বেড নাম্বার ১৪২৪ (পর্ব-৭)

বিতস্তা ঘোষাল আবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ইরাবতী পরিবার তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করছে। কিছুদিন আগেই হাসপাতালের দিনগুলো নিয়ে ধারাবাহিক  লিখেছিলেন কেবিন নং ৩০৪। আজ থেকে শুরু করলেন বেড নাম্বার ১৪২৪ নামে এক নতুন লেখা। ডায়েরির মত করে লেখা এই আখ্যান কেবল একজন রুগীর নয়, একজন কবির চোখে দেখাও বটে। আজ তার সপ্তম  কিস্তি।


ষষ্ঠ দিন

আজকের গল্প বাসন্তি মাসিমাকে নিয়ে। দরজার মুখোমুখি যে বেড জানলা ঘেঁষে সেটাই তার। পায়ের সেলুলাইটিস নিয়ে ভরতি। মাসিমার মূল সমস্যা কিন্তু পা নয়, দাঁত। বাঁধানো দাঁতের পাটি কোথায় রাখবেন, কে ধুয়ে দেবে এটাই তার প্রধান চিন্তা।অগত্যা এই অধমকেই ব্যবস্থা করতে হয় রোজ। বলে বলে রাখার জন্য নাইটিস বক্স যোগার তো করে দিলাম । এরপর ধোবে কে? উনি বলেন, বিতস্তা , তুমিই পারবে এর বন্দোবস্ত করতে।
বেড প্যান দিতে রাতে যে ভারতী মাসি কিংবা বাসনা মাসি আসে, তাদেরই বলি, মাসিমা বলছিল কে তার দাঁত ধুয়ে দেবে! আমি বলি তোমাদের মতো ভালো মাসি এখানে কেউ নেই। এমন যত্ন কেউ করে না।দেখছি তো কদিন ধরে।
বলি, মাসিমা চিন্তা নেই, এই দিদিরা আছে তো।তোমার খাওয়া হলে বোলো। করে দেবে।
বাসন্তী মাসিমার দ্বিতীয় চিন্তা তার শরীরে রক্ত নেই।অথচ রক্ত টেস্ট হচ্ছে । রোজ খোঁচাখুঁচি চলে। ঠিক, এখানে এই তৃতীয় শ্রেণির সিস্টার, যাদের দ্বারা মূলত এই পরিকাঠামো চালায়, তারা কেউ ব্লাড নিতে পারে না।আমি নিজেও তার সাক্ষী । দুই হাতে বার বার খুঁচিয়েও রক্ত নিতে পারেনি। অবশেষে আর এম ও এসে নিলেন।
আপাততঃ মাসিমার এই দুই গুরুত্বপূর্ণ দুঃশ্চিন্তা।মাসিমার সঙ্গে গল্প হয় । খুবই আস্তে কথা বলে।ভুটানের মেয়ে। একসময় যে বেশ সুন্দরী ছিলেন, তার পরিচয় এখনো শরীরে। বাপ মায়ের ১১ নং সন্তান।কেন যে এতগুলো বাচ্চার দরকার হয়েছিল ভগবান ছাড়া কেউ জানে না, নিজেই বলে হাসে।বাবা তো জন্ম দিয়েই মরে গেল। বড় ভাই পুরো পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে পাগল হল। এতগুলো ভাই বোন মা। স্কুলে পড়লাম ভুটানেই।
দাদা তখন মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়ে চিকিৎসা করছে। আমাকে নিয়ে এসে ব্রাক্ষ্ম কলেজে ভর্তি করল।মা বলল, আর দায়িত্ব নিতে পারবে না।দাদাই জোর করে পড়ালো।তারপর বিয়ে হয়ে গেল দ্বিতীয় বর্ষে । বর ত্রিবান্দ্রমে চাকরি করে। সেখানেই এতগুলো বছর কাটিয়ে
মাসিমার দুই মেয়ে। দুজনেই বিদেশে। দুজনেই ডাক্তার। বর কানে কম শোনেন।
বারবার আফসোস করছেন, ও কারোর হাতে খেতে পারে না। কানে কম শোনে।এখানে না এলেই ভাল হত। একা মানুষটা কী যে করছে!
এই একা শব্দটা বড্ড ভাবায় আমাকে। যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো মানুষ একা হয়ে যাচ্ছে , যায়, যাবে।সন্তানরা দূরে দূরে। কী হবে ভবিষ্যতে এই মানুষগুলোর! বৃদ্ধাশ্রম গুলোই কী শেষ অবধি আশ্রয় হবে!
আমারই বা ভবিষ্যত কী!

এখন মাসিমার পায়ে পাত বসানো তিনটে। সেই পায়েই সেলোলাইটিস। ডাক্তার অনুমান করছেন, ওরই নাট বল্টু থেকে ইনফেকসন। মাসিমা বাড়ি যেতে মরিয়া ।

আমিও মরিয়া । এখান থেকে মুক্তি পেতে।সাতদিন পেরিয়ে গেছে। আর এত ঘুমহীণ রাত দূর্বল শরীর টানতে পারছে না।
তবু আমি ভালো আছি । নিজের চাহিদাটা গলা উঁচু করে বলতে পারছি। কিন্তু এনারা! যেই আসছেন আমার ওপর নির্ভর হয়ে যাচ্ছেন।
ঈশ্বরের মায়ার ফাঁদ সর্বত্র পাতা। আমাকে কেবলই সে বন্ধনে বেঁধে ফেলছেন। আর আমি তত মুক্তি খুঁজছি তাঁর কাছে , তাঁর আমাকে সমর্পিত কাজের কাছে।
মনে মনে গুন গুন করি. .
“একি পরম ব্যথায় পরান কাঁপায়, কাঁপন বক্ষে লাগে।
শান্তিসাগরে ঢেউ খেলে যায়, সুন্দর তায় জাগে।
আমার সব চেতনা সব বেদনা রচিল এ যে কী আরাধনা–
তোমার পায়ে মোর সাধনা মরে না যেন লাজে
বন্দনা মোর ভঙ্গিতে আজ সঙ্গীতে বিরাজে॥”

 

 

 

 

 

.

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত