বেড নাম্বার ১৪২৪ (পর্ব-৮)

বিতস্তা ঘোষাল আবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ইরাবতী পরিবার তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করছে। কিছুদিন আগেই হাসপাতালের দিনগুলো নিয়ে ধারাবাহিক  লিখেছিলেন কেবিন নং ৩০৪। আজ থেকে শুরু করলেন বেড নাম্বার ১৪২৪ নামে এক নতুন লেখা। ডায়েরির মত করে লেখা এই আখ্যান কেবল একজন রুগীর নয়, একজন কবির চোখে দেখাও বটে। আজ তার অষ্টম  কিস্তি।


সপ্তম দিন

 

এন্টিবায়োটিক, লোনাজেপ ও অন্যান্য ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । আটটায় ডিনার দিয়ে গেছিল।খিচুরি, সেমুয়ের পায়েস।খেয়ে শুয়ে পড়লাম ।
এখানে কাজই বা কী আমার! নতুন আসা পাশের বেডের মাসিমার ব্লাড দেওয়া শুরু হল।আমার কেমন মাথা ঘোরাচ্ছিল। তাই আর এতটুকু সম়য় নষ্ট না করে মাসিমার উল্টো দিকে মুখ করে শুলাম।অন্যদিন তাও একটু লিখি, হোয়াটস এপ করি । কিন্তু আজ পড়া মাত্র ঘুম।
স্বপ্ন দেখছিলাম বোধহয় ।একটা ফাঁকা রাস্তা ।আমি যত হাঁটছি সামনেটা তত নির্জন হয়ে যাচ্ছে ।পথটা ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হচ্ছে ।
হঠাৎই কেউ যেন ধাক্কা মেরে বিছানা থেকে উঠিয়ে দিল।প্রচন্ড ভয় পেয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম।মুহূর্তে চোখ গেল সামনের মাসিমার বেডের দিকে।সাইডে লাগানো রেলিং কিভাবে যেন তার পায়ের উপর পড়ে গেছে ।আর তার ফাঁকে মাসিমার পা আটকা পড়েছে।তিনি যত টানছেন পা তত বেঁধে যাচ্ছে ।
মাথাটা দ্রুত কাজ করল।
একদৌড়ে নামলাম নিজের বিছানা থেকে।ছুট্টে মাসিমার বিছানায় ।রেলিং থেকে সাবধানে পা বের করলাম।পা তখন টানাটানিতে বেশ লাল হয়ে গেছে ।
ঘরে কোনো সিস্টার নেই।শুনলাম মিনিট কুড়ি ধরে পাশাপাশি বেডের দুই মাসিমা বেল বাজাচ্ছে।কেউ আসছে না।
রাতের সিস্টার প্রিয়াঙ্কা আসলে খেতে গেছিল।বেলের সুইচগুলো বাজছে না।আমি গিয়ে ধরে আনলাম তাকে।খুব ধমক দিলাম।যদি কোনো অঘটন ঘটে যেত কে দায় নিত! বেচারার করুন মুখ দেখে মায়া হল।

এখানে এই একটা মারাত্মক সমস্যা।কেউ খেতে গেলে অন্য কেউ তার বিকল্প হিসেবে থাকে না।প্রতি রোগী পিছু একজন করে সিস্টার বা এটেনডেন্ট মেলা দুষ্কর।
শোবার পর হাত পা কাঁপছে ।কতবড় দূর্ঘটনা ঘটতে যেতে পারত! প্রিয়াঙ্কাকে বকলাম বটে, কিন্তু ওকেও তো খেতে হবে।
কিন্তু আমি তো গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে গেছিলাম ।কে ডাকল আমায়।
ঘুম এল না বেশ কিছুক্ষণ ।ঠান্ডা মাথায় মাসিমাকে জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে হল।মাসিমা লাজুক মুখে বলল, ভীষন বাথরুম পেয়েছিল।বেল বাজিয়ে ডেকে না পেয়ে নিজেই নামতে গেলাম।নইলে বিছানা নোংরা হয়ে যেত।কিন্তু কপাল খারাপ ।এমন ঘটে গেল।
আমি আর কথা বাড়ালাম না।চোখ বন্ধ করে ঘুমোবোর চেষ্টা করতে লাগলাম ।
মুখোমুখি দুই মাসিমা গল্প জুড়েছেন।এদের মধ্যে তৃতীয় বেডের মাসিমা ত্রিপুরার ।প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন।এখানে গড়িয়াহাটে থাকেন।ছেলে দুবাই।
কাল সকালে চা খেতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে ২ টো স্টিচ পড়ে ভর্তি হয়েছেন।
খবর পেয়ে ছেলে -ছেলের বৌ নাতি নিয়ে দুবাই থেকে রওনা হয়ে গেছে ।
তিনি তার গল্পের ঝুড়ি খুলে বসে।কোন পাড়া -কোন আত্মীয়- কে কার মা বাবাকে দেখে না -কে বিদেশে থাকে, ঢাকা -চট্টগ্রাম . . .
আমার কিছু কানে আসে।কিছু ঘুম ঘুম মাথার অশান্ত নার্ভের উপর দিয়ে ঘুরতে থাকে ।আমি ক্রমশ আবার তলিয়ে যাই ঘুমের রাজ্যে ।
যতক্ষণ না প্রিয়াঙ্কা ওষুধ দেবার জন্য ডাকে।
স্কিনের ডাক্তার আসেন।বলেন ওষুধের প্রতিক্রিয়া।কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।বলেন, সাবান ধরবেন না। সবজি কাটবেন না।কাঁচা মাংসে কখনো হাত দেবেন না।
হাসি পায় । মেয়েরা রান্নাঘর, বাসনমাজা, কাপড় কাচা , বাথরুম পরিষ্কার করেই সারা জীবন কাটিয়ে দেয়। সবজি কাটার জন্য কজন মানুষ আলাদা লোক রাখে!
কিন্তু ডাক্তারকে এই সকাল ৬টায় সেসব বোঝাতে মন চাইল না।বললাম, সকাল সুন্দর হোক।
নির্ঘাৎ ভাবলেন, মাথার ব্যামো। যা ভাবলেন,ভাবুক।আমি আমার ভাবনার স্রোতে নৌকা ভাসিয়ে দিয়েছি।
চোখের সামনে আবার শুরু হয়ে গেছে দিন।
অচেনা একটা দিন।জানি না আজকের সূর্য কী নিয়ে উদিত হল আমার ভাগ্যাকাশে।তবে যাই হোক আঁধারের পর আলো আসবেই, এই বিশ্বাস আমার আছে।
কাজেই চরৈবতি: চরৈবতি:. . . . . পথ চলি নিরন্তর আনন্দে।

 

 

 

 

.

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত