| 29 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
প্রবন্ধ সাহিত্য

ভাষা দিবসের প্রবন্ধ: ভাষা আমার ভাষা ওগো । ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

অতিমারীকালে আমরা পেরিয়ে এসেছি চরম এক পরিস্থিতি। মায়েদের ভাষায় ছোটো শিশু হাঁটতে শিখলে যেমন হয় আর কি। ধর ধর ঠেকা ঠেকা অবস্থা? এই ভালো তো এই খারাপ। 

অতিমারীর ক্রান্তিকাল পেরুনো আমাদের কাছে ছিল দস্তুরমত দুরূহ কাজ। আমার একলার করোনাকালীন পাকশাল ছিল তাই রক্ষে। আধুনিক রান্নাঘর এসময় শুধু বারেবারে জারিত করেছে মা, দিদা, ঠাম্মার ঝুলকালি মাখা হেঁশেলের ত্রেতাযুগের প্রবাদ, ঘরোয়া কথাবার্তা কে। এসব মনে না পড়লে আমি আর কিসের ভাষা শ্রমিক? তাদের ঝুলিতে অঢেল আজগুবি সব শব্দমালা ভীড় করত রোজ। আস্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ছিলাম বলেই বুঝি মাতৃভাষার সেই মিষ্টতা নিজের মনের মণিকোঠায় ধরে রাখতে পেরেছি। তাই জিভের ডগা সুড়সুড় করে বেরিয়ে আসে সুললিত সেইসব শব্দকণারা। আমার তক্ষুনি নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হয়। আমি সেই শব্দের লালন করি, পালন করি। মায়েদের সেইসব শব্দসূত্র  বহন করার যোগ্যতা ছিল বলেই না পারি।

শুধু হেঁশেল পারিপাট্য নয় ভালোবেসে সংসার করতে জানলেই বুঝি এমন শব্দকণারা ঠোঁটের আগায় বেরিয়ে আসে অবলীলায়। আর এহেন সুগৃহিণীদের হেঁশেল কে আদরে রাখতে পেরে বর্তে যাওয়াটায় আখেরে লাভ হয় সাহিত্য কর্মীদের। যেন ধন্য হয়ে যায় বাংলাভাষার বিশুদ্ধ অভিধান।

যেমন যৌথ পরিবারে একা হাতে পঞ্চ ব্যঞ্জন রাঁধতেন সেযুগের গিন্নীরা। প্রথম পাতে তেতো দেখে নাক সিটকোত কেউ আবার শেষ পাতে মিষ্টি দেখলে সেই আবার কব্জি ডুবিয়ে খেত। তখনি গিন্নী মাথাগরম করে বলেই ফেলতেন

” নিমের বেলায় হ্যাক থু করে ফেল/ গুড়ের বেলায় চুকচুক করে গেল”

একই সঙ্গে সংসারে একের পর এক বিপদ এলে তাঁদের মুখ দিয়েই বেরুতো ” কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে” বা “গোদের ওপর বিষফোঁড়া ” । এই যেমন অতিমারীর সঙ্গে আমাদেরই তো অভিজ্ঞতা হল যুগপৎ ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের।

আমার মা, দিদিমা, ঠাকুমার এমন হেঁশেল তরিবত দেখেই আমার বড় হয়ে ওঠা। তাঁদের রান্নাবান্নার তাকবাক ছিল লক্ষ্য করার মত।

আমার ভাষাতেই দিদা বলতেন, খুব তার হয়েছে আজ রুইমাছের রসায়। সেই শুনে মা বলতেন বাসি বলে মজেছে আরো।

দইয়ের ঘোলের গেলাসে তলানি পড়ে থাকলেই ঠাম্মা চেঁচাতেন। ছেলেপুলের  কমে যাবার আশঙ্কায়। বলতেন ” দুধের অগ্র, ঘোলের শেষ”

ঠাম্মা আমার চিবুক ছুঁয়ে বলতেন, আমার এক ভুবন আকাশ। শ্বশুরমশাই আলুভাতে খেতে এত ভালোবাসতেন যে ছোটবেলায় মা কে বলতেন, একঘর আলুভাতে খাব আজ। আমার ঠাম্মা ভাইকে বলতেন শিব্রাত্তিরের সলতে। বাবা সেই শুনে দুই ভাই বোনের মাথায় দুটো হাত রেখে বলতেন, এরা আমার এক‌ বৃন্তে দুটি কুসুম।

রান্নাঘর থেকে প্রায়শ‌ই মুখ বাড়িয়ে ফোন ধরে মা এখনো বলেন নাটাঝামটা খাচ্ছি। বাবা টিভিতে খবর শুনতে শুনতে চেঁচিয়ে আজো বলেন “উচিত তর্পণে গাঙ শুকলো” উন্নতি আর হল না দেশের। সেই শুনে মা কথার পিঠে কথা বলে উঠলেন হয়তবা। ” হ্যাঁ গো ছেলেপুলের চাকরীর কি ভবিষ্যৎ?” তার উত্তরে বাবা হয়ত বললেন, ” মুয়ে খেঁদির বে হয়না, তার চার পায়ে আলতা” ।

মা বিয়ের পর ভিনরাজ্যে আমার নতুন গিন্নীপনা দেখে বলেছিলেন ” কি সুন্দর ঘরুনি-গেরুনি হয়েছিস! 

এই ভাষাতেই ফুলের মত ছোটো শিশুর মুখে বোল ফোটে।  

সেই ভাষায় আজও জ্বর আসে তাড়সে আর কাঁচালংকা আজও কামড়ে খাই প্রতিটি গরাসে। আজও সেই ভাষায় কাজের পরে লাগে একটু জিরেন। আজও হাতড়ে এই ভাষায় আজও খুঁজি আমার মনের মত দোসর। আজও মিস্ত্রীর পারিশ্রমিক দিই ফুরোনে।এই ভাষায় মা এখনও সামলায় ভাঁড়ার। এই ভাষাতেই বাবা লেখাপড়ায় ফাঁকি দিলে বলতেন ব্যাদড়া। অশীতিপর শাশুড়ি মা এখনও বলেন দিনভর ব্যারাম এর কথা। বলেন, “তাত সয় তো বাত সয় না” 

আজও রান্নাঘরের চূড়ান্ত ব্যাস্ততম মুহূর্তে দূরভাষ বেজে উঠলে মুঠোফোন তুলে বলি, এখন রাখো, আমি ল্যাজেগোবরে। পরে কথা হবে।

অভাবের সংসারে এখনও এই ভাষাতেই মানুষ বলে ওঠে নুন আনতে পান্তা ফুরনোর কথা। এমন এক সংসারে পথের পাঁচালীর অপুও মোহনভোগের আবদার করতে সর্বজয়ারও মনে হয়েছিল বৈকি “একে মা ভাত দেয়না, তপ্ত আর পান্তা” তাই মোহনভোগের অপভ্রংশ “সুজির পুলটিস” বানিয়ে সে যাত্রায় ছেলেকে শান্ত করেছিল মা।

এই ভাষার যাদু এমনি যে ভাষার মূর্ছনায় চোখে আসে জল।

জ্বর হলে মায়ের হাতের আলুমরিচ দিয়ে পথ্যি? কিম্বা জ্বর কমানোর জন্য মাথায় জলপট্টি? মা আর ভাষা এসবই তো জড়িয়ে জীবনকে।

আবার ঘুম এলে এই ভাষাতেই আমার চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে আবার সারারাত জেগে থেকে সেই দুচোখের পাতা এক করা যায় না । এই ভাষাতেই বহুদিন আড়ির পর দুই বন্ধু আবার আমে-দুধে মিশে যায়। বড় ঘরে মেয়ের বিয়ে দিয়ে যে ভাষায় মেয়ের মায়ের পায়াভারি হয়। সেই মিষ্টি ভাষাতেই আবার বন্ধু বন্ধুকে তেড়ে যান ন্যাদস বলে। বিষহীন সাপ এই ভাষায় ঢ্যামনা। বেকার পুত্রকে বাবা রেগে গিয়ে বলে ওঠেন ঢেঁড়স। শাশুড়িকে ব‌উ ঝগড়ার সময় বলেন তাঁর শাঁখের করাতের মত অবস্থার কথা অথবা বলে ওঠেন মা কি মুখে মধু দেয় নি গা? গেরামভারি চালে শাশুড়িরা আরও এমন ভাষা প্রয়োগ করেন । প্রত্যক্ষভাবে গাল না দিয়েও পরোক্ষভাবে একটা দুটো শব্দেই অনেককিছু বলে দেন তৎক্ষণাৎ । এই যেমন বৌয়ের মুখে কুলুপ আঁটার কথা? সেই শুনে শ্বশুর বলেন নিজের উভয়সংকটের কথা।


আরো পড়ুন: একুশের চেতনায় একুশের কবিতা এবং পরম্পরা

ট্রেন যাত্রায় ভোগান্তির কথা বলে সেই ভাষা, অথচ সেই ট্রেনে চড়ার জন্য হত্যে দিয়ে থাকে কত মানুষ। মা সংসারে দেন গতর আর আলটপকা কিছু বলে ফেলেই বিপদ বাড়ান তিনি। হয়ত মা মুখফসকে বলেই ফেলেন, সারাদিন পিঠটা দোমড় করতে পারিনি। বাবা তা শুনে বলেন, “কি কুলুক্ষ্ণে বড় গাছে লাউ বেঁধেছিলুম !”

এই ভাষাতেই কেউ তাঁর কাজের কদর করে না বলে অভিযোগ জানান মা । আগুপিছু কিছু না ভেবেই এ ভাষার শব্দকোষ হাতড়ে  মন্তব্য করি আমরা।

সেই ভাষা হল আমাদের মিষ্টি মাতৃভাষা। আমাদের বাংলাভাষা।

সেই কবেকার কাল থেকে এই মিষ্টিভাষাতেই বাঙালীদের মুখে মুখে ফিরেছে প্রবাদ।

 

দুষ্টু স্বামী কে শায়েস্তা করতে মেয়েদের পড়শীরা কখনও বলে উঠেছে

নুন চুপচুপ লেবুর রস, ত্যাঁদড়া ভাতার মাগের বশ!

সেইকবে থেকে মেয়েদের শ্বশুরঘর যেন কিছুতেই আর আপন করে নিতে পারত না তাদের। তাই তো শ্বশুরবাড়ির হেঁশেলে কোনও বিশেষ রান্না হলে বালিকাবধূর লোভে জিভ শক শক করে উঠত। আর তা দোষের কিছুই নয়। কিন্তু তাদের জন্য সব রাঁধাবাড়া তোলা থাকবে। আগে পুরুষ মুখে দেবে তার পর মেয়েদের অধিকার সেই খাবারে। তা সে যতই খিদে পাক, লোভ হোক ছোট্ট মেয়েটির।

বাড়ির একপাল বাল্য বিধবারা সেই রীতিরই স্বীকার একসময়। তাই বালিকা বধূটির ওপরেও সেই ফতোয়া জারি করতেন। তাই বুঝি সৃষ্টি হয়েছিল তিক্ত এক ছড়া… শুনেছিলাম মায়ের মুখেই।

“ও নোলা, তপ্ত খোলা / ও নোলা পরের ঘর।

ও নোলা সামলে চল / যবে যাবি বাপের ঘর

তুলে খাবি দুধের সর / এ হল শ্বশুরঘর

এখন কি আর করবি বল? / নোলা তুই সামলে চল”

আমাদের শিশুতোষ বানভাসি হয়েছিল এই ভাষায় লেখা ছড়াতেই। বাঙালীর মাছ – পিরীতির খোঁজ সবাই রাখে। তাই বুঝি প্রাচীন ছড়াকার লেখেন

 “বাঙালী কাঙালি মরে মাছেভাতে”

অথবা

” উদবিড়ালে খুদ খায় / চালে নাচে ফিঙে/ পুঁটি মাছে গীত গায়, মাগুরে বাজায় শিঙে”

এই মাছ আমাদের। এই ভাষাও আমাদের। তাই এমন ছড়া তো আমাদেরই সম্পদ। রবিঠাকুর এবং অবনঠাকুরের সংগৃহীত চট্টগ্রামের আরেকটি ছড়া?

” মণি পান্তা ভাতর শনি / অম্বল বড় ঝাল/ মাছ পাতরি দেখ্যে  মণি / তিনটি দিয়ে ফাল”

বাংলাভাষার মতোই বাঙালীর সিগনেচার রেসিপি হল মাছের পাতুরি বা অম্বল। তাই সোনার হাতে সোনার কাঁকন কে কার অলংকার।

আমার বাংলার বিয়ের উৎসবে দধিমঙ্গল থেকে পুজোর বিসর্জনের দধিকর্মা কিম্বা সপ্তপদী থেকে কুসুমডিঙের মিষ্টতা যেমন ছাদনাতলায় চুইয়ে পড়ে তেমনই দুধেআলতা পায়ে বধূবরণের গোলাপি আভাতে স্ত্রী আচারের থইথই লোকাচারে  যেন গমগম করে ভাষার ছটা।

খেলার মাঠে রাগের মাথায় বাঙালী ভাষার বাকচাতুর্যে  কচুকাটা  করে ফেলে বিপরীত পক্ষকে। সেই মুহূর্তে বিপরীত পক্ষের মুখ দিয়ে কচু পোড়া  খা এর মত ভাষাই বেরোয় যদি তারা বাঙালী হয়।

এই ভাষাতেই চালবাটার নাম পিটুলিগোলা যা বাঙালীর আলিপনার অঙ্গ। পিঠের নাম পাটিসাপটা । সর্ষে মাছের আদুরে নাম ঝালদেয়া। রসের মিষ্টি মালপোয়া কিম্বা পানতোয়া। নিরামিষ ঝোলের সোহাগী নাম ঝালের ঝোল অথবা পাঁচমেশালি তরকারীর গালভরা নাম চচ্চড়ি।  

এই ভাষাতেই অন্নদামঙ্গল কাব্যে শিব সাগ্রহে অন্নপূর্ণার হাতের রান্না খান সোনা হেন মুখে

“ পায়স, পয়োধি সপ্ সপিয়া

পিষ্টক পর্বত কচমচিয়া “

হ্যাঁ, আমরাই তো পারি সাপটে খেতে। চেটেপুটে। কচমচ করে চিবিয়ে, সপ সপিয়ে ভাতের সঙ্গে মাছের ঝোল কিম্বা ডাল  মেখে খেতে। দুধের বাটি ধুয়ে জলটুকুনও ।

সেই যে ঠাম্মা শিখিয়েছিল কোন ছোটবেলায়

 ” বাটি ধুয়ে খায় যে / ডাগর ডগর হয় সে”

ভাতের দানা ফেলতে শিখিনি যেমন, মাছের কাঁটাও বাছতে পারি তেমনই, মাংসের হাড় চুসতেও ওস্তাদ… সেই লেগাসি বয়েই তো করোনার ক্রান্তিকালে আনাজের খোসা ভেজেই খেয়ে চলি আজও।

দিদা বলেছিল

“তিলে তিলে হয় তিল্ভান্ডেশ্বর”

তাই বোধহয় ভাষারও সবটাই রেখে দিয়েছি বুকে করে, তিল তিল করে জড়িয়ে ধরে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত