বাঙালি জাতির সমাজ পরিচয় ও ধর্ম (পর্ব-১)

 

কোন একটি জাতি বা গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দর্শনের মধ্যে সুপ্ত থাকে তাঁর ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট। কেননা মানুষ যেমন সয়ম্ভু নয় তেমনি সমাজ বিচ্ছিন্নও নয়। একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে ও পরিবেশে সে ও তার গোত্রটি সমাজে বিশেষ প্রভাব ছড়ায়। আর এজন্যই কোন গোত্রের ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতির স্বরূপটি উদঘাটন করার আগে তার পারিপার্শ্বিক  অবস্থা পর্যবেক্ষণ জরুরী হয়ে ওঠে।

বঙ্গদেশে(বর্তমান বাংলাদেশ নয়) চৈতন্য প্রভাবিত যুগ যেমন ঐতিহাসিক পর্যায় তেমনি চৈতন্যপূর্ব সময় বা কালও ঐতিহাসিক। সেই ঐতিহাসিক কাল পর্বের বাংলা ইংরেজ আমলের সীমা দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলো না। সেই সময় বাঙলার সীমা নির্দেশিত হয়েছিলো-
‘ উত্তরে হিমালয় এবং হিমালয়ধৃত নেপাল, সিকিম ও ভুটান রাজ্য, উত্তর-পূর্ব দিকে ব্রহ্মপুত্র নদ ও উপত্যকা; উত্তর-পশ্চিম দিকে দ্বারবঙ্গ পর্যন্ত ভাগীরথীর উত্তর সমান্তরালবর্তী সমভূমি; পূর্ব দিকে গারো-খাসিয়া-জৈন্তিয়া- ত্রিপুরা- চট্টগ্রাম শৈলশ্রেণি বাহিয়া দক্ষিণ সমুদ্র পর্যন্ত; পশ্চিমে অরণ্যময় মালভূমি; দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর।১ ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় বলেন-‘ এই প্রাকৃতিক সীমা বিধৃত ভূমিখন্ডের মধ্যেই প্রচীন বাঙলার গৌড়-পুন্ড্র-বরেন্দ্রী-রাঢ়- সুহ্ম-তাম্রলিপ্ত- সমতট-বঙ্গ-বঙ্গাল- হরিকেল প্রভৃতি জনপদ; ভাগীরথী- করতোয়া- ব্রহ্মপুত্র-পদ্মা-মেঘনা এবং আরো অসংখ্য নদ-নদী বিধৌত বাঙলার গ্রাম,প্রান্তর, পাহাড়,কান্তার। এই ভূমিখন্ডই । ঐতিহাসিক কালের বাঙালীর কর্ম ও নমভূমি।’২ বৃৃহত্তর এই বাঙলার সামাজিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে গবেষকগণ একে দুটি বিশেষ সময় পর্বে ভাগ করেছেন-১. আদি বৈদিক বা ঋকবৈদিক যুগ ও ২. উত্তর বৈদিক যুগ।
‘ঋক বৈদিক পর্বের সূচনা ১৮০০ বা ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। অনেকে মনে করেন ঋকবেদেও শেষ স্তোস্ত্রগুলো গৌতম বুদ্ধের ও আবির্ভাবের অন্তত ৫০০ বছর পূর্বে রচিত হয়েছিলো। সে হিসেবে ১০০ খ্রি:পূ: নাগাদ ঋক বৈদিকের শেষ স্তোস্ত্রগুলো রচিত হয়েছিলো বলে অনুমিত হয় । এ বিবেচনায় খ্রি:পূ ১৮০০ থেকে খ্রি:পূ ৯০০ একালপর্ব ঋক বৈদিক কাল হিসেবে আনুমিত হয়’৩। আর উত্তর বৈদিক যুগের বিস্তৃতি আনুমানিক ‘১০০০ থেকে ৬০০ খ্রিস:পূ: পর্যন্ত’। গবেষণায় প্রমান হযেছে যে ঋক বৈদিক যুগে আর্যরা বঙ্গদেশ সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানতে পারেনি। খ্রিস্টেও জন্মেও ২০০০ বছর আগে আর্যরা ভারতে প্রবেশ করলেও বঙ্গদেশে তাদের অনুপ্রবেশ ঘটে আরো অনেক পরে। ধারনা করা হয় এদেশে আর্যদের অধিকারে আসে গুপ্তযুগের কিছ আগে অর্থাৎ উত্তর বৈদিক যুগের শেষ পর্বে। গবেষকগন বলেন যে, ঋক বৈদিক পর্বে বঙ্গে আর্যদের কোন অস্তিত্ব ছিলনা। এ সময় বঙ্গদেশে আদিম অধিবাসীদের ধর্মই প্রচলিত ছিল। এ ধর্মকে ড. অতুল সুর প্রাক আার্য ধর্ম বলে অভিহিত করেন। ‘ মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিতে বিশ্বাস, মৃতব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা, বিবিধ ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়া ও মন্ত্রাদি, মানুষ ও প্রকৃতির সৃজন শক্তিকে মাতৃকারূপে পূজা,‘ টোটেম’এর প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা এবং গ্রাম, নদী, বৃক্ষ, অরন্য, পর্বত ও ভূমির মধ্যে নিহিত শক্তির পূজা, মানুষের ব্যাধি ও দূর্ঘটনাসমূহ দুষ্ট শক্তি বা ভূতপ্রেত দ্বারা সংঘটিত হয় বলে বিশ্বাস ও বিবিধ নিষেধজ্ঞা-জ্ঞাপক অনুশাসন ইত্যাদি নিয়েই প্রাক-আর্য ধর্ম গঠিত ছিলো।’৪
ড. শিবপ্রসাদ ভট্টাচার্য ভারতীয় সভ্যতার সাথে বিশ্বে ও আদিম সংস্কৃতির মিল খুঁজে পান-“ আদিম সভ্যতার যুগে ভারতীয় জীবনের এই জাতীয় যাদুশক্তি বা প্রজনন শক্তি পূজার পিছনে যেমনটি সক্রিয়, অত্যন্ত বিস্ময়ের কথা, বর্হিভারতে, সুদূর ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে ও সভ্যতার এই পর্বে মানব মনের ধ্যান-ধারণা অবিকল এক ও অভিন্ন”।৫কেবল দেবীপ্রসাদই নন, একই মত প্রকাশ করেন ড. নীহাররঞ্জণ রায়ও। “ প্রাচ্য দেশে অবৈদিক ব্রাত্য ধর্মের প্রসার ছিলো এতথ্য সুবিদিত। অথর্ব বেদেও সঙ্গে যোগধর্মেও সম্বন্ধ বোধ হয় ছিল ঘনিষ্ট এবং এই যোগধর্মেও অভ্যাস ও আচরণ প্রাচীন বাংলারও হয়তো অজ্ঞাত ছিল না। কিন্তু, যোগ ধর্মেও সঙ্গে বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মেও কোন ঘনিষ্ট সম্বন্ধ ছিল, এমন মনে করবার কারণ নাই। বরং সিন্ধু- সভ্যতার আবিষ্কারে পন্ডিতেরা মনে করতে আরম্ভ করিয়াছেন যোগধর্ম প্রাক-বৈদিক এবং শৈব ও তান্ত্রিক ধর্মেও সঙ্গে যোগের সম্বন্ধ ঐতিহাসিক পর্বের।”৬দেবীপ্রসাদ চট্টপাধ্যায় তন্ত্রসাধনার প্রবল প্রভাব লক্ষ করে ভারতীয় ধর্মচর্চার ধারাকে প্রধান দুইটি ভাগে ভাগ করেছেন- একটি বৈদিক ধারা অপরটি তান্ত্রিক ধারা। ড. রতনকুমার নন্দ বলেন-‘ বাংলার আদি ধর্ম বিশ্বাস ও ধর্মাচারে এই তান্ত্রিক সাধন পদ্ধতির ব্যাপক প্রচলন ছিল। পরবর্তীকালেও বাংলার ধর্মাচারে এই প্রভাব ক্রিয়াশীল ছিল’৭। পরবর্তীকালে বৌদ্ধ, জৈন., শাক্ত, বৈষ্ণব প্রভৃতি সম্প্রদায়ের দর্শনের সাথে সক্রিয় হয়েছে তন্ত্র সাধন পদ্ধতি বা তান্ত্রিক ধারাা। বাংলার সহজিয় সাধনা বলতে যা বুঝায় তার মধ্যেও তন্ত্রাচার ক্রিয়াশীল।

সমাজের প্রান্তিক স্তরের মানুষের মধ্যে আর্যপূর্ব ধ্যান ধারণা ও সংস্কৃতির আস্তিত্ব সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যায়। ভারতে আর্য আগমনের পর তাদেও প্রভাবে বৈদিক ধর্মমত ব্যপক পরিচিতি পায় যারা কিনা বেদেও অপৌরেষেয়ত্বে বিশ্বাস করে। কিন্তু বৈদিক ব্রাহ্মণ্যবাদের কট্টর নীতির জন্য সমাজের নিন্ম স্তরের মানুষ বৈদিক ধর্মাচারের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে ভারতীয় ধর্মচিন্তার জগতে প্রতিবাদী ধর্মমতের আবির্ভাব ঘটে। ব্রাহ্মণদের সর্বাত্মক প্রাধাণ্যেও বিরুদ্ধে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম মত অন্যান্য নতুন ধর্মমতাদর্শীরাও বৈদিক যাগ-যজ্ঞ ও ক্রিয়া কর্মেও অসারতা ঘোষণা করতে থাকে। এসব প্রতিবাদী ধর্ম মতে গৃহিত হতে থাকে সর্ব শ্রেণির মানুষের সমান অধিকার।
জৈন আজৌবিক ও বৌদ্ধ এই তিনটি ধর্মমতই বেদ বিরোধী। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে বৌদ্ধদের তুলনায় জৈনরা বাঙলাদেশের খোঁজখবর একটু বেশি জানতেন। তাদের প্রতিষ্ঠাকালে ও প্রসার কালে তারা বাঙালাকে চারটি ধর্মাঞ্চলে বিভক্ত করে ভিক্ষুদের শ্রেনি বিভাগ করেছিলেন-১. তামলিত্তিয়া-আম্রলিপ্ত অর্থাৎ মেদিনীপুর)২. কোডিবর্ষীয়, বা কোটীবর্ষ অর্থাৎ দিনাজপুর, ৩. পোংডবর্ধনীয়া, পুন্ড্রবর্ধন অর্থাৎ (বগুড়া) এবং ৪. খববডিয়া, খর্বাট বা কর্বট অর্থাৎ পশ্চিম বঙ্গের কোন স্থান।৮ জৈন ধর্মাবলীদের একটি বড় অংশ ছিল দিগম্বর সম্প্রদায় যারা নগ্ন অবস্থায় চলা ফেরা করত। জৈন সম্প্রদায়কে নিগ্রলর্থ সম্প্রদায় ও বলা হয়। জৈন সম্প্রদায়ের আজীবিক সাপ্রদায় ও বাঙলাদেশে প্রভাব বিস্তার করেছিল। ইতিহাস সাক্ষদেয় দেয় যে ‘সম্রাট অশোকের সময় আজীবিকরা বাঙলাদেশে বেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় ছিলো এবং জৈনদের সঙ্গে তাদের বিশেষ প্রভেদ ছিলনা। জৈনধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহাবীর এবং আজীকিব ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গোসাল ছিলেন পরস্পর বন্ধু। তারা একত্রে ছয় বছর বজ্রভূমিতে কাটিয়েছিলেন। বুদ্ধের জন্মের প্রায় দুইশ বছর আগে অর্থাৎ খিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে তারা জল গ্রহন করেন। এদিকে বৌদ্ধ ধর্ম বৌদ্ধের আমল থেকেই বাংলাদেশে প্রসার লাভ করে। ততদিনে একটু একটু করে ব্রাহ্মন্য ধর্ম বাংলার বিস্তার লাভ করতে শুরু করেছে। ৯

মৌর্য সম্রাট অশোকের আমলে বৌদ্ধধর্ম বাংলায় সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে পুন্ড্রবর্ধনে বৌদ্ধধর্ম প্রসার লাভ করে। প্রাচীন কালের বৌদ্ধধর্ম ছিল থেববাষ্ঠ। এরা শুন্যতা জ্ঞান পূর্বক মোহমুক্তি বা নির্বান লাভে সচেষ্ট ছিলেন। এরা ছিলে হীনযান পথি। এর অব্যবহিত পরে মহাযান পথির আবির্ভাব। অষ্ঠম ও নবম শতকেই বৌদ্ধধর্মে গুহ্য সাধনতত্ত্ব, নীতিপদ্ধতি ও পূজাচারের প্রভাব লক্ষ করার মত। বাংলাদেশে এরা এই তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কেননা শূন্য ও বিজ্ঞানের দর্শন সাধারন মানুষের ভেদবুদ্ধির অতীত। তারা বরং আদি সংস্কৃতির সাথে সম্পর্ক যুক্ত মতবাদে তুষ্ট থাকতে পছন্দ করে। ফলে পাল আমলে এই যব সিদ্ধাচার্যদের লক্ষ করার মত। এরাই প্রথম তন্ত্রের গূঢ় সাধন পদ্ধতি লিখিত রূপে প্রকাশ করে। এই সাধনতন্ত্রকে বজ্জযান বা সহজিয়া সাধন পদ্ধতিও বলা হয়। এরা শরীর বা কায়াকে পৃথিবীর সঙ্গে তুলনা করেন। বজ্রযানীদের মতে আদিবুদ্ধ হচ্ছে সৃষ্ঠির কারন, তিনি শুণ্য আর শুণ্যই হচ্ছে বজ্র। একক অবস্থায় তিনি শুণ্য তার প্রজ্ঞাপর মিতার সাথে যুক্ত হয়ে তিনি বোধিচিত্ত। একটি শুণ্যতা অপরটি করুনা।

বোধিজিও মহাসুখের অনুভূতি ছাড়া আর কোন অনুভূতি থাকেনা এই মহাসুখের মধ্যে চিত্তের নিমাজ্জিত হওয়াই পরম নিধান।

প্রাচীন বাঙার তান্ত্রিক ধর্মের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারনে বৌদ্ধ সিদ্ধাচর্থরা বৌদ্ধতান্ত্রিক ধর্মের প্রবর্তন করেছিলেন বলে জানান ড. অতুল সুর। তান্ত্রিক সাধনায় যৌন মিলন অবশ্য পালনীয়।

 

ক্রমশ…

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত