| 20 এপ্রিল 2024
Categories
গীতরঙ্গ

গীতরঙ্গ: বায়োস্কোপের নেশা আমায় ছাড়ে না… । রাইসা জান্নাত

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

মেলার ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে নানা রঙ ও বৈচিত্র্যের লোকজ জিনিস।পুতুল নাচ, বাহারি পণ্য, মাটির তৈজসপত্র—কি নেই সেখানে। এসব দেখে মুহূর্তের জন্য মনে হতে লাগল যান্ত্রিক নগরীর ভেতরে এ যেন এক রূপকথার রাজ্য। রাজধানী থেকে একটু দূরে সোনারগাঁ জাদুঘর। প্রতি বছর এখানে মাসব্যাপী লোকজ উত্সবের আয়োজন করা হয়। গত বছরও তার ব্যতিক্রম ছিল না। এ উত্সবে গেলেই দেখা মেলে গ্রামীণ ও ঐতিহ্যবাহী নানা অনুষঙ্গের। মেলায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ করেই চোখ আটকে যায় বিচিত্র পোশাক পরা এক ব্যক্তিকে দেখে। তার কাঁধে রঙিন কাপড়ে ঢাকা বাক্সের মতো  কি যেন একটা। এর ভারে খানিক নুইয়ে পড়েছেন তিনি। হাতে ঝুনঝুনি। মেলার ভিড় কাটিয়ে একটু ফাঁকা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ান সেই ব্যক্তি। তারপর কাঁধ থেকে জিনিসটি নামিয়ে ওপর থেকে কাপড়টি সরাতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল এক রঙিন বাক্সে। তারপর ঝুনঝুনি বাজিয়ে ‘কি চমত্কার দেখা গেল’ বলে গাইতে শুরু করেন। নিমেষের মধ্যেই তাকে ঘিরে ছোটখাটো জটলা তৈরি হয়ে যায়। এরপর ষাটোর্ধ্ব হাশমত আলী সবাইকে বায়োস্কোপ দেখাতে শুরু করেন।

বায়োস্কোপকে বলা হতো গ্রাম-বাংলার ভ্রাম্যমাণ সিনেমা হল। বাক্সের মতো দেখতে যন্ত্রটিকে দীর্ঘসময় ধরে মানুষের বিনোদনের উত্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বহু প্রজন্মের বিনোদনের সাক্ষী এ বায়োস্কোপ। যদিও সেলুলয়েডের পর্দা, ডিজিটাল নানা অনুষঙ্গের ভিড়ে বায়োস্কোপ আজ কেবলই স্মৃতি। মাঝেমধ্যে মনের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এই স্মৃতি যেন উঁকিঝুঁকি মারে। মনে করিয়ে দেয় রঙবেরঙের সেই বাক্সটির কথা, যার সঙ্গে জুড়ে আছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য। হাজারো মানুষের শৈশবের গল্প, আনন্দ-বেদনা।

 

 বাংলায় বায়োস্কোপের আবির্ভাব

আধুনিক চলচ্চিত্রের যাত্রার অনেক আগে থেকে বাংলায় বায়োস্কোপের প্রচলন ছিল।ভারতবর্ষের মাটিতে প্রথম বায়োস্কোপের আগমন ঘটে ১৮৯৬ সালে। স্টিফেন্স নামে একজন বিদেশী একটি থিয়েটার দলের সঙ্গে কলকাতায় এসেছিলেন। তিনিই মূলত কলকাতায় প্রথম বায়োস্কোপ দেখান।

সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা হীরালাল সেন বায়োস্কোপ দেখানোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছিলেন।তারপর মিনার্ভা, স্টার ও ক্ল্যাসিক থিয়েটারে বায়োস্কোপের শো শুরু করেন। এরপর ১৮৯৮ সালের এপ্রিলে প্রখ্যাত এ চলচ্চিত্র নির্মাতা তার পরিবারের সদস্য মতিলাল সেন, দেবোকী লাল সেন ও ভোলানাথ গুপ্তকে নিয়ে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘দ্য রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি।’

পরবর্তী সময়ে এ কোম্পানির মাধ্যমে কলকাতা, ভোলা, মানিকগঞ্জ, জয়দেবপুর এবং বাংলা, বিহার ও আসামের অন্যান্য অংশে বায়োস্কোপ শোয়ের আয়োজন করা হয়।ঢাকাতেও এ কোম্পানি শোয়ের আয়োজন করেছিল। সময়টা ছিল ১৯১১। মার্চে ঢাকার আহসান মঞ্জিলে প্রদর্শনী শোয়ের আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এটাই ছিল বাংলার মাটিতে বায়োস্কোপ নামক জাদুর বাক্সটির এক দুর্দান্ত যাত্রার সূচনা। চারকোণাকৃতির এ বাক্স পরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম আনন্দ-বিনোদনের এক অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।

 

 জাদুর বাক্স বায়োস্কোপ

বায়োস্কোপকে জাদুর বাক্সও বলা হয়। আর বায়োস্কোপওয়ালাকে জাদুকর। কি ছিল না এ জাদুর বাক্সে? বাক্সের ভেতর থেকে বের হতো রঙবেরঙের নানা জিনিস, যা দেখে বিস্ময়ের অন্ত ছিল না মানুষের। দিল্লির আগ্রা থেকে বাংলার ঢাকা, উত্তম-সুচিত্রা, রাজ্জাক-শাবানা—সবকিছুর দেখা মিলত এ বাক্সে। ঐতিহাসিক নানা ঘটনার চিত্র যেমন রাম-রাবণের যুদ্ধ থেকে ক্ষুদিরামের ফাঁসি, বঙ্গবন্ধুর ছবি—এসবও বায়োস্কোপে দেখানো হতো। ছবি দেখার এ নেশা ছোট-বড় সবারই ছিল। বায়োস্কোপ নিয়ে তো রীতিমতো গানও আছে। ‘তোমার বাড়ির রঙের মেলায়/দেখেছিলাম বায়োস্কোপ/বায়োস্কোপের নেশা আমায় ছাড়ে না।’ গানের কথাগুলো যেন চিরন্তন সত্য। বায়োস্কোপের নেশায় একবার যে পড়েছে, সে নেশা যেন আজীবন ভোলার নয়।

আর এ নেশার জোরেই দূর থেকে ‘কী চমত্কার দেখা গেল/ রহিম-রূপবান আইসা গেল/ ঢাকা শহর দেখেন ভালো/ কী চমত্কার দেখা গেল।’ অথবা ‘ওই দেখা যায়, কেমন মজা/ দ্যাখেন, তবে মক্কা-মদিনা/ তার পরেতে মধুবালা/এক্কা গাড়িতে উত্তম-সুচিত্রা’—এই কণ্ঠ শোনার সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসত সবাই। মাঠে কিংবা ফাঁকা জায়গায় জটলা বেঁধে যেত। গ্রামীণ নারীরা এ বায়োস্কোপ দেখে ব্যাপক আনন্দ পেতেন।একটা বায়োস্কোপে চার থেকে পাঁচটি জানালা থাকত। যেখানে চোখ লাগিয়ে একসঙ্গে পাঁচ-ছয়জন দেখতে পারত।

 

 দেখতে যেমন

বায়োস্কোপ দেখতে অনেকটা চার কোণাকৃতির বাক্সের মতো। বাক্সের বাইরে মুড়ির টিনের মতো অনেকগুলো খোপ খোপ ছোট জানালা থাকত।সেখানে চোখ লাগিয়ে দেখা হতো জানা-অজানা নানা জিনিস। জানালার প্রতিটি মুখে লাগানো থাকত উত্তল লেন্স। আর বাক্সের ভেতরে কাপড়ের এক প্রান্তে লাগিয়ে রাখা হতো অনেক ছবি। এই কাপড় পেঁচানো থাকত পাশের দুটি কাঠিতে। বাক্সের বাইরে কাঠির উপরের মাথার অংশটিতে একটা হ্যান্ডেল লাগানো হতো। এ হ্যান্ডেল বাঁ থেকে ডানে আবার ডান থেকে বাঁ দিকে ঘোরালেই দেখা যেত নানা রঙের ছবি। আর ছবির সঙ্গে সঙ্গে গানের সুরে ধারাবর্ণনা করতেন বায়োস্কোপওয়ালা। বায়োস্কোপে সাধারণত অনেক ছবি সংরক্ষণ করে রাখা হতো। ছবি তোলার সেলুলয়েড ফিল্মের আবির্ভাবের পর যেকোনো কিছুর হুবহু ছবি তোলা সম্ভবপর হয়ে ওঠে। বিস্ময়কর এ উদ্ভাবনী দিয়ে নানা ধরনের ছবি তুলে একসময় তা বাক্সের ভেতরে রেখে দেখানো শুরু হয়। এটাই হলো বায়োস্কোপ।

গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন মেলা প্রাঙ্গণে দেখা মিলত বায়োস্কোপের। আবার সারা গ্রাম ঘুরে ঘুরেও বায়োস্কোপ দেখানোর চল ছিল। তবে এটা কেবল গ্রাম কিংবা গ্রামের মানুষের কাছেই জনপ্রিয় ছিল না। শহরেও বায়োস্কোপের প্রাধান্য ছিল। রাজধানীর আনাচে-কানাচেই লুকিয়ে আছে কত শত বায়োস্কোপের গল্প। প্রভাবশালী জমিদার কিংবা নওয়াবদের বাড়িতেও বায়োস্কোপ দেখানোর চল ছিল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী মাধ্যমটির ব্যবহার ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে।কয়েক বছর আগেও বিভিন্ন মেলা প্রাঙ্গণে টুকটাক বায়োস্কোপ দেখানো হতো। কিন্তু অত্যাধুনিক সব ডিজিটাল প্লাটফর্ম আইফ্লিক্স, নেটফ্লিক্সের যুগে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সাধের বায়োস্কোপ। ব্যক্তিগত সংগ্রহে এখনো হয়তো কিছু বায়োস্কোপ থাকতে পারে। চাইলে কি আবার ফিরিয়ে আনা যাবে বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিনোদন মাধ্যম বায়োস্কোপ?

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত