নবারুণ চেয়েছেন ওঁর কথাগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যাক, আর সেই গুঁড়ো ছাই ঝরে পড়ুক সাফ চকচকে গাড়ির বনেটে, গার্ডেন পার্টির ঝিঙ্কু টেবিলের খাবারের ওপরে, ছাই ঝরুক ইজ্জতের গায়ে৷
নবারুণের গল্প হালাল ঝান্ডার প্রথম অনুচ্ছেদের নির্যাস এটা৷ ও লিখেছিল, ‘আকাশের লালার সঙ্গে মিশে রোদ্দুরের ছুরির ফলার উপরে মরচে হয়ে জমছে কথাগুলো৷’
নবারুণ কথা বলেছেন উচ্চ উচ্চারণে, কবিতায়, গল্প-উপন্যাসে৷ জিরাফ যদি কথা বলতে পারত, উঁচু থেকেই বলত৷ কিন্তু জিরাফের ভাষা ঠিক মতো বুঝতে পারিনি বলেই আমরা এত ফ্যাৎ ফ্যাৎ সাঁই সাঁই করি৷ নবারুণের সিগনেচার টিউন হয়ে গেল ফ্যাৎ ফ্যাৎ সাঁই সাঁই৷
নবারুণ চলে যাওয়ার পর ফেসবুক জুড়ে লেখা হল চলে গেলেন ফ্যাতাড়ু৷ আমার মনে হয়েছে ফ্যাতাড়ুর স্রষ্টা নবারুণের চেয়ে অনেক বড় নবারুণের দিকে আমরা আলো ফেলছি না– যে নবারুণ জিরাফের মুখে ভাষা দিয়েছেন৷
সত্তরের উত্তাপ নবারুণকে সেঁকেছিল৷ সত্তরের বৃষ্টি নবারুণকে ভিজিয়েছিল৷ নবারুণের সঙ্গেই আমরা অনেকে, কিংবা আমাদের অনেকের সঙ্গে নবারুণ৷ আমরা যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম, ওয়াটারপ্রুফ পরে রাস্তায় নামিনি৷ আমাদের প্রথম যৌবনের বাতাসে ছিল গন্ধকের গন্ধ৷ চেতনার পথ জুড়ে শুয়েছিল সমাজবদলের স্বপ্ন দেখা তরুণদের মৃতদেহ৷ কালো গাড়ি৷ চিরুনি তল্লাশি, মাথায় রাইফেল নল, ঘাড়ে বেয়নেট৷ ইন্টারোগেশন, জুলুম, শিকল ঝনঝন৷ শাট আপ, সব চুপ, নইলে…৷
সেই সময় নবারুণ গলা উঁচিয়ে বলতে পারলেন– কোনও যতি চিহ্ন না রেখে–
হাজার ওয়াটের আলো চোখে ফেলে রাত্রিদিন ইন্টারোগেশন
মানি না
পা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা যতক্ষণ রক্ত ঝরে নাক দিয়ে
মানি না
ঠোঁটের ওপরে বুট জ্বলম্ত শলাকায় সারা গায় ক্ষত
মানি না
ধারালো চাবুক দিয়ে খণ্ড খণ্ড রক্তাক্ত পিঠে সহসা অ্যালকোহল
মানি না
পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা খুনির সঙ্গে রিভলভার ঠেকিয়ে গুলি
মানি না৷…৷
এই মানি না-মানি না-মানি না-র নিঃশব্দ কোরাস সন্ত্রাস শীতল তরুণদের অম্তরের দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে নির্গত হচ্ছিল যাদের রোগা শালিখের বিবর্ণ ইচ্ছাগুলি ছিল সম্ততির মতো৷ যাদের সম্ততি স্বপ্নে থাকে৷
ক্ষতচিহ্ন একদিন শুকিয়ে যায়, কাটা দাগ মসৃণ হয়, অনেকেরই হয়েছে, কিন্তু নবারুণ আমৃত্যু লালন করেছে ‘মানি না’৷ তাঁর দ্রোহকে বাঁচিয়ে রেখেছিল নিজের মতো করে৷
অম্তরের গুহাকন্দরে পুষে রাখা বিদ্রোহ রূপকথার গুপ্ত কৌটায় অন্য শরীর নিয়ে থেকে গেলেও অনেক না মানতে চাওয়াকে মেনে নিতে হয়৷ নবারুণকেও মানতে হযেছিল একটা আন্দোলনের পরাজয়৷ তারপর নানা রকমের পরাজয় এসেছে সামাজিক জীবনে৷ ১৯৭৭ সালে নতুন করে ফিরে পাওয়া লাল পতাকা, যা ব্যালটের মাধ্যমে এসেছিল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে, সেই লাল পতাকাকে ক্রমশ ন্যাকড়া হওয়া দেখতে হয়েছে, সামম্ত গ্রাম্য ক্ষমতাশালীর বদলে দেখতে হয়েছে ক্ষমতাবান নতুন দাদাদের৷ এটা তো স্বরচিত স্বপ্নেরই পরাজয়৷ সোবিয়েত ভেঙে পড়ল৷ পূর্ব ইউরোপ হয়ে পড়ল ডলার-কাঙাল৷ পুরনো বন্ধুদের দেখলেন চর্বি প্রলেপিত তেল-তেল, পরাজয় নয়? পরের প্রজন্ম এল, যারা মল-সোহাগী, যারা কোক-বিলাসী, যারা ‘বাজারের’ খাদ্য মাত্র৷ বসে বসে দেখতে হল, কিন্তু পুষে রাখা ‘মানি না’ চুপচাপ থাকে কী করে? পরাজিতদের হাহাকারের মধ্যে ক্ষোভও থাকে মিশে৷ মাথা চাপড়ানোর মধ্যেও থাকে প্রতিবাদ৷ অম্তর্দাহর মধ্যেও গোপনে থাকে দহনের ইচ্ছা৷ ফ্যাতাড়ুরা সৃষ্ট হয়৷ যারা তছনছ করে গুডুগুডু মানুষদের পুতুপুতু সম্ভার, যারা ময়লা ছোঁড়ে কুচকাওয়াজে হেগে-মুতে ভাসিয়ে দেয় কার্নিভাল৷
নবারুণ ভট্টাচার্য বয়সে আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড়৷ লেখালেখিও শুরু করেছিলেন আমার অনেক আগে থেকেই৷ যতদূর জানি, প্রথম গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৮ সালে, ‘পরিচয়’ পত্রিকায়৷ গল্পটির নাম ‘ভাসান’৷ এরপর স্টিমরোলার, খোচড়, হালালঝান্ডা ইত্যাদি বিখ্যাত গল্প ছাপা হয়ে গিয়েছিল, তখনও আমি লিখতে শুরুই করিনি সেভাবে৷ পরে পড়েছি৷ ভাসান যখন লেখেন, ওঁর বয়স তখন মাত্র কুড়ি৷ একটি বাউন্ডুলে মানুষের মৃত্যু হয়েছে, এবং এক পাগলিনী আঁকড়ে রেখেছে মৃত মানুষের শরীর৷ মৃত মানুষের বয়ানে সাধুভাষায় গল্পটি লেখা৷ মৃতের জবানিতে৷ ‘কী আনন্দ! কী আনন্দ! পিঁপড়ারা তাহাদের কাজ ইতিমধ্যেই আরম্ভ করিয়াছে৷ আমার ডানচক্ষু এবং বাঁ চক্ষুর মধ্যে যে একটি গোপন পথ আছে তাহা আমি জানিতাম না৷ ডেঁওর দল এক চক্ষু দিয়া ঢুকিয়া অন্য চক্ষু দিয়া বাহির হইতেছিল৷ পথটি কিছুক্ষণ বাদে পুরনো হইয়া যাওয়ায় তাহারা নাক, কান ইত্যাদি নতুন পথ খুঁজিবার চেষ্টা করিতে লাগিল৷ পিঁপড়ারা কথা মত কাজ করিতেছে৷’ কার কথা মতো? এটা উহ্য এই উদ্ধৃতির দুই প্যারাগ্রাফ আগে একটা লাল ঝান্ডার মিটিংয়ের সামান্য উল্লেখ আছে৷ পাঠক ভেবে নিতেই পারেন মঞ্চ থেকে বলা হয়েছিল পথ খুঁজে নিন কিংবা খাদ্য ছিনিয়ে খান জাতীয় কথা৷ এ সব কথা নবারুণ বলেননি, পাঠকের জন্য রেখে দেওয়া৷ দুটি বাক্যের মধ্যবর্তী শূন্যতা পাঠকের নিজস্ব৷ পাঠকের প্রতি লেখকের উপহার৷ কুড়ি বছর বয়সেই বুঝেছিলেন৷ পরে ওঁর গদ্য স্বাভাবিক নিয়মেই পাল্টে যায়৷ অনেক বেশি জোরে কন্ঠ ছেড়েছেন, কিন্তু অমোঘ নীরবতাও রেখে দিয়েছেন পাঠকের জন্য– তার উদাহরণ ১৯৯৯ সালে লেখা ম্যালোরি, ২০০৩ সালে লেখা চাঁদের দেয়াল৷ এ প্রসঙ্গে পরে আসব৷
তবে প্রথম গল্পটির পিঁপড়েদের পথ খুঁজে নেওয়া কনসেপ্ট নবারুণকে সারা জীবন নাড়িয়েছে৷ একটা বিকল্প রণনীতি তাঁর গল্পের চরিত্ররা খুঁজেছেন সর্বক্ষণ৷
নবারুণের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ‘প্রমা’-র আড্ডায়, ১৯৮২ সালে৷ এর আগে আমি পড়েছি, বারবার পড়েছি৷ ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’৷ যে কবিতার পঙ্ক্তিগুলো এখন প্রবাদ, ‘এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না৷এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না৷এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না৷ আমি আমার দেশকে ফিরে কেড়ে নেব৷বুকের মধ্যে টেনে নেব কুয়াশায় ভেজা কাশ বিকেল ও ভাসান৷সমস্ত শরীর ঘিরে জোনাকি, পাহাড়ে জুম, অগণিত হৃদয় শষ্য৷রূপকথা ফুল নারী নদী৷প্রতিটি শহীদের নামে এক একটি তারার নাম দেব ইচ্ছেমত…’৷
যে কবিতাটি বাংলাদেশের অতি আদরের, যে কবিতাটি আজ সমস্ত মৃত্যু-উপত্যকার অসহায় মানুষের ভাষা, গাজা স্ট্রিপার, ইরাক-আফগানিস্তান-কেনিয়ার৷
এই ৭৷৮ বছর সময়কালে দ্রোণাচার্য ঘোষ, বীরেন চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, মণিভূষণ ভট্টাচার্য, কমলেশ সেন, অমিত চক্রবর্তী প্রমুখ অনেকেই প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের কবিতা লিখেছিলেন, কিন্তু নবারুণের কবিতাই ছিল বেশি বারুদগন্ধী৷ কবিতায় মিতস্বর অনেকেরই পছন্দ, তাতে কাব্যগুণ অনেকটাই বজায় থাকে৷ কাব্যগুণ জাতীয় শব্দগুলির পশ্চাতে লাথ মেরেছেন নবারুণ৷ আজ আমি ওর সাহিত্যকীর্তির আলোচনার মধ্যে ‘রসসম্ভার’ আবহমানতা, কালজয়িতা ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার করতে গেলে এই শব্দগুলির পশ্চাদাহত হওয়ার সম্ভাবনা আছে৷
প্রমার আড্ডায়, প্রথম পরিচয়ে ওর রসিকতা, ওর বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা, নাটক সম্পর্কিত চিম্তা ইত্যাদির পরিচয় পেয়েছিলাম এবং বুঝেছিলাম মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের অনেকটা বাইরেই ওঁর অবস্হান৷ বিজন ভট্টাচার্য এবং মহাশ্বেতা দেবীর পুত্র এই পরিচয়টা জানিনি প্রথম দিন৷ নবারুণ ওঁর নিজস্বতায় আমার কাছে শ্রদ্ধেয় হয়ে উঠেছিলেন৷ এরপর প্রমায় ‘ফোয়ারার জন্য দুশ্চিম্তা’ এবং ‘শলমন ও মোগলাই’ নামে পরপর দুটি গল্প পড়ি৷ প্রথম গল্প যৌনরোগে আক্রাম্ত এক বেশ্যা এবং ওর বাবুর ভালবাসা নিয়ে৷ পরের গল্পটিতে দুজন ছিনতাইবাজ৷ যেন গোর্কির ‘লোয়ার ডেপথ’ নতুন করে লেখা হচ্ছে বাংলা ভাষায়৷ আরও পরে, যখন মণীশ ঘটক পড়েছি, যিনি নবারুণের পিতামহ, যিনি ‘পটলডাঙ্গার পাঁচালী’ লিখেছেন, মনে হয়েছে মণীশ ঘটকের জিনে লুকনো সাহস এবং সহানুভূতি নবারুণের রক্তে খেলা করেছে৷ এই সময় হালাল ঝান্ডা এবং অন্যান্য গল্প হাতে পাই৷ এখন আবার নতুন করে পড়তে গিয়ে বারবার আটকে যাচ্ছি বাফারে৷ ‘ফ্যাতাড়ু’-র গল্পের শুরুতেই যেমন– ‘প্লেন ড্রেসে এক মাতাল পুলিস৷ হয়তো লিঃ লিঃ বলে চেঁচিয়ে উঠল, পকেটে বিলিতি মালের নাম লেখা ডটপেন…৷ কুকুর শব্দটির উল্লেখ নেই কোথাও, পুলিসটি হঠাৎই লিঃ লিঃ করল, সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের মনে হয় কুকুরকে রুটি ছুঁড়ে দিচ্ছে কেউ, (কুকুরকেই ছুঁড়ে দেবার সময় লিঃ লিঃ শব্দ উচ্চারিত হয়.) তারপরই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কয়েকটা কুকুর দৌড়োচ্ছে, জিভ লকলক৷ আমার পাঠ প্রক্রিয়া আটকে যায়৷ শুনতে পাই বর্তমান সময়ের ক্ষমতাবানদের লিঃ লিঃ, আর যশো দেহি ধনং দেহি বলতে বলতে ঐ কারা ছুটছে, এ্যাঁ? নবারুণ ক্ষমতার চৌম্বকক্ষেত্রে থাকেনি কখনও৷ কালোকে কালো বলেছেন, তাঁর মনের অম্তর্গতের ‘দ্রোহ’ আমৃত্যু চালিত করেছে ওর চেতনাকে৷ যখন যা উচিত মনে করেছেন বলেছেন কলমে বা মিছিলে৷ ওকে আন্দোলনে দেখেছি রাস্তায়, বিক্ষোভে, ইস্তাহারে৷ অনেক ইস্তাহারে আমিও কখনও ছিলাম ওর সঙ্গে, কিছু মতভেদ তো ছিলই৷ আমি শিল্প চেয়েছিলাম৷ সিঙ্গুরের কারখানাটাও৷ বঞ্চিতদের এনার্কি-তথা ফ্যাতাড়ু কার্যক্রমে উচ্ছ্বাস দেখাইনি, তা বলে নবারুণের প্রতি আমার শ্রদ্ধার ঘাটতি হয়নি৷ ওঁর মাথা না নোয়ানোর দৃষ্টাম্তর দিকে তাকিয়ে আমি মাথা নোয়াই৷ যাকে গোল গল্প বলে, তেমন লেখা অনেক লিখেছি আমি৷ নবারুণ লেখেনি কখনও৷ নবারুণের লেখার একটা নিজস্ব দর্শন ছিল, আমৃত্যু সেখানে স্হিত থেকেছে৷ ও লিখেছে, ‘আমি ভাত ঘুম সাহিত্যে বিশ্বাসী নই৷ পাঠক আমার বই পড়ে নিশ্চিম্তে ঘুমোতে যদি না পারে, তবে আমি বলব কিছু একটা হল৷’ সেই ‘ভাসান’ গল্পটি থেকেই এই অনুভূতি পাঠকের হয়৷ হারবার্ট, যে হয়ত নবারুণেরই ‘ইগো’ প্রতীকী তোশকে লালন করেছিল ডিনামাইট স্টিক, মৃত্যুর পর শ্মশান চুল্লিতে যার বিস্ফোরণ ঘটে৷ ছারখার হয়ে যায় দাহযন্ত্র৷ আমরা বুঝি, ‘কখন, কোথায়, কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটবে এবং কে ঘটাবে সে সম্বন্ধে জানতে রাষ্ট্রযন্ত্রের এখনও বাকি আছে৷’ কাঙাল মালসাটের চোক্তার, দণ্ডবায়স, ডি এস, কবি পুরন্দর ভাটের মিলিত কর্মকাণ্ডে মধ্যবিত্ত মন বিপর্যস্ত হয়, লুব্ধক এক বিশাল প্রশ্নের মতো জ্বলজ্বল করে৷ ‘খোচর’ গল্পে কালীতলা যুবক সমিতির জলসায় এক নকশালকে মাথায় গুলি করে পুলিস৷ চেয়ারে রক্ত, খুলি থেকে ঘিলু ছিটকে বেরিয়ে এসেছে, খোলা রিভলভার নলে ধোঁয়া, পুলিস বলছে উৎসব চলবে৷ গান থামবে না৷ লাশ সরানো হয়৷’ দুজন প্রেন ড্রেস ছেলেটাকে নিয়ে চলল৷ একজন একটা হাত, একজন একটা পা, অসহায় মাথাটা ঝুলছে, চোখটা খোলা– মুখটাও খোলা, কিছুটা বিস্ময় এখনও মুখ থেকে যায়নি৷ রক্ত গলা থেকে গড়িয়ে কানের পাশ দিয়ে চুলে গিয়ে জমছে৷ মাটিতে পড়ছে….৷ মাইকের যান্ত্রিক শব্দটা আবার শুরু হল৷ পিয়ানো অ্যাকর্ডিয়ানের সুর শোনা যায়৷
উৎসব চলছে৷ এই মৃত্যু তো একটা ছোট্ট ঘটনা৷ লেখাটার জন্মকাল ১৯৭১ মনে কি হয় না– এটা এই সময়ের গল্প? এই সব গল্প রোববার দুপুরের নয়৷ ‘ম্যালোরি’ গল্পটিতে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা থেকে আসা কেউ একজন এক থলে সমুদ্রের কাঁকড়া দিয়ে গেছে মিথিল নামের এক মধ্যবিত্তের বাড়ি৷ বাড়িতে তখন স্ত্রী নেই, কাজের লোকও নেই৷ কাঁকড়াগুলো খলবলাচ্ছে৷ বেরিয়ে আসছে লাল দাঁড়া৷ সুখী মধ্যবিত্ত ভয় পায়৷ ডিপ ফ্রিজে পুরে দেয়৷ ওখানেই জমে পাথর হবে বিপদ৷ ঠান্ডা মাথার এই খুনের সঙ্গে তুলনা করেন শেষ প্যারাগ্রাফে আম্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে৷ আর গল্পটির নাম কাঁকড়া না দিয়ে ম্যালোরি রেখেছেন সেই পর্বত অভিযাত্রীকে মনে করে, জর্জ ম্যালোরি, যিনি ১৯২০ সালে এভারেস্ট অভিযানে বরফ চাপা পড়েন, ১৯৩৩ সালে ওঁর হিমদেহ আবিষ্কৃত হয়৷ এই ছোট্ট, দেড় হাজার শব্দটি সুখী মানুষের ঘুম কেড়ে নেয়, প্রশ্নের মুখে দাঁড়াই, আমরাও কি নিঃশব্দ ঘাতক? প্রশ্ন আসে– গ্যাস চেম্বার শুধু নয়– শাম্তিময় শীতল সন্ত্রাসও হয়! ‘ভোগী’ এবং অটো– এই স্বল্পবাক আখ্যান দুটিও বলে ‘সুখী মানুষ’ দুই সত্তা নিয়ে থাকে৷ নিঃশব্দ ঘাতকের কিংবা আত্মহননকারী পরাজিতের সময় এবং সমাজের সঙ্গে একক মানুষ লড়াই করে, সহাবস্হানও করতে হয়৷ নবারুণকেও কি করতে হয়নি? প্রতিষ্ঠানবিরোধী নবারুণ কি সাহিত্য আকাদেমির পুরস্কার, বঙ্কিম পুরস্কার ইত্যাদি নেননি? ও সবও তো প্রতিষ্ঠান– প্রতিষ্ঠানের নানা ছদ্মবেশ থাকে৷ তবে এটাও সত্যি ওঁর প্রায় সব লেখাই প্রকাশিত হয়েছে লিটল ম্যাগাজিনে, ব্যতিক্রম প্রতিদিন বা আজকাল৷ টয় গল্পটিও মধ্যবিত্ত মননে চাবুক মারে৷ এখানে ও মিথিল৷ মিথিল এক ‘সুখী মধ্যবিত্ত’-এর নাম৷ মিথিলের দুঃখ ওর ছেলে টয় বড় শাম্ত৷ মিথিল একদিন দেখে শিশু অপরাধীদের নিয়ে একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ৷ ওখানে সংখ্যাতত্ত্বে দেখানো হয়েছে অনেক হত্যাপরাধী শিশু খউব শাম্ত৷ নির্লিপ্ত ভাবে, ঠান্ডা মাথায় ওরা ওদের হত্যাকর্মের বিবরণ দিয়েছে৷ টয়কে নিয়ে ওর বাবা-মার দুশ্চিম্তা থাকল না৷
বিশ্লেষণে যাব না, এতে জার্গন ঝাড়তে হয়৷ বিদ্যাবত্তার প্রকাশ হয়৷ নবারুণ ‘চড়াই’ কবিতায় একবার লিখেছিলেন– ‘একটু চুপ করবেন বিশিষ্ট শকুনেরা৷থামাবেন আপনাদের কর্কশ হাঁকডাক৷কিছুক্ষণ, বিনা শ্রবণযন্ত্রে চড়াইয়ের কিচির মিচির শোনা যাক৷’
চড়াইয়ের কিচির-মিচিরে, গাঙের জলে, শ্যাওলায়, শাকে, ভাতের মাড়ে অন্য এক নবারুণ আছে৷ যে বলে আমাকে হত্যা করলে বাংলার সব কটি মাটির প্রদীপে শিখা হয়ে ছড়িয়ে যাব৷আমার বিনাশ নেই৷বছর বছর মাটির ভিতর হতে সবুজ আশ্বাস হয়ে ফিরে আসব৷ ও বলেছিল সেভেনথ ফ্লিটকে রুখে দেবে সপ্ত ডিঙা মধুকর৷ কেবল শহরই বিষয় ছিল না৷ ‘প্লাবন মঙ্গল’ কবিতায় প্লাবনভাসি মৃতদেহ নিখোঁজ পরিজনকে বলছে– সবুজ, সবুজতর বৃক্ষরূপ নিয়ে গাঙের কিনারে চোখ চেয়ে থেকো– যদি ফিরে আসি৷
একটু কষ্ট হয় যখন শুনি– পুরন্দর ভাটের জবাব নেই, – কী খিস্তি, কী খিস্তি…৷ বলে– নবারুণের সাহস আছে, স্ল্যাংয়ের কী ব্যবহার…৷ কিন্তু আসল নবারুণ যা আমার মনে হয়, অন্ধবেড়ালে, খেলনানগরে, ম্যালোরি, চিতামানুষ গল্পে এবং কবিতায়৷ (কবিতা সম্পর্কিত কবিতায় বলেছেন– ‘ভীতু মানুষের পাশ থেকে যে কবিতা সরে যায়, সে কবিতা হল সবচেয়ে ভীতু৷)
কে কী বলল, তাতে অবশ্য নবারুণের কিছুই ছেঁড়া যায় না৷ আর কাল, মহাকাল, অমরতা এ সব ফালতু ওর কাছে৷ ও লিখেছে–
‘শক্ত মলাটের দামী বই ও আমার হতে ইচ্ছে করে না
তাকের উপর মিহি ধূলো আর পোকাদের যত্নে যে থাকে
আমার ইচ্ছে আমাকে ছোটবেলা থেকে শেখা
একটা ছড়ার মত মনে রেখো
অথবা বেআইনী ইস্তেহারের মত…৷
আমি চাই যে আমাকে সহজভাবে নাও
যেভাবে দুঃখকে তোমরা মেনে নিয়েছো৷’

কথাসাহিত্যিক
জন্ম ২৪ আগস্ট, ১৯৫১ সালে উত্তর কলকাতায়। রসায়নে বিএসসি (সম্মান), বাংলায় এমএ, সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা করেছেন। লেখকজীবন শুরু করেন সত্তর দশকে। প্রথম দিকে কবিতা লিখলেও থিতু হয়েছেন গল্প ও উপন্যাসে। তাঁর লেখা গল্পের সংখ্যা প্রায় ৩৫০। প্রথম উপন্যাস ‘চতুষ্পাঠী’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায়। পাঠক মহলে সাড়া ফেলেন স্বপ্নময় চক্রবর্তী। বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ এবং কলাম কিংবা রম্যরচনাতেও সিদ্ধহস্ত। তাঁর রচিত ‘হলদে গোলাপ’ উপন্যাসটি ২০১৫ সালে আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত হয়। ‘অবন্তীনগর’ উপন্যাসের জন্য ২০০৫ সালে বঙ্কিম পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পুরস্কার, সর্বভারতীয় কথা পুরস্কার, তারাশঙ্কর স্মৃতি পুরস্কার, গল্পমেলা, ভারতব্যাস পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। সাহিত্যের বাইরে তিনি গণবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
এক অসাধারণ লেখা।