বেড নং ৩১১৮ (পর্ব-২)

ঘুম ভেঙে গেল পাশের বেডের মাসিমার মুখে কাঞ্চনা নামটা শুনে।মাথার মধ্যে গুঞ্জরিত হল ওই পাখিটির নাম খঞ্জনা , আর নদীটির নাম বুঝি রঞ্জনা-ওদের সাথে বুঝি আকাশের চেনাশোনা।কিন্তু কাঞ্চনা! সে কে? কোনো গৌরবর্ণা নারী! মাসিমা কার কথা বলছেন?
মাসিমা বলছিলেন আমি জমিদার বাড়ির বড় বৌ।জানিস, আমাকে কত মানুষ ভয় পায়, সমীহ করে।হিন্দু মুসলিম, বৌদ্ধ, আদিবাসী সবাই আমাকে মা বলে ডাকে।আর তুই কিনা আমাকে খেতে হুকুম করিস!
তাহলে কী যে মেয়েটি মাসিমার দেখাশোনা করছে তার নাম কাঞ্চনা?
পরমুহূর্তেই মাসিমার হুংকার কাঞ্চনা গ্রামের পাশ দিয়ে রঞ্জনা নদী বয়ে যায় ।আমার শ্বশুরের ভয়ে সেখানে বাঘে গোরুতে একঘাটে জল খেত বুঝেছিস!
এবার বোঝা গেল কাঞ্চনা একটি গ্রামের নাম।কিন্তু কোথাকার? এপার বাংলা না এপার বাংলা? সঙ্গে সঙ্গে মনে হল আরে ও বাংলার নির্ঘাত।হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ যখন বলছেন তখন বাংলাদেশ হতেই হবে।আমার অনুমান সত্য করে মাসিমা বলে উঠলেন, কুটুম্ব এলে কীভাবে যত্ন নিতে হয় জানো না?
জানিস আমাদের ৫০ থেকে ষাট পদ রান্না হত নিয়মিত।তোরা আজকালকার মেয়েরা কিছুই পারিস না।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি বলল, দিদা, তুমি এখন খেয়ে নাও।তারপর আমাকে নিজের হাতে রান্না শেখাবে।
মাসিমা তখন সোনাই সোনাই ওদিকে যাস না।খেয়ে নে, মা খেতে দেয় নি, ও সোহাগী নিশ্চয়ই ঘুমচ্ছে,
আমার কাছে এসো তুমি. . . বলে ডেকে যাচ্ছে ।
আমি এবার কিছু কিছু আধখাচরা কথা জোরা লাগাবার চেষ্টা করছি।
মাসিমা বাংলাদেশের মানুষ।এখানে এসেছেন চিকিৎসা করাতে।সম্ভবত অতীত আর বর্তমানের মাঝামাঝি স্তরে এখন ।বয়স সম্ভবত ৮০ থেকে ৯০ এর মধ্যে।এবং সোনাই তার নাতনি ।কারন দিদা ঠাম্মারা একমাত্র নাতি নাতনীর ক্ষেত্রেই ছেলের বৌকে এভাবে আক্রমণ করে।
মাসিমা খানিকক্ষন চুপ। মাসিমার দেখাশোনার মেয়েটির নাম দীপ্তি ।দীপ্তি উজ্জল প্রাণ ভরপুর বয়স উনিশের এক নবীনা।রাইসে নার্সিং ট্রেনিং নিচ্ছে।আর পাশাপাশি এখানে আটেনডেন্টের কাজ ।মা মারা গেছে ভাইয়ের জন্ম দিয়েই।বাবা রং সাপ্লাইয়ের ফাঁকে সামলায় ঘর গৃহস্থালি ।দীপ্তির পড়াশোনা উচ্চ মাধ্যমিক ।ভাই পড়ে ক্লাস টেন।
যতক্ষণ থাকে কখনো মুখের হাসিটুকু ম্লান হয় না দীপ্তির।মাঝারি আকৃতির রোগার দিকে শ্যামবর্ণ মেয়েটিকে দেখলেই মন ভালো হয়ে যায় ।
সোনাই যে সে তার ঠাম্মার সঙ্গে গল্প করে , কাঞ্চনা গ্রাম ঘুরতে বেরোয়, যে গ্রামের পরতে পরতে ভালোবাসা ছড়িয়ে, যে গাঁয়ে কোনো বিবাদ নেই।সেই গ্রামের জমিদার বাড়ির পশ্চিম কোণের ঘরের জানলা খুললেই নদী।সেই নদীর দিকে তাকিয়ে ঠাম্মা গান জোড়েন, মাঝি তুমি মাঝগাঙে নৌ বাইয়া যাও. . .
তারপর হুটোপুটি শেষ করে পাঁচ রকম মাছের পদ দিয়ে ভাত খেয়ে ঘুমোতে যায়।
পাশের বেডে বসে আমি দেখি এক আশি ঊর্ধ্ব বৃদ্ধা কী পরম ভালোবাসায় বালি হল্টের বাসিন্দা দীপ্তিকে আশ্রয় করে তার গল্পের দোসর করেছেন।সে গল্পের চরিত্র ফ্ল্যাসব্যাকে জ্বলে উঠে আবার নিভে যায় ।
মাসিমার ছেলে আসে বিকালে ।তার কাছে জানতে চাই আপনারা কী বাংলাদেশ থেকে এসেছেন চিকিৎসা করাতে ?
উনি বলেন, নাতো, এই তো ঢাকুরিয়া ব্রিজের পাশেই আমাদের বাড়ি।
তাহলে কাঞ্চনা গ্রাম?
উনি বলেন, ওসব অতীত।১৯৬৫ সালে চলে এসেছি সব চুকিয়ে ।
কোথায় এই গ্রামটা ?
চট্টগ্রাম ।
আর সোনাই?
আমার মেয়ে।
সারাদিন মাসিমা সোনাই সোনাই করেন।
ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে ফোনে সোনাইকে ধরে মাসিমাকে কথা বলতে বলেন।
মাসিমা বলেন, কে কস্তুরী? তুই কোথা থেকে এলি? আমি তো গ্রামে নাই।বেবীর বাড়ি আসছি।তারপর ওখান থেকে ছেলের বাসায় যাব।ছেলে বলছিল সুযোগ হলে ডাক্তার দেখিয়ে দেবে।
তারপর ফোন কেটে দেন।
আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, কুটুম ফোন করেছিল।
আমি নীরব শ্রোতা হয়ে ১৯৬৫ সাল আর ২০১৯ সালের মধ্যে বদলে যাওয়া পৃথিবী দেখার চেষ্টা করি।
ওনার মাথার মধ্যে আটকে থাকা সময়টা কল্পনা করি,
তারপর ক্লান্ত হয়ে যাই নিজের দূর্বলতায়।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত