| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
লোকসংস্কৃতি

ফিচার লোকসংস্কৃতি: তাম্বুর রাঙা বয়ানে । সুকন্যা দত্ত

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট
ভুড়িভোজের পর রসনা তৃপ্ত করতে পান– সুপারির জুড়ি মেলা ভার। বাংলাদেশের আঞ্চলিক গানের সম্রাজ্ঞী শেফালি ঘোষের একটি বিখ্যাত গান হলো-
“ যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম,মহেশখালির পানের খিলি তারে বানাই খাবাইতাম”
এই গানে প্রেম নিবেদনের মাধ্যম হিসেবে নায়িকা পানকেই বেছে নিয়েছেন। আমার ঠাকুমাকে দেখেছি দুবেলা ভাত খাওয়ার পর ছোটো একটা হামানদিস্তায় পান,সুপারি ছেঁচতে বসতেন। দাঁত না থাকায় চিবিয়ে পান খেতে পারতেন না,তাই এই পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। খয়েরের লাল রঙ ওনার  দুখানি ঠোঁটে লেগে থাকতো।  দূর থেকে জর্দার গন্ধ নাকে আসতো। দুপুর আর রাতে হামানদিস্তার ওই ঠং ঠং শব্দটা আমায় আকৃষ্ট করতো। পান না হলে খাওয়া যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাংলা সাহিত্যে ও পানের কথা বারে বারে উঠে এসেছে।  সাহিত্য হলো সমাজের দর্পণ, তাই সাহিত্যে সমসাময়িক  বেশভূষা, খাদ্যাভাস প্রতিফলিত হয় কাব্যগুলোতে। বাঙালি জীবনের ভোগে,আনন্দে, শৌখিনতায় তাম্বুল কে বাদ দিতে পারেনি এদেশের মানুষেরা। তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে তাম্বুল জায়গা করে নিয়েছে সাহিত্যের পাতায়। পানের পিং এর রঙ হলো তাম্র। সম্ভবত সংস্কৃত শব্দ তাম্র থেকেই’তাম্বুল ‘শব্দটি এসেছে।বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের ২৮ নং পদে রয়েছে-
“হিঅ তাঁবোলা মহাসুহে কাপুর খাই।
সুন নৈরামণি কন্ঠে লইয়া মহাসুখে রাতি পোহাই।”
এই পদে বলা হয়েছে, শবর তাঁবোলা অর্থাৎ তাম্বুল কর্পুর খায় শূন্য নৈরামণি আলিঙ্গনে মহাসুখে রাত্রি ভোর করে। চর্যাপদে ধনীদের বিলাসিতার চিত্রে তাম্বুল সেবনের কথা উঠে এসেছে। তাম্বুল সম্ভবত তখন শৃঙ্গার দ্রব্য হিসেবে ব্যবহৃত হতো।বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের প্রাচীনতম নিদর্শন ” শ্রীকৃষ্ণকীর্তন” এর ‘ তাম্বুল’ খন্ডে তাম্বুলের উল্লেখ পাওয়া যায়। বড়াইয়ের কাছে, হারিয়ে যাওয়া শ্রীরাধিকার বর্ণনা শুনে তার রূপে মোহিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণ বড়াইয়ের মাধ্যমে ‘ফলতাম্বুলসহ’ পাঠিয়ে রাধা কে প্রেমের প্রস্তাব পাঠান।তাম্বুল এখানে প্রেমের নিদর্শন রূপে প্রেরণ করা হয়েছে। তাই এই কাব্যে বলা হয়েছে-
” কথা খানি খানি কহিল বড়ায়ি
বসিআঁ রাধার পাশে।
কর্পূর তাম্বুল দিআঁ রাধাক
বিমুখ বদনে হাসে।।”সাহিত্যে নানানভাবে বার বার উঠে এসেছে পান পাতার কথা। পান কে ইংরেজিতে বলা হয় ‘ Betel’. এই শব্দটি ১৬ শ শতকে পর্তুগীজরা প্রথম ব্যবহার করে। সম্ভবত মালয়ালাম ‘ Vetile'( যার অর্থ পাতা) শব্দের সাথে শ্রুতিগত সাদৃশ্যে ‘ betel’ শব্দের প্রচলত হয়েছে। এই শব্দটি ‘ bettele’ থেকে ‘ betre’ থেকে ‘ betle’ থেকে অবশেষে ‘ betel ‘ এ এসে পৌঁছেছে। আবার পান শব্দটি সম্ভবত সংস্কৃত ‘ পর্ণ’ শব্দের থেকে এসেছে। সংস্কৃতে হোক বা শুদ্ধ বাংলায় পান কে বলা হয় ‘ তাম্বুল’। পান হলো গৃহস্থ জীবনের প্রতীক। সমৃদ্ধি, বিলাসিতা, স্বচ্ছলতা, প্রতিশ্রুতি, ভালোবাসার প্রতীক। ধর্মীয়, সামাজিক অনুষ্ঠানে পান ও সুপারির ব্যবহার দেখা যায়। মঙ্গল কাব্যে ও রচয়িতারা তাম্বুলের প্রসঙগ এড়িয়ে যাননি। ” চন্ডীমঙ্গলের “ বণিক খন্ডে ভাঁড়ু দত্তের উদরে অন্ন জোটে না কিন্তু বিলাসী লোকের মতো পান খাওয়া চাই তার।তাই তার স্ত্রী গঞ্জনা করে বলেন,
” উদরে না চিনে অন্ন, তাম্বুল পান মুখে”।
“চন্ডীমঙ্গল” এর ‘আখেটিক ‘খন্ডে ও রয়েছে ধনপতি সওদাগরের কথা। রাজার ধনপতিকে সিংহল যাত্রার নির্দেশ দিলেন। বহুদিন সিংহল থেকে কোনও সওদাগর না আসায় দেশে গুয়ারের বড়ই অভাব দেখা দিয়েছে। চিন্তান্বিত রাজা ভাবতে লাগলেন, কী দিয়ে সাজা হবে তাম্বুল, কিভাবে তিনি অতিথিদের মান রাখবেন ? রাজ-নির্দেশে ধনপতি নৌকা ভাসালেন নোনাজলে। হাত পেতে নিলেন, রাজার দেওয়া তাম্বুল, তুরঙ্গ,লক্ষ মুদ্রা,শালবস্ত্র, বর্ম ও ফলা কাটারি। যথাসময়ে যাত্রা শুরু হল। উজানিনগরে রয়ে গেলো , দুই স্ত্রী লহনা আর খুল্লনা।কবি কঙ্কণ মুকুন্দ রাম চক্রবর্তীর ‘ চন্ডীমঙ্গলে’ কবি লিখলেন-
” নানা আভরণ পরি ডালি করে নিলো ঝারি,
বাস করে তাম্বুল সাঁপুড়া “।আবার ” মনসা মঙ্গল” এ ও পানের উল্লেখ রয়েছে। চাঁদ সওদাগর বাণিজ্য করতে গিয়ে একবার এক আজব এক দেশে উপস্থিত হন। সপ্তডিঙ্গা নোঙর হয় সে দেশে। সওদাগরের সঙ্গে দেখা করতে আসেন কোতোয়াল। চাঁদ সওদাগর তখন পান খেতে ব্যস্ত ছিলেন। সোনার বাটা থেকে পান-সুপারি-চুন দিলেন অতিথিকে। কোতোয়াল চুনকে দই ভেবে চেটে খেয়ে নিলেন আর , পান ফেলে দিলেন। চাঁদ সওদাগর বুঝতে পারলেন, এদেশের লোক পানের ব্যবহার জানেন না।তার ব্যবসায়ী বুদ্ধি মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। পান পাতার বদলে দেশে নিয়ে ফিরলেন হীরে-মাণিক।
” চাঁদ বলে শুন রাজা আমার উত্তর,
পৃথিবীতে বস্তু নাহি ইহার দোসর
চুন পান গুয়া দিয়া যেথায় একত্র
দেখিতে সুন্দর মুখ হয় পবিত্র”।বিজয় গুপ্তের’ মনসা মঙ্গল’ এ লখিন্দর বিবাহ পালায় কবি লিখেছেন-
” ধর ধর বলাধিক খাও গুয়া পান
লখাইর সঙ্গে কটক যাইবে সাজাইয়া আন”।
বণিক জীবনের শৌখিনতা, বিলাসিতা, স্বচ্ছ্বলতায় জড়িয়ে আছে তাম্বুল।এই কাব্যেই আছে, জরুৎকারু সঙ্গে মনসার বিবাহ স্থির হলে গৌরী শিবের কাছে অভিযোগ করেন, এয়ো স্ত্রীরা এসে,তাদের হাতে তিনি কি দেবেন? ঘরে কিছুই নেই। শিবের পানের বদলে চৈ পাতা ও সুপারির বদলে কুলবীচি এনে দেবার আশ্বাস থেকে মনে হয় সেসময় পান অতিথি অভ্যর্থনার অংশ ছিলো।

‘ধর্মমঙ্গল ‘ এ কালুর বউ লখাকে ” দাসীতে জোগান পান গালে গোটা গুয়া”।
রায় গুণাকর ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দরের’ হীরা মালিনী বলেছে ” গালভরা গুয়া পান” এর কথা”।
অন্নদামঙ্গলে ও এসেছে পান খাওয়ার কথা,
” পান বিনা পদ্মিনীর মুখে উড়ে মাছি”।
শিবের বর্ণনা প্রসঙ্গে – ভারতচন্দ্র তার ‘অন্নদামঙ্গল’ এ লিখেছেন,
“আধ মুখে ভাঙ্গ ধুতুরা ভক্ষণ
আধই তাম্বুল পুরি রে”।

মঙ্গলকাব্য থেকে আসা যাক অনুবাদ সাহিত্যের জগতে।
কৃত্তিবাসী রামায়ণে রাম সীতার বিবাহের ভোজনস্থলে ও পান খাবার উল্লেখ আছে…
” স্নান করি আসিয়া যতেক রাজগণ।
আনন্দিত হইয়া সবে করেন ভোজন।।
ভোজন করেন রাম পরম হরিষে।
দধি দুগ্ধ দিলো রাজা ভোজনের শেষে।।
সুতৃপ্ত হইল সবে করে আচমন।
কর্পূর তাম্বুলে করে মুখের শোধন”।
লঙ্কা কান্ডেই দেখা যায়, বিভীষণ বানরদের জন্য খাবার দাবারের বন্দোবস্ত করেছেন।সেখানে রয়েছে ক্ষীর লাড্ডু, পাঁপড়,মোদক,পাকা কাঁঠালের কোষ,মধু, ঝাল লাড্ডু র কথা।এসব খাওয়ার পর আছে ‘ রতন বাটায় করে তাম্বুল ভক্ষণ’ এর কথা।শুধু মানুষ নয়,কৃত্তিবাসী রামায়ণ এ বানরদের তাম্বুল ভক্ষণ ও অবাক করে।ইন্দ্রজিৎ বধের সংবাদে শ্রীরাম চন্দ্রের এক খিলি ” কর্পূর তাম্বুল ” মুখে পুরে নেওয়ার কথা আছে। লঙ্কাপুরীতে ও সুপারী পানের প্রচলন ছিলো। স্বয়ং রাবণ শার্দূল নামের চরকে সুপারি দেওয়া পান দিচ্ছেন। কাশীদাসী মহাভারতে অশ্বমেধ যজ্ঞের বিবরণে বলা হয়েছে-
” সুবাসিত কপূর তাম্বুল পুষ্প নিয়া।
যজ্ঞ পূর্ণ ধৌম্য করে বেদ উচ্চারিয়া”।
আবার যুধিষ্ঠিরের স্বর্গারোহনের পর দেবরাজ ইন্দ্র তাকে আপ্যায়ন করেন। সেখানে বলা হয়েছে-
“ইন্দ্র আজ্ঞা পেয়ে পরে,নানা দ্রব্য উপহারে
ভোজন করায় নরনাথে।
কপূর তাম্বুল দিয়া,
পালঙ্কেতে বসাইয়া, ইন্দ্র আশ্বাসিল ধর্মস্থতে।”

সৈয়দ আলাওল রচিত “পদ্মাবতী” কাব্যে লিখেছেন,
” অধর রাতুল কৈল তাম্বুল রসে”।
চৈতন্য জীবন গ্রন্থে তাম্বুলের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস অংশে বলা হয়েছে,
” সিদ্ধা মহন্ত যোগী পান নাহি খায়।
পানের বদলে তারা হরতকী চাবায়।”
অর্থাৎ বৈরাগীরা পান খেতেন না, পানের প্রচলন ছিলো গৃহস্থ মানুষের মাঝেই। আবার ‘ চৈতন্য চরিতামৃতে ‘ এ দেখা যায়, চৈতন্যদেব শ্রীবাসের গৃহে নিমন্ত্রনে এলে তার আপ্যায়ণ বর্ণনায় লেখা হয়েছে-
” আচমন করিয়া প্রভু বসে সিংহাসনে
কর্পূর তাম্বুল যোগায় প্রিয় ভক্ত গনে”
‘চৈতন্য ভাগবত’ এ বলা হয়েছে, চৈতন্যের চর্বিত তাম্বুল খেয়ে বিধবা নারায়নী বৃন্দাবন দাসের জন্ম দেন। বৈষ্ণব পদাবলীর সুললিত পদে, তাম্বুল কে অগ্রাহ্য করতে পারেননি, রচয়িতারা।

বিদ্যাপতির রাধা , কৃষ্ণ প্রেমে নিজেকে হারিয়ে তাকেই জীবনের সর্বস্ব মনে করে বলে,
”হাথক দরপন মাথক ফুল,
নয়নক অঞ্জন মুখক তাম্বুল”।
অর্থাৎ তুমি আমার হাতের দর্পণ,মাথার ফুল,নয়নের কাজল মুখের তাম্বুল।

লোককথায় পাঁচালী র একটু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান এ, পুজো পার্বনে পান,সুপারিকে বাদ দেওয়া যেতো না।কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার ঘট প্রতিস্থাপনের নিয়মে বলা হয়েছে-
“জলপূর্ন ঘটে দিবে সিঁদুরের ফোটা,
আম্রের পল্লব দিবে তাহে এক গোটা।
আসন সাজায়ে দিবে তাতে গুয়া পান,
সিঁদুর গুলিয়া দিবে ব্রতের বিধান,।
আবার শনির পাঁচালীতে রয়েছে,
” কৃষ্ণ তিল তন্ডুলেতে মিশাইবে গুড়
সন্দেশ শর্করা আর তাম্বুল কর্পূর”…।।
ময়মনসিংহ গীতিকার নানান পালায় তাম্বুল কে তুলে আনা হয়েছে। কাজলরেখা আচমনের জল দেওয়ার পরই অতিথিদের জন্য কেয়া খয়ের দিয়ে সাজা সুগন্ধি তাম্বুল আনে।

” ময়নামতির গান” এর নায়িকা ময়নামতির পান খাওয়া বা তাম্বুল বিলাস এ বলা হয়েছে, গুয়া-মুড়ি(সুপারি ও মৌরি), ধনে, করপুর বা কর্পূর,দল চিনি( দারুচিনি), জৈষ্ঠ মধু, লং বা লবঙ্গ, এলাঞ্চি বা এলাচ এবং জায়ফল।
ময়মনসিংহ গীতিকার বৃষ্টি মন্ত্র….
”খাজুর পাতা হলদি,মেঘ নাম জলদি।
এক বিড়া পান, ঝুপ ঝাপাইয়া নাম।”
খনার বচনে বলা হয়েছে,
”পান পুঁতে শ্রাবণে,
খেয়ে না ফুরায় রাবণে”

শিশু সাহিত্যে-
“আয় রঙ্গ ঘাটে যাই,গুয়া পান কিনে খাই,
একটা পান ফোঁপড়া,মায়ে ঝিয়ে ঝগড়া। “
ঘুম পাড়ানি গান-
” ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি ঘুমের বাড়ী যেও,
বাটা ভরা পান দেবো গাল ভরে খেও”।
নানান লৌকিক গানে ও লেখকরা পানের কথা এনেছেন। বানভট্ট তার “কাদম্বরী” তে রাজকুমার চন্দ্রাপীড়ের পান বহনকারী পত্রলেখা কে ” তাম্বুল করঙ্কবাহিনী” বলে পরিচয় দিয়েছেন। সে সময়ে রাজ অন্তঃপুরে পান-পাত্র বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একদল পরিচারিকা বহাল করা হতো।তাদেরই বলা হতো ‘ তাম্বুল করঙ্কবাহিনী’।
প্রাচীন যুগ,মধ্য যুগ পেরিয়ে আধুনিক যুগের সাহিত্য বা গানে ও তাম্বুল কিংবা পানের কথা এসেছে।কবি গানের বিখ্যাত শিল্পী ভোলা ময়রার একটি গান আছে-
‘পানকে তাম্বুল বলে পর্ণ সাধু ভাষা,
বরুজে বিরাজ করে চাষার বড় আশা “।
আবার,
জসীমউদ্দিন ” পালের নাও” কবিতায় লিখেছিলেন-
” পালের নাও পালের নাও, পান খেয়ে যাও পালের নাও”।
অদ্বৈত মল্লবর্মন তার লিখিত উপন্যাস,’তিতাস একটি নদীর নাম ‘ এ লিখেছেন-
” পান খায়ো রসিক জামাই কথা কয়ো ঠারে”।
বাঙালির জীবনে তাম্বুল ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে আছে। শৌখিনতায়, শৃঙ্গারে,বিলাসিতায়, পুজো- পার্বনে, ব্যবসায় তাম্বুল পাকাপোক্ত জায়গা করে নিয়েছে। এমনকি বিখ্যাত গানের সেই লাইনটি ও বাদ দেওয়া যায় না,
“তোমায় হেরি গো স্বপনে শয়নে
তাম্বুর রাঙা বয়ানে।”
পুরাণে পান, সুপারির প্রসঙ্গে নানান কাহিনী পাওয়া যায়। কথিত আছে, যখন শ্রীরামচন্দ্রের সংবাদ পৌঁছোনোর জন্য হনুমান সুদূর লঙ্কায় সীতার কাছে যান, তখন সীতা তাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন পান পাতা দিয়ে তৈরি মালা দিয়ে। মহাভারতের একটি কাহিনীতে বলা হয়েছে, একবার রাজসূয় যজ্ঞের সূচনার জন্য পান পাতার প্রয়োজন হয়। তখন অর্জুন নাগলোকে গিয়ে সর্পের রানীর কাছে পান পাতার জন্য অনুরোধ করেন। সম্ভবত এ কারণেই পান পাতার আরেক নাম  নাগভেল্লী বা নাগরবেল।
১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দে ভারতে সুলতানী শাসনের সময় মুসলমান পর্যটক ইবনবতুতা, এদেশে আসেন। তার বৃত্তান্ত থেকে জানা যায়, ভারতে সুলতানরা বিলাসবহুল ভোজনের পর  পান খেতেন। সে সময় তিনি ভারতবর্ষে প্রচুর পানের বরজ দেখেছিলেন।এমনকি সম্মানীয় ব্যক্তিদের পান দিয়ে অভ্যর্থনার রীতির প্রচলন ছিলো, যা ছিলো সোনা কিংবা রূপার চেয়ে ও সম্মানের। মার্কোপোলোর ভ্রমণ বৃত্তান্ত থেকে জানা যায়, ১৩ শ শতকে ভারতের রাজাদের মধ্যে পান খাওয়ার রীতি প্রচলিত ছিলো। মুঘল সম্রাট শাহজাহান রাজকুমারী জাহানারার পান সুপারীর ব্যয় পূরণের জন্য সুরাটের সমগ্র রাজস্ব দিয়ে দিতেন। মনুক্কির মতানুসারে, রাজ পরিবারের নারীদের পান, জুতো ও আতরের জন্য রাজ পরিবারের পুরুষেরা বহু টাকা ব্যয় করতেন।বার্নিয়ার এর লেখায় পাওয়া যায়, তুরস্কের কফির মতো ভারতবর্ষের পান ও ছিলো রাজকীয়। আইন- ই- আকবরী গ্রন্থে আমীর খসরুর একটি পদের উল্লেখ আছে। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন-
বাগানের অসম্ভব সুন্দর ফুলের মতো হলো পান, ভারতের সবচেয়ে মধুর ফল।আয়ূর্বেদের পানের বহু গুনাগুনের উল্লেখ আছে। প্রাচীনকালে মেয়েদের প্রসাধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলো পান। তাম্বুল চর্চিত রাঙা ঠোঁটে নায়িকা নিজের সাজসজ্জা সম্পন্ন করতেন। তবে আধুনিক সময়ে পানের চর্বিত চর্বনে ও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। আগুণ পান, চকলেট পান, বারানসীর পান তাম্বুল সমাজে পাকাপোক্তভাবে নিজের আসন করে নিচ্ছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত