স্মরণ: ভূমেন্দ্র গুহ

জন্মদিনে প্রণাম স্যার। আপনার কাছে আমার ঋণের শেষ নেই। আমি বিশ্বাস করি না আপনি নেই।আপনি আমার একমাত্র মেনটর।

নবারুণ ভট্টাচার্যর মৃত্যুর পর বিশেষ সংখ্যার জন্য ‘এই সময়’ পত্রিকায় লেখা জমা দিয়েছি, বিভাগীয় সম্পাদক ফোন করে জানতে চাইলেন আমার সঙ্গে নবারুণদার কোনও ছবি আছে কিনা। আমি থতমত খেয়ে বললাম, না তো। অথচ নবারুণদা বেশ কয়েকবার আমার বাড়ি এসেছেন, আমি নবারুণদার বাড়ি গেছি, নিয়মিত আড্ডা তো বহাল ছিলই, কখনও ছবি তোলার কথা ঘুণাক্ষরেও আমার মনে হয়নি।

হ্যাঁ! ভূমেন্দ্র গুহর সঙ্গে আমার কোনও ছবি নেই।অথচ এই লেখাটার সঙ্গে তেমন একটা যুতসই ছবি থাকলে মন্দ হ’ত না। ঘুরে-ঘুরে সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় তো ক্যামেরা ও টেপ-রেকর্ডার নিয়েই ঘুরতাম!আসলে কেউ কি গাছের সঙ্গে, সূর্যের সঙ্গে, বাতাসের সঙ্গে ছবি তুলে রাখে নাকি? আমিও জাস্ট তুলিনি। তাছাড়া এমন কোনও ভাবনার অবকাশও হয়নি। ভূমেন্দ্র গুহ তো ভূমেন্দ্র গুহই। এত বাহুল্য কেন? আয়োজন কেন? কেন এত মতলব?

কবে থেকে পরিচয়? একটা শুরু তো থাকে। জন্মের।মৃত্যুর। অথবা থাকে না। তখন সবে ‘বিভাব’ পত্রিকার জীবনানন্দ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। অক্টোবর মাস। সংখ্যাটা হাতে পেয়ে একটা ঘোর লাগা ভাব। পাগল খ্যাপা অবস্থা। সেটা ১৯৯৮।দিনরাত সংখ্যাটা নিয়ে যাকে বলে ডুব জলে যেটুকু প্রশ্বাস!

এমন একটা সময় একদিন সন্ধ্যাবেলা অনির্বাণ(ধরিত্রীপুত্র)দার ফোন। ভূমেন্দ্র গুহ জীবনানন্দর ডায়েরি উদ্ধারের কাজে সাহায্য করতে পারে এমন কাউকে খুঁজছেন, যদি আমি দেখা করি।আসলে অনির্বাণদা আমার জীবনানন্দ ও কমলকুমার প্রীতির কথাটা কিছুটা জানতেন।অনির্বাণদার জীবনদীপ বিল্ডিঙের অফিসে আমাদের মধ্যে জীবনানন্দ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়ছে। তাছাড়া আমাদের মাঝখানে কমন একজন প্রিয় মানুষ ছিলেন, বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিত, যাঁর কমলকুমার ও জীবনানন্দ নিয়ে কাজ প্রায় প্রবাদপ্রতিম। এবং আজকে আমার যতটুকু যা সামান্য লেখালেখি তার নেপথ্যে রক্ষিত স্যারের ভূমিকা সবচাইতে বেশি।

আমি তো প্রস্তাবটি শুনে ভেবাচেকা খেয়ে গেলাম।ভূমেন্দ্র গুহ তখন প্রায় মিথ। ‘দরগা রোড’ কাগজ করেন, রাতভোর আড্ডা বসে দরগা রোডের বাড়িতে। রথী-মহারথীরা সেই আড্ডা আলোকিত করেন। তাছাড়া সদ্য প্রকাশিত ‘বিভাব’তো আমার হাতে। কাকে বলে সম্পাদনা, চোখে আঙুল দিয়ে যেন দেখিয়ে দিয়েছেন।

তো একদিন গুটিসুটি গিয়ে হাজির হলাম দরগা রোডের বাড়িতে। তখন প্রায় সন্ধ্যা ৭.৩০। জীবনে সেদিন অনেককিছু প্রথম দেখলাম। পাজামা ফতুয়া পড়া ডাক্টার বাংলাতে প্রেসক্রিপশন লেখা ডাক্তার, রোগীর সঙ্গে খেজুরে গল্প জুড়ে দেওয়া ডাক্তার। তো বসেই আছি, সমস্ত রোগী চলে যাওয়ার পর আমার ডাক এল। দুরুদুরু বক্ষে গিয়ে বসলাম সামনের চেয়ারে।আমাকে যেন প্রায় দেখলেনই না, বা দেখেও পোকামাকড় জ্ঞান করলেন। ঠিক বাঁ হাতে কিছু নামের লিস্টের একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে তাচ্ছিল্য ভরে বললেন, দেখুন উদ্ধার করতে পারেন কিনা।

বাড়ি ফিরে এসে কেমন একটা রোখ চেপে গেল।(পরে শুনেছি এই লিস্টটা অনেক হাতফেরতা হয়ে আমার কাছে এসেছিল)। লাইব্রেরি প্রীতিটা আমার আগে থেকেই ছিল। বইপত্রও ছিল সামান্য। তো এক সপ্তাহ আদাজল খেয়ে লেগে পড়লাম। এবং ২/৩ টি ছাড়া প্রায় সবগুলি উদ্ধারও করেও ফেললাম।

সেই শুরু। আর কোনও চৌকাঠ পেরোনো নয়,একেবারে সটান মানুষটার হৃদয়ে প্রবেশ করলাম।অতঃপর পরবর্তী ১০টা বছর এমন কোনও দিন মনে পড়ে না, আমাদের দেখা হয়নি বা ফোনে কথা হয়নি। শুধু আমি নয়, আমার পরিবার ও ভূমেন্দ্র গুহর পরিবারও কাছাকাছি হলাম। সে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। অন্য প্রসঙ্গ। আমার প্রসঙ্গ আজ জীবনানন্দ দাশ।

শেষ ক’বছর যে জীবনানন্দকে দেখছেন, সেই দেখার আলো আমি ভূমেন্দ্র গুহর চোখেমুখে ফুটে উঠতে দেখতাম। জীবনানন্দের প্রসঙ্গ উঠলে, বিশেষ করে দিদির প্রসঙ্গ (জীবনানন্দের বোন সুচরিতা দাশ) উঠলে শিশুর মতো হয়ে উঠতেন। কত গল্প।কত ঘটনার কথা যে বলতেন। আবার কাজের ক্ষেত্রে কঠোর শিক্ষক। কত যে বকা খেয়েছি।শিখেছি যে কতকিছু। কীভাবে পান্ডুলিপি উদ্ধার করব, হাতে ধরে শিখিয়েছেন। শিখিয়েছেন জীবনানন্দের হস্তলিপি উদ্ধারের প্রক্রিয়ায়ও।

দু’টো ঘটনার কথা মনে পড়ে। আমার বাড়ি। সন্ধ্যা হয় হয়। কথা উঠেছে জীবনানন্দের নারী বিদ্বেষ নিয়ে। তুমুল তর্ক। কথার মাঝখানে দেখি, শাশ্বতীকে বললেন, কাব্যসমগ্রটা নিয়ে আসতে। তারপর সেই সন্ধ্যায়, না থেমে একের পর এক জীবনানন্দর প্রেমের কবিতাগুলো পড়ে যেতে লাগলেন। সুচেতনা, শঙ্খমালা, শ্যামলী, বনলতা,…। থামলেন যখন চোখ ভরা জল। জল আমদের চোখেও। আর একদিন।সেটাও আমাদের বাড়ি। সন্ধ্যা। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে খুব বিষণ্ণ কন্ঠে যেন স্বগোতক্তি করছিলেন, সারা জীবন অপারেশন করে ক’টা লোক বাঁচিয়েছি, বড়োজোর ১০০। একটা বোমা পড়লে ১০০ লোক মারা যায়। অথচ জীবনানন্দ লোকটা বড্ড অভাগা, দেখার কেউ নেই লোকটার, আমি যদি শুধু এই কাজটাই করতাম।

৭/৮ বছরে আমাদের যৌথ সম্পাদনা ও আমার সম্পাদক সহায়কের ভূমিকা হিসেবে ১৫টা বই প্রকাশিত হয়েছে। একটি বইয়ের ভূমিকায় আমার সম্পর্কে লিখেছিলেন, আমি নাকি তাঁর ‘অন্ধের যষ্টি’। ঠিক আমার বাবার বয়সী ছিলেন মানুষটা। আর আমার মানুষটাকে ঠিক শিশুর মতোই মনে হত।অমন উচ্ছ্বাস, অভিমান ও রাগ।

কত স্মৃতি। কত সাক্ষাৎকার যে একসঙ্গে নিয়ে ফিরেছি। কত আড্ডা। কত শত বই জোগাড় করা।কত রোদ ঝড় বৃষ্টি মাথায় করে ফেরা। ডায়েরির একেকটা এন্ট্রি উদ্ধারের পর সেকি উল্লাস। লিখলে মহাভারত হয়ে যাবে। অমন নিষ্ঠা ভরে কাজ করতে খুব কম মানুষকেই দেখেছি। কেন ভারতবর্ষের প্রথম ওপেন হার্ট সার্জারিটিতে উনি ছিলেন টের পেতাম।

আমাকে একটি বই উৎসর্গ করেছিলেন। শাশ্বতীকে একটি। আমি কোনও বই তাঁর জীবিতকালে উৎসর্গ করতে পারিনি। মৃত্যুর পর করেছি। শ্মশানে গিয়েছিলাম। শ্রাদ্ধেও। থাকতে পারিনি বেশিক্ষণ।আসলে সহ্য করতে পারিনি। অতিজীবিত ছিলেন যে মানুষটি।

শুনেছি তখন ভূমেন্দ্র গুহর অনেক বন্ধু, অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী, অনেক পরামর্শদাতা, অনেক জনপ্রিয়তা। তখন আমি রাজস্থান। আমি বরাবরই ভিড়ের মধ্যে গুটিসুটি এক কোণে থাকা মানুষ। পার্টি করতে পারি না। নেশা করতে পারি না। মন জুগিয়ে কথা বলতে পারি না। নিজের কথা মুখ ফুটে বলতে পারি না। আমার ভূমেন্দ্র গুহ তো দুপুরবেলা সল্টলেকের বাড়িতে নিজের হাতে ভাত বেড়ে খাওয়াচ্ছেন, যাবতীয় ফিক্সড ডিপোজিট আলমারি থেকে বেড় করে অর্থনৈতিক পরামর্শ চাইছেন, আমার ভূমেন্দ্র গুহ সল্টলেকের রাস্তার অল্প আলোয় অপ্রকাশিত পাণ্ডলিপির খবর শুনে আমাকে জড়িয়ে ধরছেন, এমন কোনও দিন মনে পড়ে না আমাকে করুণাময়ী মোড় অবধি এসে গাড়িতে না তুলে ফিরেছেন।

তবে সামান্য হলেও আমার অহঙ্কারও আছে কিছু।আসলে ভালোবাসা। আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে ভূমেন্দ্র গুহর সঙ্গে যুগ্মভাবে জীবনানন্দ দাশের গ্রন্থ সম্পাদনা করেছি।

কবি ছিলেন মানুষটা। আদ্যপান্ত একজন কবি।প্রজ্ঞায় বাঁচতেন মানুষটা। প্রজ্ঞা তাঁর মতে, ‘সীমাতিক্রান্ত জ্ঞানের বিশুদ্ধতা’। মহাচার্য দীপংকরের ‘বোধি-পথ-প্রদীপ’ -এর এই সূত্রে তাঁর মতি ছিল,’ প্রজ্ঞার সব ধর্মই স্বভাবত আলম্বনহীন।তাই নৈরাত্ম-ভাবনাই প্রজ্ঞা-ভাবনা।।’

এমন নির্মোহ,যুক্তিনিষ্ঠ ও দরদি মানুষ খুব কম দেখেছি।আজকের লেখাটা আসলে জীবনানন্দকে নিয়ে। আমার কাছে জীবনানন্দ দাশের সমার্থক শব্দ ভূমেন্দ্র গুহ।চোখে যে গড়াবে জল, সে-রকম সাহসিক নই…।

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত