বাংলাদেশের অ্যামেচার থিয়েটার চর্চা ও আবশ্যিক প্রসঙ্গসমূহ

 

 

বাংলাদেশে চর্চিত থিয়েটারের স্বরূপঃ-

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে স্বাধীনতার মূল আদর্শ ও চেতনার সাথে বিন্দুমাত্র আপস না করা উল্লেখযোগ্য অর্জনটির নাম ‘থিয়েটার’। সদ্য স্বাধীন স্বদেশে থিয়েটার হয়ে উঠে মূলত যুদ্ধফেরত স্বপ্নাতুর তরুণদের স্বপ্ন নির্মাণের হাতিয়ার আর স্বপ্নভংগের যন্ত্রণার বিপরীতে প্রতিবাদের অস্ত্র।ফলে শখের চর্চার অবস্থাটি পরিবর্তিত হয়ে এর সাথে যুক্ত হয় আন্দোলন শব্দটি। এদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন,স্বাধীনতার মৌল চেতনার ক্রমাগত পশ্চাৎগামীতা এই শখের চর্চাটিকে এক অনিবার্য দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বে আন্দোলনের দিকেই ধাবিত করে এবং এটা ছিলো সময়ের দাবি।

আজ থিয়েটার চর্চার চারদশক অতিক্রম করে শ্লাঘার সাথে উচ্চারণ করাই যায় যে,শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির বহুমাত্রিক ধারাগুলোর মধ্যে একমাত্র থিয়েটারই পথ হারায়নি অশ্লীলতা কিংবা যথেচ্ছা চর্চার নীতিহীন চোরাগলিতে। বিভক্ত হয়নি স্বাধীনতার মৌল আদর্শের প্রশ্নে। টিকে থাকার প্রয়োজনেও নয়,লাভের প্রয়োজনেও নয়।

বরং আজ, কর্পোরেট শাসিত ব্যবস্থায় যখন পৃষ্ঠপোষকতাহীন আ্যমেচার থিয়েটার চর্চা তার অস্তিত্ব নিয়ে নানাবিধ হুমকির মুখোমুখি তখনো থিয়েটার  আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন বন্ধুর পথেই অবিচল। শখের বিলাসিতা বর্জন করে আন্দোলনের এই অমসৃণ পথচলায় থিয়েটার বাস্তবে কতোটা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে কিংবা মানুষই কতোটা থিয়েটারের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে,সময়ের প্রয়োজনে এর মীমাংসা আজ গুরুতর বিবেচ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাথে এও বিবেচ্য যে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটে থিয়েটার আন্দোলনের চূড়ান্ত দায়বদ্ধতার উদ্দেশ্য যদি হয় সমাজ মানস পরিবর্তন কিংবা রাষ্ট্র ও সমাজের অসংগতির অবলুপ্তি তাতেই বা কতোটা সার্থকতা অর্জন করতে পেরেছে? আর এসব বিবেচনার আবশ্যিক অনুষঙ্গ হিসাবে উত্থাপিত হয় যে বিষয়টি তা হলো, শিল্পে সামাজিক দায় কিংবা শিল্পের দায় কোনটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে থিয়েটার আজ স্পষ্টত দুটি ধারায় চর্চিত।প্রথমটি অ্যামেচার থিয়েটার কর্মীদের দ্বারা যা দেশব্যাপী ছড়িয়ে রয়েছে আর দ্বিতীয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক একাডেমিক পাঠ সংশ্লিষ্ট। দুই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চার অতীত ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ গন্তব্য নিয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে।

 

থিয়েটার উৎপত্তির ইতিহাস ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটঃ-

থিয়েটার অর্থাৎ মঞ্চ নাটকের একটি নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক রূপ পাওয়া গিয়েছিলো প্রাচীন গ্রিকদের কাছ থেকে এমনকি পেশা হিসেবে অভিনয়কে বেছে নেয়ার ধারণা গ্রিকদের কাছ থেকেই পাওয়া এই মঞ্চ নাটকে সময়ের প্রয়োজনের সাথে অভিযোজিত করার প্রয়াস প্রথম পরিলক্ষিত হয়অ্যান্টিগোনেনাটকে ১৯৪৪ সালে ফরাসি নাট্যকার জ্যাঁ আনউই নাজি বাহিনীর ফ্রান্স দখলের বিষয়টি প্রকাশের জন্য নাটকটি রচনা করেছিলেন ১৯৪৮ সালে জার্মান নাট্যকার ব্রেখট এই নাটকটি ব্যবহার করেছিলেন মিশরের প্রাচীন নগরী থিবির শাসক ক্রেউনের সাথে হিটলারের আর থিবির সাথে পরাজিত জার্মানির সাদৃশ্য দেখিয়ে তখন থেকেই থিয়েটারের সাথে সমাজ সচেতনতামূলক প্রবণতার সংশ্লিষ্টতা লক্ষ্য করা যায় পরবর্তীতে স্পেন, ইটালি, ফ্রান্স, রাশিয়া ইত্যাদি দেশে মঞ্চ নাটকের বিকাশ প্রক্রিয়ার একটি সাধারণ প্রবণতা ছিলো রেঁনেসা এবং গ্রিকদের কাব্যধর্মীতা থেকে সরে গিয়ে তা হয়ে উঠেছিলো বাস্তবঘনিষ্ঠ

বাংলায়থিয়েটারশব্দটির উদ্ভব প্রচলন রাশিয়ান নাগরিক গেবেসিম স্তেপানোভিচ লিয়েবেদেফের নামটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ১৭৯৫ সালে ২৭ নভেম্বর কলকাতার ডোমতলায় বেঙ্গলি থিয়েটার কর্তৃক তিনিকাল্পনিক সংবদলনামে যে নাটকটি মঞ্চস্থ করেন, বাংলা নাটকের ইতিহাস এই দুশো বছরেই সীমাবদ্ধ এই তত্ত্ব এখন আর গ্রহণযোগ্য নয় বলা যায় লিয়েবেদেফ আর তার কাল্পনিক সংবদল বাংলা নাটকের হাজার বছরের ইতিহাসের একটি নতুনতর অভিঘাত যা বাংলা নাটককে আবদ্ধ করে প্রসেনিয়ামেসঙ্গীত, চিত্রাংকন, নৃত্যের মত নাট্যকলার বয়স পৃথিবীর কোন দেশই মেপে নিতে পারেনি কারণ এসবের জন্ম মানুষের আদিম রসচেতনার রহস্যময় অতীতে দুশো বছর আগে আমরা যদি লিখিত নাটক না পাই তার অর্থ কি এই যে, দুশো বছর আগে পর্যন্ত বাঙালী নাট্যরস কি বস্তু জানতো না? নাট্যাভিনয়ের কোন রকম প্রক্রিয়াতেই তারা যুক্ত ছিলেন না? নাট্যচর্চা বলতে যৎসামান্য কিছুও ছিলোনা?’ (বাংলা নাট্য প্রসঙ্গে লিয়েবেদেফের আগের কথা, মোহিত চট্টোপাধ্যায়)

এর বিস্তৃত উত্তর আমরা পাই সেলিম আলদীনের মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থে যেখানে তিনি বলেছেনআমাদের নাটক প্রাশ্চাত্যে মত ন্যারোটিভ রিচুয়েল থেকে পৃৃথকীকৃত সুনির্দিষ্ট চরিত্রাভিনয় রীতির সীমায় আবদ্ধ নয় তা গান, পাঁচালি, লীলাগীত, গীতনাট, পালা, পাঠ, যাত্রা, গম্ভীরা, আলকাপ, ঘাটু, মঙ্গলনাট, গাজীর গান ইত্যাদি বিষয় রীতিকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে

দুশো বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে উপমহাদেশের মানসিক দাসত্ব লিয়েবেদেফকে শুরুর বিন্দু ধরে থিয়েটার চর্চার যে ইতিহাস তৈরি করতে চেয়েছে সেলিম আল দীন তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে দৃঢ়তার সাথে সন্ধান করেছেন নিজস্ব শিল্পবিশ্বাসের রীতিটির মোহিত চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘১৭৯৫ এর ২৭ নভেম্বর যদি হয় বাংলা প্রসেনিয়াম থিয়েটারের জন্মদিন তাহলে ওইদিনটি বাঙালীর নিজস্ব থিয়েটারের মৃত্যুদিনও বটেসেলিম আল দীন তার গবেষণাকর্মের মাধ্যমে বর্ণনা সংলাপের অভেদাত্মায় দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পবিশ্বাসের রীতিটি প্রতিষ্ঠিত করে প্রমান করলেন বাঙালীর হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী নাট্যচর্চার ধারাটি সমান বেগেই বহমান ছিলো

এই মৃত্তিকা সংলগ্ন নাট্যচর্চা যা লোকশিল্প চর্চার অর্ন্তজাত তা সমান্তরালভাবে বহমান থাকলেও এটা অস্বীকার করার জো নেই যে, বাঙালি থিয়েটার শব্দটিকে আপন করে নিয়েছিলো লিয়েবেদেফেরকাল্পনিক সংবদলথেকেই এবং তারপর একের পর এক নানা বাঁক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তা এই সমাজের ভেতরেই পরিপুষ্টি অর্জন রেছিল অব্যাহতভাবে যাকে বিষ্ণু বসু নির্দেশ করেছেন এভাবে, ‘১৮৩১ থেকে ১৮৭৩ পর্যন্ত যদি ধরে নেয়া যায় বাবু থিয়েটারের কাল, তবে উনিশ শতকের ষাটের দশককে বলা চলে মধ্যবিত্ত যুবকদের নাট্যপ্রচেষ্টা যার পরিণতি ঘটেছিলো ন্যাশনাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠায় ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর ন্যাশনাল থিয়েটার মঞ্চস্থ করলো নীলদর্প‘। শুরু হল পেশাদার থিয়েটারের পালা নীলদর্পন নাটকের মধ্য দিয়েই থিয়েটারের সমাজ সচেতন প্রবণতাটির যাত্রা শুরু

বিশ শতকে সারা পৃথিবীতেই জাতীয় সমস্যার সাথে গুরুত্ব পেলো আন্তর্জাতিক সমস্যা দু দুটো বিশ্বযুদ্ধ তৎসংক্রান্ত অর্থনীতির, রাজনৈতিক সামাজিক সংকট সমাজে যে অস্থিরতা তৈরি করে থিয়েটারও তার বাইরে থাকেনা তা থেকে ১৯৪৩ সালে গণনাট্য সংঘের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৪ সালে নবান্ন প্রযোজনাটি আক্ষরিক অর্থেই থিয়েটারের পালাবদল ঘটালো তীব্রভাবে সমাজ সচেতনতামূলক দায়বদ্ধতা এর সাথে সংযুক্ত হলো এবং এখনকার গ্রুপ থিয়েটার সেই ঐতিহ্যই বহন করে চলেছে

বাংলাদেশে স্বাধীনতা লাভের পূর্বে যেকোন কারণেই হোক সেভাবে থিয়েটার চর্চা হয়নি পেশাদার কিংবা শৌখিন কোন নাট্যচর্চাই এই পূর্ববঙ্গে সংঘটিত হতে পারেনি স্থায়ী রঙ্গমঞ্চের অভাব এর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ কলকাতাকেন্দ্রিক নাট্যচর্চা যেখানে এই রঙ্গমঞ্চকেই কেন্দ্র করে উজ্জ্বীবিত হয়েছিলো পূর্ববঙ্গে শওকত ওসমান, মুনীর চৌধুরীরা সামান্য হলেও সেই চর্চায় ব্যস্ত ছিলেন বিশেষত মুনীর চৌধুরীর কবর মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসনশোষনের বিরুদ্ধে মুনীর চৌধুরীর এই থিয়েটার  প্রচেষ্টা ছিলো শৈল্পিক অথচ তীক্ষ্ণ প্রতিবাদ ১৯৫৬ সালে ঢাকাতে গ্রুপ থিয়েটার একটি চর্চার ক্ষীণ ধারার সূচনা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিকড্রামা সার্কেলগঠনের মাধ্যমে এই ড্রামা সার্কেল থিয়েটার চর্চার ক্ষেত্রে একটি ইতিহাসের সূচনা হলেও এর প্রভাব থিয়েটার আন্দোলনে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি

স্বাধীনতা অর্জনের অব্যবহিত পরে ১৯৭২ সালে তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ও এর বাইরেও সুসংগঠিত নাট্যদল গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটার চর্চা শুরু হয় এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী শিল্পচর্চার পথে অগ্রসর হয়। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৭৩ সালে ‘বাকি ইতিহাস’ নাটকটি দর্শনীর মাধ্যমে মঞ্চস্থ করে বাংলাদেশের মঞ্চনাটকে গুনগত পরিবর্তনের সূচনা করে।এর আগে ১৯৭২ সালে থিয়েটার,  ঢাকা থিয়েটার, আরণ্যক নাট্যদলের মতো উল্লেখযোগ্য নাট্যদলগুলি একই সাথে মঞ্চে আবির্ভূত হয়।

১৯৭২ সালেই গঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক নাট্যদল নাট্যচক্র,  বহুবচন। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক নাট্যপ্রচেষ্টা নাট্য আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় নাট্য প্রতিযোগিতায় নাটক রচনা থেকে মঞ্চায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সৃজনশীল তরুণরা যুক্ত হয় এবং এদের থেকেই বের হয়ে আসেন পরবর্তীকালের উল্লেখযোগ্য নাট্যকার নির্দেশক অভিনেতৃগণ।বাংলা নাটকের বরপুত্র সেলিম আল দীন নিজেই স্বীকার করেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তঃহল প্রতিযোগিতার ফসল।১৯৭২ সালে আন্তঃহল নাট্যপ্রতিযোগিতার ভেতর দিয়েই বাংলাদেশের গৌরবময় থিয়েটার পথযাত্রার ভ্রুণের সঞ্চার ঘটে। আর এই ভ্রুণ পত্রে পুস্পে সুশোভিত সমৃদ্ধ সন্তান হয়ে বিকাশ লাভ করে দেশব্যাপী অসং্খ্য থিয়েটার কর্মীদের ভালোবাসায় ও ত্যাগে। ১৯৭৫ এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং চেপে বসা সামরিক শাসকের স্বৈরাচারী শাসনে এই গ্রুপ থিয়েটার চর্চা  প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে।

 

 

এই থিয়েটার চর্চার যে প্রধানতম বৈশিষ্ট্যগুলোকে   শুরু থেকেই উজ্জ্বলতর হয়ে নির্দিষ্ট করা যায়,সেগুলো হলো   থিয়েটার চর্চার সামাজিক দায়বদ্ধতা, থিয়েটারকে প্রতিবাদের ভাষা করে তোলা, সামাজিক ও রাজনৈতিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা এবং বিণা পারিশ্রমিকে থিয়েটার চর্চা করা। এরই মধ্যে ১৯৮১ সালে সারাদেশের বিচ্ছিন্ন নাট্যদলগুলোকে আদর্শিক এক মঞ্চে নিয়ে এক জোরদার সাংগঠনিক কর্মতৎপরতার সূচনা ঘটে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান নামক প্ল্যাটফর্মটি গঠনের মাধ্যমে।পথনাটকের মতো তীব্র রাজনৈতিক  শ্লোগান সমৃদ্ধ নাটকের পাশাপাশি নানা নিরীক্ষাপ্রবণতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতায় শিল্পসুষমামণ্ডিত একের পর এক মাইলফলক নাটক মঞ্চে আসতে থাকে।যার ধারাবাহিকতা এখন আরো ক্ষুরধার পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় বহমান। সারা দেশে প্রতিবছর আ্যমেচার থিয়েটার দলগুলো সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে শ খানেক নাটক মঞ্চস্থ করে। আয়োজন করে নানা উৎসব-প্রদর্শনীর। এই নাট্যপ্রযোজনা সমূহের অনেক কয়টি প্রায়শই দেশের বাইরে বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চার উজ্জ্বলতম প্রতিনিধি হিসাবে প্রতিনিধিত্ব করে।

এই গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের ফসল হিসাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাত্রা শুরু হয় নাট্যচর্চা সংক্রান্ত বিভাগের। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের একাডেমিক পাঠ আরেকটি স্বতন্ত্র ধারা হিসাবে সংযুক্ত হয় থিয়েটার চর্চায়।

 

সমকালীন সমাজে থিয়েটার  চর্চার প্রয়োজনীয়তা ও প্রভাবঃ

থিয়েটার যেহেতু দৃশ্যকাব্য, সেহেতু থিয়েটারের উদ্দীষ্ট দর্শক।থিয়েটারের দর্শক কারা,সে দর্শক কেমন এবং তার পরিমাণ কী। যে সামাজিক দায়বদ্ধতা থিয়েটারের আদর্শিক অবস্থান,কতোটুকু পূরণ হচ্ছে সেই প্রত্যাশা?

বৃহৎ জনগোষ্ঠীর যে সামান্য অংশ মঞ্চে থিয়েটার দেখতে আসে, Samul Salden তাঁর An Introduction Of Playwrighting গ্রন্থে সে দর্শকের চারটি প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করেছেন।সেগুলো হলো Diversion, Simulation,Illumination, Sensation। দর্শক থিয়েটার দেখতে আসে তাঁর জীবনের চাপ থেকে মুক্তি পেতে কিংবা ভাবনাগুলোকে নাড়া দিতে বা জীবনকে বড়ো করে দেখতে নয়তো চেতনা জাগিয়ে তুলতে।ব্যক্তিসত্তার উপর গুরুত্ব আরোপ করে ভিক্টর হুগো দর্শককে তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন।(১) সাধারণ দর্শক- যারা নাটকের ভাবরস বা চরিত্রের সামগ্রিক গভীরতার দিকে নজর দেন না। (২) ভাবপ্রবণ দর্শক- নাট্যকৌশল না দেখে প্রেমভক্তি সহানুভূতি ইত্যাদিতে প্রভাবিত হয় এবং (৩) চিন্তাশীল দর্শক-যে নাটকে গভীর উপলব্ধির সন্ধান করে।

প্রশ্ন হলো দর্শক এবং থিয়েটার, কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।রুশ সাহিত্যিক গুগোল থিয়েটারের জীবনঘনিষ্ঠ অর্থাৎ সামাজিক দায়বদ্ধতার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন আর তার সফল বাস্তবায়ন করেন স্তানিলাভস্কি। চেখভ বলেন, গোগোলকে দর্শকদের স্তরে নামিয়ে এনো না,বরং দর্শকদেরই উন্নীত করো গোগোলের স্তরে। বাংলাদেশের থিয়েটার শুরু থেকে দর্শককেই উন্নীত করতে চেয়েছে থিয়েটারের দায়বদ্ধতার স্তরে। ফলে থিয়েটারে অনুপ্রবেশ করেনি অপসংস্কৃতি, অশ্লীলতা। বরং যদিও এদেশের বাস্তবতায় দর্শক সং্খ্যা সীমিত তবু সেই সীমিত সং্খ্যক দর্শকদেরই চাহিদা প্রবণতা এবং থিয়েটার এক্টিভিস্টের টানাপোড়েনে ও ঘাত প্রতিঘাতেই এদেশে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সময়ের বিশেষ বিশেষ নাট্য আন্দোলন।  যদিও আমাদের রাজনৈতিক, আর্থ সামাজিক সংকট,ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান, জঙ্গীবাদের বিপরীতে থিয়েটার ঝলসে উঠেছে নিজস্ব দায়ে,তবু কথা থেকে যায় এতে কী পরাহত হয়েছে শিল্পের দায়?

এক্ষেত্রে প্রখ্যাত নাট্য সমালোচক Nicoll এর বক্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে,”………  the really strong playwright is the man who is in tune with the audience, but who may perhaps desire to play some melodies for the reception of which the audience is nearly but not quite ready”( world drama)।   তিনি নাট্যকারকে দর্শকের কাছে ধরা দিয়ে তাদের এর মাধ্যমেই নন্দনতত্ত্বের অজানা সুরের কথা শুনিয়ে দেয়ার যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা সর্বোতভাবেই সমগ্র থিয়েটারের উপর বর্তায়। থিয়েটার দর্শকের সামনে উপস্থাপিত হয় বলে জনমানসের রুচির পরিবর্তন কিংবা অভিঘাত তৈরির দায়িত্ব এবং ক্ষমতা দুটোই থিয়েটারের থাকে। সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের সাথে জনমানসেরও পরিবর্তন ঘটে।থিয়েটারের ভাষা, উপস্থাপনের কৌশলেও তখন পরিবর্তন ঘটে।জনমানসের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে ফলে থিয়েটারে তার প্রতিফলন ঘটে।কিন্তু তা কোনভাবে কেবলই দর্শকের মনোরঞ্জনের জন্য নয়। প্রখ্যাত নাট্যকার জর্জ বার্নাড শ তাঁর শিষ্য আর্চারকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, I have to think of my pocket, of the managers pocket,of the spectators pocket. It is these factors that dicates the playwright method leaving him so little room for selection.

বলা বাহুল্য থিয়েটারে  মঞ্চসাফল্য,শিল্পমূল্য ও দায়বদ্ধতার পুরোটাই আ্যামেচার নাট্যকর্মী কর্তৃক চর্চিত। এবং একাডেমিক পাঠশেষে মাঠপর্যায়ে থিয়েটারকর্মী গড়ে উঠার নিদর্শন একেবারেই নেই বললেই চলে। নাট্যকলায় ডিগ্রি অর্জনকারী কেউ থিয়েটারের প্রতি দায়বদ্ধতা বোধ করেন না বলে যে কোন বিষয়ে ডিগ্রিধারী ব্যক্তির মতোই তিনি পেশাজীবী হয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠার পথ অনুসন্ধান করেন।যেখানে তাদের অর্জিত জ্ঞান ও প্রশিক্ষন থিয়েটার চর্চাকে সমৃদ্ধ করার কথা সেখানে বরং অনেকক্ষেত্রে আ্যমেচার নাট্যকর্মীদের সাথে তাদের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ব্যাকরণ নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। থিয়েটার চর্চার জন্য যা একপ্রকার বিষাদময় ঘটনাই বটে।

প্রশ্ন হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী একজন ব্যক্তি তাঁর পেশা খোঁজে নেবেন এটাই স্বাভাবিক। থিয়েটার এদেশে কোনোভাবেই পেশা হয়ে উঠা তো দূরের কথা,একটি নাটক প্রযোজনার ব্যায়ভার বহন করা পর্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। গিরিশচন্দ্র ঘোষ বাণিজ্যিক থিয়েটারে বেতনভোগী নাট্যকার হয়ে দর্শক মনোরঞ্জনের ঊদ্দেশ্যে নাটক লিখেছেন।সেসব নাটকের প্রয়োগ কৌশলের উদ্দেশ্যও ছিলো দর্শক মনোরঞ্জন। তাঁর নাটক হাউসফুল থাকতো এবং বাণিজ্যিক ভাবে সফল হয়ে উঠতো। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যা রূপকথার মতোই শোনায় হয়তোবা। বাণিজ্যিক ভাবে সফলতা দূরে থাকুক, দর্শনীর বিনিময়ে শ্রম ঘাম মেধার মূল্য দূরে থাকুক, প্রযোজনার অবকাঠামো বা মহড়ার খরচ পর্যন্ত উঠে আসার নিশ্চয়তা থাকে না।

  গিরিশচন্দ্র যে সময়ে কাজ করেছেন সেই সময়ের সাথে বর্তমান সময়ের বিশাল তফাৎ।এই সময়ে মুঠোয় রিমোট নিয়ে দর্শক মুহুর্তে চলে যেতে পারেন পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে। এই সময় দর্শক কেনো হলে আসবেন মঞ্চ নাটক দেখতে কিংবা নাট্যকর্মীরা কেনোই বা মঞ্চে কাজ করবেন, প্রসঙ্গগুলি যদি আবশ্যিকভাবে উত্থাপিত হয় তবে প্রথমত নিঃসন্দেহে এটি অনস্বীকার্য সত্য যে  এদেশের অপেশাদার এবং অপ্রশিক্ষিত হাজারো নাট্যকর্মী নতুন নতুন কর্মপ্রচেষ্টা ও চ্যালেঞ্জিং নিরীক্ষাপ্রবণতা নিয়ে সময় ও জনমানসের দাবি মেটাচ্ছে।গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের আনাচে কানাচে। সম্পূর্ণ ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো থিয়েটারের ব্রতে উৎসর্গ করছেন নিজেদের ত উচ্ছ্বাস,উদ্দীপনা ও সর্বোচ্চ মেধা ও সৃজনশীলতা। ফলে রাজধানী এবং রাজধানীর বাইরে মঞ্চগুলো প্রতিদিন মুখর থাকছে নিত্য নতুন নাট্য প্রযোজনায় এবং যা  শুধুমাত্র বিনোদন সংশ্লিষ্ট নয়। এবং মোটেই ভয়াবহ দর্শক সংকটে কোথাও থিয়েটার চর্চা মুখ থুবড়ে পড়ে নি।বরং নাট্য সংগঠনগুলো পারস্পরিক প্রতিযোগিতার মনস্কতায় ও নন্দনতাত্ত্বিক প্রয়াসে নিজেদের উত্তোরত্তোর ছাড়িয়ে যাওয়ার আপন আনন্দের মগ্নতায় কাজ করে যাচ্ছে।

এবং দ্বিতীয়ত এই হাজারো নাট্যকর্মী ও শত শত নাট্য সংগঠন কতোদিন এই প্রণোদনা,পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক নিরাপত্তাহীন ভাবে কতোদিন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে পারে,প্রশ্নটির মীমাংসা খোঁজার স্বার্থে সর্বাগ্রে রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রসংগ আসে। গত কয় বছরে দেশে ক্রমবর্ধমান জঙ্গীবাদের উত্থান, মূল্যবোধের অবক্ষয়, মুক্তবুদ্ধির কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টা ইত্যাদি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গৌরব গিলে খাওয়ার উপক্রম তখন রাষ্ট্র যন্ত্রের উপলব্ধির সময় হয়েছে যে জাতির সাংস্কৃতিক মান উন্নত না হলে সকল উন্নয়ন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ব্যাপারটি উপলব্ধি পূর্বক থিয়েটারে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছিলো।এবং এখনো তা বর্তমান আছে।

কিন্তু গভীর দুঃখের সাথে উচ্চারিত যে সত্য, বাংলাদেশের থিয়েটার মুক্তিযুদ্ধের সোনালী ফসল হওয়া সত্ত্বেও, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে অবিচল হওয়া সত্ত্বেও থিয়েটার এদেশে কাঙ্ক্ষিত পৃষ্ঠপোষকতা পায় নি। মুক্তিযুদ্ধের সরকারের শাসনামলে থিয়েটার কর্মীদের এই প্রত্যাশা মোটেই বাহুল্য নয়।

এদেশের থিয়েটারের বেঁচে থাকা আর পরিপুষ্টি অর্জন  এখনো আ্যমেচার নাট্যকর্মীদের ঘামে-শ্রমে-মেধায়-মননে। তাঁরা একদিকে শেকড়ের সন্ধানে “সোনাই মাধব কন্যা” করছে, ইতিহাস খুঁড়ে জগৎজ্যোতিকে তোলে আনছে, অন্যদিকে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে মঞ্চস্থ করছে ‘নিশিমন বিসর্জন।’

 

শেষ কথাঃ-

থিয়েটার কর্মীরা কোনোরকম দৃশ্যমান প্রাপ্তিহীন  এই থিয়েটার চর্চা কেনো তবু অব্যাহত রেখেছেন? রেখেছেন নিজেদের শিল্পসত্তা ও মানবিক সত্তার কারণে। ঠিক যে কারণে মানবিক মানুষ সৌন্দর্যে আলোড়িত হয়,ঠিক যে কারণে মানবিক মানুষ যৌথ কাজে উদ্দীপ্ত হয়,নিজের দায়বদ্ধতা উপলব্ধি করে,  নিজের এই মানবিক বোধ ও দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই থিয়েটারকর্মীরা ভালোবাসার থিয়েটারকে বাঁচিয়ে রাখবে।

 

তথ্যসূত্রঃ-

১. মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য,সেলিম-আল-দীন

২.২০০ বছরের বাংলা প্রসেনিয়াম থিয়েটার,সম্পাদনা গণেশ মুখোপাধ্যায়

৩.দুই বাংলার থিয়েটার,সম্পাদনা সেলিম রেজা রেন্টু

৪.গেরেসিম স্তেপানভিচ লিয়েবেদেফ,অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ,বাংলা একাডেমি।

৫.গিরিশচন্দ্র, অবিনাশ গঙ্গোপাধ্যায়।

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত