ভাঙন সময়ের কবিতাগুচ্ছ

রাজ্য, দেশ, পৃথিবী সবখানেই অশান্তি, ভাঙনের সুর। রক্তের স্রোতে ভিজে যাচ্ছে সময়। একটা গুমোট জড়তা ঘিরে ধরেছে অস্তিত্বকাল। এমন সময় কবিতাই নামুক পথে। শ্লোগান হয়ে উঠুক মুখে মুখে কিংবা বোধকে নাড়িয়ে যাক কবির উচ্চারণ।


সংশয়

প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে ভাবি
বেঁচে আছি তো!

খবরের কাগজ পড়ি না,
সেই খুন, জখম, হানাহানি
টিভি চ্যানেলের একঘেয়ে ঘ্যানঘ্যান
সরিয়ে নিয়েছি নিজেকে কবেই
সব উত্তেজনা ম্রিয়মাণ

আমি মরে গেছি!
নিজের গায়ে চিমটি কাটি,
নাকের সামনে রাখি হাত
শ্বাস চলছে অবিরাম
তবে আমি মৃত নই,
বেঁচেও তো নেই

প্রতিবাদ করতে ভয় পাই
প্রকাশ্যে কোনো কথা বলিনা
যা রাষ্ট্র বিরোধী

অথচ সমস্ত মায়েদের চোখের জল
ছুঁয়ে যায়, ক্ষতবিক্ষত মুখ দেখে
আতঁকে উঠি,
কুঁকড়ে যাই, দিশেহারা হই

খুব ভয় করে, ছেলে মেয়ে বড় হচ্ছে ,
এত এত সন্তান- তাদের হাসি হাসি মুখ-
সহসা আতঙ্কের ছায়া সেখানে
কী রেখে যাচ্ছি -যাব তাদের জন্য!

চিৎকার করি একা একা
বিড়বিড় করি আয়নার সামনে
ছায়া পড়ে
একমাত্র তখনি বুঝতে পারি বেঁচে আছি

 

মৃত্যুর মিছিল থেকে

খানিক আগেও রজনীগন্ধার সুবাসে
ভরে ছিল জায়গাটা
গোলাপ জুঁই বেল পরস্পর কথা বলছিল
প্রেমের কথা
ত্যাগের কথা
ভক্তির কথা
ঈশ্বরের কথা
সমর্পনের কথা
ভালবাসার কথা

এখন সেখানে মাংস ঝুলছে
রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে ছড়িয়ে
থাকা পাপড়ির গায়ে
সেদিকে চেয়ে কুকুরের দল

জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে
ব্যবধান ক্রমশ কমছে

 

অনুভব

ভোররাতে ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা ।ভীষণ রাগে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম ।চিৎকার করলাম। কি দিয়েছ আমায়! অপমান-যন্ত্রণা কষ্ট ছাড়া! চলে যাও তুমি।
চাই না তোমার মিথ্যে করুণা ।
তুমি চুপ। তাকালাম ফিরে তোমার মুখের দিকে।শান্ত চোখে যেন জ্যোৎস্নার আলো।ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসি। ইশারায় বললে- এসো ।
তখনো ক্রোধ ঘিরে আমায়।তবু পিছু নিলাম ।
শহর থেকে বহু দূরে এক উদ্বাস্তু শিবির।শত শত শিশুর চামড়া ফেটে রক্তর ফোঁটা মাটিতে ।চোখে নিদারুণ যন্ত্রণা ।দেখলাম অনাহারে দীর্ণ মায়ের জীর্ণ শরীর ।
পুরুষের হাতে শূণ্য পাত্র, অভূক্ত তারাও ।
দেখলাম ফুটপাথ জুড়ে পশুর মৃত শরীর ।খুবলে খাচ্ছে মানুষের দল। কি ভয়ংকর সে দৃশ্য! ভয়ে চোখ বুজলাম ।
ঈশ্বর হাসল।এতেই এত কাতর! চলো আমার সাথে ।
একী! কে ওই মানব! পিঠে হাতে ক্রুশ! কার মুখে জোর করে ঢালা হচ্ছে হেমলক! ওকে তো চিনি। তীব্র শীতের রাতে রাস্তায় ভিখারির মত পরে!
না না দেখতে চাই না আমি।চিৎকার করলাম।
স্মিত হেসে বলল, তোমার যন্ত্রণা কি এদের থেকেও বেশি! তারপর বললে, ওই দেখ নতুন দিনের সূর্য কত লাল, দেখ ধানের শিষে কেমন বাতাসের নাচ, পাখির গান তুমি শুনতে পাও না!
লজ্জা়য় শ্রদ্ধায় মাথা নিচু হয়ে গেল ।কত বোকা আমি! তোমাকে অস্বীকার করেছি!
তুমি চোখের দিকে তাকালে।চলে যাবার আগে বললে-
কালচক্রে কোনো কষ্ট কোনো অপমান-ই স্থায়ী নয়।কেবল ভালবাসা আর ক্ষমাই চির সত্য।বাকি সব সময় গ্রাস করে নেয় ।

 

জীবন জিজ্ঞাসা

নানা কথা বলার পর সেই প্রশ্ন
ছিন্নভিন্ন করে দিল
এতক্ষণ স্তব্ধ থাকা মনকে-
সেই জটিল প্রশ্ন :
মানেহীণ এ জীবন নিয়ে কী করব!
প্রশ্ন ছড়িয়ে গেল স্বর্গ মর্ত্য পাতালে-
সহসা
অন্তরাল থেকে উত্তর এল;
জীবন আছে বলেই এই জীবন জিজ্ঞাসা
মানে খোঁজা বলেই জীবন অর্থহীন

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত