ভ্রমি বিস্ময়ে

 

যেভাবে আজও জাগি, সেভাবেই। তুমি বলবে শব্দে এত ‘ই’-লাগাই কেন। আমি আবারও বলব ‘থাক-না, আমি তো এভাবেই-ই বলি…প্লিজ’ তুমি আমার কুহু রঙের সাথে তোমার অবেলা-র প্রাইমার মিশিয়েছো।বিশ্বাস করো এমন ভাবে যত্নে আমার আইল্যাশের ওপর নকল আইল্যাশ লাগিয়ে দেয় নি। কেউ কোনোদিনও না। সংখ্যা না গুণেই বলছি কিন্তু, আমার এক প্রেমিক একবার আদর করে আইভরি রঙের আইশ্যাডো আমায় লাগিয়ে দেবেই। সে কী আবদার! অগত্যা ‘বিস্ময়’ আর ‘ই’ একদম দূরে রেখে একদম তার উলটো দিকে হাঁটুমুড়ে বসলাম। আমার দু’হাত তার কোমর জাপটে রেখেছে। চোখ সেজে উঠবে বলে প্রস্তুত। তিনিও রেডি। টানটান ব্যাপার। পুরোনো প্রেমকে খোঁচা মেরে যে তৃপ্তি বয়ে বেড়ানোর গান বাতাসে ভেসে আসে; তেমনই প্রসন্নতা নিয়ে আমার চোখের প্রসাধনে ব্যস্ত তিনি! ‘বাহ্ও কি দরমিয়া দো পেয়ার মিল রহেহ্যায়…’  হুম খুউব! না না, স্মার্টফোন জুড়ে। আননোন নাম্বার’ সাদা-নীল আলোয়। পাশেই রেখেছিল। কিন্তু না, ভয়ঙ্কর অবাধ্য তো! বেজেই চলেছে। তিনি রিসিভ না করেই অন্যঘরে গেলেন আমার ‘চোখ’ ফেলে। সেই থেকে আমি দৃষ্টিহীন। ইচ্ছে করছে পাশে একটা স্মাইলি ইমোজি আদর করে বসিয়ে দিই। মানে আমার এই লেখার সাথে। সব রিংটোন এক কিন্তু এই ‘আননোন নাম্বার’ এর জন্য ‘বাহও কি দরমিয়া…’

পাশের বাড়িতে মেজো পিসিমার নাতনি ঠিক তারপর থেকেই রোজ রাত ঘন হলেই পড়ার মাস্টারমশাই চলে গেলে হারমোনিয়াম বাজিয়ে শুরু করে দেয় গান। যতক্ষণ না তার মা তাকে থামতে বলেন। মেজো-পিসিমানব্বুই জর্দা মুখে পুরে শুনতে থাকেন নাতনির গান। ভাঙা রেকর্ডের মতো বাজছেই।

”চোখ গেল, চোখ গেল কেন ডাকিস রে, চোখ গেল পাখি..”।  ‘আ মোলও! তো বয়ে গেল…’ মনে পড়ে? খুব মনে পড়ে আমার।

গানের দিদিমণি আর গান পেলেন না! উফফ! ঠিক এমন একটা সময়তেই দিতে হল এই গান! বরং উনি শেখাতেই পারতেন রবি ঠাকুরের চোখের গানটা! ওই যে, “চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে…” এই কথাগুলোই বলছিলাম আর-এক প্রেমিককে। ওয়ান-শট টাকিলার মতো এক ঢোকে গিলছিল আমার প্রেমিক। কী ভালোই না ব্লেন্ডিং করে! হ্যাটস অফ! এটাও কিন্তু একটা আর্ট। সবাই পারে না। আমাকে অবাক করে পেগ বানানোর সময় তার নিষ্ঠা! আবার নামিয়ে আনি ‘বিস্ময়’- চিহ্ন। আর ‘ই’-টা তো আমার সেই প্রেমিকের ওই যে পকেট; নাঃ, তবে আমি ‘ডানে-বাঁ’-এ একদম নই। আর এখন তো ‘চোখ’-ই নেই! যখন ছিল তখনও বারবার ‘ই’-কার বুকে রাখতে গিয়েই শার্ট ছিঁড়ে তার বুক ভেঙে, আমার বুক ডুবিয়ে রেখে এসেছি কুহু রং। মনে নেই?

তুমি আমার এই তীব্রতাকে হত্যার জীবন রেখা ভাবলে। আমিও নতুনভাবে তাকাতে শুরু করলাম। আমার ভিতরের চোখ আরও প্রখর হচ্ছে, অন্ধত্ব টপকে। যা বলছিলাম, অসম্ভব ভালো ব্লেন্ডিংটা আসলেই জানে সে। আবারও ইমোজি দিতে ইচ্ছে করছে। গ্লাসটা বদল করেছিলাম। ওকে আমার হত্যার দায় থেকে চিরকালের মতো বাঁচিয়ে দিলাম এবং আমিও বাঁচলাম। জাস্ট দুটো সিপের পরই ওকে উলটো দিক থেকে ছোঁয়ার আছিলায় আমার হাতের ধাক্কা টুকরো টুকরো তরলের সাথে কাচ ইটালিয়ান-টাইলসের মেঝেতে বইছিল এক স্বাধীন নাবিকের মতো। ভাগ্যিস, সেদিন টাকিলা ছিল না।

ঠিক এই কথাগুলোই বলছিলাম পরবর্তী জনকে। আসলে কী বলুন তো স্বামী বিবেকানন্দের ওই বাণীটা খুব মানি বইকি। এবার কিন্তু গালে হাত দেওয়া কবি সুকান্তের মতো ইমোজিটা কোত্থেকে একলাফে এসে আমাকে শুধলো যে কী সেই বাণী?

বললাম যে, মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ। টুকটুক করে ও ওখান থেকে চলে গেল। আরে বাব্বা! কী মনোযোগী তিনি! আমার প্রতিটি মন খারাপের দিকে আরিব্বাস! সে কী দুরন্ত নজর তার! আমার ভেতরের-বাইরের সব আলো ভিজে চুপচুপে! ভাবলাম; কী কেয়ারিং রে বাবা। এমনটাই তো চেয়েছিলাম আমি। এতদিনে কেউ আমাকে তার নিজের একটি চোখ দিতে চাইলো। আবার নামিয়ে আনলাম ‘বিস্ময়’। কিন্তু চিহ্নটা বলল যে  বিস্ময় গেলেই হবে। তিনি ঠিক সময়ে নেমে আসবেন।  ওয়েব ম্যাগে দ্রুত ভাইরাল হল এই খবর।

রমরম-গমগম করছে পুরো স্যোশাল মিডিয়া ‘তেরি-মেরি’-কাহানির মতো! ‘চক্ষুদান’ বলে কথা! তা-ও আবার কার জন্য না দু’দিনের প্রেমিকার জন্য।অভাবনীয়! একদিকে হত্যার সরগম অন্যদিকে ওই প্রায় জীবন দানই। হৈহৈ করে আমার এই প্রেমিক বিখ্যাত হতে লাগলেন। কী না প্রেমিকাকে নিজের চক্ষু দান। মিডিয়ায় তার স্টেটমেন্ট পাব্লিক গোগ্রাসে খেল। মানে ওই যা-হয়। এমন আরও মহৎ প্রকল্প তার সাথে জড়িত। এ রাম! কী ভুল! কী ভুল! ‘তাঁর’-গুলো সব ‘তার’ হয়ে গেছে।

প্রেসমিট ডাকা হল।  পরদিন খবর আপডেট হল। আরও অনেক কিছু হল। আমার এমব্লায়োফিয়া সারিয়ে তোলা আমার মধ্যবিত্ত বাবা-মা’র মুখটা ভেসে উঠলো! সেই চার বছর বয়স থেকে আঠারো পর্যন্ত আমার বাবার আমাকে নিয়ে তিলোত্তমার কাছে ছোটা। বাসের জানালা দিয়ে মাকে টাটা করা আমার ঝাপসা চোখ;  লক্ষ্মী ট্যারা সারানো মা আমার…তোমাদের মুখ।

চোখ ভেঙ্গেচুরে বেরিয়ে আসছিল বারবার! নাহ আমি তোমাদের সারানো চোখের দখল আর কাউকেই নিতে দেবো না। যা-হয় হোক। চোখে চোখ রেখে আমি দৃষ্টিবিহীন হয়েই বাঁচি। তুমুল বাঁচি। সমস্যাটা ঠিক সেখানেই। আসলে রূপান্তরে তেপান্তর। ওই যে ওই গানটা খুব মনে আছে তো? দেখুক পাড়া-পড়শিতে কেমন মাছ গেঁথেছি বড়শিতে…? হ্যাঁ, এই এক্সিবিটটাই দেখলাম। তার আর চোখ দেওয়া হল না। সব সাহায্যের হিসেবের ফিরিস্তি পেশ হল। মুঘল আলো থেকে লিটল ম্যাগ, ওয়েভ থেকে ওয়েভে। জেগে উঠল রাসসুন্দরী দেবীর বরের ‘ঘোড়া’।

আমি আরও সামনের দিকে  এগিয়ে গেলাম রাগ দেশ, হেডফোন কানে গুঁজে। কুহু রং থেকে অবেলা আজও কী অদ্ভুত রবি ঠাকুরের লুকোচুরির সমস্ত ছায়া হয়ে  বলে যায়। গাছের ছায়া ঘরের জানালাতে  পড়বে এসে তোমার পিঠে-কোলে।

আবার তুমি আমায় অরণ্যদেব  শোনাবে। রোনাল্ডো-বেবেতোর গল্প বলবে। স্বপ্ন দেখাতে গিয়ে মাঝে মাঝে ভয়  গুঁজে দেবে। বেশি আগলে রাখতে গিয়ে দূরত্ব টানবে। তোমার আমার মাঝে ভয় ধীর পায়ে ঢুকে পড়বে সোম বাবুর বাড়ির ভিতর অথবা ইয়া বড়ো পুকুরের পাশে মেজোমারখাটের নীচে….আর আমি আমার ড্রিমগার্ল-এর দিকে আর তোমার দিকে  তাকিয়ে বলব “আবার আমি তোমার খোকা হব, গল্প বলো তোমায় গিয়ে কব…”  খোকা বা খুকুর জন্য বিস্ময় ও  চিহ্ন কেউই আসে না আর আমিও ডাকি না অথবা হঠাৎ যদি এই চোখ খোয়ানো আমি বলে উঠি, ”নিবতো যদি আলো যদি হঠাৎ যেতো থামি আকাশ ঘিরে উঠতো কেঁদে হারিয়ে গেছি আমি…”  হ্যাঁ, পুরুষ আমি প্রচুর-প্রচুর পেয়েছি। কিন্তু বীরপুরুষ কিনা জানি না, আমি  একটা মানুষ পেয়েছি। আজও যে নিঃস্বার্থ

জেগে থাকে; হিসেবহীন; বিজ্ঞাপনহীন। আজও আমার অনুপস্থিতিতে যে-শোনে দেহহীন আমার ডাক। আজও যে নিঃস্ব হয়ে জল ঢালে আমার সমাধি স্থানে বোনা গন্ধরাজ গাছটায় রোজ। আমার পরমবন্ধু! বিশ্বাস করুন আমার কথাশিল্পী সাগরিকাদিকে মনে পড়ে ভীষণ-ভীষণ।

গ্রহণ আর গ্রাস এক নয়। তুমি এই কথাগুলো প্ল্যাকার্ডে লিখে গন্ধরাজ গাছের পাশে লাগিয়ে রেখেছো। আমি জানি তো, আমার, গাছের শিকড়ের আর প্ল্যাকার্ডের লাঠির অভিমুখ একদিকে। তোমার বাঁশিও শুনি রোজ। কিন্তু ওই গানটা আর গাইবে না তো তুমি; আমার ভীষণ কষ্ট হয়। আমি তো কোত্থাও যাইনি। বড়ো কষ্ট হয়।

”কেন পিরিতিবাড়াইলা রে বন্ধু ছেড়ে যাইবা যদি…”

বরং বাঁশিটাই শুনিও…।

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত