বেদনার আলোকচিত্র

এক.

কবিতার কাছে নতজানু হয়েছিলাম। ভোরের বেলা শিশির ঝরার অপেক্ষা। সূর্যোদয়ের হাত, কপাল, ঠোঁট আর বাহুতে লেগেছিল পরাগ কবিতা। আমি অপেক্ষা করছিলাম। কতক্ষণে শাঁখ বাজবে। সাগর স্বপ্ন বুনবে। কতক্ষণে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে ডানা মেলবে রোদ। কতক্ষণে শূন্যতার কাছে পৌঁছবে জল। চোয়ালে সূর্য নিয়ে কবিতা এসেছিল। আদ্দির পাঞ্জাবি। কবিতা এসেছিল। পদযুগলে পদ্ম মেখে কবিতা এসেছিল। চোখ ছলছল কবিতা এসেছিল। একটা উদাত্ত মাঠের ওপারে ঘন কালো নদী, কবিতা এসেছিল। বাঁশবন মঞ্চে কবিতা এসেছিল। শিরশির ঝিরঝির রাতে। নির্বাক মৃত্যুর ওপার থেকে। ফুটন হলুদ কালো গাড়িতে। পুজোর একাকীত্বে। কবিতা। ওঁরা বেড়াতে যেত এক সময় ঘর হতে শুধু দুই পা। শুধু দুই। পাহাড় ডিঙিয়ে একবার কবিতা এসেছিল লাইব্রেরীর লুকোনো পাতায়। এক গাল হাসি আর দুই টোল। দুঃখভরা চোখেই বারবার। কখনো কখনো রোদের ছলনায়। এক বাগান ফুল ছিল ফুটে। সবাই গোলাপ। সবাই সুন্দর। পা দুটো ডুবিয়ে বসে থাকতে থাকতে কেন যেন একটা ছবি তুলে নিল কেউ, কবিতার। জংলি ফুলের কাছে দু চোখ ভরা আশার ছবি তুলে নিল। বেগনি ফুল। বন্ধুরা বলল, কবিতারা এরকম জংলি হয়। বন্ধুরা বলল, কবিতার চোখে মায়া থাকে, মমতা, এই রকম। আর বাঁক ফিরলেই, থাকে বন্ধুত্ব। বাহুতে ঝকঝক করে শক্তি, লাজুক। হয়ত সেটা মিথ্যে কথা। কাতরতার উদ্যান ছাড়িয়ে কবিতা হয়ে যায় শুধু বোবা মরূদ্যান। আর কিছু থাকে না। বন্ধুরা বলেছিল, কোনো কিছুর কোনো মানে নেই। সেটাই কবিতা। তুমি শুধু ফুটে থাকো। ফুটে থাকো।

দুই.

এই ঘরে অপেক্ষারা ছিল একদিন। অপেক্ষার ডাকবাক্সে মাঝেমাঝে চিঠি পড়ত। সেই চিঠির রঙ মুক্তর মত শাদা। আর বনের মত কালো। সেই চিঠির গন্ধ তেরো ক্রোশ দূরে পাতকুয়োর জলের মত, শীতল। লেফাফা এক পালতোলা শরৎ। অপেক্ষার ডানা ছিল। কলজে ছিল। রামধনু-রঙ। স্ফটিক গোলকের মত হামেশাই বদলাত। সকলে সেই অপেক্ষার নাম দিয়েছিল, পাগলী, ভবঘুরে, উল্টোরথ। ইত্যাদি। একটা পুরোনো মাঠে হাওয়া বইত। অধীর পবন। অনেকে জমা হত, কস্মিনকালে। কখনো কখনো প্যারাশুটের মত মেঘের কাছে, সেখানে খেলতে আসত অপেক্ষার দুরন্ত পদযুগল। চুল উড়ত মুখের আগলে। বটগাছ-ঝুরি ছুঁয়ে যেখানে ছায়া নামে সেখানে গরীব ঘর। কুপি জ্বলা ধোঁয়া আর মোমবাতির গন্ধ। চেনা চেনা মুখ। ওদের অপেক্ষা অন্য রকম। অপেক্ষা চেয়ে থাকত। লম্বা বাস সবুজ বাতাস ঠেলে গন্তব্যে পৌঁছত এক সময়। অপেক্ষা শেষ হত। রোদ নেমে আসত শালবনে। অপেক্ষা শেষ হত। পাখিরা ডাকত, শেষ শেষ শেষ। কেউ দেখেছিল, সেই কচি গাছে মগডালে পা ঝুলিয়ে বসে ছিল অপেক্ষা। বলেছিল, কী দুরন্ত বালিকা রে বাপ! কেউ বলেছিল, তোমায় নিয়ে গল্প লিখতে চাইলাম, কিন্তু পারলাম না। তোমাকে সমীহ করে মাপতে পারলাম না।

এভাবেই জলাজঙ্গলের ধারে রাত ভোর হল। পুকুর ভাসিয়ে সূর্য উঠল। নারকেল গাছে দুলুনি এলো তন্দ্রার। এভাবেই অপেক্ষার হাত ধরে এলো আনাড়ি লোক। আনাড়ি লোকের হাতে ছিল গাছ কাটার কুড়ুল। সে এক টব থেকে অন্য টবে গাছ কেটে লাগাতে গিয়ে, মেরে ফেলল। তারপর গাছ মরে যাওয়া দেখে দুঃখ পেল। বলল, যাই, ফেলে দিয়ে আসি শিকড়। শিকড় না থাকা ভালো, নকল গাছের পাতাও সবুজ, সে কখনো মরে না।

অপেক্ষার স্বপ্নে মায়ের মতো একজন এসেছিল রাতে। সে মা নয়। মায়ের মমতাভরা স্বপ্নফুল। রাতের চোখে ঘুম থাকে না। শোলোক শোনার জন্য জেগে থাকে। কাজলকালো চোখ। এসে কাঁথার পাশে বসেছিল, আর থির তাকিয়ে ছিল, যেন বড়ো হওয়া শিশুর দেখভাল করতে এসেছে। বিস্ময়। কতো জানে, অথবা বোঝে, এমন স্পন্দহীন। স্বপ্নের ভিতর ‘যাই, যাই’ করল না মাধবীলতা ফুল। সে থাকার জন্য এসেছে। স্পন্দহীন জেগে থাকার মধ্যে ঘুম যায় অপেক্ষারা।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত