বেড নাম্বার ১৪২৪ (পর্ব-৫)

Reading Time: 2 minutes

বিতস্তা ঘোষাল আবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ইরাবতী পরিবার তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করছে। কিছুদিন আগেই হাসপাতালের দিনগুলো নিয়ে ধারাবাহিক  লিখেছিলেন কেবিন নং ৩০৪। আজ থেকে শুরু করলেন বেড নাম্বার ১৪২৪ নামে এক নতুন লেখা। ডায়েরির মত করে লেখা এই আখ্যান কেবল একজন রুগীর নয়, একজন কবির চোখে দেখাও বটে। আজ তার পঞ্চম  কিস্তি।


চতুর্থ দিন

মাসিমা চলে যাবার পর হঠাৎ করেই শূন্যতা।কিন্তু কোনো শূন্যতাই তো শূন্য নয়।পূর্ণ হবার প্রক্রিয়া ।তাই সেই বিছানায় এসে গেল রাখীদি। রাখীদি পেটের স্ক্যান করাবেন।তাই একদিনের অতিথি।তার কথা বলার আগে বরং পরের বেডের মাসিমার কাছে যাই। এ ঘরে দুটো খুব ছোটো কাচের জানলা ।সেই জানলার ধারের একটি বেডে মাসিমা।আমি আসার পরদিন দুপুরেই ভর্তি হয়েছে ।বয়স ৯০ এর কাছাকাছি ।বাঁজখাই গলা।ভর্তি হয়েছে পেটের সমস্যা নিয়ে। অগত্যা সারাদিন রাত বেড প্যানের নিচে।হাগিস পরানো যায় না।সঙ্গে সঙ্গে আলার্জি।মাসিমা চেঁচিয়ে যান, বেড প্যান দাও।কারোর দেখা নেই।আবার চেঁচান। বাধ্য হয়ে আমি আসরে ।প্রথমে বেল, তারপর সিস্টার খুঁজি।তাতেও না কাজ হলে ঘর থেকে বেরিয়ে নিয়ে কাউকে ধরে।বয়স্ক মানুষ কতক্ষণ চেপে রাখতে পারেন! কেন জানিনা এখানে বয়স্ক দের সঙ্গে থাকতে থাকতে ভীষণ বাবার, মায়ের, শাশুড়ি মায়ের মুখ মনে পড়ছে ।হাসপাতালে ওরাও কী ঠিক যত্ন পান? বাবার ক্ষেত্রে আর এন টেগরে দেখেছি কী কষ্ট পেয়েছে মানুষটা, জল তেষ্টায় গলা শুকিয়ে গেছে , কেউ জল দেয় নি।ভিজিটিং আওয়ারে গিয়ে জল দিয়েছি । আমি খুব প্রতিবাদী চরিত্র নই।বরং অনেক কিছুই মেনে নেই, মনে মনে যন্ত্রণা পাই।এখানে এসে কেন যে এদের ভীড়ে বাবার মুখ মনে পড়ছে, আর ভেতর থেকে কেউ বলছে, না তোমাকে এটা করতে হবে। বাবার সময় বোনেরা প্রতিবাদ করেছিল।আমি নীরব ছিলাম।ভয় পেতাম কোনো অশান্তির ।কিন্তু এখন হঠাৎ নিজেকে পরিবর্তিত রূপে দেখে অবাক হচ্ছি ।হয়তো তখন ঘটে যাওয়া দৃশ্যাবলীর প্রতিবাদ গুলো নীরবে মনের ভিতরে ছিল । সেগুলোই জমতে জমতে এভাবে বাইরে বেরিয়ে আসছে। ফিরে আসি মাসিমার কথায়।বিশাল চেহারার মাসিমা।অবিবাহিত ।সকাল বেলায় কটি ছেলে নিয়ম করে দেখতে আসে।শুনলাম, তারা সব পালিত।মাসিমার বাড়িতে যে মেয়েটি কাজ করত, একটি তার।সে বেচারা তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে কাজে এসেছিল।অসুস্থ হয়ে হঠাৎ মারা গেল।বর বাচ্চাকে ফেরত নিল না।সেই বাচ্চা মাসিমা কোলে তুলে নিলেন।এভাবেই অনেক অনাথ মাসিমার সন্তান।আমি তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে মনের আতস কাচ দিয়ে মেপে নিতে চাই কতটা ভালবাসা, কতটা অভিনয় লুকিয়ে ! না, টিভি সিরিয়ালের ব্ল্যাক চরিত্রের মত কোনো নীল আলো চোখে পড়ে না।শুধু ভালবাসা আর কী ভীষণ নির্ভরতা সেখানে । মাসিমার নাম রমা।স্টেট ব্যাঙ্কের প্রাক্তনী।ওনাকে দেখে বাবার কথা মনে পড়ে ।নিজের সন্তানকে মানুষ ভালোবাসবে, এতে আশ্চর্যের কী আছে, এটা তো ইনস্টিংক্ট।কিন্তু কোনো কিছু না ভেবে যিনি পরের সন্তানকে নিজের মত মানুষ করেন তিনিই আসল মা। বিকেলে আসেন মাসিমার ভাই, ভাইয়ের বউ আর তাদের মেয়ে। আমি রমা মাসিমাকে মুগ্ধ হয়ে দেখি। শ্রদ্ধায় মাথা নিচু হয়ে আসে । আর মনে হয় বাবা ঠিকই বলতেন, যুগ যুগ ধরে এই হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আসেন বলেই আজও মানুষ এগিয়ে চলেছে জীবনের খোঁজে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>