| 16 এপ্রিল 2024
Categories
ইতিহাস

ইতিহাস: বিরিয়ানি এলো কিভাবে । তমালিকা ঘোষাল ব্যানার্জী

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

বাঙালির ভালোবাসা হলো বিরিয়ানি। পাশের বাড়ি থেকে বিরিয়ানি রান্নার গন্ধ এলেই মন আনচান! পরেরদিনই বিরিয়ানি রান্না করতে হবে, নয়তো ঘুমই আসবে না। কোনো রেস্টুরেন্টের সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে বিরিয়ানির গন্ধ পেলে তো আর কথাই নেই! অমন প্রাণ ভরে নিশ্বাস তাজা হাওয়াতেও মানুষ নেয় না।

বিরিয়ানির কিন্তু প্রকারভেদ আছে– কলকাতাই, ঢাকাই, লখনৌয়ি, সিন্ধী, হায়দ্রাবাদী, বোম্বাই, মালাবারী, দিল্লী ইত্যাদি নানাপ্রকার। স্বাদেও একে অপরের থেকে আলাদা।

কিন্তু এই বিরিয়ানি এলো কোথা থেকে?

এ সম্পর্কে বেশ কয়েকটি মতবাদ প্রচলিত আছে। একটি হলো, তুর্কি মঙ্গল বিজয়ী তৈমুর বিন তারাগাই বারলাস ১৩৯৮ সালে বিরিয়ানিকে ভারতবর্ষের সীমানায় নিয়ে আসেন। সেসময়ে একটা বিশাল মাটির হাঁড়িতে চাল, মশলা মাখা মাংস ও ঘি একসঙ্গে দিয়ে হাঁড়ির মুখটি ভালোভাবে বন্ধ করে দেওয়া হতো। এবার গনগনে গরম গর্তে হাঁড়িটি মাটি চাপা দিয়ে রাখা হতো সবকিছু সেদ্ধ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। তারপরে হাঁড়িটি বের করে তৈমুরের সেনাবাহিনীকে খাওয়ানো হতো। সেই খাদ্যই এখন বিশ্বজুড়ে বিরিয়ানি নামে পরিচিত।

অন্য মত অনুযায়ী বিরিয়ানির প্রচলন আরব ব্যবসায়ীদের দ্বারাই শুরু হয়। ভারতবর্ষের কথা বলতে গেলে, বিশেষ করে মালাবারের দক্ষিণ উপকূলে তুরস্ক ও আরব ব্যবসায়ীদের বেশ আনাগোনা ছিল। তাঁদের কাছ থেকেই বিরিয়ানির উৎপত্তি হয়েছে।

সব চাইতে বেশি সমাদৃত মতটি হলো, মুঘল সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের কাহিনীটি। একবার মুমতাজ মহল মুঘল সৈন্যদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে ব্যারাকে গেলেন, কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে তিনি দেখলেন সৈনিকদের স্বাস্থ্যের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। তাই মিলিটারি মেসের বাবুর্চিকে তিনি স্বয়ং নির্দেশ দিলেন চাল ও মাংস সমৃদ্ধ এমন একটা পুষ্টিকর খাবার তৈরি করতে যেটা সৈনিকদের ভগ্ন স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করে দিতে পারবে। সম্রাজ্ঞী মুমতাজ মহলের আদেশে বাবুর্চি যে খাবারটি তৈরি করলেন সেটাই আজকের দিনের বিরিয়ানি নামে পরিচিত।

কলকাতায় বিরিয়ানি:

কলকাতায় বিরিয়ানির আগমন ঘটে ১৮৫৬ সালে লখনউয়ের নবাব ওয়াজেদ আলি শাহএর হাত ধরে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে দেশবিদেশে ভ্রমণ স্থগিত রেখে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে পাকাপাকিভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন তিনি এবং কলকাতাতেই জীবনের শেষ ৩০ বছর কাটিয়ে দেন। তাঁর জন্যই বিরিয়ানির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল কলকাতা। নবাবের রসনাতৃপ্তির জন্যই এ শহরে ‘দমপোখ্‌ত’ বা ঢিমে আঁচে রান্না শুরু হয়।

বিরিয়ানিতে আলু:

অনেকের মতে বিরিয়ানিতে আলুর প্রচলন নাকি ওয়াজিদ আলি শাহই করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে বিতর্কও রয়েছে। তবে সেসময় আলু কিন্তু সস্তা ছিল না, এদিকে মাংসের দামও বেশি ছিল। বিপুল পরিমাণে মাংস যোগ করে বিরিয়ানি তৈরি করার ব্যয়ভার সামাল দেওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে ৷ সেই কারণে কিছুটা খরচ বাঁচাতে এরই সঙ্গে বিরিয়ানির পরিমাণ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আলুর ব্যবহার শুরু হয় ৷

আর ডিম?

বিরিয়ানি রান্নায় ডিমের আগমনের ব্যাপারে সঠিকভাবে তেমন কোনো তথ্য জানা যায় না। কিছুজনের মতে, যাঁরা আলুর বিরিয়ানি খেতেন তাঁদের খাবারে যাতে পুষ্টির অভাব না ঘটে সেই কারণে সেদ্ধডিমের আগমন ঘটে এই রান্নায়। জনপ্রিয়তার কারণে ধীরে ধীরে মাংসের বিরিয়ানিতেও সেদ্ধডিম যোগ করা শুরু হয়। উৎপত্তিগত দিক থেকে যদিও বিরিয়ানির পাতে সেদ্ধডিম নেহাতই বাড়তি, তবুও ভোজনরসিক বাঙালির কাছে এই সেদ্ধডিম বিরিয়ানি পরিবারেরই একজন হিসাবে পরিণত হয়েছে, যাকে ছাড়া বিরিয়ানিই অসম্পূর্ণ হিসাবে অনুভূত হয়।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত