| 25 মে 2024
Categories
এই দিনে গল্প সাহিত্য

ইমু পাখির ডানায় চড়ে

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

আজ ০৫ জানুয়ারি কবি, কথাসাহিত্যিক, সম্পাদক ও প্রকাশক বিতস্তা ঘোষালের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

আজ ঝিমলির স্কুলে যেতে ইচ্ছে করছে না। তার ভারী মন খারাপ। দুই দিন হলো মা বাড়িতে নেই। মা থাকলে তার মনের সব কথা সে মাকেই বলতো। কিন্তু এখন তো নেই। অথচ না বললে তাকে স্কুলে যেতেই হবে।

অনেক ভেবে-চিন্তে, ভয়ে-ভয়ে বাবার কাছে গিয়ে পেছন থেকে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো। সিদ্ধার্থ তখন চেয়ারে বসে কাগজ পড়ছিল। ঝিমলিকে সামনে টেনে আনা মাত্র সে বললো, বাবা তুমি আজ অফিস যাবে?
-হ্যাঁ ,যাব তো।
-কাকাইও যাবে? সে আবার প্রশ্ন করলো।
-হ্যাঁ সোনা কাকাইও যাবে। কেন বলো তো? কিছু আনতে হবে তোমার জন্য?
একটু কাঁচুমাচু মুখ করে ঝিমলি বললো, একটা কথা বলবো? বকবে না তো?
মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধার্থ হেসে ফেললো, বলো সোনা।
-আমি আজ স্কুলে যাবো না।
-কেন? আজ কি স্কুল বন্ধ?
-না না।
-তবে? হোম টাস্ক হয়নি বুঝি?
-উঁহু। তাও না।
-তাহলে! ও বুঝেছি, আজ স্নেহা স্কুলে আসবে না।
-স্নেহা কি তোমাকে ফোন করেছিল বাবা? বললো আজ আসবে না। আমাকে তো কাল বললো, আসবে। স্নেহা আসবে না, ভেবে ঝিমলি বেশ চিন্তায় পড়ে গেলো।
-না সোনা। স্নেহা ফোন করেনি। তুমি যাবে না বলছ বলে আমি ভাবলাম স্নেহার জন্য। জানো ঝিমলি, আমি যখন স্কুলে পড়তাম, আমার অনেক বন্ধু ছিল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিল সাহেব।
-সে কি ইংরেজ ছিল বাবা?
-ইংরেজ? না না। আমার মতোই ছিল। আমি আর সাহেব রোজ স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ঠিক করে নিতাম কাল টিফিনে কী নিয়ে যাবো। কোন বইটা আমি নেবো, কোনটা সে আনবে।
-তোমাদের বুঝি সব বই আনতে হতো না?
-হতো। কিন্তু ব্যাগ ভারী হয়ে যেতো বলে নিয়ে যেতাম না।
-তোমাদের স্কুলে হোম টাস্ক করতে হতো না?
-হতো তো। কিন্তু, বলেই সিধু মেয়েকে আরও কাছে টেনে নিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললো, একটা কথা বলবো। খুব সিক্রেট। কাউকে বলতে পারবে না কিন্তু। প্রমিস?
-গড প্রমিসি বাবা। ঝিমলিও ফিসফিস করলো।
-আমি কোনোদিন নিজে হোম টাস্ক করতাম না। সাহেব পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। সেই নিজেরগুলো করার পর আমারগুলোও করে দিতো।
-অ্যা বাবা! তুমি চিটিং করতে?
-না না, ওগুলোকে চিটিং বলে না।
-বুঝেছি। খুব গম্ভীর স্বরে বড়দের মতো করে ঝিমলি বললো, তোমার তো পড়ার সময়ই থাকতো না। খালি ঘুড়ি উড়িয়ে বেড়াতে, তাই না বাবা?
-না না, পড়তামও। না পড়লে কী রক্ষা ছিল? তোমার দাদু যা রাগী ছিল! যদি জানতে পারতো পড়তে বসেনি, তাহলে হাত-পা বেঁধে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দিতো।
-দাদুটা খুব বাজে ছিল। নিজের ছেলেকে এভাবে কেউ মারে? তারপর বাবার গলা জড়িয়ে ধরে কিছুটা আদুরে আর কিছুটা ভয় মেশানো গলায় ঝিমলি বললো, আমি যদি পড়া না করি, মানে আমি তো রোজই করি, হোম টাস্কও করে নিয়ে যাই, কিন্তু ধরো একদিন করলাম না, তাহলে কি তুমিও আমাকে মারবে বাবা?
-না সোনা, তুমি আমার লক্ষ্মী সোনা মা। তোমাকে কি মারতে পারি! বাবার কথায় আশ্বস্ত হলো ঝিমলি।
-জানো বাবা, রিমি, পায়েল কোনোদিন হোমওয়ার্ক করে নিয়ে যায় না। আর মিস রোজ বকে।
-কেন করে নিয়ে যায় না? ওরাও বুঝি ঘুড়ি ওড়ায়?
-না বাবা। তুমি কী গো? মেয়েরা কি ঘুড়ি ওড়ায়?
-তবে? অবাক হবার ভান করে সিদ্ধার্থ চোখ বড়বড় করলো।
-আসলে, ওরা তো স্কুল থেকে ক্রেশে চলে যায়। মা-বাবা ফেরে সেই রাতে। তখন ওদের বাড়ি নিয়ে যায়। ওরা কি আর একা একা হোম ওয়ার্ক করতে পারে? ওরা তো ছোট।
-ঠিক।
-বেচারারা রোজ বকা খায়। মিস খুব বাজে। একটুও মায়া-দয়া নেই বাচ্চাদের ওপর।
মেয়ের বলার ভঙ্গিতে হেসে ফেললো সিদ্ধার্থ, তাহলে এখন কী করবে ভেবেছ ওদের জন্য? সিদ্ধার্থ কৃত্রিম গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে।
-সেটাই তো! আমি তো মায়ের কাছে করে নেই। স্নেহাও মায়ের কাছে করে। একটু ভেবে, আচ্ছা বাবা, এক কাজ করলে হয় না?
-কী কাজ মা?
-কাউকে বলে দেবে না তো!
একটু আগে ঝিমলি যে ভঙ্গিতে গড প্রমিশ বলেছিল, ঠিক সেভাবেই সে এখন গড প্রমিস বলে, ঝিমলির বলার অপেক্ষায় রইলো।
-আমি আর স্নেহা ঠিক করেছি টিফিন পিরিয়ডে একসঙ্গে বসে নিজেদের হোমওয়ার্ক করে নেবো। আর রিমি আর পায়েলকেও আমাদের সঙ্গে বসিয়ে করিয়ে নেবো।
-বাহ! এত খুব ভালো। সোও..ও..ও…না মা আমার। মেয়েকে আদর করে বললো, এবার বলো তো, আজ কেন স্কুল যাবে না বলছ?

ইমু পাখি যখন এসে ছোঁ করে এসে তুলে নিয়ে দৌড় লাগাবে, তখন বুঝবি। ডানায় বসিয়ে উড়তে উড়তে সেই অস্ট্রেলিয়া নিয়ে চলে যাবে।

এতক্ষণে আসল কথায় আসতে পেরে ঝিমলি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। সে আদুরে গলায় বললো, আজ তো বাড়িতে ভাই আসবে।
ঝিমলির কথা শুনে সেই মুহূর্তে কোনো উত্তর খুঁজে পেল না সিদ্ধার্থ। কী বলবে ভেবে না পেয়ে শেষে সে মেয়ের কপালে একটা চুমু খেয়ে বললো, এমনিতে স্কুল গিয়ে কোনো লাভ নেই। আমিও অনেক সময় যেতাম না। কিন্তু…
-কিন্তু কী বাবা, ঝিমলি অস্থিরভাবে জিজ্ঞেস করলো।
-কিন্তু যারা ভালো মেয়ে তারা কখনো স্কুল কামাই করে না। স্কুলে না গেলে মিস আমার সোনাকে আর ভালোবাসবে না। তাছাড়া রিমি আর পায়েলের হোম ওয়ার্ক করাতে হবে, স্নেহাও অপেক্ষা করবে ঝিমলির জন্য। তাই না! লক্ষ্মী মেয়ে আমার, ঠাকুমার কাছে গিয়ে রেডি হয়ে নাও।

বাবার কথা শুনে ঝিমলি ঠাকুমার কাছে গেলো বটে, কিন্তু মন ভালো হলো না। ঠাকুমা সুনেত্রা দেবী তাকে স্নান করিয়ে, ভাত খাইয়ে, স্কুল ড্রেস পরিয়ে, চুল বাঁধতে বাঁধতে প্রশ্ন করলেন, কী হয়েছে দিদু ভাই? মুখখানা বাংলার পাঁচের মতো কেন? বাবা বকেছে বুঝি?
-না। ঠাকুমার গলা জড়িয়ে ধরে ঝিমলি বললো, ঠাম্মা, বাবা কি রোজ স্কুলে যেতো?
-তোমার বাবা? সে ভারি দুষ্টু ছিল। তাকে স্কুল পাঠানো আমার কাছে রীতিমতো বিভীষিকা ছিল। কোনো রকমে বকে স্নান করানো তো গেলো। ওমা খাবার বেড়ে দেখি তিনি আবার বেপাত্তা। তারপর খুঁজে খুঁজে তাকে কারোর বাড়ির ছাদ থেকে উদ্ধার করে আনা হলো। তখন স্কুলে অল রেডি দেরি হয়ে গেছে। খেলো কী খেলো না, সাইকেল নিয়ে দৌড়।
-দাদু জানতে পারতো না? দাদু তো খুব রাগী ছিল। হাত-পা বেঁধে ঝুলিয়ে দিতো।
-সে তো দাদু বাড়ি থাকলে। তোমার বাবা যখন স্কুলে যেতো তখন তো তিনি অফিসে।
-ও! তাই বলো। একটু থেমে ঝিমলি আবার বললো, আচ্ছা ঠাম্মা, বাবা তো নিজের হোম ওয়ার্ক করতো না। সাহেব কাকু করে দিতো। কিন্তু বাবাকে কে পড়াতো?
-পড়াতো দাদু। কখনো কখনো আমি। তোমার দাদুকে ভীষণ ভয় পেতো তোমার বাবা। একেবারে যমের মতো। একমাত্র তিনি বাড়ি থাকলে তোমার বাবা জব্দ হতো। কিন্তু তুমি এখন ঝটপট রেডি হয়ে নাও তো। গাড়ি এসে যাবে কিন্তু।
-ঠাম্মা তুমি আমাকে খুব ভালোবাসো? গলা জড়িয়ে ধরে ঝিমলি।
-এ আবার কী কথা দিদুভাই! তুমি হলে কি না আমার প্রাণ। আমার সোনা। তোমাকে না ভালোবেসে পারি?
-তাহলে আমার একটা উপকার করতে পারবে?
অবাক হয়ে ঠাকুমা জিজ্ঞেস করলেন, কী উপকার শুনি? দেখি পারি কি না?
-তুমি প্লিজ্‌ বাবাকে বলবে আজ আমি স্কুল যাবো না।
-কেন দিদুভাই? পড়া মুখস্ত হয়নি বুঝি? ঠাকুমা সস্নেহে জিজ্ঞেস করলেন।
-পড়া সব মুখস্ত। কিন্তু আজ আমার ভাই আসবে। তাই…
ঠাকুমা একটু দুষ্টুমির হাসি হেসে বললেন, কে বলেছে একথা তোমায়?
-কাকাই বলছিল, মা আজ হাসপাতাল থেকে একটা ভাই নিয়ে আসবে।
-তোমার কাকাইয়ের মাথা আর আমার মুণ্ডু! কী যে বলে তার ঠিক নেই। মনে হচ্ছে এবার কাকাইকেই ডাক্তার দেখাতে হবে।
-কিন্তু মা তো ভাই আনতেই গেছে।
ঠাকুমা এবার রুষ্ট হয়ে বললেন, ভাই কী বোন তা কী জানি! তবে তুমি স্কুলে না গেলে ভাই আসবে না। তারপর ছেলেভোলানি স্বরে বললেন, তুমি ফিরলে আমরা সবাই মিলে ভাই আনতে যাব কেমন!
-সত্যি বলছ?
-তিন সত্যি।
মোজা পরাতে পরাতে তিনি দুটো আঙুল এগিয়ে দিয়ে ঝিমলিকে বললেন, দিদুভাই ধরতো একটা।
ঝিমলি চট করে মধ্যমাটা ধরামাত্রই ঠাকুমা তার গাল টিপে, সোনা মেয়ে, বিকেলে চকলেট দেব, এখন চলো, বলে বাড়ির বাইরে গিয়ে দাঁড়ানো মাত্র স্কুলের গাড়ি এসে গেলো। নাতনিকে সেখানে তুলে দিয়ে, দুষ্টমি করবে না, টিফিন খেয়ে নেবে, বলার পর দুর্গা দুর্গা বলে মাথায় হাত ঠেকালেন।

গাড়িতে যেতে যেতে ঝিমলি ভাবে, সবাই কেন তাকে আঙুল ধরতে বলছে? মা হাসপাতাল যাওয়ার আগে হামি খেয়ে দুটো আঙুলের একটা যেকোনো আঙুল ধরতে বলেছিল। আবার বাবা, কাকাই, ঠাকুমা সবাই একই কথা বলে। সে অবশ্য এই ক’দিনে বুঝে গেছে কোনটা ধরলে সবাই খুশি হয়ে চকলেট দেয়।

স্কুলে আজ তার কোনো কিছুতে মন নেই। মিস ‘জনি জনি ইয়েস পাপা’ পড়াচ্ছেন। অন্য দিন সে হাত তুলে মিসের মতোই রাইমস্‌ বলে। কিন্তু আজ ইচ্ছে নেই। তার মন পড়ে আছে কখন সে বাড়ি যাবে আর ভাইকে দেখবে! আচ্ছা ভাইকে কেমন দেখতে হবে? তার মতো? সবাই বলে তাকে নাকি লক্ষ্মী ঠাকুরের মতো দেখতে! ভাই যদি কার্তিকের মতো হয় বেশ ভালো হবে। পরমুহূর্তেই সে ভাবে, ভাই হাসপাতালে কী করে আসবে? সে তো খুব ছোট। হাঁটতেও পারবে না। তবে?

ক’মাস আগে সে তার ফ্ল্যাটের বন্ধু সুহানার ভাইয়ের অন্নপ্রাশনে গেছিল। সেই ভাইটা একটু বড়। কিন্তু সেও কোলে করে ঘুরছিল। নিমন্ত্রণ বাড়ি থেকে ফেরার পথে ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করলো, ঠাম্মা, ভাইটা কোথা থেকে এলো? তাকে কে নিয়ে এলো?
-ডাক্তারবাবু নিয়ে এসেছেন। ঠাকুমা উত্তর দিলেন।
সে আবার জিজ্ঞেস করলো, ডাক্তারবাবু কোথা থেকে পেলো?
-ডাক্তারবাবু একদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলেন, তখন ভগবান তাকে ডেকে ভাইটাকে দিলেন।
-ভগবান ডাক্তারবাবুকে চেনেন?
-ভগবান সবাইকে চেনেন।
-ডাক্তারবাবু কেন অ্যান্টিকে দিলো?
-অ্যান্টি একদিন বসে বসে কাঁদছিল। তাই দেখে ডাক্তারবাবুর মায়া হলো। তিনি তখন ভগবানকে বললেন, একটা ছেলে দেওয়ার জন্য। ব্যস, ভগবান ছেলে বানিয়ে দিয়ে দিলেন।
-ভগবান বুঝি বাচ্চা বানান?
-হ্যাঁ। বানান তো। ভগবানের গুপ্তচর তার রথে চেপে সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখেন কার বাড়িতে ছেলে নেই, কার বাড়িতে মেয়ে নেই, তারপর ভগবানের কাছে গিয়ে রিপোর্ট করেন। তখন তিনি চাহিদা অনুযায়ী বাচ্চা বানিয়ে দেন।
-ভগবানের গুপ্তচর কে?
-সে কী আর একজন দিদুভাই! অনেক।
-একটু থেমে উত্তেজিত হয়ে ঝিমলি বললো, আমি একজনকে চিনি।
-তুমি চেন? কাকে দিদুভাই?
-নারদ মুনী। তিনি সব জায়গায় ঘুরে বেড়ান, নারায়ণ নারায়ণ বলে সবার সবকিছু জেনে নেন আর সেইসব কথা গিয়ে বিষ্ণুকে বলেন।

নাতনির কথা শুনে হেসে ফেললেন সুনেত্রা। বললেন, তুমি তো দেখছি সব জানো। এবার চুপ করো দিদুভাই। বকে বকে গলা শুকিয়ে গেলো।
নিজের জলের বোতলটা তাড়াতাড়ি ঠাম্মাকে এগিয়ে দিলো ঝিমলি। আরও কিছু বলার আগেই তারা নিজেদের ফ্ল্যাটের দরজায় পৌঁছে গেলো।
সুনেত্রা দেবী যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

ঝিমলি সেই সময় চুপ করে গেলেও মনের মধ্যে প্রশ্নটা রয়েই গেলো। রাতে মা’কে জড়িয়ে ধরে শোবার সময় সে জিজ্ঞেস করলো, মা, সুহানার ভাইকে কে এনে দিলো?
মা একটু চুপ করে থেকে বললো, একটা বড় পাখি কোলে করে তাকে আকাশ থেকে নিয়ে এসেছে।
পাখির কথাটা ঝিমলির খুব মনে ধরলো। সে তার বাড়ির জানলায় কত পাখি দেখে, টিয়া, বুলবুল, শালিক, চড়ুই, কাক আরও কত কী। পাখিগুলোর কথা মনে পড়তেই সে বললো, এই পাখিগুলো তো খুব ছোট, তারা ভাইকে আনতে গিয়ে ফেলে দেবে না তো?
-না, সোনা। এই পাখিটা অনেক বড়। মা তাকে অভয় দিলো।
-এই পাখিটার নাম কী?
-কোন পাখিটার?
-যে পাখিটা ওই ভাইটাকে নিয়ে এসেছিল।

সেই মুহূর্তে ঝিলের ইমু পাখির কথা মনে পড়লো। ছোট বেলায় দুষ্টুমি করে রাস্তায় একা একা বেড়িয়ে গেলেই মা বলত, যা যা, একা একা ঘুরে বেড়া। ইমু পাখি যখন এসে ছোঁ করে এসে তুলে নিয়ে দৌড় লাগাবে, তখন বুঝবি। ডানায় বসিয়ে উড়তে উড়তে সেই অস্ট্রেলিয়া নিয়ে চলে যাবে। আর মাকে দেখতে পাবি না।
-দেখতে পাব না কেন? অস্ট্রেলিয়া তো প্লেনে করেই যাওয়া যায়। তুমি আমায় গিয়ে নিয়ে আসবে।
-হ্যাঁ। ইমু তোকে এয়ারপোর্টেই নামাবে কিনা!
-ইমু পাখি কি খুব বড়? ঝিল স্কুলে জেনারেল নলেজের বই পড়ে জেনেছে, উট পাখি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় পাখি। ইমু পাখির নাম তো তার বইয়ে নেই। সে আবার জিজ্ঞেস করতো, ইমু পাখি কি উট পাখির মতো?
-প্রায় অতটাই। তারপর মা হাত যতটা সম্ভব উঁচু করে তুলে বলতো, এই এত্ত বড়। একটা মানুষের সমান আর যা জোর দৌড়ায় না!
এবার ঝিলের ভয় করতো। সে মাকে জড়িয়ে ধরে বলতো, তাহলে সে আমায় কোথায় নিয়ে যাবে?
-জঙ্গলে। তুই ওদের সাথে সেখানেই বড় হবি, গাছে গাছে উড়ে বেড়াবি। ফলমূল পোকা মাকড় খাবি।
-কী মজা! তাহলে আমি মুগলী বা টারজানের মতো জঙ্গল শাসন করবো।
-তা আগেই বাঘ আর সিংহ এসে ঘাড় মটকে খেয়ে নেবে।
এবার ঝিল চিন্তায় পড়ে যেতো। সে যদি বেঁচেই না থাকে তাহলে কী করে জঙ্গল শাসন করবে! তার থেকে মা’র কথা শোনাই ভালো, ভেবে সে বাড়ি ফিরে যেতো।

ঝিমলি এখন নিশ্চিন্ত। স্বপ্নে দেখা ইমু পাখিটাই তার ডানায় বসিয়ে ভাইকে মা’য়ের কাছে দিয়ে এসেছে।

মা ঠাম্মা কিচ্ছু জানে না। বলে কিনা সুহানার ভাইকে ডাক্তারবাবু ভগবানের থেকে নিয়ে এসেছে! কী যে বোকা আম্মাটা! ঝিমলির কথায় ঝিল অতীত থেকে আবার বাস্তবে ফিরে এলো। মেয়ের দিকে তাকিয়ে, ছিঃ আম্মাকে বোকা বলতে নেই, বলে হেসে তাকে আরও কাছে টেনে নিয়ে বললো, এবার ঘুমোও দেখি।

স্কুল ছুটি হতেই ঝিমলি এক দৌড়ে গাড়িতে উঠে পড়লো। অন্য দিন সে স্কুলের মাঠে লুকোচুরি খেলে, দৌড়াদৌড়ি করে, পাখির পালক কুড়ায়। স্নেহা তাকে পাখির পালক কুড়োতে ডাকলো।
-আজ খেলব না রে। বাড়ি গিয়ে ভাই আনতে যাবো, সে জানিয়ে দিলো।

বাড়ি পৌঁছেই সে ঠাকুমার কাছে গিয়ে ভাইয়ের খবর জিজ্ঞেস করে জানলো, ভাই এখনো আসেনি। শুনে খুশি হয়ে সে চটপট খেয়ে নিলো।

বেশ কিছুদিন হলো ঝিমলি আর মায়ের হাতে খায় না। সে এখন মায়ের কাছে কম যায়। রাতেও সে ঠাম্মা আর কাকাইয়ের পাশে শোয়। মা প্রায় সব সময়ই খাটের ওপর শুয়ে-বসে থাকে। ঘরের সব কাজই প্রায় ঠাম্মা আর পুতুলদি করে। মা এখন তাকে আগের মতো কোলেও নেয় না। বড়জোর কাছে গেলে গাল টিপে দেয়। এখন সে দূর থেকে মা’কে দেখে। মা আস্তে আস্তে চলে ফেরে। তার পেটটা কেমন গোল হয়ে ফুলে গেছে। মাঝে মাঝে তাকে ডেকে মা পেটে হাত ছোঁয়ায়, কান পাততে বলে। তার খুব লজ্জা লাগে। সে অবাক চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে দৌড়ে পালায়। সবই যেন বড় অদ্ভুত মনে হয় তার।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেলো। ঠাম্মা হাসপাতাল গেলো না। জিজ্ঞেস করলে বললো, ভাই এখনো আসেনি।
ঝিমলি জানলায় দাঁড়িয়ে থাকার সময় বাইরে ডাক্তারকাকুকে দেখতে পেলো। রিকশা করে যাচ্ছিল। সে ঝুঁকে পড়ে দেখার চেষ্টা করল তার হাতে ভাই আছে কি না!
দেখতে না পেয়ে ‘ঠাম্মাটা সত্যিই বোকা’ নিশ্চিত হয়ে গেলো সে। এবার সে মায়ের বলা সেই বড় ইমু পাখিটার কথা ভাবতে লাগলো।
রাতে সে কাকাইয়ের পাশে শুলো। ঘুমে তার চোখ বুজে আসছে। তবু সে ঘুমোবে না। হাই তুলে সে কাকাইকে জিজ্ঞেস করলো, কাকাই ভাইকে নিয়ে ইমু পাখি কখন আসবে?
কাকাই তার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললো, এখন তো রাত হয়ে গেছে। পাখিরা রাতে বাসা থেকে বেরোয় না। ঘুমো এখন। কাল ভোরে ঠিক আসবে।
ঘুমের আবেশে ঝিমলি বললো, তুমি সত্যি বলছ? ঠিক আসবে?
-ঠিক বলছি সোনা। তুমি ঘুম থেকে উঠলেই দেখতে পাবে।
ঝিমলি কাকাইকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে গেলো। স্বপ্ন দেখলো, সে স্কুলের মাঠে ঘুরে ঘুরে পালক কুড়চ্ছে। অনেক পালক একসঙ্গে জড়ো হওয়া মাত্র সেটা একটা বড় পাখি হয়ে গেলো। তার দুটো বড় পাখায় মাঝখানে শুয়ে নরম মাখনের দলার মতো একটা বাচ্চা। উড়তে উড়তে সেই পাখিটা মা’র কাছে যাওয়া মাত্র ঝিমলির ঘুম ভেঙে গেলো। সে দেখলো পাশে কাকাই নেই। জানলা দিয়ে রোদ ঘরে ঢুকছে। সে এক লাফে বিছানা থেকে নেমে ঠাম্মার কাছে যেতেই ঠাকুমা বললেন, শিগগিরই মুখ ধুয়ে দুধ খেয়ে নাও। ভাই দেখতে যাব।

ঝিমলি এখন নিশ্চিন্ত। স্বপ্নে দেখা ইমু পাখিটাই তার ডানায় বসিয়ে ভাইকে মা’য়ের কাছে দিয়ে এসেছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত