| 2 মার্চ 2024
Categories
ইতিহাস

বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা কৃষ্ণাঙ্গ সান্তা ক্লজ

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট
শুভজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
লাল জামা, লাল টুপি, সাদা চুল, লম্বা দাড়ি আর স্লেজ আর সেইসঙ্গে কাঁধে উপহার বোঝাই ঝুলি— সান্তা ক্লজ। তাঁকে ছাড়া ক্রিসমাস ইভ কল্পনাতেও আনা একপ্রকার দুঃসাধ্য ব্যাপার। কাল্পনিক উপাখ্যানের এই চরিত্র যে শুধুমাত্র গল্পের পাতা কিংবা নিছক মূর্তিতে আটকে থাকেন এমনটা নয়। যেকোনো জায়গাতেই ক্রিসমাসে দেখা মেলে তাঁর। বহুরূপীদের হাত ধরেই বড়দিনের উৎসবে তিনি হয়ে ওঠেন জীবন্ত চরিত্র।
 
সান্তা সাজার এই চল আজকের নয়। বহু যুগ ধরেই তা চলে আসছে পাশ্চাত্য এবং প্রথম বিশ্বের দেশগুলিতে। কিন্তু বড়োদিনের উৎসব উদযাপনে সান্তার চরিত্রিক বৈশিষ্ট নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল মার্কিন প্রদেশে। পৃথিবীর অন্যতম উন্নত দেশ হলেও মার্কিন প্রদেশে আজও বর্ণবিদ্বেষের ছাপ সুস্পষ্ট। জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুই তার প্রমাণ। তবে তা কোনো নতুন ঘটনা নয়, দীর্ঘদিন ধরেই এই বৈষম্য চলে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায়। সেই বৈষম্যই জন্ম দিয়েছিল সান্তা-বিতর্কের।
 
মার্কিন সমাজব্যবস্থার চালকাসনে থাকা অভিজাত, অর্থবান শ্বেতাঙ্গরাই একসময় আয়োজন করতেন ক্রিসমাস ইভের পার্টি। সেখানেই তাঁরাই ভাড়া করে আনতেন বাস্তবের সান্তা ক্লজদের। তবে সেই উৎসব থেকে ব্রাত্য থাকতেন কৃষ্ণাঙ্গরা। অনুমতি মিলত না অংশগ্রহণের। কিন্তু বড়োদিনের উৎসব যে সকলের। সকলেরই অধিকার রয়েছে সেই আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার। সেই উপেক্ষা, সামাজিক বৈষম্যই বিশ শতকের শুরুর দিকে জন্ম দিয়েছিল ‘কালো সান্তা’-র (ব্ল্যাক সান্তা)।
তবে সময়টার খানিক উনিশ-বিশ তফাৎও হতে পারে। কারণ, কৃষ্ণাঙ্গ সান্তা ক্লজের প্রথম উল্লেখ মেলে ১৯০১ সালের ব্লুমফিল্ড পত্রিকায়। ধরে নেওয়া যেতে পারে তার খানিক আগেই জন্ম নিয়েছিল ‘ব্ল্যাক সান্তা’। তাছাড়াও বিশ শতকের শূন্য দশকে একাধিক ক্রিসমাস পার্টিতেও ‘ব্ল্যাক ফেস সান্তা’-র উপস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন লক্ষ করা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্রে।
১৯১৫ সালে, ভার্জিনিয়া রিসর্টে মার্কিন রাষ্ট্রপতি উইলসনের হানিমুন সফরের বিবরণেও উল্লেখ পাওয়া যায় কৃষ্ণাঙ্গ সান্তার উপস্থিতি। সেই পার্টিতে ভাড়া করে আনা হয়েছিল ১৫ জন নিগ্রো সান্তা ক্লজকে। যাঁরা হাস্যকৌতুক এবং নিগ্রো ব্লুজ মিউজিকের মাধ্যমে মাতিয়ে তুলেছিলেন রাষ্ট্রপতির পার্টিকে।
এরও বছর চারেক পরে আমেরিকার রাস্তায় প্রথম দেখা মেলে কৃষ্ণাঙ্গ সান্তার। পিটসবার্গ ডেইলি’র প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয় ‘ভলেন্টিয়ার্স অফ আমেরিকা’ নামের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে রাস্তায় নেমেছিলেন কালো সান্তা। দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ শিশুরা যাতে ক্রিসমাসের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্যই এই উদ্যোগ নিয়েছিল সংস্থাটি। সান্তার মাধ্যমে কিছু উপহার সামগ্রীও বণ্টন করা হয়েছিল তাদের মধ্যে।
 
তবে কালো সান্তা ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ১৯৩৬ সালে। কিংবদন্তি ট্যাপ-ডান্সার বিল রবিনসন নিজে সেজেছিলেন সান্তা ক্লজ। বড়দিনের প্রাক্কালে হার্লেমের পথ-শিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন তিনি। তার আগে নিউ-ইয়র্ক থেকেই কৃষ্ণাঙ্গ সান্তা ক্লজ আসতেন হারলেম বা শিকাগোর মতো কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিতে।
 
বিল রবিনসনের সান্তা সাজার পর থেকে ক্রিসমাসে কৃষ্ণাঙ্গ সান্তার ছবি এবং প্রতিকৃতি তৈরির চল বাড়ে। ১৯৪৩ সালে, হারলেমের অন্যতম বৃহত্তম বিপণন কেন্দ্র ব্লামস্টেইন, বড়দিনের প্রাক্কালে ক্রেতা-মনোরঞ্জনের জন্য নিয়োগ করে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সান্তা ক্লজ। ১৯৪৬ সালের শিকাগোর একটি দোকানও অনুসরণ করেছিল এই উদ্যোগ। তারপর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দোকানেই ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছিল কালো সান্তার পুতুল, মূর্তি।
 
অন্যদিকে সমাজ থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের খানিকটা দূরে সরিয়ে রাখার নীরব প্রতিবাদের ভাষাও হয়ে উঠেছিল কালো সান্তা ক্লজ। শ্বেতাঙ্গ পরিচালিত বিভিন্ন শপিং মল, যেখানে প্রবেশ নিষেধ ছিল কৃষাঙ্গদের, সেসব মলের বাইরে দেখা মিলত তাঁদের। বারবার তাঁদের আক্রান্তও হতে হত ‘সভ্য সমাজ’-এর মানুষদের থেকে। অশ্রাব্য গালিগালাজ থেকে শুরু করে হিংস্রতার সামনেও পড়তে হয়েছে তাঁদের। তবে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের প্রতিনিধি হিসাবেই সান্তা এই লড়াই চালিয়ে গেছেন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে।
 
 
১৯৬০-এর দশকে নাগরিকতা অধিকার আন্দোলনেও মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিল কালো সান্তা। জাতিগত সাম্যের লড়াইয়ে অর্থনৈতিক বয়কটের পাশাপাশি ‘কালো সান্তা’-র মাধ্যমে চলেছিল সচেতনতা প্রচার। গায়ের রঙের যে চরিত্রকে আলাদা করে দিতে পারে না, সেই কথাই বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলেছিল মার্কিন মুলুক জুড়ে। হ্যারি বেলাফোন্টে, জোন বায়াজ, মারলন ব্র্যান্ডো, ডায়াহান ক্যারোলের মতো বিখ্যাত তারকাদের সঙ্গে বিভিন্ন পদযাত্রা এবং পিকেটিংয়ে দেখা গিয়েছিল কৃষ্ণাঙ্গ সান্তাদের। চলেছিল যদৃচ্ছ পুলিশি ধর-পাকড়ও।
 
তবে আজ পরিস্থিতি অনেকটাই পালটে গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। বর্ণবৈষম্য একেবারে মুছে না গেলেও অনেকটাই কমেছে তার মাত্রা। এই লড়াইয়ের পিছনে খানিকটা হলেও কৃতিত্ব রয়েছে কাল্পনিক উপাখ্যানের এই চরিত্রের। আজও ব্যক্তিগত ক্রিসমাস পার্টি ছাড়াও নিয়ম করেই হার্লেম বা শিকাগোর মতো শহরে জনসমাবেশে, শপিং মলে দেখা যায় ‘কালো সান্তা’দের। কালো সান্তার মূর্তি শুধু প্রতিবাদের প্রতীক না থেকে, অনেকাংশে হয়ে উঠেছে ইন্টেরিয়ার স্টেটমেন্টও। অনেক শ্বেতাঙ্গরাও ব্যক্তিগত আগ্রহেই সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন কালো সান্তার।
 
তবে আবির্ভাবের একশো বছর পেরিয়ে এসেও গুরুত্ব কমেছে কি তাঁর? একুশ শতকে দাঁড়িয়ে বর্ণবৈষম্যের একাধিক নিদর্শন মনে করিয়ে দেয় সেই কথাই। সম্প্রতি সম্প্রীতির সেই বার্তা পৌঁছে দিতেই উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম শপিং মল সংস্থা ‘মল অফ আমেরিকা’। ক্রিসমাসের প্রাক্কালে মার্কিন প্রদেশের উল্লেখযোগ্য শহরগুলিতে থাকা তাদের বিপণিতে ‘কালো সান্তা’-র উপস্থিতির কথা ঘোষণা করেছে তারা। যে ধর্ম সামাজিক বিভাজনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল একটা সময়, সেই ধর্মই এখন হাতিয়ার হয়ে উঠছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে…
 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত