Boi O Amar Pochondopur amar mitra

পাঠ প্রতিক্রিয়া: এ আমাদের পছন্দপুর । সুদেব বসু

Reading Time: 7 minutes

চমস্কির ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা আমাদের performance আর competence-এর কথা বলে। মানবমস্তিষ্কে ভাষা ব্যবহারের যে আদর্শ রূপটি থাকে তা হল performance আর যেটি সে প্রতিনিয়ত প্রকাশ করে তা হল competence। একটু গভীরে ভাবলে মনে হয়, জীবনও কি এমন নয়? প্রতিনিয়ত যা আমরা করি বা করতে বাধ্য হই তাকে performance আর যা করার স্বপ্ন আমাদের থাকে তাকে competence বললে ব্যাখ্যায় হয়তো খুব ভুল হয় না। ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যেমন থাকে দক্ষতা, শব্দের প্রাচুর্য বা অভাব তেমনই জীবনের সঙ্গেও জুড়ে থাকে একটি দুর্লঙ্ঘ্য শর্ত— প্রতিবেশ। একটা মানুষের বেড়ে ওঠার পাশাপাশি একটি পারিপার্শ্বিক পৃথিবীও ক্রমশ বড় হয়, বদলে যায়। কিংবা হয়তো উল্টো। প্রতিবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়েই এগোয় মানুষের জীবন। সেজন্যই সুসজ্জিত ফ্ল্যাটের শান্তনু রায় প্রফেসর হয়ে যায়, ভিসি বা রাজ্যপাল হওয়ার স্বপ্ন দেখে। অনিকেত হীরা পুরুলিয়ার চড়া রোদে সাইকেল নিয়ে ফিরি করে সার, কখনো বা ঝুলিয়ে নেয় সস্তা খেলনার ব্যাগ। যে রাত্রে সুজনের দাদা সুমন ইউএসএ-তে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে সেই জমে যাওয়া শীতের রাতেই সরকারি বাহিনীর নির্মম পেষণে শম্ভু হীরার রেডিমেড দোকান চুরমার হয়ে যায়। ‘ধ্রুবপুত্র’, ‘অশ্বচরিত’, ‘মোমেনশাহী উপাখ্যান’-এর লেখক অমর মিত্র যখন উপন্যাসের ক্যানভাসে পছন্দপুর যাত্রা করেন তখন হয়তো বাস্তব পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষই ব্যক্তিগত অনুসন্ধান করছে পছন্দপুরের জন্য। মহামারীতে অন্ধকার পৃথিবীতে প্রাণভরে নিশ্বাস নেওয়ার জন্য একটুকরো রোগমুক্ত ভূমি খুঁজে চলেছে সকলেই। এই উপন্যাসের চরিত্রদের যাপনে অবশ্য মহামারী সে অর্থে নেই। তারা সকলে খুঁজে চলে আর একটু সুন্দর, আর একটু নিশ্চিন্ত এক জীবন। কোথায় তার খোঁজ মিলবে সেই অনুসন্ধান দুই কাহিনিতে নির্মিত এই উপন্যাস জুড়ে। দুশো আশি পাতার জমির মধ্যে লেখক সাজিয়ে দিয়েছেন দুটি আখ্যানকে যারা পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে আছে। তাই যে চরিত্রের নাম উপন্যাসের প্রথম শব্দটির মাধ্যমে উঠে আসে সে মানুষ নয়, নয় কোনো জীব। আজকের কলকাতায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ব্যুইক, অস্টিন, সেডানদের সতীর্থ হিলম্যান। কালো রঙের পেটমোটা গাড়ি। তার ড্রাইভার অতনু দমদম রোডে হিলম্যানসহ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার পরে রেখে যায় তার বন্ধু শম্ভুকে। শম্ভু হীরা, যার চোখে অতনুর হত্যাকারী হয়ে যায় তার সুচাকুরে বাবা রবিন রায় আর ‘পফেসর’ ভাই শান্তনু। শান্তনুকে চমকানোর এক অর্থহীন নেশার আবর্তে পড়ে যায় শম্ভু। আসলে সেই চমকানো দিয়ে সে নিজেই ক্ষতিপূরণ করতে চায় নিজের জীবনের। যে জীবন ঝুপড়ির দুটো ঘরে আটকা পড়ে থাকে। যে জীবনের শরিক হয়ে লিলি ভাতের সঙ্গে বেগুনপোড়া নিয়ে আসে, তাদের ছেলে তাতুন ইংরেজি বলতে না পারায় ভাল চাকরি পায় না। সে জীবনেই শম্ভু বারবার হ্যালুসিনেট করে তার হারানো বন্ধু অতনুকে যে মরে গিয়েও তার ভেতরেই রয়ে গিয়েছে। কানে কানে সে শোনায় পছন্দপুরের কথা। “আমরা মাসে একবার করে বেরোব, অনেক জায়গা আছে, সাতপাহাড়, বেলপাহাড়ি, দুমকা, অযোধ্যা আর ইয়স ইয়েস পছন্দপুর…দার্জিলিং ভায়া পছন্দপুর”। শম্ভুর জীবনে এই পছন্দপুরের নামটুকু দিয়ে যায় অতনু। সে অবশ্য খোঁজ দেয়নি। শম্ভু হীরা তাই বারবার আসা যাওয়া করে অতীত থেকে বর্তমানে। সময়ের ঘড়ির পিছিয়ে যাওয়া আবার বর্তমানে ফিরে আসা অমর মিত্রের উপন্যাসে আগেও ঘটেছে। তাঁর নিজের জবানিতেই “সময় থেকে সময়ান্তরে যাত্রাই ঔপন্যাসিকের যাত্রা”। তাই শম্ভুর চেতনায় বারবার আসা-যাওয়া করে অতনু, রাবেয়ার কাছে যৌনতৃষ্ণা মেটানো, গাঁড়াপোতার পিসির বাড়িতে কাটানো মধুচন্দ্রিমা, গোলকিপার হয়ে খেপ খেলা বা নিজের দোকান ধ্বংসের ছবি। সময়ের মানচিত্রে এদের অবস্থান অনেক দূরে দূরে। এইসব কাছে-দূরের স্টেশন পেরিয়ে যখন সে বাস্তবের মাটিতে পা রাখে তখন তার ন্যারেশনে শান্তনু হয়ে যায় ধান্দাবাজ, অসৎ এমনকি খুনের ষড়যন্ত্রের শরিক। তার ফ্ল্যাটবাড়ি বা মারুতি সুজুকি শম্ভুর চক্ষুশূল হয়ে ওঠে। তার অবস্থান থেকে শান্তনু হয়ে যায় শত্রু। কোথাও সে ভাতে থাকে সে বা তার ছেলে একটা ভালো জীবন থেকে বঞ্চিত হয়েছে শান্তনুর জন্যই। নিশ্চিন্ত ও নিস্তরঙ্গ জীবনে শম্ভুও হয়ে ওঠে শান্তনুর চোখে এক মূর্তিমান উপদ্রব। কোনো এক অজান্তেই তার পাসওয়ার্ড ২১১২, অতনুর মৃত্যুদিনের তারিখ। তার মন আর শম্ভুর উপস্থিতি সংকেত পাঠায়— অতনুর মৃত্যুর পিছনে তারও কি রয়ে গেছে কিছু দায়ভাগ? দেবারতি ও নিজের পুত্রকে নিয়ে যে সুখের বৃত্ত সেখানেও কখনো কখনো নামে হতাশার আঁধার। যখন সুমন ইউএসএ-তে যায়। তার চেয়ে অনেক কম প্রতিভা নিয়েও কোনো এক শম্ভু হীরা ব্লু রিজ মাউন্টেনে একটি বাংলোয় বসে বেহালা বাজাতে পারে। কথা হারিয়ে তখন নিস্তব্ধ হয়ে যায় তার চলভাষ। উপন্যাসের প্রথম আখ্যানটিতে শম্ভু আর শান্তনুই প্রোটাগনিস্ট। বৃত্ত যখন ক্রমশ ছোট হয়ে আসে তখন সুজাতা, গৌতমরা ঢুকে পড়ে ন্যারেটিভে। গরীব কিন্তু আত্মসম্মানী কবি নীলাভ মজুমদার। তারা যখন আরো গভীর চেতনার কথা যখন শোনায় তখন শান্তনুর অপূর্ণতাগুলোও আস্তে আস্তে উপস্থিতি জানান দেয়। সেখানে ধনী, প্রভাবশালী অধ্যাপক হয়েও সে বোঝে, সে কোথাও হেরে যাচ্ছে তার একসময়ের বন্ধু নীলাভর কাছে। সেই নীলাভ যে কবিতার অন্তরালে প্রবেশ করে নিজেকে ক্রমশ ছেয়ে ফেলেছে অন্ধকারে। তাকে অ্যাকাডেমি চত্বরে নিজের কবিতার বই বিক্রি করতে দেখে যে তাচ্ছিল্য ছুড়ে দিত শান্তনু সেই নীলাভই স্পর্ধিত গলায় বলে “আমি নিজের কবিতা বেচে খাই। তোর দম আছে?” শান্তনুর অধীনে গবেষণা করা সুজাতা তার কাছে ধরা দেয় না, বরং নিজের প্রেমিকের সহগামী হয় যে নতুন কিছু করতে চায়, ভাবতে চায়। নেট-সেট-ডব্লুবিসিএস নয় বরং একটা আশ্চর্য কিছু, একটা পথের পাঁচালি, জলপাইহাটি, নাইন্থ সিম্ফনি তার অন্বিষ্ট। শান্তনুর তথাকথিত কেরিয়ারিস্ট ভাবনার উল্টো দিকে আর একটা প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিতে চায় গৌতমবুদ্ধ বসু, সুজাতা, নীলাভরা। প্রতিষ্ঠিত শান্তনু দেখে তার যে প্রতিষ্ঠাকে সে সুখ ভাবত তার মধ্যেও আসলে অপূর্ণতা। অথবা হতদরিদ্র নীলাভর অহংকারই তাকে ভাবতে বাধ্য করে অন্তর্গত রক্তের ভেতরে খেলা করা বোধের উপস্থিতিকে। যা দৃশ্যমান তাই কি একমাত্র বাস্তব? হয়তো সফলতার চরমে পৌঁছেও সে অনুভব করে পছন্দপুর তার কাছে অধরাই রয়ে গেছে।


 Boi O Amar Pochondopur amar mitra


এ কাহিনি স্পষ্টতার উজ্জ্বল আলোয় ভরানো নয়। বরং একধরনের অপূর্ণতা, বিমর্ষতা ছায়ার ম্তো জুড়ে থাকে আখরমালার গায়ে। চরিত্ররা থাকে, লেখক থাকেন, পাঠকের জন্যও আসন পাতা থাকে। আর থাকেন বিষণ্ণ কলকাতার একজন কথাকার। বারবার ফিরে আসে জীবনানন্দের কবিতা বা প্রবন্ধের অমোঘ উচ্চারণ। আসলে মানুষই বেঁচে থাকে, হেঁটে চলে, আর কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়। এই আখ্যান সেই দৃশ্য দিয়েই গাঁথা এক মালা তাই এটি যেখানে শেষ হয় সেখানে উপন্যাসের অনেকগুলো সূত্র একসঙ্গে এসে ধরা দেয়। সেখানে থাকে তাতুন, যাকে রানী মাহাতো প্রেমের বন্ধনে পছন্দপুরে নিয়ে যেতে চায়। শম্ভু হীরার ছেলে তাতুন যেন জেনে যায় সেখানে গেলে সে আর একটু ভালো একটা পৃথিবী পাবে, পাবে হারিয়ে যাওয়া পাখি আর গাছেদের। ন’পাহাড়িতে সারাজীবন কাটানো হেডমাস্টার সুপ্রকাশ বা কলকাতা থেকে আসা কবি গৌতমবুদ্ধ বসুরাও সেই সন্ধানেই হাঁটে। তাতুন বা অনিকেত শম্ভুর ছেলে হয়েও তার মতো হয়নি। শম্ভুর রুক্ষতা তার মধ্যে নেই। কিন্তু দু’জনের পথই খুঁজে চলে একই লক্ষ্য পছন্দপুর। শম্ভু জানত পছন্দপুর হল অতনুর অসমাপ্ত অনুসন্ধান। তাই আখ্যানের সমাপ্তিতে এসে সে খুঁজে পায় বৃষ্টিধোয়া দিন। বসন্তের শুরুতে পলাশের উৎসব। হয়তো সেখানেই পছন্দপুর। তাতুন আর রানীই হয়তো খুঁজে বের করবে সেই পথ। অমর মিত্র একরৈখিক কাহিনি লেখেন না। প্লটের সুসংবদ্ধ পথে তাঁর বিচরণ নয়। বরং একের পর এক মানুষ, যারা সকলে পরস্পরের থেকে আলাদা, তাদের দর্শনকে তুলে ধরতে চান তিনি। তাঁর লেখায় গুরুত্ব পায় সমাজের নিচের তলার গুরুত্বহীন মানুষের দল। ‘কুমারী মেঘের দেশ চাই’, ‘ধনপতির চর’, ‘দশমী দিবসে’ ইত্যাদি উপন্যাসে সেই মানুষদের কথাই ঘুরেফিরে আসে। স্টোরি টেলিংয়ের প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে ফর্ম নিয়ে নিরন্তর পরীক্ষানিরীক্ষাই তাঁর অন্বিষ্ট। তাই বর্তমান উপন্যাসের প্রথম আখ্যানটিতে উঠে আসে কলকাতা শহর তাঁর সমস্ত অনুষঙ্গ নিয়ে। চরিত্রদের মুখে এমন এক বিমর্ষতা মাখানো থাকে যা হয়তো এই শহরের মাটিতেই পাওয়া যায়। আবার এই কাহিনির সূত্র ধরে যখন দ্বিতীয় আখ্যানের শুরুতে জীমূতবাহনের ফোন পায় নিলয় তখন মনে হয় পছন্দপুরের দিক থেকে ডাক এসে পৌঁছয় শহরে। শহরকে আমন্ত্রণ করে পছন্দপুর।


 Boi O Amar Pochondopur amar mitra


তিরিশ বছর আগে ছেড়ে আসা ন’পাহাড়ি থেকে যখন নিলয় ফোন পায় তখন সে স্বাভাবিকভাবেই বিস্মিত হয়। লেখক অবশ্য আগেই জানিয়ে দেন, এই কাহিনি কল্পকাহিনি। এই কাহিনির ঘটনাগুলি কলকাতা থেকে দূর ভূগোলের বুকে ঘটে চলে। এটাই প্রকৃত পছন্দপুর না হতে পারে, আবার পছন্দপুরের সঙ্গে মিলে যেতেও পারে এর অনেক কিছু। ন’পাহাড়ি স্কুলের করণিক জীমূতবাহন বলেছিল, সে বলছে পছন্দপুর থেকে। অর্থাৎ প্রথমেই পাঠকের প্রতি বার্তা, জীমূতবাহনের অবস্থান ন’পাহাড়ি থেকে বদলে গিয়েছে পছন্দপুরে। দ্বিতীয় আখ্যানে হাত ধরাধরি করে চলে রুক্ষ বাস্তব আর মিথ। পছন্দপুরের কথায় বারবার উঠে আসে নোয়ার নৌকার কথা। যে কল্পকাহিনি বিশ্বের সব সভ্যতায়, সব ভাষার উপকথায় ছড়িয়ে আছে। যেমন আছে মহাপ্লাবন। সৃষ্টিকে কখনো না কখনো প্লাবিত হতে হয় আর তখনই প্রাণীজগতের ত্রাতা হয়ে ওঠে নোয়ার নৌকা। জীমূতবাহনের বয়ান পাঠককে সেই বিশ্ব-উপকথার সঙ্গে আঞ্চলিক মিথকে মিলিয়ে দেখায়। পছন্দপুরের পাহাড়েই এসে ঠেকেছিল নোয়ার নৌকা, পছন্দপুর আশ্রয় দিয়েছিল অসংখ্য প্রাণীকে। আজও সেই পছন্দপুর এক অনাবিল আশ্রয়ের জায়গা। জীমূতবাহন বিশ্বাস করে, সকলকে করাতে চায়— পছন্দপুরে এসেই জীবনকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এখানেই আছে প্রাণের সন্ধান। তাই নোয়ার নৌকা, আরারাত পর্বত, গিলগামেশের সঙ্গে বাংলার প্রান্তের এক কাল্পনিক জনপদকে মিলিয়ে ভাবতে তার অসুবিধে হয় না। নোয়া নামটি ‘নূহ’ বলেও উচ্চারিত হয়েছে এখানে। নোয়ার নৌকার সঙ্গে কাক, পায়রা নিয়ে গড়ে ওঠা মিথোলজি যেমন জায়গা পায় তেমনই ১৯৭৮-এর বন্যাও মিলেমিশে যায় সেই প্রাচীন মহাপ্লাবনের সঙ্গে। জীমূত ন’পাহাড়ি স্কুলের প্রাক্তন ভূগোল শিক্ষককে দূরভাষে শুনিয়ে চলে এই কাহিনি। পছন্দপুরের জীমূতের পাশাপাশি হাত ধরে চলে ন’পাহাড়ির ইতিবৃত্ত। সেখানের অতীত ও বর্তমান ঘিরে থাকে ভূসম্পদের বিত্তহরণের ইতিহাস। সেখানের মুকুটহীন রাজা কালভৈরব বা ভৈরবহাজারি, যে নিজেই নিজেকে শয়তানের আশীর্বাদধন্য দানব বলে ঘোষণা করে। সে একদিকে উন্নয়নের নামে পাহাড়ের অবস্থান পালটে দেয়, প্রকৃতিকে নিজের পদানত করতে চায়। আবার ফ্রি রোড বানিয়ে নরহত্যার আয়োজন করে, ন’পাহাড়ির অবিসংবাদিত মালিক হয়ে ওঠে। ভৈরবের যে ছবিটা ক্রমশ ফুটে ওঠে এই আখ্যানে তার সঙ্গে পাঠক সহজেই হয়তো খুঁজে নিতে পারেন আধুনিক পৃথিবীতে কর্পোরেট আগ্রাসনকে। এর সঙ্গেই জুড়ে থাকে সুভাষচন্দ্র বিশ্বাসের খুন, চন্দ্রার ধর্ষণ, ভৈরব হাজারির ভয়ে রামচন্দ্রের পরিবারের মহারাষ্ট্রে লুকিয়ে থাকা। রামচন্দ্রের জন্মভূমিতেও রয়েছে এমনই এক ত্রাস, যার ভয়ে সকলে ক্লীব হয়ে থাকে। অদ্ভুতভাবে তার বর্ণনা জীমূতের দেওয়া ভৈরবের ছবির সঙ্গে মিলে যায়। সন্ত্রাসের রূপ যে সর্বত্রই এক তা যেন এই সাদৃশ্যের মধ্য দিয়ে দেখান লেখক। বারবার আখ্যানে ফিরে আসে নাইজেল স্মিথের লেখা, সাধু জেকব ইত্যাদি প্রসঙ্গ কারণ পছন্দপুরের লোক মিথ ভালোবাসে। পছন্দপুর মানে এমনই এক জায়গা যেখানে ভালোলাগার মানুষরা থাকে, যেখানে কেউ আত্মহত্যা করতে পারে না, ভৈরবের সব চক্রান্ত যেখানে ধ্বংস হয়ে যায়। এমন এক স্বপ্নপুরীর অস্তিত্ব কী আদপে সম্ভব? ঠিক একইভাবে দূরভাষে যে জীমূতের গলা বারবার শোনা যায়, যার অস্তিত্ব প্রমাণ হয় না, সে কি আদৌ আছে? একদল মানুষ বিশ্বাস করে তিরিশ বছর আগের সেই করণিক বহু আগেই নিহত হয়েছে ভৈরববাহিনীর হাতে। তাহলে কি বাকি পৃথিবীকে পছন্দপুরের কাহিনি শোনাতে সে ফিরে আসে আবার? পছন্দপুরে এমন কিছু ঘটনার কথা উঠে আসে যেখানে জাদুবাস্তবতার কথা ভাবা অসম্ভব নয়। কিন্তু পুথিগত ধারণাকে গ্রাহ্য না করে অমর মিত্র একটি সাক্ষাৎকারে জানান “জীবনের মধ্য থেকেই জাদুর উপাদান সংগ্রহ করি”। একদিকে যদি পছন্দপুরের পাহাড়ের গুহায় থাকা সেই আশ্চর্য নৌকা থাকে তাহলে অন্যদিকে আছে শিল্পা ও তার স্বামীর মৃত্যু, যা দুর্ঘটনার আড়ালে খুন। ভৈরবের ফেসবুক পেজে ফলোয়ারের সংখ্যা দু’লাখের বেশি, একই লোক দশরকম নামে তাকে লাইক করে। এসব পড়তে পড়তে কাল্পনিক জনপদ পছন্দপুর আর আজকের ভারত মিলেমিশে এক হয়ে যায়। কাল্পনিক বলা এ কারণেই যে পছন্দপুরের অস্তিত্ব প্রমাণ হয় না। নিলয় রামচন্দ্র চেয়েছিল ন’পাহাড়িকে ভৈরবের কবলমুক্ত করবে। তা যদি নাও হয়, প্রথম আখ্যানের সুজাতার কথামতো “কবিতার প্রতি সমর্পণ, সেই স্বপ্নটা তো মিথ্যে নয়।” তাই প্রথম আখ্যানে ফিরে গিয়েই একটুকরো আশার আলো রেখে শেষ করেন লেখক। তারা হেডস্যারের খোঁজ পেলেও পছন্দপুরের হদিশ মেলে না। কিন্তু সন্ধান থামে না। প্রথম আখ্যান থেকে উঠে এসে অনিকেত, রানী হাত ধরে ড্রাইভার দিগন্তশেখরের। পলাশতলী থেকে এগিয়ে চলে পছন্দপুরের অনিঃশেষ যাত্রায়। একটি উপন্যাস বা আখ্যানপাঠের সময় পাঠককে লেখকের সহযাত্রী হতেই হয়। যদিও চূড়ান্ত বিচারের দায়ভার ন্যস্ত হয় পাঠকের হাতে। দীর্ঘ উপন্যাস একটু একটু করে অভিযাত্রা হয়ে ওঠে। কিন্তু ঔপন্যাসিক ভেদে বদলে যায় তার ধরন। তাই ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ট্রিলজি আর ‘পদ্মানদীর মাঝি’-র অভিমুখ আলাদা। ‘গোরা’ আর ‘ঢোঁড়াইচরিতমানস’-এর ভারতসন্ধানও আলাদা হয়ে যায় প্রকৃতিতে। নিটোল কাহিনি খুঁজতে গেলে পছন্দপুরের অনুসন্ধান সফল হবে না। প্রথাগত ধাঁচে প্লটের পরিণতি এখানে নেই। যেমন নেই লেখকের অন্য উপন্যাসেও। কিন্তু যা আছে তা হল চরিত্রের দর্শন। তাদের সঙ্গে ক্রমান্বয়িত আলাপে বেরিয়ে আসে কিছু কথা। সেগুলোকে একসঙ্গে জোড়া লাগালে হয়তো আলো-আঁধারির মধ্যে ধরা দিতে পারে পছন্দপুরের পাখিরা।

ও আমার পছন্দপুর অমর মিত্র দেজ পাবলিশিং মূল্য ৩৫০ টাকা

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>