মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আজ ও আগামীর বাংলাদেশ

সুতপা বেদজ্ঞ 
ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে অজস্র লড়াই-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের মনোজগতে সৃষ্টি করেছে বহুমাত্রিক চেতনাবোধ। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই ভূখণ্ডের মানুষ অতীতের ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ-সাম্প্রদায়িকতা-গণতন্ত্রহীনতা ও শোষণ-বৈষম্যের বিপরীতে যেসব প্রগতিশীল ধ্যানধারণা-দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন ও লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন সেগুলিই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এটা নিছক কোনো সামাজিক চেতনা নয়। এটা কোনো বায়বীয় ব্যাপারও নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একদিকে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা, মুক্তিযুদ্ধের অর্জন, তার অস্তিত্বের ভিত্তি; একই সাথে এই চেতনা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণের সোপান। মানুষের মোহভঙ্গ: ধর্মীয় চেতনা থেকে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের জন্ম: ব্রিটিশ পৃষ্ঠপোষকতায় সাম্প্রদায়িকতা ও বিভেদের রাজনীতির পরিণতিতে উপমহাদেশে ভারত ও পাকিস্তান এ দুটি রাষ্ট্রের অভ্যূদয় হয়। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। সদ্যস্বাধীন পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার মানুষদের রাজনৈতিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী শাসনের যাতাকলে আবদ্ধ করার লক্ষ্যে প্রথম আঘাত হানে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর। তারা সর্বপ্রথম আঘাত হানে বাংলা ভাষার ওপর। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা বাংলা হলেও তারা উর্দুকেই করতে চাইল রাষ্ট্রভাষা। প্রতিবাদে গর্জে উঠল সেদিনের বাঙালি তরুণ-ছাত্র সমাজ। বাঙালিদের তীব্র প্রতিবাদে পাকিস্তানীরা সাময়িকভাবে পিছু হঠলেও জিন্নাহর ঘোষণার রেশ ধরে ’৫২ সালে আবারো ঘোষণা এলো- উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এ চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেই ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন। সালাম-জব্বার-রফিক-শফিকদের রক্ত দান। বস্তুত: তাদের রক্তেই সেদিন অঙ্কুরিত হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার। বাঙালি চেতনার এখানে একটি গুণগত উল্লম্ফন ঘটল-মুসলিম জাতীয়তাবোধকে নাকচ করে উদ্ভব ঘটল বাঙালি জাতীয়তাবোধের। আবহমান কালের বিবর্তনশীল আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে গড়ে ওঠা লোকজ সংস্কৃতিই হয়ে ওঠে আমাদের সংস্কৃতির ভিত্তি। সে সময়ে মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ছাড়া পুরো জাতি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনায় শুধু উজ্জীবিতই হলো না, বিক্ষোভে-বিদ্রোহে হলো উদ্বেলিত। এ চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে বাঙালি নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের পরাস্থ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে। তাই বাঙালির জাতীয়তাবাদই হলো আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল প্রেরণা। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকে আরো ঋদ্ধ করে তোলে: এদেশের মেহনতি মানুষ ও জনগণ শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে নির্মাণ করেছে ইহজাগতিক-গণতান্ত্রিক ও মানবিক লোকসংস্কৃতির সুবিশাল ভাণ্ডার। মনীষীরা সৃষ্টি করেছেন শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের ঐশ্বর্যময় ধারা। লোকসংস্কৃতি তথা শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের এই গণতান্ত্রিক- ইহজাগতিক ও মানবিক ঐতিহ্যে লালিত এই ভূখণ্ডের মানুষ গড়ে উঠেছে অসাম্প্রদায়িক চেতনায়। আর ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবোধ আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে মানুষের অসম্প্রাদায়িক চেতনা আরো ঋদ্ধ হয়ে ওঠে। কারণ বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার মধ্যে নিহিত আছে ধর্মনিরপেক্ষতার বীজ। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবোধের বিপরীতে বিকশিত হয়ে ওঠা এই নৃতাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদ বস্তুনিষ্ঠভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ। এ পরিচয়ের ক্ষেত্রে ধর্ম কোনো ভূমিকা রাখে না। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সব ধর্মের লোক মিলিয়েই বাঙালি নৃগোষ্ঠী। জাতিগত শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন : সমাজতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্নের আত্মপ্রকাশ: বাংলাদেশের ইতিহাস শ্রমে-সৃজনে-বিদ্রোহে ও স্বপ্নে বর্ণিল এক ইতিহাস। এদেশের মানুষ জুলুমবাজ ব্রিটিশের শোষণ ও শাসনের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য থেকেই শোষণ থেকে মুক্তি তথা শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর আমাদের বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। বাঙালি জাতি পাকিস্তানের একচেটিয়া ধনিক, বৃহৎ ভূ-স্বামী, সামরিক-বেসামরিক আমলা ও সাম্প্রদায়িক শক্তি প্রভাবিত শাসকদের ঔপনিবেশিক ধরনের শাসন-শোষণের শিকার হয়। বাংলাদেশের মেহনতি মানুষের সৃষ্ট সম্পদ স্থানান্তরিত হতে থাকে পাকিস্তান ও সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহে। পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালির জাতীয় বিকাশের আকাঙ্ক্ষাকে স্বৈরাচারি পন্থায় দমন এবং জাতিগত শোষণ-পীড়নের নীতি অনুসরণ করে। পাকিস্তানি শাসকদের এই জাতিগত শোষণ, দমন-পীড়ন ও প্রতিক্রিয়াশীল নীতির বিরুদ্ধে দেশবাসী মাতৃভাষার অধিকার, গণতন্ত্র ও জাতীয় বিকাশের দাবিতে তীব্র সংগ্রাম গড়ে তোলে। দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে এবং তা জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের মহামোহনায় মিলিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের গতিমুখ ছিল শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা সমাজতন্ত্রের দিকে। আমাদের স্বাধীনতার জন্য দেশবাসীর মুক্তিসংগ্রামের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন, গণতান্ত্রিক ভারতসহ সারা বিশ্বের শান্তি, গণতন্ত্র, প্রগতি ও সমাজতন্ত্রের শক্তিগুলো। বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুক্তিসংগ্রামের ধারার সঙ্গে যোগসূত্র গড়ে ওঠে আমাদের মুক্তি সংগামের। এভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্তর্জাতিক যোগসূত্র এবং জাতিগত বৈষম্য-শোষণের বিরুদ্ধে অন্দোলনের অভিজ্ঞতা ও দেশবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে সমাজতন্ত্র বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের মৌলিক চেতনা হিসেবে সামনে চলে আসে। একনায়কত্ব ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ ঘটায় : এ দেশের মানুষ ব্রিটিশের স্বৈরাচারী, অগণতান্ত্রিক নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে, জীবন দিয়েছে। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর অগণতান্ত্রিক নীতি ও শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা অসংখ্য গণসংগ্রামে দেশের জনগণ গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য অকাতরে জীবন উৎসর্গ করেছে। বৃহত্তর পাকিস্তানী কাঠামোর মধ্যে বাঙালি জনগোষ্ঠী ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। সুতরাং বাঙালির স্বায়ত্ত্বশাসন থেকে স্বাধিকার আন্দোলন ছিল মর্মগতভাবে সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠির শোষণ-শাসনের নাগপাশ থেকে সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। ফলত: মর্মগতভাবেই এ আন্দোলন ছিল গণতান্ত্রিক। সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই ছিলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সারকথা। আমাদের স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার আন্দোলনের মধ্যদিয়ে গড়ে ওঠা উপরিউক্ত চেতনা ও মূল্যবোধগুলোই মুজিবনগর সরকারের ঘোষণায় সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়-বিচার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কার্যকরী নীতি ও পদ্ধতি হিসেবে সংগতকারণেই গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা-জাতীয়তাবাদ স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধানে গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানের বাংলাদেশ চলছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার বিপরীতে: সাম্রাজ্যবাদ-সাম্প্রদায়িকতা, লুটপাটতন্ত্র ও গণতন্ত্রহীনতা এখনো দেশের সামনে বড় বিপদ রূপে বিরাজ করছে। দেশ আরো বেশি করে সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদের নিগড়ে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িকীকরণ ঘটে চলেছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন হামলা বন্ধ হয়নি। রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক প্রবণতা ও কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক যন্ত্রগুলি শক্তিশালী হয়ে উঠলেও তার জনকল্যাণমূলক কাজ দুর্বল হয়ে পড়ছে। রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর নাগরিকবৃন্দের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ ক্রমাগত ক্রমে আসছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি রাষ্ট্রের ও শক্তির হস্তক্ষেপ বাড়ছে। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি আরো দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে চলেছে। বিকেন্দ্রীকরণের বদলে ক্ষমতার অধিকতর আমলাতন্ত্রিকরণ ও কেন্দ্রীভবন ঘটে চলেছে। মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। জনগণের সমর্থনের বদলে ক্ষমতায় থাকার জন্য আওয়ামী লীগ এখন সামরিক বেসামরিক প্রশাসন যন্ত্রের ওপর নির্ভরতা, লুটেরা ধনিক শ্রেণির মদত এবং বিদেশি রাষ্ট্রের ও শক্তির আর্শিবাদের ওপর ভিত্তি করে ক্ষমতা নিশ্চিত করার পথ গ্রহণ করেছে। সম্পদ বৈষম্য ও শ্রেণি বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে বিপুল অর্থ। রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতিতে বিপদজনক দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে। পরিবেশ-প্রকৃতির বিরুদ্ধে আগ্রাসন অব্যাহত রয়েছে। প্রায় সব ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে অস্থিতিশীলতা, নৈরাজ্য ও অনিশ্চিয়তার উপাদানগুলি। সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষের মনে বিরাজ করছে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক ফলশ্রুতিতেই জন্ম নিয়েছে রাজনৈতিক সংকট। পরিস্থিতির দাবি হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে গোটা অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শত্রু-মিত্রের শ্রেণি বিন্যাস: মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা প্রগতিশীল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও শোষণ বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার প্রকৃত বাস্তবায়ন ঘটবে এবং এই প্রক্রিয়ায় যেহেতু উৎখাত ঘটবে সব ধরনের শোষণ ও সাম্প্রদায়িক শক্তি, সেহেতু এই প্রক্রিয়ার সফল বাস্তবায়নে বিভিন্ন শ্রেণি ও স্তরের স্বার্থ একই রকম হবে না। একমাত্র লুটেরা শাসকশ্রেণি ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী ব্যক্তি ছাড়া সকলের স্বার্থই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের মধ্যে নিহিত আছে। শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করতে পারলে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় তারা চালিকাশক্তি হতে পারে। দেশের মধ্যস্তরের জনগণ বিশেষত শিক্ষিত ছাত্র-যুবরা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। সাম্রাজ্যবাদের পদলেহী জাতীয় স্বার্থবিরোধী লুটেরা বুর্জোয়া ধারা বাদে ক্ষুদে-মাঝারি এবং সাধারণভাবে জাতীয় স্বার্থের ধারায় বিকাশমান উৎপাদনশীল গোষ্ঠী নানা দোদুল্যমানতাসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবদান রাখার সম্ভাবনা আছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে রাষ্ট্র ও সমাজের গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক-প্রগতিশীল পরিবর্তনে শত্রুর ভূমিকায় থাকবে সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের সহযোগী লুটেরা ধণিক গোষ্ঠী এবং গ্রামাঞ্চলের কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীসহ মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল চক্র। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তোলার কর্তব্য: বর্তমান সংকট থেকে পরিত্রাণের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল পরিবর্তন সাধন ছাড়া বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি নেই। এই কর্তব্য একক কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে, এমনকি কোনো রাজনীতিবিদদের পক্ষেও এককভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। সমগ্র জাতির সর্বস্তরের জনগণের শক্তি-সামর্থ্যরে মিলিত প্রচেষ্টা এবং বাস্তবতার নিরিখে তার সৃজনশীল প্রয়োগের মাধ্যমে এই কর্তব্য সম্পাদন করা সম্ভব। প্রথমত: মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার আলোকে জাতীয় স্বার্থ রক্ষাকারী গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্প কর্মসূচি উত্থাপন ও তাকে জনপ্রিয় করে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত: বিকল্প কর্মসূচির ভিত্তিতেই আওয়ামী লীগ-বিএনপি বৃত্তের বাইরে রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের মতো সামর্থ্যবান, যোগ্যতাসম্পন্ন এবং জনগণের আস্থাভাজন শক্তি সমাবেশ গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত: মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার ভিত্তিতে প্রণীত বিকল্প কর্মসূচির ভিত্তিতে সংগঠিত করার মধ্য দিয়েই জনগণ অবশেষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের বস্তুগত শক্তিতে পরিণত হবে। চতুর্থত: দেশের সম্ভাব্য বাম ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক এবং সামাজিক শক্তিকে উপরোক্ত মৌলিক চিন্তার যতটা সম্ভব কাছাকাছি আনার জন্য এবং এসব বিষয়ে সাধারণ ঐক্যমত্য ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠার জন্য কমিউনিস্ট পার্টিকে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আমাদের আছে সুমহান সংগ্রামী ঐতিহ্য, আছে অতীত অনেক গৌরবগাঁথা। মুক্তিযুদ্ধকালে সমগ্র জাতির ঐক্য, অপরিসীম ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা আমরা ছিনিয়ে এনেছি। আজ নতুন করে সেরূপ জাতীয় উজ্জীবনের কর্তব্য আমাদের সামনে উপস্থিত। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনায় বিশ্বাসী সকল দল, ব্যক্তি ও শ্রেণিকে জনগণের ওপর আস্থা রেখে, সঠিক পথ গ্রহণ বা ভুল পথ পরিত্যাগের সাহস দেখাতে হবে। তাহলেই সমগ্র জাতির সকল দেশপ্রেমিক শ্রেণি, স্তর ও ব্যক্তির সম্মিলিত প্রয়াস, শক্তি-সম্পদ-মেধা ও সমবেত সংগঠন শক্তির মাধ্যমেই সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল পরিবর্তন সাধনের এই কর্তব্য সম্পাদিত হতে পারে। বীরের এই জাতির পক্ষে বিজয় ছিনিয়ে আনা কঠিন কাজ নয়।
(১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, খুলনা জেলা শাখার সেমিনারে পঠিত) লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, খুলনা জেলা কমিটি, সিপিবি
কৃতজ্ঞতা: একতা

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত