচিত্রই শুধু আমি এখানে দিতে পারি।

সধবার একাদশী’র এবং আরো কয়েকটি নাটকের সাফল্যে উৎসাহিত হ’য়ে এই তরুণ শৌখিন অভিনেতারা একটি সাধারণ রঙ্গমঞ্চ প্রতিষ্ঠার কথা ভাবলেন, যেখানে লোকেরা ইচ্ছেমতো টিকিট কেটে অভিনয় দেখতে পারবে। বড়লোকদের রঙ্গশালায় আমন্ত্রণপত্র ছাড়া তো সাধারণের প্রবেশাধিকার ছিলো না। তাছাড়া, সাধারণ রঙ্গমঞ্চের পরিকল্পনা তঁদের মাথায় এসেছিলো শুধু টাকা রোজগারের জন্য নয়, প্রতিবার অভিনয়ের জন্য চাঁদা তোলা এক বিরাট সমস্যা হ’য়ে দাঁড়িয়েছিলো। কেননা চাঁদা যাঁরা দিতেন তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত সামান্য কয়েকজন ব্যক্তি এবং তাঁদের সংখ্যাও সীমাবদ্ধ। প্রতিটি অভিনয়ের জন্য বারবার চাঁদা দেবার সংগতিও সব সময়ে হ’তো না। সুতরাং সানন্দে এই প্রস্তাবটি গৃহীত হোল এবং যুবকরা এর নাম দিলেন ন্যাশনাল থিয়েটার। এইখানেই গিরিশচন্দ্রের সঙ্গে তাঁদের মতান্তর হ’লো। তিনি মনে করলেন সাধারণ রঙ্গশালার নামকরণ ন্যাশনাল হওয়া অনুচিত, কেননা নামের উপযুক্ত দায়িত্ব পালন করবার সামর্থ্য তাঁদের নেই। কিন্তু অন্যরা সম্মত হলেন না এবং প্রথম সাধারণ রঙ্গশালার উদ্বোধন হ’লো ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দে বিখ্যাত নীলদর্পণ নাটক নিয়ে।

এখানে একটা জিনিস লক্ষ করার আছে। বাঙলাদেশে নবনাট্যরীতিতে প্রথম মৌলিক নাটক হ’লো কুলীনকুলসর্বস্ব তৎকালীন সামাজিক কুপ্রথাকে আক্রমণই তার লক্ষ্য। আর প্রথম যে-নাটক নিয়ে সাধারণ রঙ্গশালার উদ্বোধন হ’লো তার নাম নীলদর্পণ। এর বিষয় হোল কী-ক’রে নীলকর সাহেবদের অত্যাচারে দেশ ধ্বংস হচ্ছে। অর্থাৎ বলা যায়, থিয়েটারের সূত্রপাতই হ’লো এই সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা নিয়ে। এবং আমার মনে হয় চৈতন্যযুগের অভিনয়ধারা বিষয়ে যদি যথেষ্ট জানা যায়, তাহ’লে দেখতে পাবো সেযুগেও নাট্যাভিনয়ের এই সামাজিক দায়িত্ব বোধ ছিলো, উদার বৈষ্ণবধর্ম প্রচারের একটি নিশ্চয় একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।

১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দের শেষে ভারতবর্ষে এলেন তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রিন্স অব ওয়েলস, পরে যিনি সপ্তম এডওয়ার্ড হয়েছিলেন। জগদানন্দ নামে জনৈক ব্যবহারজীবী প্রিন্সকে স্বগৃহে [অন্দরমহলে] আমন্ত্রণ জানান। এই উপলক্ষে গজদানন্দ ব্যঙ্গনামে একটি নকশা রচিত হয়। গিরিশচন্দ্র এই নকশার জন্য দুটি গান রচনা করেন। মহারাণীর একজন অতি-অনুগত প্রজাকে বিদ্রুপ করার অভিযোগে পুলিস এই অভিনয় বন্ধ ক’রে দেয়। একই বিষয়ে আরো দুটি নাটকের ওপর অনুরূপ নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। সে-সময়ে পুলিস কমিশনার ছিলেন মিঃ হগ এবং পুলিস সুপারিনটেন্ডেন্টের নাম ছিল মিঃ ল্যাম। তখন আক্রমণের লক্ষ্য হলেন এঁরা। শূওর এবং ভেড়ার পুলিস নাম দিয়ে একটি নকশা লেখা হ’লো এবং অভিনীতও হ’লো। সাহেবদের পক্ষে এতোটা বরদাস্ত করা স্বভাবতই অসম্ভব ছিলো। ভারত সরকারের গেজেটের বিশেষ সংখ্যায় ঘোষণা করা হ’লো যে, জনসাধারণের স্বার্থে সরকার যে-কোনো নাট্যাভিনয়কে ব্যক্তিগত কুৎসা বা আক্রমণপূর্ণ, রাষ্ট্রবিরোধী, অশ্লীল, অথবা অন্য কোনো কারণে আপত্তিকর মনে করলেই তার অভিনয় বন্ধ ক’রে দিতে পারেন।

এর কিছুদনি পরেই ১৮৭৬ খ্রীষ্টাব্দে ‘নাট্য অভিনয় নিয়ন্ত্রণ বিল’ পাশ হ’লো। আমার মনে হয় এই আইন এখনও ভারতবর্ষের বহু জায়গায় চালু আছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে নেই, বছর তিনেক আগে এই আইন রদ হয়।

যদিও গিরিশচন্দ্র ন্যাশনাল থিয়েটারের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেছিলেন, কিন্তু তাঁর সহযোগীদের প্রয়োজন ছিলো তাঁর মতোই একজন বিচক্ষণ নির্দেশকের। তাঁরা তাই তাঁর সহযোগিতা প্রার্থনা করলেন। গিরিশচন্দ্র সম্মত হলেন। এবং তারপর আমরণ রঙ্গমঞ্চের সেবা ক’রে গেছেন। তবে একই দলে নয়, কেননা একটা না একটা কারণে দলগুলি কিছুদিন পরেই ভেঙে যেতো। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেও গিরিশচন্দ্র বাঙলা রঙ্গমঞ্চের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছিলেন, যে-কারণে তাঁকে বাঙলা মঞ্চের জনক বলা হয়। জনৈক নৈরাশ্যবাদী একবার বলেছিলেন যে বাঙলা রঙ্গমঞ্চের জনক আছে ঠিকই, কিন্তু কোনো কাকা বা জ্যাঠা নেই।

যাই হোক, ১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ গিরিশচন্দ্র নিজস্ব একটি মঞ্চ পেলেন। কিন্তু নাটক কোথায়? মাইকেল-দীনবন্ধুর নাটক হ’য়ে গেছে। রঙ্গমঞ্চের জন্য চাই নতুন নাটক অথচ নাটককার নেই। তখন গিরিশচন্দ্র মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্যে’র নাট্যরূপ দিলেন এবং এটি সাফল্যে সঙ্গে অভিনীতও হ’লো। এই সময়েই বিনোদিনী দাসী নামে এক অতি-অল্প-সয়সী অভিনেত্রী দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরবর্তী যুগে যিনি বাঙলা রঙ্গমঞ্চের একজন শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী রূপে স্বীকৃতি পেয়েছেন।

এখানে একটু আগের ইতিহাসে ফিরে যেতে চাই। কী-ক’রে অভিনেত্রীরা আবার নাট্যক্ষেত্রে ফিরে এলেন। ভারতে প্রাচীন যুগে, গ্রীক প্রথার বিপরীতে, নাটকে মেয়েরাও অংশ নিতেন। মধ্যযুগে জয়দেবের সময়েও অভিনেত্রীর প্রচলন ছিলো। কিন্তু নবাবি আমলে নাট্য-অভিনয় পূর্বতন রাজাদের মতো নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। ফলে জমিদার বা সাধারণের বায়নায় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরেঘুরে অভিনয় করতে হ’তো। কিন্তু দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ দলগুলির সঙ্গে অল্পবয়েসি সুন্দর অভিনেত্রী নিয়ে যাওয়া নিরাপদ ছিলো না। ফলে ক্রমশ ছেলেরাই মেয়েদের অংশে অভিনয় করতে শুরু করলো। তবে আমরা দেখেছি পুরোপুরি মেয়েদের নিয়ে অভিনয়ের দলও কয়েকটা ছিলো।

আঠার শতকে লেবেডেফ বহুকাল পরে মেয়েদের দিয়ে অভিনয় করালেন। উনিশ শতকের গোড়ায়, ১৮৩৫ খ্রীষ্টাব্দে, বিদ্যাসুন্দর-এর অভিনয়ে মেয়েরা স্ত্রী-ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিগত রঙ্গশালায় সাধারণত অভিনেত্রীর প্রচলন ছিলো না। এবং যেসব তরুণেরা ন্যাশনাল থিয়েটার শুরু করেন, তাঁরাও মেয়েদের ভূমিকা ছেলেদের দিয়েই করাতেন। প্রথম সাধারণ রঙ্গশালা বন্ধ হ’য়ে যাবার পর ১৮৭৩ খ্রীষ্টাব্দে বেঙ্গল থিয়েটারের প্রতিষ্ঠা হয়। তারপর থেকে অভিনেত্রীদের নেওয়াটা রেওয়াজ হ’য়ে গেছে। স্বভাবতই তখন অভিনেত্রীদের সংগ্রহ করা হ’তো বিশেষ একটি পল্লি থেকে।

কিন্তু বেঙ্গল থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হবার চার বছরের মধ্যেই পূর্বোক্ত পল্লি থেকে সংগৃহীত অভিনেত্রী বিনোদিনী দাসী বাঙলা রঙ্গমঞ্চের একজন শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীরূপে গণ্য হলেন। এই ঘটনা বিশেষ অনুধাবনযোগ্য।

গিরিশচন্দ্র তাঁকে ভালো-ভালো প’ড়ে শোনাতেন, তরজমা ক’রে বুঝিয়ে দিতেন, দেশ-বিদেশের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কথা বলতেন, এবং অভিনয়শিল্প বিষয়ে শিক্ষা দিতেন। শুধু একা তাঁকে নয়, আরো বহু নটনটীকে গিরিশচন্দ্র শিক্ষা দিয়েছিলেন, যার জন্য জীবনকালেই তিনি ‘বাঙলা রঙ্গমঞ্চের জনক’ আখ্যা পেয়েছিলেন।

শ্রীমতী বিনোদিনী পরে একটি বিশেষ মূল্যবান আত্মজীবনী লিখেছিলেন। আমার মতে বইটি বাঙলা রঙ্গমঞ্চের কর্মীদের অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত।

মেঘনাদবধ কাব্য’-এর নাট্যরূপের আলোচনায় ফিরে আসা যাক। মধুসুদন লিখেছিলেন :

সম্মুখ সমর পড়ি বীরচূড়ামণি
বীরবাহু চলি যবে গেলা যমপুরে অকালে … ইত্যাদি।

গিরিশবাবু দেখলেন প্রতিটি পঙক্তিতে এই চোদ্দো মাত্রার কঠিন অনুশাসনে সংলাপের ধ্বনি অস্বাভাবিক হ’য়ে পড়ে। [আমাদের] স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে মানে অনুযায়ী কেটে কেটে পড়া এবং অভিনেতার আবেগের ঘাত-প্রতিঘাতের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শ্বাসযতি দেওয়া। সেজন্য গিরিশবাবু অমিত্রার ছন্দকে অভিনয়ের উপযোগী করার জন্য এর বদল ঘটালেন। যদিও বলা হয় যে আরো কেউ কেউ এ চেষ্টা করেছেন, তবু গিরিশচন্দ্রের সৃষ্টিসাফল্যের জন্যেই এর নাম হয়ে গেছে গৈরিশ ছন্দ।

এই গৈরিশ ছন্দকে অভিনেতা এবং দর্শকসমাজ সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করলেন এবং এর সম্ভাবনা সত্যি-সত্যি সীমাহীনভাবে বিস্তৃত হ’লো।

মধুসূদন যখন প্রথম অমিত্রার ছন্দের প্রবর্তন করেন তখন লোকেরা ভেবেছিলো এটা বিদেশ থেকে আমদানি করা জিনিস, আমাদের কাব্যধ্বনির সঙ্গে মেলে না। কিন্তু গিরিশচন্দ্র যখন একে আমাদের বাকষ্পন্দের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ভাঙলেন, তখন আমাদের কানে দেশীয় আদিম পুরোনো অভিনয়রীতির মতো ঐতিহ্যসম্ভূত মনে হ’লো, যদিও তার চেয়ে অনেক ভালো। তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ সাধারণ অশিক্ষিত লোকেরাও এই ছন্দে লেখা সংলাপ অনায়াসে বুঝতে পারে। আমি আমার ছেলেবেলাতেই দেখেছি সাধারণ চাষীশ্রেণীর মানুষ যেমন ক’রে কৃত্তিবাসের রামায়ণ বা কাশীদাসী মহাভারত উপভোগ করে, তেমনভাবে যাত্রায় এই জাতীয় কাব্যের রসাস্বাদন করছে। আমি যখন এই জাতীয় কাব্যের সহজবোধ্যতার ওপর ঝোঁক দিচ্ছি তখন তার মানে এই নয় যে, এগুলি শুধু সমাজের নীচের মহলেই জনপ্রিয় ছিলো, বিদগ্ধ মহলে এর কোনো আদর হয়নি। আমার বক্তব্য হ’লো বাঙলা থিয়েটার অন্তত একটি অঙ্গে নিজস্ব ঐতিহ্যকে আশ্রয় ক’রেই বিবর্তিত হয়েছে, (যদিও কখনো কখনো বিষম পাশ্চ্যত্যরীতিকেও গ্রহণ করেছে) এবং তাতেই দেশের বহুসংখ্যক লোকের মন ছুঁতে পেরেছে।

কিন্তু তিনি (গিরিশচন্দ্র) নাটককার হ’তে চাননি। তিনি আসলে ছিলেন অভিনেতা এবং সমসাময়িকদের সাক্ষ্য বিশ্বাস করলে বলতে হয় মহৎ অভিনেতা। পরবর্তীকালের আর একজন মহৎ অভিনেতা শ্রীশিশিরকুমার ভাদুড়ী গিরিশচন্দ্রের শেষ অবস্থায় একবার অভিনয় দেখেছিলেন। তখন শিশিরবাবুর বয়েস কুড়ি কি বাইশ।

আজ থেকে তিরিশ বছর আগে যখন শিশিরবাবুর বয়েস প্রায় বাহান্ন, তাঁর নিজের মুখে এই অভিনয়ের একটি দৃশ্যের কথা শুনি। আমি অনুভব করতে পারছিলুম শিশিরবাবু কতো মুগ্ধ হয়েছিলেন সেই অভিনয় দেখে। আমার পক্ষেও সে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। এক মহৎ অভিনেতার মুখে আর এক মহৎ অভিনেতার অভিনয়ের বর্ণনা শোনা।

যাই হোক, গিরিশচন্দ্রকে বাধ্য হ’য়ে নাটক লিখতে হয় এবং তিনি অনেকগুলি নাটক লিখেও ছিলেন। অধিকাংশ নাটকই রঙ্গমঞ্চের খিদে মেটানোর জন্য লেখা, কিন্তু অবাক হ’তে হয় এই ভেবে যে অভিনয়ের গুণে অনেকগুলি নাটকই বিরাট গভীরতা লাভ করেছিল। প্রফুল্ল, বলিদান, চৈতন্যলীলা, শঙ্করাচার্য’ অভিনয়ের সময়ে যে-গভীরতা লাভ করতো ব’লে আমরা পড়ি সে-গভীরতা সহজে আসে না, এবং প্রত্যেক যুগেই আসে না।

কিন্তু অধিকাংশ নাটকগুলি এখন পড়লে মনে হয় না যে মাইকেল অথবা দীনবন্ধুর শ্রেষ্ঠ নাটকগুলির সঙ্গে তুলনীয়। পণপ্রথা বিষয়ে লেখা বলিদান নিয়ে কী-ক’রে ট্র্যাজিক মহিমায় পৌঁছানো যায় আমি ভেবে পাই না। কিন্তু প্রাপ্ত তথ্য থেকে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে এই নাটকে তাঁর অভিনয় অসাধারণ হোত। এ থেকে বোঝা যায় নাটকের লিখিত ভাষায় যা প্রকাশ হয় না, অভিনয়ের জাদুতে অভিনেতারা তা তৈরি করতে পারেন। আর নাটককার স্বয়ং যেখানে অসাধারণ অভিনেতা সেখানে তিনি খসড়াটা মাত্র নাটকে প্রকাশ করেন, আসল সৃষ্টি উদঘাটিত হয় তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে। লেখকদের মতো ছাপার হরফ গিরিশচন্দ্রের ভাবনা প্রকাশের বাহন ছিলো না। আর তাই তাঁর শিষ্যদের এমন এক অ-পূর্ব রীতিতে অভিনয় শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, তাঁরাও মঞ্চে বিস্ময় সৃষ্টি করতে পারতেন।

এবং সাধারণত যা হয়, গিরিশচন্দ্র যতোদিন ছিলেন, আশেপাশে তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিলেন না। তিনি থিয়েটারকে একটা মর্যাদা দিয়েছিলেন এবং কেবল প্রমোদ-বিতরণের কেন্দ্র হওয়ার অধঃপতন থেকে একে রক্ষা করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। কারণ, তখনকার দিনে হঠাৎ-নবাব এবং পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণকারী স্নবদের পাল্লায় প’ড়ে সেও এক Permissive সমাজ ছিল, অন্তত পুরুষদের বেলায় তো খুব Permissive বটেই।

গিরিশচন্দ্র মারা যান ১৯১২ খ্রীষ্টাব্দে। গিরিশচন্দ্র-র মৃত্যুর পরে রঙ্গমঞ্চের অবস্থা আলোচনা করবার আগে কয়েকটি বিষয়ে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। আমাদের আলোচ্য যে-থিয়েটার তার পরিবেশ সৃষ্টিতে অনেকগুলির মধ্যে এ-কয়েকটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

আমার মতে ১৮৭৬ খ্রীষ্টাব্দের নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রণ বিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর ফলে সমাজের বাস্তবচিত্রণ এবং তার আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলনরূপে নাটকের দায়িত্বশীল ভূমিকার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হ’লো। রামনারায়ণ তর্করত্নের কুলীনকুলসর্বস্ব, মাইকেল মধুসূদন দত্তের একেই কি বলে সভ্যতা এবং বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ, দীনবন্ধুর মিত্রের সধবার একাদশী যে-পথের সূচনা করেছিলো, আমরা আশা করতে পারতুম জাতীয়তার উন্মেষের সঙ্গে-সঙ্গে এ ধরনের আরো অনেক নতুন নাটকের। কিন্তু এই আইন রঙ্গমঞ্চের কন্ঠরোধ করলো। সুতরাং গিরিশচন্দ্র মধুসূদনের কাব্যের নাট্যরূপ দিলেন, নবীন সেনের পলাশীর যুদ্ধ-ও নাট্যীকৃত হ’লো। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসও নাটকে রূপান্তরিত ক’রে অভিনীত হয়েছিলো। কিন্তু তারপর? গিরিশচন্দ্র পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে নাটক লিখতে শুরু করলেন এবং সেগুলি দারুণ জনপ্রিয় হয়। তিনি শেক্সপীয়ারের নাটকেরও তরজমা করেছিলেন, কিন্তু টিকিট বিক্রির দিক দিয়ে সেগুলি একেবারে মার খেয়েছিলো।

তাই গিরিশচন্দ্র বিক্রির দিকেও লক্ষ্য রেখে নাটক রচনা করতে লাগলেন। এবং সেটুকু তিনি না-করলে সাধারণ রঙ্গমঞ্চগুলি দেউলে হ’য়ে যেতো এবং নিয়মিত অভিনয়ের প্রথাও বন্ধ হয়ে যেত।

দ্বিতীয় যে-জিনিসটা লক্ষ করার মতো তা হ’লো শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে এক অংশের থিয়েটার সম্পর্কে গোঁড়ামি। অনেকে একে এড়িয়ে চলতেন। তাঁদের শুচিবাইয়ের কারণ অভিনেত্রীদের সংগ্রহ করা হ’তো গণিকাপল্লি থেকে। এইসব ভদ্রলোকদের ধারণা ছিলো থিয়েটারের নামে একদল মাতাল এবং বেশ্যারা বেলেল্লাপনা করে। এই ভিক্টোরীয় শুদ্ধতাবোধ হয়তো মহারাণী ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকালে ইংরেজি শেখার অন্যতম ফল। তার মানে এই নয় যে কোনো অভিনেতার মদ্যপান দোষ ছিলো না, বা কারো কোনো চরিত্রস্খলন হ’তো না, কিংবা কোনো সময়ে কেউ জঘন্য আচরণ করতেন না। (কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি সে-যুগের তুলনায় এখনকার থিয়েটার বা অন্য সহযোগী শিল্পে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে অনেক বেশি শিথিল আচরণ চোখে পড়ে, সেযুগে যেটা সম্ভব ছিলো না।) তবু এই কারণে থিয়েটারকে অচ্ছুৎ করা উচিত হয়নি।

সুতরাং একদিকে যখন সরকার সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন যাতে কোনো ‘বিপজ্জনক চিন্তাধারা’ রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করতে না পারে, আর অন্যদিকে শিক্ষিতদের মধ্যে এক অংশ (ভাবতে মজা লাগে যে আমরা শিক্ষিত বলতে সবসময়ে ইংরেজি জানা লোক বুঝি) যখন থিয়েটারকে তাচ্ছিল্য করেছেন, তখন রঙ্গমঞ্চ কার কাছে পৃষ্ঠপোষকতা পাবে? দর্শকদের অধিকাংশই ছিলো অতি সাধারণ, কোনো উচ্চশিক্ষার অহঙ্কার তাদের ছিলো না। থিয়েটারকে মূলত নির্ভর করতে হোত এই ধরনের দর্শকদের ওপর।

তৃতীয় যে-জিনিসটা লক্ষ্যণীয় তা হ’লো শ্রীরামকৃষ্ণের আবির্ভাব ও তাঁর বাণী। সমাজ যখন অসংখ্য মত ও পথে বিচ্ছিন্ন, যখন একে সংহত করার মতো কোনো শক্তি নেই, তখন রামকৃষ্ণদেব এলেন তাঁর গভীর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। তাঁর এই [উদার] চিন্তাধারা একদিকে কেশব সেন, স্বামী বিবেকানন্দের মতো বুদ্ধিজীবীদের আকর্ষণ করলো, অন্যদিকে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সাধারণ মানুষকেও উদ্বুদ্ধ করলো। থিয়েটারও সঙ্গে সঙ্গে একটা কেন্দ্র পেলো,- তৎকালীন সমাজের ঘুর্ণিঝড়ে সেও ছিলো অস্থির।

এই কেন্দ্রের, সমাজের এই অন্তঃকরণের বোধ, তা যেকোনো মহৎ শিল্পসৃষ্টির পক্ষে অপরিহার্য। শিল্পী যখন অনুভব করেন তিনি তাঁর শিল্পের মধ্যে দিয়ে সমাজের সকল ধরনের লোকেদের কাছে পৌঁছাতে পারেন, তখনই তার শিল্পমাধ্যম এমন একটি বিশিষ্ট গুণে অন্বিত হয় যে এই শিল্পীর প্রকাশ যেমন সহজ হয়, যেমন প্রত্যক্ষ হয়, তেমনই জাতির অবচেতন মনের অজস্র তন্ত্রীতে গিয়ে ঘা মেরে তাদের স্পন্দিত ক’রে তোলে।

অভিনয়শিল্পীদের পক্ষে এটা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা একটা বই বছরে পাঁচ হাজার কপি বিক্রি হ’লে আমরা বলি খুব সার্থক। কিন্তু থিয়েটারের ক্ষেত্রে যদি বছরে মাত্র পাঁচ-ছয় বার ভালো হাউস পায় তাহ’লে আমরা বলবো মার খেলো। সুতরাং সকলেই ভাবেন, থিয়েটারকে জনপ্রিয় হ’তে গেলে বুদ্ধির দিক দিয়ে খেলো হ’তে হবে, আর নয়তো মুষ্টিমেয় বুদ্ধিজীবীদের মন যোগাতে গিয়ে প্রচন্ডভাবে আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করতে হবে। এই চক্র্যব্যুহ থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায়, যদি সমাজ উৎকেন্দ্রিক না হয়, যদি তার মূলকেন্দ্র হয় দৃঢ়। এই কেন্দ্র বলতে আমি বোঝাতে চাইছি টোটালিটেরিয়ান রাষ্ট্রের মতো ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো ব্যাপার নয়। সমাজের অধিকাংশ ব্যক্তিসমষ্টির অনুভূতির সাযুজ্য থেকে যায় জন্ম। যার ফলে শিল্পী [দর্শক-পাঠকের সঙ্গে] সামগ্রিকভাবে মানসিক সংযোগ অক্ষুণ্ন রেখেও অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও অত্যন্ত গভীর হ’তে পারেন। যেমন পেরেছিলেন সফোক্লেস কিংবা শেক্সপীয়ার।

বাঙলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে আমাদের আলোচ্য পর্বে এই সাযুজ্য এনেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস। ধর্মীয় বিষয় নিয়ে লেখা নাটক শুধু জনপ্রিয় হ’লো তাই নয়, দর্শকদের মনের মধ্যে প্রচন্ড আলোড়ন তুললো। মঞ্চশিল্পীরাও এই প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন ব’লে তাঁদের অভিনয়ও উত্তুঙ্গ স্পর্শ পেয়েছিলো। কিন্তু সে-যুগটা ধর্মীয় আন্দোলনের সময় বোধহয় ছিল না। দেশে তখন আধ্যাত্মিক উন্নতির সঙ্গে-সঙ্গে প্রয়োজন ছিলো রাজনৈতিক স্বাধীনতার এবং আর্থিক উন্নয়নের। স্বামী বিবেকানন্দ এটা বিশেষভাবে অনুভব করেছিলেন। তাই তাঁর কর্মধারায় এসবের সমন্বয় দেখা দিলো। কিন্তু সেটা আরো পরে। আর গিরিশচন্দ্রের স্বাধীনতা সম্পর্কিত যেকোনো নাটকের কন্ঠরোধ করবার জন্যে ছিল ইংরেজের আইন।

আটের দশকে গিরিশচন্দ্র শ্রীরামকৃষ্ণের একজন পরম ভক্ত-শিষ্য ছিলেন। এবং সে-সময় থেকে শ্রীরামকৃষ্ণও রাঙলা রঙ্গমঞ্চের অভিভাবক সন্ত রূপে গণ্য হন।

এর ফলে বাঙলা থিয়েটার যেমন শক্তি পেয়েছিলো, তেমনি কতকগুলি দুর্বলতাও দেখা দেয়। শ্রীচৈতন্য বা কবীরের সময়ে ধর্মীয় নাট্য হয়তো বৈপ্লবিক হ’তে পারতো, কিন্তু উনিশ শতকের শেষার্ধে তার এই প্রভাব আংশিক হ’তে বাধ্য।

১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দে তৎকালীন বড়োলাট বঙ্গবিভাগ করলেন। এই বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য প্রচণ্ড আন্দোলন শুরু হয়। স্বদেশী আন্দোলন আরো দানা বাঁধলো কয়েকটি গুপ্ত সংগঠন গ’ড়ে ওঠার পর। সারা দেশ জুড়ে দেশপ্রেমের বন্যা এলো। থিয়েটার প্রকাশ্যভাবে কিছু ভূমিকা না-নিতে পারলেও গিরিশচন্দ্রের মীরকশিম, সিরাজদ্দৌল্লা জাতীয় নাটক মঞ্চস্থ করা হ’লো। এগুলি সেদিন অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছিলো। কিন্তু এই সমস্ত নাটকের অভিনয় তৎকালীন ইংরেজ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়।

গিরিশচন্দ্র ঘোষের মতো মহৎ নাট্য প্রতিভার এই ছিলো পটভূমি। এই পরিবেশের মধ্যেই তিনি বাঙলা থিয়েটারকে একটা দৃঢ় ভিত্তি দিয়ে গিয়েছেন।

গিরিশচন্দ্রের পর বাঙলা রঙ্গমঞ্চের উল্লেখযোগ্য নতুন পর্বের সুচনা হ’লো শিশিরকুমার ভাদুড়ীর আর্বিভাবে। তিনি কলেজ জীবনে বেশ নামকরা অভিনেতা ছিলেন এবং ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে তাঁর নাট্যপ্রযোজনা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো। তিনি কলেজের অধ্যাপনা ছেড়ে পুরোপুরি নাট্যে আত্মনিয়োগ করেন। এটা হ’লো তৃতীয় দশকের ঘটনা। ১৯২৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি যোগেশ চৌধুরীর সীতা নাটক নিয়ে নিজস্ব নাট্যসম্প্রদায় গ’ড়ে তুললেন। এইভাবে ‘নাট্যমন্দির’-এর সূচনা হ’লো।

ততোদিনে দেশের অনেক পরিবর্তন ঘ’টে গেছে। স্বাধীনতার আকাঙ্খা অনেক বেশি তীব্র হয়েছে, বহু তরুণ এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। আমরা যারা সে-সময়ে খুবই ছোটো ছিলুম, দেখতুম বড়োদের মধ্যে যাঁরাই সৎ বুদ্ধিমান এবং উদার ছিলেন, তাঁরা সবাই কোনো না কোনোভাবে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা চাইতেন অন্য ধরনের থিয়েটার। বিশেষত গিরিশচন্দ্রের মৃত্যুর পর থেকে বাঙলা রঙ্গমঞ্চে নাটক প্রযোজনা এবং অভিনয়ের মান খুব নেমে গিয়েছিলো। অভিনয়ের মান নেমে যাওয়াটা আরো দুঃখের কেননা পূর্ববর্তী বাঙলা রঙ্গমঞ্চের যেটুকু কৃতিত্ব তা প্রধানত এই ক্ষেত্রে। শিশিরবাবু নাট্যমন্দির খোলবার আগে স্টার থিয়েটারে একটি সম্প্রদায় মহাসমারোহে কর্ণার্জুন করছিলেন। এই নাটকের প্রযোজনা ও পোশাক-পরিচ্ছদ অনেক উন্নত,- নবাগতদের অভিনয়ের ধরনও তৎকালীন পুরানো অভিনেতাদের থেকে পৃথক। কিছু লোক মনে করেন যে এই রীতির পরিবর্তনে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে শিশিরকুমারের প্রযোজনার পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই শিশিরকুমার যখন নাট্যমন্দির গ’ড়ে তুললেন, সেটি শ্রেষ্ঠ থিয়েটার রূপে গৃহীত হ’লো। এবং তারপর থেকে শিশিরকুমারকে যুগান্তকারী শিল্পপ্রতিভা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

শিশিরকুমার হলেন প্রকৃত অর্থে বাঙলা রঙ্গমঞ্চের প্রথম নির্দেশক। নাট্য-অভিনয়কে একটি সামগ্রিক শিল্পকর্ম হিসেবে তিনিই প্রথম দেখেন। নাট্যমন্দিরে তাঁর প্রযোজনাতে তিনি প্রকাশ করেছেন তাঁর সূক্ষ্ম শিল্পবোধের পরিচয়। তাঁর মঞ্চসজ্জা, তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ, আগের কালের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

তাঁর প্রযোজিত যোগেশ চৌধুরীর সীতা এবং দিগি¦জয়ী নাটক, শরৎচন্দ্রের ষোড়শী এবং রমা, ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের নরনারায়ণ, আলমগীর এবং রঘুবীর আজ কিংবদন্তীর মতো। তাঁর প্রয়োজনায় নৃত্য এবং গীত ক্রমশ গৌণ ভূমিকায় চ’লে গেলো। এটা অবশ্য আকস্মিক পরিবর্তন নয়। গিরিশচন্দ্রের বহু নাটকে যদিও গান ছিলো, কিন্তু বহুপ্রধান চরিত্রগুলিরই কোনো গান নেই। গানগুলি ছিলো এই কারণে যে দর্শকেরা নাটকে কিছু ভালো গান শুনতে ভালোবাসতো এবং গিরিশচন্দ্রও খুব ভালো সংগীত রচনা করতে পারতেন।

শিশিরবাবুর সময়ে প্রধান নাটকগুলিতে গানের অংশ ক্রমশ কমতে থাকে। নাটকের প্রধান ঝোঁক সংগীতের চেয়ে সংঘাতে বেশি লক্ষ্য করা গেলো। পুরোনোর সঙ্গে নবীনের দ্বন্দ্ব। এর ফলে [নাট্যাভিনয়] গানের চেয়ে অভিনয়ের ওপর অধিকতর নির্ভরশীল হ’য়ে উঠলো। তবে, সেই সময়ে ‘নাট্যমন্দিরে’ নাচগানের জন্য যে ‘সখীর দল’ ছিল তার খুবই খ্যাতি ছিল শহরে।

স্বাভাবিকভাবেই এর একটি প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো গীতিনাট্যের পুনরুজ্জীবনে। আগেকার দিনের মতো এই গীতিনাট্যের লক্ষ্য ছিলো সাধারণের মনোরঞ্জন। কিন্তু বাঙলা রঙ্গমঞ্চের মূল ধারার ওপর এ-জাতীয় নাটকের বিশেষ প্রভাব নেই। সুতরাং এখানে এ বিষয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন।

শিশিরবাবু মহৎ অভিনেতা ছিলেন এবং অভিনয়ে একটি নতুন ধারা এনেছিলেন। কিন্তু আমি যখন প্রথম কলেজে ঢুকেছি, তখন আমাদের সংস্কৃতের অধ্যাপকের কাছ থেকে শিশিরবাবুর অভিনয় বিষয়ে খুব বিরূপ মন্তব্য শুনি। শিশিরবাবু সম্পর্কে আমার অধ্যাপক মহাশয়ের প্রধান আপত্তি ছিলো যে তাঁর অভিনয় বড়ো বেশি ‘ন্যাচারাল’। রামচন্দ্র তো আর সাধারণ মানুষ নন যে আর পাঁচজন লোকের মতো তাঁর কথাবার্তার ধরন বা কাজকর্ম সাধারণ হবে। অথচ শিশিরবাবু নাকি রামচন্দ্রকে সেভাবেই দেখিয়েছেন।

এই সমালোচনায় আমার অনেক জ্ঞান হয়েছে, আমি এ থেকে ক্রমশ একটা বিরাট সত্য দেখতে পেয়েছি। আমার সেই শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শিশিরবাবুর অভিনয় ‘ন্যাচারালিস্টিক’, কিন্তু আমি যখন সেই অভিনয় দেখলুম, আমার তখন তা মনে হয়নি। এ থেকে বোঝা যায় প্রত্যেক মহৎ শিল্পীও তাঁর সমসাময়িক কালের সঙ্গে অচ্ছেদ্যবন্ধনে বাঁধা। তিনি শুধু শব্দের ব্যঞ্জনাকে প্রকাশ করেন তাই নয়, সমসাময়িক যুগের ভাবনা-চিন্তাকেও মূর্ত ক’রে তোলেন তাঁর অঙ্গের চালনায় ও শব্দব্যবহারের ভঙ্গিতে। এর সাহায্যেই তিনি নাটকে বর্ণিত বিষয়কে অতিক্রম ক’রে যান, কেননা তিনি শিল্পী। না-হ’লে অভিনয় তো শিশুপাঠ্য বইয়ের অলংকরণ বা চিত্রণের মতো হ’য়ে পড়ে কিংবা নির্দেশকের হাতে পুতুলের মতো অভিনেতার দশা হয়।

অভিনয় হ’লো একটি মহৎ সৃষ্টি। এখানে জটিল চরিত্রের ভাবনাচিন্তাগুলি এমন একটা রূপে প্রকাশ পায় যা আর কোনো শিল্পমাধ্যমে প্রকাশ করা যায় না। যেমন চিত্রশিল্প দু-একটা রেখার টানে অথবা কয়েকটা রঙের সংমিশ্রণে যা সৃষ্টি করতে পারে সেটা কোনো শব্দে, নৃত্যে বা সংগীতে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তেমনি সংগীতে পাশাপাশি দুটি পর্দা যে-অনুভব সৃষ্টি করে, তার হুবহু প্রকাশ অন্য কোনো শিল্পমাধ্যমে সম্ভব নয়। তেমনি অভিনয়ও যা প্রকাশ করতে পারে, অন্য শিল্পে সেটা আশা করা সম্ভব নয়। তেমনি অভিনয়ও যা প্রকাশ করতে পারে, অন্য শিল্পে সেটা আশা করা যায় না। বাঙলা রঙ্গমঞ্চের শ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের এইটাই ছিল প্রধান শক্তি। সেই শ্রেষ্ঠ অভিনেতারা আবেগের সঙ্গে বুদ্ধিকেও উদ্দীপ্ত ক’রে তাঁদের সময়কে প্রতিফলিত করতে পারতেন।

অভিনয় অন্যান্য শিল্পকর্মের মতোই বাস্তবের প্রতিফলন, এবং সেই সঙ্গে অভিনয়ে রূপ পায় আমাদের রক্তে অন্তর্নিহিত অতি গোপন আশা-আকাঙ্খা, যা বাস্তবে পরিণত করার কামনা আমাদের মধ্যে নিহিত থাকে। যা লব্ধ ও যা অলব্ধ, এবং যা লভ্য ও যা অলভ্য, এইসব বিপরীতের বৈদ্যুতিক আকর্ষণ বিকর্ষণের ফলে এক অবর্নণীয় জটিল প্যাটার্ন তৈরি হয় আমাদের মনে, বাস্তবের ও স্বপ্নের এই নিগূঢ় সংঘাতের ফলে। কিন্তু এই স্বপ্ন তো যুগে-যুগে পরিবর্তিত হয়। যেমন পরিবর্তিত হয় বাস্তব অবস্থাও। বিশেষত এই শতকের ঊর্ধ্বশ্বাস গতির যুগে। ফলে এক পুরুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পরবর্তীকালের কাছে অর্থহীন হ’য়ে যায়। তাই আগের যুগের অভিনয়ের ধরনও পরে অতো পুরোনো ও অস্বাভাবিক লাগে।

এই পর্বের অনেক নতুন অভিনেতারা অভিনয়ে যে-নতুন রীতি আনলেন শ্রেষ্ঠ নাট্যমুহূর্তগুলিতে, বলা যায়, তা কাব্যময় এবং আবেগপ্রবণ। কিন্তু অনেক সময়ে মনে হ’তো প্রদর্শনলোভী এবং কিছুটা মোটা দাগের। কিন্তু ন্যাচারালিস্টিক অর্থে এই অভিনয় কখনোই বাস্তব ছিলো না। অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ লোকজনের কথাবার্তার ধরনের অনুকৃতি নয়। শ্রীযোগেশ চৌধুরী এবং শ্রীমনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, এই দু-জন অসাধারণ অভিনেতাকে বাদ দিলে আর কারো অভিনয়ে এই স্বাভাবিকতা ছিলো না আর এই দু-জন অভিনেতা কোনোদিন সে-যুগের থিয়েটার-মালিক বা দর্শকসমাজের কাছ থেকে সেরকম বড়ো অভিনেতা ব’লে স্বীকৃতি পাননি। কেননা তাঁদের অভিনয়ে এই উজ্জ্বল বর্ণশোভার কারুকার্য ছিলো না।

কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে নাটককারেরা এবং নাট্যপ্রযোজনাগুলো ক্রমশ বাস্তবানুকরণের দিকেই ঝুঁকছিলেন। নকল ছাদ লাগানো বাক্স সেট চালু হ’লো, দৃশ্যপরিবর্তনের সুবিধার জন্য ঘূর্ণক্ষম রঙ্গমঞ্চ এলো, নাটকের বিষয়-নির্বাচনেও সামাজিক প্রসঙ্গের চেয়ে পারিবারিক সম্পর্কের ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হ’লো। তার মানে এই নয় যে সামাজিক বিষয় নিয়ে একেবারেই নাটক লেখা হয়নি। শ্রীশচীন সেনগুপ্ত বেশ কতকগুলি লিখেছিলেন। কিন্তু সাধারণভাবে থিয়েটারের ‘রিয়ালিস্টিক’ প্রযোজনার ধরনটাই কোনো বিস্তৃত পটভূমিতে নাটক রচনার প্রতিকূল ছিলো।

অভিনয়ের রীতি বিষয়েও তাই। বিশেষ যুগে যে-অভিনয়রীতি খুব ‘ন্যাচারাল’ মনে হ’তো, তিরিশে এসে মনে হ’লো সেটা যেন খুব কৃত্রিম। জীবনের এটা খুবই একটা নিষ্ঠুর নিয়ম। দু-একটি অসাধারণ ব্যতিক্রম ছাড়া, মনে হয় বড়োজোর একটা দশক পর্যন্তই অভিনয়-শিল্পীর কালসীমা। আমার ধারণা, এবং সেটা নেহাতই আমার ব্যক্তিগত ধারণা যে, কবি ও সাহিত্যিক সম্পর্কেও বোধহয় এই নিয়মই খাটে। তাঁদের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলি সাধারণত এক দশকের মধ্যেই রচিত হয় এবং তারপর শুরু হয় অবরোহণ। অভিনেতার বেলায়, মানে ভালো অভিনেতার ক্ষেত্রে দেখতে পাই তিনি এক যুগ পর্যন্ত দৈনন্দিন জীবনের সংলাপের বাকস্পন্দ এবং ধ্বনিমাধুর্য ধ’রে রাখতে পারেন। কিন্তু তারপর কথ্যভাষার ভঙ্গিও বদলাতে শুরু করে। এমন কি স্বর মডিউলেশনের মানে বদলে যায়। তখন সেই অভিনেতারই স্বরক্ষেপ বা স্বরপরিবর্তনের ধরন এবং অভিনয়ের রীতি সেকেলে লাগে, মনে হয় অতীত যুগ থেকে আমদানি করা, যখন অনুভূতির ধরন যেন আলাদা ছিল, যখন আচরণের মানদণ্ড যেন আলাদা ছিল।

এই বিষয়টি, আমার মনে হয় একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে স্পষ্ট করা যেতে পারে। আমাদের ছেলেবেলায় রাজনৈতিক মিছিলে স্লোগান দেবার রেওয়াজ ছিলো, এখনও যেমন আছে। কিন্তু ধ্বনির ধরন অনেক বদলেছে, এতোই বদলেছে যে চেনাই যায় না। আমাদের ছেলেবেলায় আমরা শুনতুম, ব-ন্দে-মা-ত-র-ম্ বা ইন-কি-লা-ব জিন-দা-বাদ। এই স্লোগানগুলি টেনে-টেনে বলা হ’তো। যেন সমস্ত লোকদের আহান করা হচ্ছে। এখন ‘বন্দেমাতরম্’ স্লোগান হিসেবে কদাচিৎ দেওয়া হয়। কিন্তু ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেবার ধরনও অনেক বদলেছে। এখন এইভাবে বলা হয় : ইন/কি/ লাব/ জিন/ দা/ বাদ। ঝোঁকটা এখানে একেবারে অন্যরকম। অনেকটা মার্চ করার তালের সঙ্গে মেলানো। আমার ধারণা আজকালকার ছেলেরা হয়তো এই আধুনিক রীতিতে স্লোগান দেওয়ায় ঠিক সেই রকমই মত্ত হ’য়ে ওঠে, যেমন আমরা হতুম আমাদের কালে, আমাদের ধরনে দেওয়া স্লোগানে।

ধ্বনির ধরন পরিবর্তনের আরো কিছু দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্র-পরবর্তী কয়েকটি কবিতা নেওয়া যাক। যেমন রবীন্দ্রনাথের এই কবিতাটি :

ওহে অন্তরতম
মিটেছে কি তব সকল তিয়াস আসি অন্তরে মম।
অথবা
দুয়ার বাহিরে যেমনি চাহিরে মনে হ’লো যেন চিনি
কবে নিরুপমা ওগো প্রিয়তমা, ছিলে লীলাসঙ্গিনী।

রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ কবিতা পড়বার সময়ে দেখা যাবে পঙক্তির শেষভাগে স্বরক্ষেপ ওপরে উঠে যায়। এই প্রবণতা রবীন্দ্রোত্তর কবিদের মধ্যে অনুপস্থিত। জীবনানন্দ থেকে একটি উদাহরণ নেওয়া যাক :

আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি …
অথবা বিষ্ণু দে-র:
শুনেছি সেকালে নিরাপদ কবি গানে …
অথবা সুধীন্দ্রনাথের:
আমার কথা কি শুনতে পাও না তুমি …

প্রত্যেকটি লাইনের শেষ শব্দের ঝোঁক নীচের দিকে। [উচ্চারণের] এই পরিবর্তনের পেছনে যে-মানসতা কাজ করেছে তা পূর্ববর্তী কবিদের মধ্যে পাওয়া যাবে না। আবার এই আধুনিক কবিদের মধ্যে একজনের সঙ্গে আরেকজনের যতোই বৈপরীত্য থাক সবার মধ্যে কিন্তু কিছু একটা যুগলক্ষণ থাকে, যার সাহায্যে আমরা এক যুগের সঙ্গে অন্য যুগের পার্থক্য বুঝতে পারি।

অবশ্য একথাও স্বীকার করতে হবে যে, রবীন্দ্রনাথকে পুরোপুরি কোনো একটি শ্রেণীতে ফেলা যায় না। তাঁর পরবর্তী যুগের ‘পৃথিবী’ ইত্যাদি কবিতা পড়লে বোঝা যায় ফীনিক্সের মতো তিনি বারবার নতুন জন্ম লাভ করতে পারেন। কিন্তু তাঁর মতো ব্যতিক্রমের দৃষ্টান্ত কয়েক শতকের মধ্যে একটিই পাওয়া যায় এবং সেজন্য আপাতত আমাদের আলোচনার বাইরে। আমরা শুধু এইটুকু বলতে পারি, যদি কোনো অভিনেতার আবেগপ্রকাশের বাচনভঙ্গি দু-দশক ধ’রেও জীবন্ত লাগে তাহ’লে তিনি অসাধারণ অভিনেতা।

কিন্তু তিরিশের এবং তার পরবর্তী যুগের অভিনয় ধারায় তৎকালীন সামাজিক স্বরপরিবর্তনের কোনো চিহ্ন ছিল না।

সেজন্য নাটকগুলি যদিও লেখা হ’তো রিয়ালিস্টিক ধরনে, অর্থাৎ নাট্যমুহূর্তগুলি তৈরি হ’তো স্থানের ও কালের নির্দিষ্টতার মধ্যে, স্বগতোক্তি থাকতো না, তাহ’লেও সংলাপগুলি খুব বাস্তবানুগ হ’তো না। বিশেষত আবেগময় দৃশ্যগুলিতে। কোনো-কোনো ক্ষেত্রে সংলাপগুলি বাস্তবানুগ হ’লেও অভিনয়ের ধরনের জন্য কৃত্রিম লাগতো।

মঞ্চসজ্জার ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য ; বাস্তব করবার চেষ্টা চলতো, কিন্তু কখনো বাস্তব মনে হ’তো না। কেননা দেয়ালগুলো হ’তো ফ্রেমে আঁটা কাপড়ের। যাতে স্বাভাবিক দেওয়ালের ঘনত্বটা আসতো না। দরজা-জানলাগুলোও পুরু বা ভারি মনে হ’তো না। এবং দরজা ধাক্কানোর কোনো দৃশ্য থাকলে অভিনেতার পক্ষে তা হ’তো মর্মান্তিক। উপরন্তু আমাদের ঘরের দেওয়ালের মতো সাদা বা কাছাকাছি কোনো হাল্কা রঙের পরিবর্তে এখানে নানা রকমের ফুলের অলংকরণে চিত্রিত থাকতো।

এর ফলে রিয়ালিস্টিক ধরনটা খুব কৃত্রিম লাগতো। এই কারণে বিশের যুগের নবনাট্যধারার জয়যাত্রা তিরিশে এসেই ম্রিয়মাণ হ’য়ে গেলো। যদিও এর সঙ্গে শিশিরবাবুর মতো প্রতিভাবান অভিনেতা যুক্ত ছিলেন, যাঁর অভিনয়ে আবেগ এবং বুদ্ধির ও কবিত্বের সুন্দর সমন্বয় আমরা দেখতে পাই। তাঁর শ্রেষ্ঠ অভিনয়গুলি আমার দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অভিনয়গুলির তুল্য। কিন্তু শেষের দিকে তাঁর ক্ষমতার উপযুক্ত নাটক তিনি পাননি। ফলে তাঁর বিশিষ্ট শক্তির বিকাশও পুরোপুরি হয়নি। এই নাটকের অভাবের একটি কারণ আমার মনে হয় ‘বাস্তবানুগ’ থিয়েটারের অন্ধ স্বীকৃতি। যার জন্য শিশিরকুমারের মতো অসাধারণ বুদ্ধিমান, দ্রুত পরিবর্তনশীল অস্থির ব্যক্তিত্ব, সঙ্কীর্ণ নাটকের চৌহদ্দির এই ছোটোখানো মানুষদের ভিড়ের মধ্যে জায়গা পাননি। অবশ্য তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ভূমিকা পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে তরুণ মাইকেলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হ’তে হ’লো তাঁর অভিনয়-জীবনের শেষ প্রান্তে যখন তিনি বৃদ্ধ।

এ থকে আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগে। থিয়েটারের রিয়ালিস্টিক ধরনের সঙ্গে বাঙলা রঙ্গমঞ্চের বৈশিষ্ট্যের কি কোনো বিরোধ আছে? গিরিশচন্দ্র ইংরেজি থিয়েটারের সঙ্গে বাঙলা দেশের যাত্রা এবং অন্যান্য লোকশিল্পের ফর্ম মিশিয়ে অভিনয়ের যে-ধরনটা তৈরি করলেন সেটা আমরা আত্মস্থ করলুম। কিন্তু যে মুহূর্তে নাটক এবং নাট্যপ্রযোজনা ‘বাস্তবানুগ’ হ’তে লাগলো ভালো নাটক লেখাও হ’লো না, বড়ো অভিনেতারাও কোনো সুযোগ পেলেন না। যদি সত্যি-সত্যি [সেকালের] নাটকগুলি রিয়ালিস্টিক হ’তো তাহ’লে যোগেশবাবু অথবা মনোরঞ্জনবাবুর মতো অভিনেতারা এই নাট্যধারায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করার সুযোগ পেতেন। কিন্তু এ-রিয়ালিজম তো আহরণ করা, জাতির চেতনার থেকে তার উদ্ভব হয়নি।

ইউরোপে রিয়ালিস্টিক থিয়েটারের আবির্ভাবের একটা পটভূমি আছে। তা হ’লো বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার মধ্য দিয়ে বাস্তব বিষয়ে জ্ঞানলাভের চেষ্টা। যন্ত্র-শিল্প-প্রসারের সঙ্গে-সঙ্গে চিত্রশিল্পী, লেখক, ও মঞ্চশিল্পীদের দৃষ্টিভঙ্গিরও বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছিলো।

আমাদের দেশে এরকম কোনো অবস্থা ছিলো না। সুতরাং পশ্চিম থেকে যে-বাস্তবপ্রতিম ধরন আমরা অনুকরণ করলুম, তা আমাদের নাটককারকে মুক্তি দিতে পারলো না। ফলে ঐ ফর্ম আমাদের দেশের গভীর বাস্তবরূপ দিতে গিয়েও ব্যর্থ হ’লো। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম রবীন্দ্রনাথ। তিনি পেরেছিলেন বাস্তবকে তুলে ধরতে, যদিও এমন একটা রীতিতে যাকে প্রচলিত অর্থে বাস্তব রীতি বলা হয় না। এই পর্বে তাঁর কয়েকটি শ্রেষ্ঠ নাটক রচিত হয়েছিলো, অথচ সে যুগের কোনো সাধারণ রঙ্গশালায় সেগুলি অভিনীত হয়নি। থিয়েটার তখন প্রায় অন্ধ গলির মধ্যে পথ খুঁজছে, আর তার বাইরের জগৎ দ্রুত বদলাচ্ছে। তিরিশের শুরুতেই জগদ্ব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট, বেকার সমস্যা, স্বাধীনতা আন্দোলনের তীব্রতা, মুসলিম লীগের প্রসারণ এবং তারই ফল হিসেবে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস-এর কোনো অভিঘাতের জন্যই থিয়েটারের প্রস্তুতি ছিলো না। আর চল্লিশের শুরুতেই থিয়েটারকে দেখাতে লাগলো প্রাণহীন উদ্যমহীন লুপ্তযৌবনের মতো।

এই সময়ে রঙ্গমঞ্চে একটা নতুন আন্দোলনের ঢেউ এলো। অবশ্য পেশাদারি রঙ্গমঞ্চে নয়। পেশাদারি রঙ্গমঞ্চগুলি তখন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। নতুন হাওয়া এলো এদের বাইরে। উপলক্ষটা হ’লো পঞ্চাশের মন্বন্তর। আমরা দেখেছি পালে-পালে গাঁয়ের মানুষ কলকাতায় এবং অন্যান্য শহরে এসে ভিড় করেছে [খাবার আশায়] আর কীটের মতো মরেছে রাস্তায়। অধিকাংশ বাঙালীর কাছে দুঃস্বপ্নের মতো মনে হ’তো। তাদের আর্তস্বর, ‘ফ্যান দাও বাবা’। ভাত চাইবার সাহস ছিল না তাদের। চালের তখন বড় দাম। তাই শুধু একটু ফ্যান চাইতো। তাতেও বাঁচেনি।

সারা প্রদেশ এক হ’য়ে এই মানুষের তৈরি দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে ধিক্কার দিয়ে উঠলো। এই চেতনা থিয়েটারকে দিলো একটি কেন্দ্র, যেখান থেকে সে সবার সঙ্গে শিল্পের ভাষায় কথা বলতে পারে। আমাদের গভীর বেদনা এবং দুঃখই হ’লো এই ঐক্যসূত্র। আর এ থেকে জন্ম নিলো আর এক নতুন থিয়েটার যা কাঁধে তুলে নিলো এই সামাজিক দায়িত্ব।

প্রথম যে-নাটকটি জনসাধারণের মনে সাড়া জাগালো, চেতনা আনলো নবনাট্যের তা হ’লো নবান্ন। সেটা ১৯৪৪ সালের কথা।

গণনাট্য সংঘ বহু তরুণ-তরুণীকে আকর্ষণ করেছিলো। তাঁরা অনুভব করেছিলেন থিয়েটারের সামাজিক ভূমিকার কথা। তাঁদের আনুগত্য ও নিষ্ঠার ফলে সম্ভব হ’লো এই ঐতিহাসিক প্রযোজনার, যে-অভিনয়কে কেন্দ্র ক’রে বাংলা রঙ্গমঞ্চে নতুন যুগের সূচনা হ’লো বলা হয়। মনে রাখতে হবে এই সমাজচেতনার অর্থ প্রচারসর্বস্ব থিয়েটার নয়। দীনবন্ধু-মধুসূদনের নাটক যেমন সমসাময়িক সমাজের সঙ্গে দায়িত্বশীলভাবে সংলগ্ন, এখানেও তেমনি। হয়তো এই কারণে অনেকে নবান্ন প্রযোজনার সঙ্গে নীলদর্পণ-এর অভিনয়ের তুলনা করেছেন।

এই নতুন পর্বের নাট্যধারাকে বোঝাবার জন্য নবান্ন প্রযোজনার কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের কথা এখানে আলোচনা করা যেতে পারে:

প্রথমত নাটকটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনে লেখা হয়েছিলো। এখানে ছককাটা কোনো গল্পের কাঠামো ছিলো না যাকে কেন্দ্র ক’রে চরিত্রগুলির সংঘাত হয় এবং ঘটনা চরমে ওঠে। অথচ এটাই ছিলো সে যুগের ‘বাস্তববাদী’ নাটক লেখার রীতি।

নাটকের গঠন ছিলো পর্বে পর্বে বিবরণ মূলক। দুর্ভিক্ষের বছরগুলিতে চাষীদের দুর্ভোগের ধারাবিবরণের মতো,-কী ক’রে তারা গ্রামছাড়া হ’লো (প্রথম অঙ্ক), কলকাতায় আসবার পর তাদের কী ঘটলো (দ্বিতীয় অঙ্ক) এবং কী-ক’রে তাদের কেউ-কেউ আবার নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে গিয়ে নতুন চেতনায় উদ্বুদ্ধ হ’য়ে নতুন ক’রে বাঁচবার চেষ্টা করলো।

নাটকের এই ধারাবিবরণের ধরন অনেক সুধী বন্ধুর কাছেও ত্রুটি ব’লে মনে হয়েছিলো। তাঁরা পশ্চিমের বাস্তবানুগ নাটকের গড়ন বিষয়ে ওয়াকিবহাল ছিলেন, এবং সেই রীতি থেকে কোনোরকম বিচ্যুতি হ’লে,-খুব কম ক’রে বললে,- তাঁদের দারুণ ব্যথা দিতো। অবশ্য বহুকাল পরে, যখন ব্রেখট-প্রবর্তিত নাট্যশৈলির প্রচলন হ’লো তা কিন্তু সবাই বিনা বাক্যব্যয়ে সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করলেন। একদিকে সাহেবদের প্রতি এই বিশ্বাস অন্যদিকে স্বদেশী যাবতীয় মৌলিক সৃষ্টির বিষয়ে সন্দেহ, এটা হচ্ছে আমাদের অনেক ‘বুদ্ধিজীবী’দের (আমি এই শব্দটি উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে ব্যবহার করছি) অন্যতম প্রধান লক্ষণ। ব্যাপারটা সত্যিই বড়ো ‘মর্মস্পর্শী’, তবে দুর্ভাগ্যবশত কিঞ্চিৎ উৎকট রসেরই যেন প্রাধান্য আছে এতে।

সে যাই হোক, নবান্ন’র প্রযোজনায় দ্বিতীয় যা লক্ষ্যণীয় : মঞ্চসজ্জা শুধু যে বাস্তবানুগ ছিলো না তাই নয়, রঙ্গমঞ্চে একই দৃশ্যে দুটি ভিন্ন [ঘটনা উপস্থাপনার জন্য] স্তরের প্রয়োগ হয়। স্তরগুলি স্থানের ভিন্নতা বোঝাবার জন্য, অর্থাৎ দুটো স্তর স্থানগত ভিন্নতা নির্দেশ করতো। কিন্তু স্তর দুটির প্রয়োগে আরো যে-একটি অর্থ ছিলো তা চরিত্রচিত্রণের। মঞ্চের সম্মুখভাগের চরিত্রগুলি ছিলো সম্পূর্ণ ব্যক্তি, আর মঞ্চের পেছনে ওপরের স্তরের চরিত্রগুলি সমষ্টি,-জনতার অংশ,-তারা ব্যক্তিহিসেবে ছিল না।

এবং নাটকটির আগাগোড়া-অভিনয়রীতি তখনকার প্রতিষ্ঠিত অভিনেতাদের রীতির চেয়ে কানে অনেক বেশি স্বাভাবিক ছিলো ; এই স্বাভাবিকতার মধ্য দিয়েই নাট্যটিতে অনেক গভীর কাব্যমুহূর্তের সৃষ্টি হ’তো। শুধু নীরবতার মাধ্যমে নয়, (সাধারণত বাস্তবধর্মী নাটকে এইভাবেই কাব্যময় অভিঘাতের সৃষ্টি হয়), আবেগময় দৃশ্যে কথা বলার বিশিষ্ট ভঙ্গীতেও এই অনুভূতি জাগাতো।

সাধারণত আমরা যখন একটি আবেগমুহূর্ত তৈরি করতে চেষ্টা করি, তখন আমরা ধীরে-ধীরে একটি নীরবতা গ’ড়ে তুলি, কথা যথাসম্ভব কম ব্যবহার করি, যাতে আবেগের কাব্যময়তা ভেঙে না যায়। (এর কারণ, আমরা জানি যে সাধারণত সংলাপের মধ্যে কাব্যময়তা প্রকাশ করতে গেলে সংলাপটাই সচেতনভাবে কাব্যিক হয়ে যায়, এবং তার ব্যবহারে প্রকৃত কবিতার বরং হানিই ঘটে।) সেই নীরবতাও নবান্ন নাট্যে ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু নবান্ন’র অভিনয় আরও প্রমাণ করলো যে অভিনেতার পক্ষে কবিতার কণামাত্র বিসর্জন না-দিয়ে, একটুও কৃত্রিম না-হ’য়ে, সবাক ও আবেগময় হওয়া সম্ভব। এই গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছিল এই কারণেই যে-আমি আগেই যেমন বলেছি-আমাদের থিয়েটার তখন সমাজমানসের একটা কেন্দ্র খুঁজে পেয়ে যেন মুক্তি পেয়েছে, সেই কেন্দ্রের বোধ তখন যেন অবাধ স্বাধীনতার আস্বাদ এনেছে নাট্যরূপের মধ্যে।

অবশ্য এই সার্থকতা তখন নাট্যাভিনয়ের সঙ্গে জড়িত সকলেই যে বুঝেছিলেন এমন নয়। কিন্তু তাহ’লেও নাট্যটি বিপুল সাফল্য লাভ করে, এবং প্রত্যেকের কাছে নতুন যুগের সূচনা ব’লে স্বীকৃত হয়।

কিন্তু ১৯৪৮ সালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের মধ্যে কোনো-কোনো শক্তি এটাকে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক মতের প্রচার বাহনে পরিণত করতে চাইলেন। এই সংগঠন, যা এতোদিন এতো দক্ষ, কুশলী ব্যক্তিকে আকর্ষণ করেছিলো,- এর ফলে তার সেই রূপ ভেঙে গেলো।

তাই ব’লে কাজ বন্ধ হ’লো না। ‘বহুরূপী’ নামে আরেকটি সংগঠন ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং কয়েক বছরের মধ্যে আরো বহু প্রতিষ্ঠান গ’ড়ে ওঠে এই কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য।

এই কালের একটি উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা হ’লো নতুন ইহুদি। পূর্ব-পাকিস্তান থেকে আগত উদ্বাস্তুরা ছিলো এই নাটকটির বিষয়।

এইরকম অনেক প্রযোজনার দ্বারা ‘অন্য থিয়েটার’ বহুলভাবে প্রমাণ করে যে সে সামাজিকভাবে দায়িত্বসম্পন্ন, যা সাধারণ রঙ্গমঞ্চ তখন মোটেই ছিল না। ‘সাধারণ থিয়েটারগুলি’- যারা বাঁধা প্রেক্ষাগৃহে নিয়মিত অভিনয় করতো-তারা ক্রমশই আরো বেশী ক’রে ব্যবসায়িক মনোভাবাপন্ন হতে থাকে, আর বাংলা নাট্যের যা কিছু মানমর্যাদা তা প্রতিষ্ঠা করেছে ‘সাধারণ রঙ্গমঞ্চের’ বাইরের ঐ ‘অন্য থিয়েটার’।

তাই স্বাভাবিকভাবেই এই ব্যবসায়িক কোম্পানীগুলি নতুন ধরনের নাট্যধারাকে রোধ করবার যথাসাধ্য চেষ্টা করে। প্রথমতঃ নবান্ন’র পর তারা তাদের মঞ্চগুলি নিয়মিতভাবে ভাড়া দিতেই অস্বীকার করে। কিন্তু নতুন নাট্যকর্মীদের নিঃস্বার্থ নিষ্ঠার জন্য এই নব-নাট্যের প্রসারকে কোনো মতেই রোধ করা যায়নি।

কাজ শুধু চলছিল বললে ভুল হবে, কাজ এগোচ্ছিল। পরবর্তী উন্নতির ধাপ হোল নাটককার হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করায় প্রমাণ করা যে তাঁর নাটকগুলি শুধু পাঠ্যবস্তু নয়, সেগুলি ভালো ‘থিয়েটার’-ও হতে পারে।

তাঁর দু-একটি নাটক অভিনীত হবার সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল যে, তাঁর লিখিত সংলাপ অত্যন্ত জীবন্ত ও দ্যুতিসম্পন্ন, এবং বিস্ময়করভাবে সূক্ষ্মতামণ্ডিত,- যে-সূক্ষ্মতা অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকমনে নাটকীয় অভিঘাত জাগাতে সক্ষম। বোঝা গেল যে এই বাস্তব জগৎ, এ সম্বন্ধেই তিনি লিখেছেন, এই বাস্তব জগতের বাস্তব সমস্যাগুলিই তাঁর লেখার বিষয়।

আসলে, যতোদিন আমরা পশ্চিমীরীতির মাপকাঠিতে রবীন্দ্রনাথকে বিচার করবার চেষ্টা করেছি ততোদিন তাঁকে অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য ব’লে মনে হয়েছে। কিন্তু নবান্নকে কেন্দ্র ক’রে যে নতুন নাট্যধারার সূচনা, তার লক্ষ্য ছিল এমন এক নাট্যরূপের যা একদিকে যেমন আধুনিক, অপরদিকে তেমনিই বিশিষ্টভাবে ভারতীয়। এবং এই বুদ্ধিদীপ্ত ভারতীয় থিয়েটার গ’ড়ে তোলার আকাঙ্খাই এই নাট্যকর্মীদের রবীন্দ্রনাথের নাটক মঞ্চস্থ করার বিশিষ্ট নাট্যরূপে পৌঁছে দিয়েছে।

তাঁর নাটক, মানে তাঁর নাটকের গঠন, কোথায় যেন আমাদের প্রাচীন নাট্যশিল্প যাত্রার সঙ্গে মেলে। কিন্তু তার অনুকরণ নয়। অথচ বুঝতে পারা যায় যে নানা শিল্পকলা প্রকাশের যে পরস্পরা আছে আমাদের, তারই মধ্যে তাঁর শিকড় প্রোথিত, এবং সেই শিকড় থেকেই তিনি আহরণ করেছেন তাঁর প্রাণশক্তি। নিরক্ত নন্দনতাত্ত্বিক নয় তাঁর নাটক, যেমন নয় ধার করা সংস্কৃতির উন্নাসিক মুষ্টিমেয়র লক্ষ্যে উদ্দিষ্ট।

থিয়েটারকে সমৃদ্ধ করতে গেলে চাই এমন কিছু ধ্রুপদী নাটক যা যুগে যুগে নতুন ভাষ্যে উপস্থাপিত করা যাবে। তাহলে সমসাময়িক কালে নাটকের অভাব থাকলেও অভিনেতা ও প্রযোজকদের বিকাশ অব্যাহত থাকে। নাটক তো কারখানায় ফরমাশ দিয়ে তৈরি করানো যায় না। বহু সামাজিক কারণ থাকে এক একটা নতুন ধরনের ও গভীর উন্মোচনের নাটকের জন্মের। যেমন বহু সামাজিক কারণ থাকে নাটকের অবনতিরও।

রবীন্দ্রনাথের নাটকের সঙ্গে সঙ্গে এই নাট্যধারা (ব্যবসায়িক রঙ্গমঞ্চের প্রতিতুলনায়) সারা বিশ্বের চিরায়ত নাট্যসাহিত্য থেকেও বাছাই করেছে অভিনেয় নাটক।

রাজনৈতিক থিয়েটারও গ’ড়ে উঠেছে এর মধ্যে। খোলাখুলিভাবে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচারিত হয় এইসব নাটকে।

নতুন অনেক পথঘাট তৈরি হওয়ায় এবং যাতায়াতের সুবিধার ফলে গ্রামাঞ্চলে যাত্রার জনপ্রিয়তাও বেড়ে গেছে অনেকগুণ। এখনকার যাত্রায় একদিকে স্বাধীনতা আন্দোলনের নানা কাহিনী, অপরদিকে হিটলার বা লেনিনের কাহিনী- এসব বিষয়বস্তুও দর্শককে প্রচুর আকর্ষণ করছে।

শ্রীবাদল সরকারের নাটক নিয়েও বেশ উৎসাহ ও আলোচনা লক্ষ করা যায়।

বিভিন্ন মতের ও বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীর অসংখ্য গোষ্ঠী নতুন নতুন রীতি নিয়ে পরীক্ষা-সমীক্ষা চালাচ্ছেন।

অনেক তরুণ-তরুণী অবশ্য আধুনিকতম হবার উৎসাহে পশ্চিম গোলার্ধে যখনি যা হাওয়া বইছে তখনি তার সুরে গলা মেলাবার চেষ্টা করছেন। এবং ফলে তাঁদের মাথা যাচ্ছে ঘুলিয়ে, শেকড় যাচ্ছে হারিয়ে, – ঠিক যেমন ঘটেছিল তাঁদের বাপ-ঠাকুর্দাদের আমলে, ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির সন্তান হবার হিসেবে।

ব্রেখট ইয়োনেস্কো টেনেসি উইলিয়ামস এডওয়ার্ড আলবি প্রমুখের নাটক যথেচ্ছ তরজমা ক’রে অভিনীত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ভাবানুবাদ এমনিই স্বাধীন যে কুম্ভীলকগিরিও এর চেয়ে ভালো ব’লে মনে হয়।

নতুন নাটক প্রচুর লেখা হলেও নতুন যুগের সূচনা করার মতো এখনো কিছু লেখা হয়েছে ব’লে জানি না।

অভিনয়ের ক্ষেত্রেও গত দশকের ধারা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন কিছু ঘটেনি। বরং কিছু কিছু নতুন অভিনেতার অভিনয়ের ধরন মধ্য-চল্লিশের ব্যবসায়িক মঞ্চের অভিনয়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

এবং আরো-একটা বিপদ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ‘অন্য থিয়েটার’ ও ব্যবসায়িক থিয়েটারের মধ্যে ভেদরেখা যেন লুপ্ত হ’তে বসেছে। খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার মোহে অনেক অভিনেতা ও নির্দেশক ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছেন। ফলে, যে সুস্থ বিভেদ নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল তার অবলুপ্তি ঘটছে, আবহাওয়া কলুষিত হয়ে উঠছে।

এই রাজ্যের ভয়াবহ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা হয়তো নাট্যজগতের এই বিভ্রান্তির কারণ। প্রাণ এখন খুব সুলভ, এবং নীতিজ্ঞান তেমনিই দুর্মূল্য। বেকারের সংখ্যা প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। স্বাধীনতার পর থেকে এখনো লাখে লাখে উদ্বাস্তু আসছেন। রাজ্যের অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে।

শিল্পীরা আবার হারিয়ে ফেলছেন তাঁদের কেন্দ্র। বেবেলের মিনারের মতো চারপাশে কোলাহল আপনার কানে আসবে। কিন্তু কোনো ভাবের আদান-প্রদান হয় না।

হয়তো এরই মধ্যে, কিংবা এর ভিতর দিয়ে চ’লে উত্তীর্ণ হয়েই নতুন জন্ম নেবে সমাজ। থিয়েটারেরও হয়তো তখনি আসবে এক নতুন রূপ,- আরো অনেক উন্নত বোধ আর প্রখরতর কোনো নতুন চেতনা নিয়ে।

কিংবা এবার হয়তো উন্নততর নাট্য জন্ম নেবে ভারতের অন্য কোনো ভাষার মাটিতে, বাংলায় নয়।

শম্ভু মিত্র : বাঙলানাট্যের প্রবাদ পুরুষ।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত