বাংলাদেশের লোকধর্ম (পর্ব-৪)

আধ্যাত্মিক গুরু ফকির শিবরাম ঠাকুরের জীবন ও কর্ম
চতুর্থ অধ্যায়

বাংলাদেশে ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের প্রবর্তক ফকির শিবরাম ঠাকুরের জন্ম যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার জগদানন্দকাঠি গ্রামে। শিবরামের পিতার নাম হরে কৃষ্ণদাস। তিনি জাতিতে ছিলেন জেলে বা কৈর্বত। ‘লোকশ্রুতি মতে হরেকৃষ্ণ দাসের দুই ছেলে ছিলো তাদের একজন শিবরাম ঠাকুর। বেতলা নদীর তীরে হরেকৃষ্ণ দাসের ঘর আলো করে আনুমানিক ১১১০ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ১৭০৩ খ্রিষ্টাব্দ ফকির শিবরাম জন্মগ্রহন করেন।
তার জীবনী লেখক-ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের সত্য সদানন্দ সরদার তাঁর-‘ফকির শিবরাম ঠাকুর ও কর্তাভজা ধর্ম’ গ্রন্থে জানান-‘শিবিরাম বাংলা ১১১০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম হরেকৃষ্ণদাস, জাতিতে কৈবর্ত্ত। শিবিরামের আদি নিবাস ছিল জগদানন্দকাটি, ঝিকর গাছা, যশোর।’১
শিবরাম দাস ছিলেন সহজ সরল প্রকৃতির ধর্মপ্রাণ মানুষ। খানিকটা আত্মভোলা প্রকৃতির এই মানুষকে একদিন কর্তভজা সম্প্রদায়ের প্রবর্তক আউলেচাঁদ বা ফকির ঠাকুর স্বপ্নে দর্শন দেন। আউলে চাঁদ তখন নদীয়ার ঘোষপাড়ায় আসন পেতেছেন।একদিন ঘোষপাড়া কর্তভজাদের গানের উৎবে মুখর। শিবরামকে দর্শন দিয়ে ফকির ঠাকুর বলেন-‘আমি হালিশ্বরে কানাই ঘোষের বাড়ি আছি, আমার সঙ্গে দেখা কর।’ আদেশ পেয়ে শিবরাম হালিশ্বরে কানাই ঘোষের বাড়ি যেয়ে উপস্থিত হন। ষষ্ঠাঙ্গে উবু হয়ে ফকির ঠাকুরকে ভক্তি ভরে প্রণাম করলে ফকির ঠাকুর হাত তুলে তাকে আশীর্বাদ করেন এবং প্রতিমাসে ঘোষপাড়ায় আসার জন্য নির্দেশ দেন। তবে প্রতিবার তাঁর কাছে আসার সময় মোট (অর্থাৎ ঠাকুরের জন্য বাধ্যতামূলক নিয়ে যাওয়া খাবার) নিয়ে যাবার জন্য বলেন। ফকির ঠাকুর বা আউলে চাঁদের নির্দেশে শিবরাম প্রতিমাসে মোট নিয়ে ঠাকুরের সাথে দেখা করেন-তার সেবাযত্ন করেন আর ধর্মোপদেশ শোনেন। এভাবে শিবরাম দাস ধীরে ধীরে ফকির ঠাকুর বা আউলে চাঁদের অন্যতম ভক্ত হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। কথিত আছে শিবরাম ঠাকুরের মধ্যে আধ্যাত্মিকতা টের পেয়ে শিবরাম ঠাকুরকে বন্দনা করেই ফকির ঠাকুর নিজে গেয়ে উঠেছিলেন-

‘নতুন মানুষ ভবে এলো
জীবের সকল দুঃখ দুরে গেল।
ও তার নতুন আচার নতুন বিচার
নতুন এ ভাব জানাইলো।…’

একবার শিবরামকে পরীক্ষা করার জর‌্য আউলেচাঁদ তাকে নিয়ে গেলেন বিধুদোল দেখতে। মন্দিরে গিয়ে ফকির ঠাকুরসহ সকল ভক্ত বিগ্রহকে প্রণাম করলেন কিন্তু শিবরাম ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। সকলে পুবের বাঙ্গালকে নিয়ে কানাঘুষা করতে লাগল। আউলেচাঁদ শিবরামকে নাম ধরে ডাকেন।বলেন, ‘কি ব্যাপার শিব! তুমি প্রণাম করলে না কেন?’ শিবিরাম গলায় গামছা দিয়ে করজোড়ে আউলেচাঁদকে প্রণাম করে বলে-‘আমি তো তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে চিনিনা তাই তোমাকেই প্রনাম করছি।’

সত্য সদানন্দ সরদার জানান-‘শিবিরাম গলায় বস্ত্র দিয়ে করজোড়ে দন্ডায়মান হয়ে বলতে লাগল-ঠাকুর আমি তোমার, তুমি আমার, তুমি যদি হুকুম কর তাহলে সর্বক্ষন তোমাকে দিব সারা। আমি তো তোমাকে ছাড়া অন্যকাউকে চিনিনা। তুমি আমার সারৎসার।’২
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভক্তরা তাই আজো গায়-

ফকির জন কয়েক লোক সঙ্গে লইয়ে
বিধুদোল দেখতে গেলেন,
সকলে সাবা(প্রণাম) দেন ঐ বিগ্রহকে
শিবিরাম সাবা(প্রণাম) দিলেন ফকিরকে।

ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের যেমন কোন ধর্মগ্রন্থ নেই তেমনি শিবরাম সম্পর্কেও কোন প্রামান্য দলিল বা পুঁথি পুস্তক নেই। তার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানতে হলে লোক শ্রুতি ও ভক্তদের গানের পদই সহায়। এই লোকশ্রুতি ও গানের পদের সাহায্যেই সত্য সদানন্দ সরদার রচনা করেছেন তার খুব সংক্ষিপ্ত জীবনী গ্রন্থ ‘ফকির শিবিরাম ঠাকুর ও কর্তাভজা ধর্ম’। প্রচলিত লোকশ্রুতি গুলোই এখানে লিপিবদ্ধ হয়েছে যা শিবিরামের মহত্তকে প্রকাশ করেছে। ফকির টাকুর তার শিষ্যদের নিয়ে ভক্তদের নিয়ে বিধুদোল শেষে ফিরে আসছেন। হাঁটাপথ, তীব্রগরম, প্রচন্ড রোদ ভক্তরা আউলেচাঁদকে অনুরোধ করলো কোথাও একটু খানি বসে বিশ্রাম নিতে।সবাই একটি গাছতলায় বসার সিদ্ধান্ত নিল। এক ভক্ত বলল-ঠাকুর বসব কিসে? শিবরামকে নির্দেশ দেয়া হল পাশের বাড়ি থেকে চাটাই বা বিছানা নিয়ে আসার জন্য শিবরাম একটার পর একটা চাটাই আনে আর তাতে ভক্তরা কেউ বসে পড়ে কেউ বা পড়ে শুয়ে। এভাবে একে একে ১৮টি চাটাই আনা হল। ভক্তরা বসেছে কিন্তু ঠাকুরের বসার জায়গা হল না। শিবরাম কি করবে? শেষে সে তার কাঁধের গামছাটা পেতে দিলো মাটিতে। আউলেচাঁদ তাতে বসে পড়লেন। শিবরামকে তিনি শিষ্যত্বে বরণ করলেন। মন্ত্র দিলেন-
‘গুরু সত্য বিপদ মিথ্যা…
-কোট দিলেন-

চুরি ,ব্যভিচার, মদ
মাংস,ডিম, এটো, মিথ্যাকথা
ফকির এসে রীত বাতলালেন
কোট সত্য-ধর্ম, করবেন না অন্যথা।

ভক্তরা আজো শিবরামের সাথে ফকির ঠাকুরের লীলা পদে সেই স্মৃতি ধরে রেখেছেন।

‘আর পথে বসবার বিবেচনা করে
পাতিয়ে আঠারো বিছানা একজন মানুষের তরে
ঠাকুর বসার জায়গা না পেয়ে
শিবিরাম দিল গামছা পেতে,
ঠাকুর বসলেন গামছার পর
দেখে জীবের ভুল সারেনা…..

শ্রীচৈতন্য যে কৃষ্ণের নামে প্রেম বিতরনের প্রয়াস পেয়েছিলেন স্বামীবিবেকানন্দ যে যুগ ধর্মের প্রবর্তন করার চেষ্টা করেছেন বাউল সাধক লালনও সেই পথের পথিক; সেই পথে মোক্ষ ও মুক্তির সন্ধান করেছেন জগদানন্দ কাঠির কৈবর্ত সন্তান শিবরাম দাস। লালন যখন বলেন-এই মানুষে চেয়ে দেখ, সেই মানুষ আছে; কত যোগী ঋষি চারযুগ ধরে বেড়াচ্ছে খুজে।’ তখন শিবরামের ভক্তরা গায়-

“এবার সে ৩৬ বর্ণের ভান ঘুচাইয়ে
করতেছেন সে একাকার
চারি বেদ চৌদ্দশাস্ত্রে ধরা না পাইল যারে,
সেই মানুষ এই সংসারে করতেছেন বিহার।”

মানুষ ভজার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে শিবরাম ঘোষপাড়া ছাড়লেন। আউলেচাঁদের নির্দেশে তিনি বিয়ে করলেন ব্রজবাকশার পাচু বিশ্বাসের মেয়ে মায়া দেবীকে। তর গর্ভে শিবরামের তিন ছেলে জন্মগ্রহণ করে-তারা হলেন শম্ভু, রূপ ও সনাতন। মায়াদেবীর গর্ভসঞ্চার নিয়েও আছে লোকশ্রুতি। ধর্মগুরু বা সাধকদের কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা রকম গল্প বা কাহিনি তৈরী হয় । তবে সাধক মানুষদের কর্মক্ষমতার উপর দেবত্ব আরোপ করা হয়। এটি অতিপ্রাচীন কাল থেকেই হয়ে আসছে। বর্তমানে খ্রিস্টিয়ান সমাজে পোপকর্তৃক কাউকে সেন্ট ঘোষনা করার জন্য তার ঐশ্বারক ক্ষমতাকে আমলে নেয়া হয়, যাচাই করা হয়।
শিবরামের ক্ষেত্রেও সেই ঐশীশক্তির প্রভাব ছিল বলে তার ভক্তরা বিশ্বাস করে। শিবরাম এতটাই ফকির ঠাকুরের প্রতি নিবিষ্ট ছিল যে, সে প্রায়ই জগদানন্দকাঠি ছেড়ে ঘোষ পাড়ায় পরে থাকত। সেবা করত আউলে চাঁদের। এতে মায়াদেবী মনোকষ্ট পেতেন। একদিন তিনি মা-বাবাকে শিবরামের কথা বললেন। শিবরাম যে তার খবরই রাখে না। শুনে পাঁচু বিশ্বাস চলে গেলেন ঘোষ পাড়ায়। নালিশ করলেন আউলে চাঁদকে। আউলে চাঁদ ডাকলেন শিবরামকে। শিবরাম তখন স্নান ছেড়ে ভিজা শরীরে দাড়িয়ে আছেন। বললেন-আমার অপরাধ কি ঠাকুর? আউলে চাঁদ বললেন-গৃহী ধর্ম তুমি অমান্য করছো। পাঁচু বিশ্বাস বললেন-তুমি তো বাবা ভক্ত নিয়ে আছ আমার মেয়ে কি নিয়ে থাকে, বল দেখি? যদি ছেলে পুলে হত তা নিয়ে না হয় থাকত। শিবরাম বলল-ক’জন ছেলে লাগবে? পাঁচু বিশ্বাস বলেন-২/৩টা। শিবরাম বললেন-একটা কথা বলা হোক দুটো না তিনটা? পাঁচু বিশ্বাস বললেন তিনটা। শিবরাম তাকে গ্লাস আনতে বললেন, গ্লাসে গামছা নিংড়ে জল দিয়ে বললেন-এ জল পান করলেই তার ছেলে হবে। পাঁচু বিশ্বাস সেই জল এনে দেন মেয়েকে। সেই জল খেয়ে গর্ভঞ্চার হয় মায়া দেবীর।
একবার আউলেচাঁদ ঠাকুরের ইচেছ হল তিনি ভক্তের অর্থাৎ শিষ্যদের ভক্তি বা অনুরাগ পরিমাপ করবেন। ভক্তরা ভক্তি ভরে যে দান ফকির কে দিয়েছে তা বাটখাড়া দিয়ে পরিমাপ হবে। ঠাকুর আউলেচাঁদ দাড়ি পাল্লা আনতে বললেন। দাড়িপাল্লার এক পাশে শিবরামের দেয়া এক টাকা বা ষোল আনা দিলে অন্যপাশে বাকি শিষ্যদের দান তুললেন। না, সমান হল না। ঠাকুর বললেন কি ব্যাপার শিব। তিন রতি কম কেন? শিব হাসলেন। বললেন-যা তোমার তা তো তোমাকে দিলাম ঠাকুর আর তোমার নির্দেশে যে তিনটি ছেলে হল তাদের জন্যই তো কম পড়ল তিন রতি। এই লোক কাহিনীর সাথে যীশুর কাহিনীটির অদ্ভুদ মিল রয়েছে। একবার যীশুকে ফাঁদে ফেলার জন্য ইহুদী পুরোহিতেরা তাকে প্রশ্ন করল-প্রভু আপনার মত কী? সরকারকে অর্থাৎ কৈসরকে কর দেয়া কি ঠিক? যীশু উত্তর করলেন-‘যা ঈশ্বরের তা ঈশ্বরকে দাও যা কৈসরের তা কৈসরকে দাও।’ অর্থাৎ রাষ্ট্রর নাগরিক হিসেবে সরকারের যে দায়িত্ব তাকে তা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে সে স্রষ্টার সৃষ্টিও, তাই তাঁকেও ঈম্বরের মানথ পূর্ণ করতে হয়। শিবরাম গৃহী ধর্ম পালন করে বাকীটা দিয়েছেন ফকির ঠাকুরকে এটাই তো গৃহী ধর্মের অবশ্যপালনীয় কর্ম হওয়া উচিৎ।
ফকির ঠাকুর সন্তুষ্ট হয়ে বললেন-শিব তোকে আর ঘোষ পাড়ায় মোট নিয়ে আসতে হবে না। তুই জগদানন্দকাঠিতে বসে মোট দিবি।

শিবরাম ফিরে এলেন জগদানন্দকাঠি। ১১৬৯ বঙ্গাব্দে কার্তিক মাসের পূর্নিমা তিথিতে তিনি আসন গ্রহণ করলেন জগদানন্দকাঠিতে। জগদানন্দকাঠি গ্রামে বেতনা নদীর তীরে শিবরাম মহন্ত নিত্যধাম অবস্থিত। এই ধামের পূর্ব দক্ষিণ কোনে জগদানন্দকাঠি বাজার। বাজারের সাথে আছে প্রাচীণ একটি গাছ। লোকশ্রুতি আছে যে ফকির আউলে চাঁদের প্রধান ভক্তদের অর্থাৎ বাইশ ফকিরের আস্তানাছিল এই স্থানে। নানা জায়গা থেকে মানুষ এেেস এখানে মানথ করে। বটগাছ থেকে পশ্চিম দিকে শিবরামের দোল খোলা। তার একটু সামনে হিমসাগর। প্রতিবছর কার্তিক মাসের পূর্নিমা তিথিতে এখানে উৎসব হয়। ভক্তরা হিমসাগরের জলকে আতি পবিত্র মনে করে। হিমসাগরের উত্তর পাড়ে আউলে চাঁদের তালপাতার কুঁড়ে ছিল বলে কথিত আছে। বর্তমানে তা ঠাকুর ঘর এবং তা গ্রিল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।

শিবরামের ভক্তরা শিবরামের সাথে আউলে চাঁদকে একরূপ সাধনা করে। তারা মনে করে যিনি ফকির আউলেচাঁদ তিনিই শিবরাম ঠাকুর। এ প্রসঙ্গে সত্য সদানন্দ তার বইয়ে জানান “ ঠাকুর বলেন; শিব আমি তুমি, তুমি আমি, তোমা হতে আমার কোন ভিন্নতর নাই। অভেদ, যেমন জলকাটিলে ফাঁক থাকে না’ আজ তোর আর আমার এই অভেদ। এই ভাব ঠাকুর পোষণ করিলেন। এই দুই দেহ বকে, এই বাবে ফকির ঠাকুর শিবিরামের স্বরূপে রূপ মিশিয়ে পূর্ব দেশে অথাৎ জগদানন্দ কাঠি ঠাকুর আসলেন ১১৬৯ সালের কার্তিক মাসের পূর্ণিামা তিথিতে।’ ৩-এ প্রসঙ্গে ভক্তগণ গায়-

মিশিয়ে কেশে কেশে, মিশিয়ে বেশে বেশে
আসিয়ে বসলেন দেশে জগদানন্দ কাটি,

শিবরামের ঐশ্ব শক্তির গুনে সাধারণ মানুষ রোগ ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভ করতে শুরু করে। ভক্ত তাই গায়-

বলে বোবায় বুলি নামের গুনে
অন্ধজানা পায় নয়ন,
হাম, যক্ষা, কুষ্ঠ ব্যধি
কটাক্ষে তার হয় নিবারন।

শিবরামের আবির্ভাবে পূর্ববাঙলার ভক্তরা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে গায়-

‘.. শুনো শুনো ভাই সকল
জীবের মিটে গেছে সব গন্ডগোল
এবার ফালগুন মাসে ঘোষপাড়ায়
দোল করলেন সেই মহাজন
সেই মানুষ এলো এই জগদানন্দকাঠি
এসে মহন্ত মশায়ের বাটি
চান না ডালিম তলার মাটি
কথায় দুঃখ হয় নিবারন।

এতকাল যে সব ভক্তরা ডালিম তলার মাটি ছুয়ে রোগ বালাই দূর করত আজ তারা জগদানন্দকাঠিতে ভগবানের সন্ধান পেয়ে উদ্বেল। তারা মাটিতে নয় তাদের দুঃখ ঘোচে শিবরামের কথা শুনে। তিনি ক্ষুধার্তে অন্ন দিচ্ছেন, পিপাসায় জল দিচ্ছেন,তিনি মুসকিলের আসান, বিপত্তির ঢাল। তিনি কিছু চান না ,চান কেবলই মন। ভক্ত তাই গেয়ে ওঠে।

জগদানন্দ কাটি মানুষ বসিলেন যখন
এবার কিছু চাইনে, তিনি চেয়েছেন কেবল-ই মন।
হাত কপাল ঘুচে গেছে অখন্ড এই মন আছে
তাইতে তিনি মন চেয়েছেন মনগে তারে দাও।
এবার দিলেরে মন রবে সে ধন হবে দুঃখ নিবারন
আর এ কথা এই বলিলেন, রাখিলে থাকতে চালেন
তাইতে তিনি রীত বাতলালেন চেয়েছেন পিরিত
পিরিত নইলে রবেনা সে ধন, পিরিত তার প্রয়োজন।

এই গানে শিবরামের প্রবর্তিত ধর্মের রীত পদ্ধতির উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি যে মন ছাড়া কিছুই চান না। সাধনার একমাত্র উপকরণ মন, মন দিলে তবেই আসল ধন মেলে, দুঃখের নিবারন হয়, সুখ আসে কিন্তু সেই ধন ধরে রাখতে চাই পিরিত অর্থাৎ প্রীতি বা প্রেম। প্রেম ছাড়া মন অচল। এই গানের গভীর তাৎপর্যে ধরা পরেছে খ্রিস্টিয় তত্ত¡। যীশু বলেন-তোমার সমস্ত মন তোমার সমস্ত প্রান দিয়ে সদাপ্রভুকে ভালবাসবে।’ আর নিজের প্রতিবেশিকে আপনার মত প্রেম করবে।” এই দুটি বিশেষ আজ্ঞা শিবরামও প্রচার করেছেন আর এভাবে খ্রিস্টের মত শিবরামও তার ভক্তের কাছে রাজা হয়ে ওঠেন। ভক্ত গেয়ে ওঠে-
নতুন রাজার রাজ হলো
পুরানো অমলা সব তৈগিরী…..

শিবরাম ঠাকুরের ধর্ম প্রচার বাড়তে লাগল শয়ে শয়ে লোক এসে দীক্ষা নিতে লাগল। জগদানন্দকাঠি হয়ে উঠল সর্বধর্মের মানুষের তীর্থ ভ‚মি। সত্য সদানন্দ তার বইয়ে বলেন- ‘সত্য পথ অবলন্বন করে ঠাকুর শিবিরাম মহন্ত শুধু রোগ ব্যাধি মুক্ত করেন তা নয়। নির্ধনের ধন, মৃতকে জীভন পর্যন্ত দিয়েছেন-তখন বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন ধর্মের হাজার হাজার মানুষ এই ধর্ম গ্রহণ করতে লাগল।’৪
ঠাকুর শিবরামের অসংখ্য ভক্ত তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আশু মামুদ, পিরো মামুদ, ফতে মামুদ, কপাট দাস, রঘু চক্রবর্তী, হারি, রামদেব, ভায়ে গাজী, দাতা রাম সাহা প্রমুখ।
বাংলাদেশে ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের প্রবর্তক মহামানব শিবরাম ঠাকুর১১৭৮ বঙ্গাব্দের ভাদ্র ,১৭৭১ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করেও ভক্তদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে মিথ। লোক শ্রুতি অনুসারে একদিন শিবরাম স্ত্রী মায়া দেবীকে বললেন-‘আজ থেকে আমি এখানে সাতদিন সাত রাত ঘুমাবো। এই সাতদিন সাতরাতের মধ্যে যে ভক্ত আমাকে খুঁজতে আসবে তাকে তুমি বলবে যে আমি ঘুমিয়েছি।”
মায়া দেবী জানতে চান-কি জন্য এই ঘুম?আমাকে কি বলা যায়?
শিবরাম বললেন-‘এ এক কঠিন সাধনা, সত্যনাম নিয়ে যে চলবে সে যাতে এই ভাবে নিত্য ধামে যেতে পারে তার জন্য এ সাধনা। তুমি আমাকে বিছানা পেতে দাও।’ মায়া দেবী আর কোন কথা না বাড়িয়ে ঘরে ভিতর তার জন্য বিছানা করে দিলে শিবরাম ঘুমিয়ে পড়লেন। পরদিন এক ভক্ত এলেন-মায়া দেবী বললেন ইনি ঘুমিয়েছেন। এভাবে যত ভক্ত আসে তাদের সকলকে তিনি একই উত্তর দিলেন এভাবে তিনদিন পার হল। চতুর্থ দিনে মায়াদেবী বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলেন ঔ দেখ তিনি ঘরে মরে পরে আছেন। একথা বলার সাথে সাথে পচা দুর্গন্ধ ছুটতে লাগল। ভক্তরা ভক্তরা বুঝলেন শিবরাম দেহ রেখেছেন,
এদিকে জগদানন্দকাঠি থেকে হারি এসেছেন ফকির শিবরামের ভাইঝিকে খবর দিতে। বললেন ঠাকুর দেহ রেখেছেন। শুনে ভাইঝি অবাক। সে কি করে হয়? তিন দিন ধরে তো তার শিবকাকা তার বাড়িতেই আছেন মাত্র খেয়ে দেয়ে বললেন খুকু যেতে হবে। কত আবদার অনুরোধ কাকু থাকলেন না। মাত্রই চলে গেলেন। খুকু জানতে চাইলো-কোথায় দেহ রেখেছেন কাকা? হারি বললেন-জগদানন্দকাঠি। ভাতিঝি এলো হারির সাথে-হ্যা সত্যি-ই তো ঠাকুর দেহ রেখেছেন।
এবার সৎকারের পালা। সবাই তাকে নিয়ে শ্মশানে গেল বেতনা নদীর তীরে শ্মশানে চিতার উপর তুলে দেয়া হল মৃতদেহ। চিতায় দেহ রাখতে না রাখতেই শুরু হল ঝড়-বৃষ্টি। সবাই ঝড়-বৃষ্টির দাপটে লাশ ওভাবে রেখে নিরাপদ আশ্রয় চলে গেল। শুধু সেখানে থেকে গেল শম্ভু আর রূপ। ঝড় বৃষ্টি থামলে সবাই শ্মশানে এসে দেখে চিতার উপর ফকির ঠাকুরের দেহ নাই। তার দুই ছেলে শম্ভু আর রূপও নাই। একজন দেখল নদীতে এক লোক বড়শী দিয়ে মাছ ধরছে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল তুমি কি কিছু দেখেচ? সে বলল-দেখলাম একখানা নৌকা উত্তর দিক থেকে এসে এখানে থামলো। একজন লোক তাতে উঠলেই নৌকাটি দক্ষিণ দিকে চলে গেল। আর দুটো ছেলে সেই নৌকার পিছে ছুটতে ছুটতে বাবা বাবা বলে ডাকছিলো। এ কথা শুনে সকলে নদীর তীর ধরে খুঁজতে লাগলো কিন্তু কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া গেলনা। সবাই হতাশ আর বিষন্ন হয়ে যখন ফিরছে তখন দৈব বানী হল;
যারা এই সত্য ধর্ম এই সত্য নাম
সত্যপথে থাকবে
তাদের মৃত্যুর পর অগ্নিদাহ্ করা হবেনা।
সবাইকে সমাধি দিবে।৫
ভক্তরা বাসায় ফিরে এসে দেখে ঘরে মা মায়াদেবীও নেই, নেই ছোট ছেলে সনাতনও। ভক্তরা এই অলৌকিক ঘটনায় ভেঙ্গে পড়লে-শিবরাম তাদের বললেন-সত্য নামেই জীবের শক্তি। তোমরা পাঁচজন এক হয়ে যা বলবে সে তা শুনবে।
সে অতীত ছিলো, বর্তমানে আছে
ভবিষ্যতেও থাকবে….
ভক্তের প্রেম ডুরিতে চিরকাল থাকরে।৬
এখানে শিবরাম খ্রিস্টের বানীই যেন প্রচার করলেন-‘আমার নামে যেখানে দুই বা তিনজন উপস্থিত হয় আমি তাদের প্রার্থনা শুনি।’ যা হোক শিবরামের মৃত্যুর পর কে হবে গুরু তাই নিয়ে বিতন্ডা শুরু হলে শেষ পর্যন্ত সবার সিদ্ধান্তক্রমে শিবরামের বড় ভাইয়ের মেয়ে গুরু হন। শিবরাম ঠাকুরের ভাইঝির মৃত্যুর পর গুরুহন তার ছেলে অমূল্য মহন্ত।৮

ভক্তের ভক্তিতে শিবরামের অবস্থান:

কর্তাভজা সম্প্রদায়ের প্রবর্তক আউলে চাঁদকে যেমন ভক্তরা শ্রীচৈতন্য জ্ঞানে বিশ্বাস ও মান্য করে তেমনি শিবরাম ফকিরকে তাঁর অনুসারিরা আউলে চাঁদের অবতারাংশ বলে বিশ্বাস ও মান্য করে। তাই তাঁরা আবির্ভাবপদে গেয়ে ওঠেন-

শুনো শুনো ভাই সকল
জীবের মিটে গেছে সব গন্ডগোল।
এবার ফাল্গুন মাসে ঘোষ পাড়ায়
দোল করলেন যেই মহাজন,
সেই মানুষ এলো এই জগদানন্দকাটি,
এসে মহন্ত মহাশয়ের বাটি,
চান না ডলিম তলার মাটি
কথায় তাঁর দুঃখ নিবারণ।

ভক্তরা আউলেচাঁদ ও শিবরামকে আলাদা ব্যক্তি হিসেবে মান্য করেন না। তাদের কাছে বরং আউলেচাদঁ যেমন মহাজন শিবরামও তেমনই মহাজন। ভক্তরা তাই গায়-
এই ফকির বলো যারে দেখো সেই এক্তারে
তার রয়েছে সর্ব্বস্ব ধন, ফকির হয় জগতের মহজন।

শিবরাম ফকির ভক্তদের কাছে কেবল মহাজন ই না তিনি চার যুেগর অবতার, যুগ স্রষ্টা-

আর সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলি, চারযুগ সবে বলাবলি
এই চারযুগের অধর ধন এবার ধরা দিয়েছে।
… … …
আর সৃষ্টি করলেন যিনি সেই হতে উৎপত্তি তিনি
ভেবে বোঝ মনে মনে কার আগমন হয়েছে।

মনুষের মধ্যে দেবত্ব আরোপ করা নতুন কিছু নয়। প্রতিষ্ঠানিক ধর্মেও এরকম দেবত্ব আরোপ লক্ষ করার মতো যেমন খ্রিস্ট ধর্মে যিশু মানুষ হওয়া সত্বেও তার অলৌকিক ক্ষমতায় সাধারণ ভক্তের বিশ্বাস অটুট। শিবরামও তার ব্যতিক্রম নন। তিনি ত্রেতা যুগে ধনুর্ধারী রাম অবতার , দ্বাপরে বংশিবাদক কৃষ্ণ হয়ে জীবকে দয়া করেছেন। শুধু তাই নয় শিবরাম যে সয়ং শিব তাও তাঁর ভক্তরা বিশ্বাস করে। দেবত্ব আরোপ করার পরেও আবেগাক্রান্ত ভক্তরা তাকে অধর মানুষ বলেও মেনে নিয়েছেন।তাঁরা ফকির বিনা মুক্তির উপায় খুঁজে পান না। কেননা ফকিরই তাদেও বিষ্ণু হরি যার নাম মাহাত্ম্য লিখতে মুনির কর কেঁপেছে। এ নাম জীবের পক্ষে মূখ্যধাম সরূপ। এ নাম নিলে মুখে আপদ খন্ডে বিপদ খন্ডে ভব রোগের আরাম হয়। এভাবে আউলে চাঁদ যেমন কর্তাভজাদের কাছে মুক্তির পথ ও পাথেয় হয়ে আছেন তেমনি বাংলাদেশের ভগবানিয়াদের কাছে ঠিক একই ভাবে ফকির শিবরাম ঠাকুরও মুক্তির পথ ও পাথেয় হয়ে গেছেন। তাই ভক্তরা গায়-
আর হালিশ্বরে যে পায় সেখানে
সে-ই পায় রুপ এইখানে।
অর্থাৎ হালিশ্বর ঘোষপাড়াতে গিয়ে যে ভক্ত আউলে চাঁদকে পায় সে এইখানে অর্থাৎ জগদানন্দকাটিতেও তাকে পায় বা পেতে পারে। এভাবে আউলেচাঁদ ও ফকির শিবরাম ঠাকুর ভক্তের কাছে এক হয়ে যান। আর এভাবে শিবরামের ভক্তরা তাদের মানব জনম সফল করতে গেয়ে ওঠেন-

দয়াল মহানন্দে উঠছে কান্দি,
উঠল প্রেমের তুফান জগদানন্দকাটি।
অধম হলি তুই তর্কবাদী
ডুব দিলিনে রুপসাগরে।

 

তথ্যসূচী:
১.সত্য সদানন্দ সরদার, ফকির শিবিরাম ঠাকুর ও কর্তভজা ধর্ম, প্রাগুক্ত, পৃ: ২৬।
২.প্রাগুক্ত, পৃ: ২৭।
৩. প্রাগুক্ত,পৃ: ৩৩।
৪. প্রাগুক্ত, পৃ:৩৩।
৫. প্রাগুক্ত, পৃ: ৩৫।
৬. প্রাগুক্ত, পৃ: ৩৬।
৭. প্রাগুক্ত, পৃ: ৩৬।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত