| 20 মে 2024
Categories
নক্ষত্রের আলোয়

আমার ছোটবেলার কথা । বিনয় মজুমদার

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

বার্মায় তোডো শহরে আমি জন্মেছি, ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে ১৭ই সেপ্টেম্বর আমার জন্মের পরেই বাবামা আমাকে নিয়ে বাবার জন্মস্থান ফরিদপুরে চলে আসে, তারপর আমাকে নিয়ে বাবামা ফের জাহাজে করে কলকাতা থেকে রেঙ্গুনে যায়, এই জাহাজে থাকা কালে আমি উড়ন্ত মাছ দেখেছিলাম মাছ দেখার দৃশ্যটি এখনো আমার মনে আছে এর আগেকার ঘটনাবলির কথা আমার বিশেষ মনে নেই অর্থাৎ উড়ন্ত মাছ দেখার স্মৃতি আমার জীবনের প্রথম স্মৃতি তারপর বার্মা গিয়ে বাবা এলাতে বাবার নতুন কর্মস্থলে যায়, এইখানে বার্মার সব বাড়ির মতো কাঠের তৈরি একটি দোতলা বাড়িতে আমরা থাকতাম দোতলার বারান্দায় বসে আমি , , শিখতাম মায়ের কাছ থেকে আমার স্পষ্ট মনে পড়ে একখানা জলচৌকির উপর স্লেট রেখে মেঝের উপর বসে লেখাপড়া করতাম আমাদের বাড়ির পিছনে একটি বিরাট গাছ ছিল, সেই গাছে অনেকগুলি বকের বাচ্চা বসে থাকতো, তখনও তারা উড়তে শেখেনি প্রত্যেকদিন সন্ধের একটু আগে একটি বক মুখে করে মাছ নিয়ে এসে বকের বাচ্চাদের খাওয়াতো

শহরে অনেক বাঙালি পরিবার ছিল একটা লোক ছিল গরু কাটবার কাজ করতো সে, গরু কেটে কেটে গরুর মাংস বিক্রি করতো এই লোকটির যখন মরবার সময় উপস্থিত হলো তখন মরবার আগে গরুর মতো হাম্বা করে ডাকছিল

আর এক বাঙালি পরিবারের কর্তা হাতুড়ে ডাক্তার ছিল সে একটি গ্রামোফোন বাজাতো একটি গান বাজাতো আমার এখনো এক লাইন মনে আছে-গানটি এরকম-বার , বার রে হাপ লোকে তোরে দেখতে চায়… …

এই এলাকা থেকে বদলি হয়ে বাবা ফের তেডোতে চলে আসে তেডো একটি ছোট রেলস্টেশন রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে তাকালেই দেখা যেতোমানডেলেস্টেশনটি, ছেলেবেলায় চোখ এতো ভালো থাকে মানুষের রেল স্টেশনে সুন্দরম্ নামে এক হিন্দুস্থানী বিস্কুট, লজেন্স বিক্রি করতো বিস্কুটগুলি হাতির মতো, হাঁসের মতো, মুরগির মতো ছিল এই তেডো শহরটি বলতে গেলে মরুভূমির মতো ছিল পায়ের নিচে ঘাস ছিল না, শুধু বালি বালির ভিতরে দুটো নিমগাছের কথা এখনো মনে আছে বুনো মুরগি উড়ে এই নিমগাছে এসে বসতো এই বালি রোদ্দুরে গরম হয়ে বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে গায়ে এসে লাগতো এবং গা পুড়তে থাকতো আমাদের বাড়িতে বা, কোনো বাড়িতেই নলকূপ ছিল না ইঁদারা থেকে জল তোলা হতো আমাদের বাড়িতে কাজ করতো রাজস্বামী এবং তার বর্মা বউ মাফু রামস্বামী বাঁকে করে জল নিয়ে আসতো এই মরুভূমি সদৃশ তেডোতে ফনীমনসার গাছ ছিল প্রচুর বাবার বাংলোর পাশেই ছিল বাবার অফিস অফিসের দরজাতেই ছিল একটি বিরাট নিমগাছ

১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে যখন মহাযুদ্ধ শুরু হলো তখন বাবার অফিসের সামনে নিমগাছটির ছায়াতে বিরাট একটি গর্ত খুঁড়ল গভর্নমেন্ট গভীর গর্তের ভিতরে দাঁড়িয়ে হাত তুললে সে হাত দূরের লোকেরা দেখতে পেতো না এই গর্তের মধ্যে দুখানা খাটিয়া পেতে দিল গর্তে নেমে খাটিয়ায় বসার জন্য মাটি কেটে সিঁড়ি তৈরি করে দিল এবং বড় বড় গাছ কেটে সেইগুলি গর্তের উপর রেখে গর্তের একটি ছাদ করে দিল এই ছাদের উপরে বালির বস্তা রেখেছিল বহু যাতে বোমা পড়লে আগুন না লাগে যেই জাপানি উড়োজাহাজ আসতো তখনই সরকার জোরে সাইরেন বাজিয়ে দিত এং আমরা সবাই ছুটে গিয়ে সেই গর্তের ভিতর নেমে খাটিয়ার উপরে বসে থাকতাম সমস্ত কর্মচারীর বাড়িতেই এই রূপ ভূনিম্নস্থ বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছিল ব্রিটিশ সরকার যেমন পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ লাগলে কলিকাতায় জানালার কাচে আঠা দিয়ে কাগজ এঁটে দিত কিন্তু কলিকাতাতে ভূনিম্নস্থ বাসস্থান ব্রিটিশ সরকার বানায়নি, বার্মায় বানিয়েছিল যখন যুদ্ধ করতে করতে ব্রিটিশসৈন্য পশ্চাদসরণ করছিল তখন সব ভারতীয় স্থির করলো যে পালিয়ে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টকে না জানিয়ে ভারতে ফেরা যাক কিন্তু তখন সমস্ত জাহাজ শুধুমাত্র সৈন্য বহনের কাজে ব্যস্ত ছিল, তখন ব্রিটিশ গভর্নমেন্টকে বলে ভারতীয়গণ পায়ে হেঁটে ভারতে ফেরার অনুমতি নিল এবংতেডোরকাছেতাজিশহরে বাবা স্বপরিবারে এক বাঙালির বাড়িতে উপস্থিত হলো এই বাঙালির বাড়িটি তিনতলা ইঁটের দালান, কাঠের নয় সেখানে আরও বহু ভারতীয় এসে উপস্থিত হলো

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত