বেড নাম্বার ১৪২৪ (পর্ব-৩)

 


বিতস্তা ঘোষাল আবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ইরাবতী পরিবার তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করছে। কিছুদিন আগেই হাসপাতালের দিনগুলো নিয়ে ধারাবাহিক  লিখেছিলেন কেবিন নং ৩০৪। আজ থেকে শুরু করলেন বেড নাম্বার ১৪২৪ নামে এক নতুন লেখা। ডায়েরির মত করে লেখা এই আখ্যান কেবল একজন রুগীর নয়, একজন কবির চোখে দেখাও বটে। আজ তার তৃতীয় কিস্তি।


 

দ্বিতীয় দিনের রাত

 

৯ টার মধ্যে শুয়ে পড়েছিলাম প্রচন্ড কাঁপুনির কারনে।কিন্তু শুলে কী আর কাঁপুনি কমে না কি ঘুম আসে! অন্য ওষুধগুলো খেয়ে নিয়েছিলাম।ভাবলাম ঘুমিয়ে নিই, ততক্ষণে কাঁপুনি কমুক।তারপর না হয় এন্টিবায়োটিক চালু করবে।এমনিতেও ওটা দেবার সময় রাত দশটা ।
তিনটে কম্বল নিয়ে শুলাম ঠিকই।কিন্তু পাশের মাসিমার চিৎকার শুরু হয়ে গেল ।প্রথমে খাওয়া নিয়ে তুড়ার সঙ্গে ঝামেলা , তারপর আমি এখানে অন্ন গ্রহন করব না জাতীয় কথা ।
আমি বললাম, মাসিমা কাল তো তোমার ছুটি, কিন্তু তুমি না খেলে ডাক্তার ছাড়বে না।তখন উনি মুড়ি দুধ খাবে বলে বায়না ধরলো ।দুধ মুড়ি এল যখন তখন তার আর সে ইচ্ছা নেই।তিনি তখন আগের খাবারের থেকে একটু খেয়ে তুড়াকে বকতে লাগল।
খাওয়া পর্ব মেটার পর শুরু হল, ও দিদি তুমি একটু বুলাকে ফোন করে বলে দাও আমার জামা কাপড় নিয়ে আসতে।তাকে বোঝানো যায় না এত রাতে জামার দরকার নেই।
এরপর হঠাৎ তার নজরে পড়লো আমার গায়ে আর একটা কম্বল দেওয়া ।তার শীত করতে শুরু করল।অথচ নিজের কম্বল ও চাদর কোনোটাই তার গায়ে নেই।সরিয়ে দিয়েছে সব।তবু জেদ।কম্বল আরেকটা লাগবেই।আমার জ্বর মাথা ব্যথা তখন আকাশ ছোঁবার পথে।
তুড়াকে বলি, মারে দয়া কর, ওনাকে একটা কম্বল দে।তবে উনি শান্ত হবে।কম্বল এল।এবার ডাক্তার কোন আসছে না তার জন্য শুরু হল বায়না।
আমাকে বলে , দিদি তুমি ডাক্তারকে বলো , তবে ঠিক আসবে।বাধ্য হয়ে আর এম ও কে ডেকে পাঠালাম ।তিনি এলেন, জানতে চাইলেন, কী সমস্যা , বললেন, কাঁপুনি, শীত করছে ।উনি চাদর কম্বল ভাল করে জড়িয়ে দিয়ে চলে গেলেন।
রাত তখন ১ টা।
আমার আন্টিবায়োটিক শুরু করা যায় নি এসব চক্করে। চ্যানেলে ওষুধ স্যালাইন এর মাধ্যমে শুরু করা মাত্র হাত ফুলে গেল মারাত্মক ।অর্থাৎ এই চ্যানেল খারাপ হয়ে গেছে ।ডাক্তার এলেন।আর এম ও। ড:বানীব্রত নাথ। চ্যানেল করলেন।অনেকক্ষণ গল্প হল।বললেন, কোনো জিনিস ভালোবেসে না করলে আর পারফেক্ট না হলে সেই কাজের মূল্য কমে যায় ।চেষ্টা তো করা যেতে পারে ভালো কিছু করার ।ভালো লাগলো শুনে।
আরো কিছু কথার পর বললাম, ধন্যবাদ ডক্টর, এত রাতে বিরক্ত করার জন্য ।সুন্দর চেহারার ডাক্তার বানীব্রত নাথ বললেন, বলুন তো ম্যাডাম, হাসপাতালে কজন রোগী আসেন, যারা ভালো করে কথা বলেন! আপনার মতো পেশেন্ট তো কমই পাই।তাই বিরক্ত করলেন বলবেন না।বরং আমার ভালো লাগল বহুদিন পর।
ওষুধ চালু হল আবার।জ্বরও বাড়ছে।এবার বমি।বেচারা তুড়া সবে চেয়ারে গিয়ে বসছে।আমার ডাকে উঠে এল।
এসবের মধ্যে দিয়ে ঘড়ির কাটা ছুটে চলেছে।রাত প্রায় ৩ টে।মাসিমার বাবু এলি, বুলা এলি ডাক বন্ধ হয় নি।
আমি না চাইলেও বারবার মাসিমাকে বোঝাতে চাইছি , আসবে মাসিমা, ঘুমিয়ে পড়ো।সকাল হতে চলল।দেখবে সূর্যের আলো ফুটলেই চলে আসবে।
এতক্ষণে কী বুঝল কে জানে ! বলল, তুমি সত্যি কথা বলো।আমি তাহলে শুলাম।ভোরে ওরা এলেই ডেকে দিও।আর তুমি ফোন করে দাও জামা কাপড় আনার জন্য।
মাসিমাকে আশ্বস্ত করি।
সেই মুহূর্তে বাবার কথা মনে পড়ছিল ।বাবাকে যখন দেবী শেঠীর হসপিটালে ভরতি করা হয়েছিল বাবাও বাড়ি যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।বাবাও রাতে ঘুমতেন না।ছাড়ার আগের দিন আই সি সি ইউ থেকে কেবিনে দিলে সারা রাত প্রশ্ন করছিলেন, কটা বাজে রে? আর কতক্ষণ বাদে বাড়ি যাব? যত বলি, বাবা সকাল হলেই চলে যাব।ততবার বলে, তুই মিছে বলছিস।ভোর হয়ে গেছে ।
আসলে সব বাবা মাই বোধহয় একটা বয়সের পর বাড়ি অন্ত প্রাণ হয়ে যায় ।সেখানেই নিশ্চিন্ত আশ্রয় খোঁজে ।হতে পারে ছেলে মেয়ে সব বিদেশে, হতে পারে একা দীর্ঘদিন, কোনো না কোনো আয়া মাসির ভরসায়, তবু বাড়ির ওই চার দেয়ালের ভিতর নিজের খাট, নিজের বিছানা, নিজের বাথরুম. . এই সব কিছুর মধ্যে সে পরম শান্তি খুঁজে পায়।
শান্তির সন্ধানেই তো আমাদের পথ চলা. . .

 

 

 

 

 

 

 

.

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত