কবি বেলাল চৌধুরীর ১০ কবিতা

Reading Time: 5 minutes 

আজ ২৪ এপ্রিল। জীবনের অনিবার্য নিয়মে দুনিয়াকে বিদায় জানিয়ে কবি বেলাল চৌধুরী গতবছর এই দিনে চলে যান। ষাটের দশকের অন্যতম শক্তিমান এই কবি ছিলেন একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক। কবি বেলাল চৌধুরীর প্রথম প্রয়াণ দিবসে তাঁরই লেখা ১০ কবিতার তুলে ধরার মধ্য দিয়ে ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধা।
স্বদেশ আমি আছি ব্যাপ্ত হয়ে তোমার রৌদ্রছায়ায় এই তো তোমার ঘামে গন্ধে তোমার পাশাপাশি তোমার ছায়ার মতো তোমার শরীর জুড়ে তোমার নদীর কুলকুল স্রোতে ; তোমার যেমন ইচ্ছে, আছি আমি—- ঝিরিঝিরি পাতার ভেতর ভেতর হাওয়ার নাচে রাত্রিদিন তোমার ধানের ক্ষেতে উদাসী বাউল ; ভাটিয়ালি গান ভেসে যায় কোন নিরুদ্দেশে ; আছি আমি বেলা শেষের রোদের মতো গড়িয়ে তোমার পায়ে পায়ে আছি আমি তোমার ধানের দুধে তোমার আঁচল ছোঁয়া নীলাম্বরী মেঘে আছি আমি এই তো তোমার নাকছাবিটির মুক্তো যেমন জ্বলছে কেবল জ্বলছে কেবল।       আত্মপ্রতিকৃতি সারাদিন আমি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে ঘুরে কী দেখেছিলাম ? ভাট ফুল, আকন্দের ঝোপঝাপ মাছরাঙাদের অকারণ খিটিমিটি ? গ্রামীণ ছবিতে আজ আর নেই সেই কিংবদন্তীখ্যাত মসলিন, নকশিকাঁথার দিন ! গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু, পুকুর বরা মাছ এ জাতীয় কথারা আজ সেরেফ কথার কথামালা গ্রামগুলি হতশ্রী, এমনকি অগুনতি, অনেক মানুষ মিলিয়ে যে-মানুষের ছবি চোখের সামনে জেগে ওঠে তার মত হতকুচ্ছিত প্রাণী যেন আর কিছুই হয় না—- লিকলিকে সরু পা, রোগা কাঠাম আর ডিগডিগে পেট, চোখেমুখে ঘোলাটে নির্বোধ শূন্যতা —- তবু ঐ সব মানুষের ভিড়ে একজন মানুষের খোঁজে পথ হাঁটছিলুম আমি আপন মনে তখন না-বিকেল না সন্ধ্যা এমন একটা আলগা সময় পাখিরা কুলায়ের পথে কূজন মুখর ঠিক আমার বা পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে একটি শীর্ণতোয়া রোগা দুঃখী নদী, কুলুকুলু শব্দ বা গরুর খুরে ধুলো ওড়া কাব্যিক গোধূলি কিন্তু তার ধারে কাছে কোথাও পড়ল না চোখে, বরং দেখলুম বাঁশের খুটিতে আড়াআড়ি টানা দড়ির ওপর শুকোতে দেয়া ঝুলন্ত জালের গায়ে লেগে থাকা মৃত কিছু মাছের সাদা পেট, আঁশ;—- তার অন্য পাশে ছিল পথের লাগোয়া একটি প্রাচীন মসজিদ আগাছা শ্যাওলা ও খরখরে গুল্মের জরাজীর্ণ দেওয়ালের গা ফুঁড়ে বেড়িয়ে আসা অশ্বথ্বের একটি ডাগর চারা নদী থেকে ভেসে আসা ঝিরঝিরে হাওয়ার লাবণ্যে মুখ বাড়িয়ে যেন দেখছিল নদীটিকে এই দুই ভিন্ন প্রেক্ষিতের মাঝখানে একাকী দাঁড়িয়ে হঠাৎ আমার মনে হল : এই বিংশ শতাব্দীর একজন নিঃস্ব নিঃসঙ্গ মানুষ আমি ভান করি স্বেচ্ছা নির্বাসিতের, অনিকেত বলতে উদ্বাহু হয়ে উঠি অথচ জন্মেছি এই সব অখ্যাত গ্রামে গঞ্জেই পূর্বপুরুষেরা ছিলেক কৃষিকর্মী ; অধুনা আত্মপ্রতারণায় নগরনিবাসী আমি আর কতকাল এমন করে নিজেকেই নিজের চোখ ঠাওরাবো।       ডুবে আছি কেতকী কুসুমে ডুবে আছি কেতকী কুসুমে চেয়ে দ্যাখো কি রকম উতরোল হাওয়া আর ঢেউয়ে ফেনিল, রুপালি রণরোল নিঃশেষে মুছে দিয়ে নীল নীলিমা সাধ সৌর চলচ্ছবি যেন অবাধ, অগাধ ; জ্যোতির্ময় বলয় জুড়ে ব্যাপ্ত হয়ে আছি কৃতদার পাতার হলুগ ; পাতা ঝরে যায়- পাতা ঝরে যায় বৃন্ত থেকে, মৃত মাছি যেন টুপটাপ ; অচ্ছোদসরসী নীরে ভাসে ভেলা, হায় যুগল সহায়। ডুবে আছি কেতকী কুসুমে বিস্মরণে ব্যাপ্ত নিদারুণ জাগরণ ও ঘুমে।         প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি আমার গোপন পাপগুলি এতদিন পর বিরূপ-বৈরিতায় শস্ত্রপাণি হয়ে উঠেছে এবার তাদের বজ্রনির্ঘোষ কন্ঠে উচ্চারিত হলো- আমার কঠোর দণ্ডাজ্ঞা আমার মাথার ওপর উত্তোলিত তীক্ষ্ণ কৃপাণ চোখের সামনে জ্বলন্ত লাল লৌহশলাকা ওদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এবার ওরা অটল আমার সর্বাঙ্গ ছেঁকে ধরেছে মাছির মতো বিস্ফোটক দগদগে ঘা পুঁজ আর শটিত গরল গোপন পাপের শরশয্যায় শুয়ে আমি নিদারুণ তৃষ্ণায় ছটফট করছি- হায় রে জলধারা কিন্তু এবার ওরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ- নিষ্কৃতি নেই আমার নির্বাসনে মৃত্যুদণ্ড- ঠাণ্ডা চোখে দেখছি আমি নীল কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে আমার দেহ।       নারীটি যখন নদী হয়ে গেল সে কি তার মৃত্যু দৃশ্যে পেয়েছিল পরিপূর্ণতা, কে জানে! না হলে ঠোঁটের কোণে চিলতে হাসিটি কি করে ফুটিয়ে তুলেছিল ঐ বিভ্রম ; — নগ্ন পদযুগল যেন নীরবে কওয়াকয়ি করছিল এসেছি ঢের দূর, আর নয়, নদীটি বহে যাচ্ছিল আপন মনে এঁকে বেঁকে হেলায় ফেলায় . . . ভরা জোয়ারের টানে গেল ভেসে জ্যোত্স্না উদ্ভাসিত চরাচরকে আঁধারে ডুবিয়ে।       কুলাঙ্গার কুলাঙ্গার  (ত্বকীকে নিয়ে কবিতা) ছিঃ! হিমেল জ্যোৎস্নায় ভেজা রক্তখোর চিল সূর্যোদয়ের আগে যে সদ্যপ্রস্ফুট গোলাপে বসালে তোমার নোংরা হিংস্র নখের আঁচড়ে তা আমার পবিত্র পতাকাকেই কলঙ্কিত করলো। থুঃ! তোমার কৃত্রিম দেশপ্রেমে, ধিক তোমার বারুদবিলাসী মেকি গণতন্ত্রের উল্লাসে। সবই তোমার কুরাজনীতির গণিতশাস্ত্র। তুমি নগরবাসীর লজ্জা, ত্বকীর আত্মার অভিসম্পাতে অভিশপ্ত তুমি। মনে রেখো, পুড়ে খাক হবে তোমাদের ময়ুরপুচ্ছ সকল ডানা, কেননা জ্বলবে, জ্বলে উঠবেই প্রখর প্রতিভার দীপ্ত অঙ্গার। খুনি তুমি, পাপী তুমি, মুক্তিযুদ্ধের সবুজ-চেতনার কুলাঙ্গার।       খর্বকায় বামনের গান ওরে’ও, বুড়ো হাবড়া, নিতান্ত সঙিনাবস্থায় প্রসারিত পায়ের পাতার ওপর দাঁড়িয়ে, চেনা জগৎ সীমার ওপর ঝুঁকে গ্রন্থিল প্যাচানো কোনাচে_ যে রকম কেউ কেউ_ মনে আঁকে ছবি বা মাপে বয়স;_ খাটো বহর ওদো, অতীতচারি ওরা হাওড়ায় নিজেদের শিকর সম্পর্কে জ্ঞাত অজ্ঞাত বহু বহু বরকনদাজি গুল গল্প যাকে এক কথায় বলা যায় বার ফট্টাই…       তুমি সেই বৃক্ষ জটিল অরণ্যে তুমিই একমাত্র বিটপী শালের মত অটল, সেগুনের মত নমনীয় ও কোমল ঝাউয়ের মত তোমার মর্মরিত মাধুর্যের দিকে, কাঠুরেও তার কুড়ালের হাতলে আলতো হাত রেখে দাঁড়ায় ফিরে | বৃষ্টি তবু তুমি, তোমার উড়ন্ত উজ্জ্বল সবুজ চুল দূরের বাতিঘরের মতই করে প্রলোভিত ; অরণ্যের বিষণ্ণতার ভেতর হঠাৎ বিচ্ছুরিত বসন্তের মঞ্জুরিত রাজফুলের মত তোমার রক্তিম অধর | তুমি সেই বোধিদ্রুম যার প্রতি, দিবাবসানে ক্লান্ত ক্ষুধার্ত ভবঘুরেও দাঁড়ায় ফিরে দিক নির্দেশের জন্য, তুমি সেই লক্ষভেদী অনুকূল আগুনের প্রতি প্রলুব্ধ করে জ্বেলে দাও লেলিহান শিখা আলোকিত করে তোল সমগ্র পশ্চাৎপট | তুমি সেই বৃক্ষ, আমি কুঠার হয়ে দেখেছি : তোমার সমারোহের কাছে অবরুদ্ধ হয়ে চিহ্নিত করি তোমাকে নিজেরই জন্য, সহিষ্ণু , ধূর্ত ও কুশলী হাতে তোমার দেহকে অনাবৃত করে নিয়ে যাই তোমার হৃদয় নিজেরই গূঢ় প্রয়োজনে |       সেই সুখ প্রতি মুহূর্তে বদলায় জীবন পৃথিবী অনুভব করে বিচিত্র অভিজ্ঞতা পাখিরাও এ ডালে ও ডালে ঘুরে ঘুরে দেখে কখনও আটকে যায় মাঝ মাঠে শিকারি সঠিকভাবে চলতে বাধা পায় বদলে যায় তার স্নায়ু হাতের আঙ্গুল নিশানা মস্তিষ্কের হোঁচটও খায় কখনও। কিন্তু কি আশ্চর্য একমুহূর্ত এলো এখানে আমার জীবনে যা লিখা হয়ে গেল নির্দ্বিধায় হৃদয়ের খাতায় রচিত হলো কাব্যগ্রন্থ অন্তরে শরীরের ভাঁজে ভাঁজে অনুভূত হল স্পন্দন। জানতে চাও সেটি কি এমন অভিনব অনুভব! শুনে রাখ সুদর্শন সুদীর্ঘ অপেক্ষার সাম্পানে চড়ে বিশ বছর পর তোমাকে যা দেখছি মনে হচ্ছে সেই সুখ তুমি একটুও বদলাওনি পুরোপুরি আলোর মতন। যেন আগেরই সেই সুখ।     মানুষের ডাহুকী ভাবনা মানুষতো ডাহুক নয় অথচ ডাহুকের বেদনার ভেতরে মানুষ ডুবে যেতে পারে, ডুব দেয় চিরকাল- এইভাবে মানুষের ডাহুকী ভাবনা মূত্ররসে যেমন ভেসে যায় মানুষের স্বভাবের নির্বিবেকী তাবৎ লোনা ও অম্লতা তেমনি মানুষ ঢেলে দিতে পারে ঐ ডাহুকী ভাবনার ভেতর মানুষের যতো বেদনা, বিষতিক্ত সারাৎসার, ডাহুক ও মানুষ যদিও পরস্পর বেদনার এপিঠ-ওপিঠ, কিছুটা মানুষের, কিছুটা ডাহুকের তবু মানুষ তো কখনো ডাহুক নয় অথচ ডাহুক তার বেদনার সীমা- স্বর্গের কতোদূর, কতোদূর- একজন মানুষকে নিয়ে যেতে পারে?     এক জীবনে বেলাল চৌধুরীঃ পুরো নাম : বেলাল চৌধুরী জন্ম তারিখ: ১২ নভেম্বর, ১৯৩৮ বাবার নাম : রফিক উদ্দিন আহমদ চৌধুরী মায়ের নাম : মুনীর আখতার খাতুন চৌধুরাণী পারিবারিক অবস্থান : ৪ ভাই ৫ বোনের মধ্যে সবার বড় স্ত্রী : কামরুনন্নেসা চৌধুরী (প্রয়াত) সন্তান : কন্যা-সাফিয়া আখতার চৌধুরী মৌরী/ পুত্র- আব্দুল্লা প্রতীক ইউসুফ চৌধুরী ও আব্দুল্লাহ নাসিফ চৌধুরী। পৈত্রিক নিবাস : শারিশাদি, ফেনী। বর্তমান নিবাস : পল্টন হাউজিং সোসাইটি, পুরানা পল্টন, ঢাকা। শিক্ষাজীবন : প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের চেয়ে মানুষ ও বিশ্বের ছাত্র হওয়াকে গুরুত্ব দেন বেশি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে কুমিল্লা ইউসুফ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক। কর্মজীবন : বোহেমিয়ান জীবনে অর্থ আয়ের প্রতি চিরকালই থেকেছেন উদাসীন। তবুও জীবিকার তাগিদে কাজ করেছেন সচিত্র সন্ধানী, ভারত বিচিত্রা, দৈনিক রূপালীতে। প্রাতিষ্ঠানিক কর্ম বলতে, এরকমই হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে দিয়েছেন নিজের মেধা-শ্রম। থিতু হননি কোনখানে। প্রকাশিত গ্রন্থ কবিতা : নিষাদ প্রদেশে, বেলাল চৌধুরীর কবিতা, আত্মপ্রতিকৃতি, স্থিরজীবন ও নিসর্গ, স্বপ্নবন্দী, জলবিষুবের পূর্ণিমা, বত্রিশ নম্বর, প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি, যাবজ্জীবন সশ্রম উল্লাসে, প্রাণকোকিলা, সেলাই করা ছায়া, যে ধ্বনি চৈত্রে শিমুলে, কবিতার কমলবনে, বিদায়ী চুমুু, মুক্তিযুদ্ধের কবিতা। গদ্য : মিশ্র চিত্রপট, নিরুদ্দেশ, হাওয়ায় হাওয়ায়, স্কুলিঙ্গ থেকে দাবানল, ডুমুর পাতার আবরণ, রোজনামা : বল্লাল সেনের বকলমে, লাকসাম দাদা, গ্রেট হ্যারি এস, সুন্দরবন সোঁদরবন ও রবীন্দ্রনাথ। অনুবাদ : মৃত্যুর কাড়ানাড়া (গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ), এ্যান্ডোরা (মার্কস ফিশ,) জলের মধ্যে চাঁদ ও অন্যান্য জাপানি গল্প, তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি (১ম, ২য় ও ৩য় খ-)। ভ্রমণকথা : সূর্যকরোজ্জ্বল বনভূমি, বাঙালি ও বাংলাদেশের ইতিহাস খুঁজতে গেলে এবং যেতে হবে বত্রিশ নম্বর শিশুসাহিত্য : সাড়ে বত্রিশ ভাজা, বত্রিশ দাঁত, ফাতনা, সপ্তরত্নে কা-কারখানা, সবুজ ভাষার ছড়া। সম্পাদনা : লঙ্গরখানা, পদাবলী কবিতা সঙ্কলন, বিশ্ব নাগরিক গ্যেটে, পাবলো নেরুদা শতবর্ষ স্মারক, শামসুর রাহমান সংবধর্না গ্রন্থ, কিংবদন্তির কথকতা-আবুজাফর ওবায়দুল্লাহ স্মরকগ্রন্থ, হাসান-হাফিজুর রহমান স্মারকগ্রন্থ। সম্মাননা : একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, নীহাররঞ্জন পুরস্কার, আবুজাফর ওবায়দুল্লাহ পুরস্কার।     সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও বেলাল চৌধুরীঃ
     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>