| 14 এপ্রিল 2024
Categories
ধারাবাহিক সাহিত্য

বেহুলা কথা (পর্ব-২)

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

 

বিয়ের দিন স্থির করে চাঁদবেনে বাড়ি ফিরে গিয়েই তৈরি করলো লৌহনিগড়, গায়ে হলুদের নানাবিধ তত্ত্বের সঙ্গে গাঠালো লৌহবলয়,সূচনা হলো বেহুলার লৌহ-কঠিন যাপন পর্বের। বস্তুত মাছ প্রজননের, কলাই ষষ্ঠী তথা সন্তানের, নোয়া সৌভাগ্যের প্রতীক।এ সমস্ত কিছুই একযোগে বাস্তবতা হারিয়ে পুরোটা জীবন জুড়ে বেহুলার শুধু ধাতব শীতল লোহা। লোহা আর লোহা।

রস বিকৃতির পীড়া…

শুভদৃষ্টির প্রথম চাউনিতেই চোখ পুড়লো বেহুলার, হা ঈশ্বর! কেউ কথা রাখেনা। এ পুরুষের চোখ মুখ জুড়ে যে স্পষ্ট ব্যভিচারের চিহ্ন! জীবন দূরস্থান, এর সঙ্গে এই রাতটাই যে কী করে কাটাই! মাল্যদান করতে করতে কঁকিয়ে উঠলো বেহুলার অন্তরের অন্তস্থল। হে বিশ্বাসহন্তা ব্যভিচারী পুরুষ! তুমিই আমার নিয়তি, আমার ভবিতব্য, আমার বিধিলিপি।

সখীরা বাসরঘরে কড়ি খেলতে খেলতে রঙ্গরসের প্রশ্নোত্তরী ছড়া কাটেঃ

প্রঃ এ তো বড়ো রঙ্গ যাদু, এতো বড়ো রঙ্গ চার কঠিন দেখাতে পারো, যাবো তোমার সঙ্গ…

লখীন্দর ভিজে ন্যাতার মতো নিশ্চুপ রইলে, বেহুলাই তার হয়ে উত্তর দিলো…

উঃ লৌহ মৎস্য, লৌহ কলাই, লৌহেরই বাসর,
লৌহ বলয় অধিক কঠিন বঙ্গনারীর ঘর।

আবার প্রশ্নঃ
এ তো বড় রঙ্গ যাদু, এ তো বড়ো রঙ্গ, চার ওষুধ দেখাতে পারো, যাবো তোমার সঙ্গ…

আবারও লখীন্দরকে নিশ্চুপ দেখে উত্তর দিতে যায় বেহুলা।

উঃ চোরের কিল, হলুদের শিল, মেয়ের শ্বশুরবাড়ি,…

হঠাৎই তার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বোবা লখীন্দর মুখর- মিল জোগালোঃ
… করোনারির মহাওষুধ যতেক পরনারী।

রসময়ের রসিকতায় উচ্চকিত হাসিতে ফেটে পড়লো বাসর, কিন্তু হৃদকম্প শুরু হয়ে গেল বেহুলার। স্পষ্টাস্পষ্টি চোখে পড়ল লখীন্দরের বোলচালের জীবন্ত উৎসটিকে, মামী শাশুড়ী কৌশল্যা বাসরে ঢুকছেন।

অনেক রাতে বাইরে থেকে লৌহকপাট এঁটে দিয়ে যখন বিদায় নিল সবাই, প্রথম কথা বললো লখীন্দর।

-বড়ো খিদে পেয়েছে।

বেহুলা সখীদের কাছে শুনেছিল, বাসররাতে বর বউয়ের নানাবিধ খাওয়া খাওয়ির কথা।এখন লখীন্দরের এবম্বিধ আটপৌরে কথা শুনে শান্তস্বরে বললো, বলুন কি খাবেন, ব্যবস্থা করছি।

-ভাত খাবো।

বেহুলা হতবাক। অর্থাৎ কিনা দরোজা খুলে বাইরে হেঁশেলে যেতে দিতে হবে।

এবং সে মেয়ের নাম বেহুলা। ভেতরে তার মজুত ছিলই জন্ম-জন্মান্তরের অপমানের আগুন। নিজের কাপড় ছিঁড়ে তাতে ঘি ঢেলে, বুকের আগুন সহযোগে মঙ্গল হাঁড়ির চাল আর নারকোলের জল দিয়ে সে রান্না করলো ভাত। ঐ খেয়ে কালঘুমে আক্রান্ত হলো লখীন্দর। জন্মের মতো কর্ম তার শেষ।

বেহুলা হাতের কর গুনে দেখলো, কুল্লে তিনটি মাত্র সক্রিয় কর্ম লখীন্দরের কৃতকর্মের তালিকায়।

১) বেহুলাকে পরীক্ষার জন্য লোহার মাছ ধরে আনা।
২) বেহুলাকে জ্যান্তে পোড়াবার জন্য মামী কৌশল্যাকে ধর্ষণ।
৩) বেহুলাকে অপমানের জন্য বাসরেই বাধ্যতার ভাত রাঁধানো।

এমন কর্মবীর পুরুষের জীবনের সব আসনই যে শবাসন হবে, তাতে আর আশ্চর্য কি!

 

 

 

 

 

(চলবে)

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত