আজ তোমার জন্মদিন বাবা

আজ ২৩ আগষ্ট সম্পাদক ও সাহিত্যিক বৈশম্পায়ন ঘোষালের জন্মজয়ন্তী। ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


বাবা আজ তিন বছর হল তোমার জন্মদিনে তুমি নেই। একটা একটা করে দিন রাত কেটে যাচ্ছে, যাবেও। তুমি চলে যাবার পর থেকে কত জায়গায় ঘুরছি।কত নতুন জায়গা, নতুন মানুষ..দেখছি, ঘুরছি, মিশছি, কিন্তু সবের মাঝে শুধু তোমাকেই খুঁজছি ।খালি মনে হচ্ছে এই তো আর একটু গেলেই তোমাকে পেয়ে যাব।
মনে আছে বাবা একবার ফাটাকেষ্টর কালি দেখতে তোমার সঙ্গে গেছিলাম।তুমি পুজোর ফিতে কাটছিলে।আমি কি করে ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলাম ।এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি, তোমায় খুঁজছি, পাচ্ছি না।খুব কান্না পাচ্ছিল, ভাবছিলাম আর বোধহয় তোমাকে পাব না।তখন বুবুন পিসির (তোমার মামাতো বোন)সঙ্গে দেখা ।আমাকে দমদম স্টেশনে নামিয়ে রিক্সায় তুলে দিয়েছিল পিসি। আমার তখন নিজের জন্য নয়, তোমার জন্যে চিন্তা হচ্ছিল ।তুমি কি করছ আমায় না পেয়ে!
তুমি সেদিন অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছিলে।সাথে পুলিশের গাড়ি। আমি জানলা দিয়ে দেখছিলাম তোমার করুণ মুখ, ছলছল চোখ। মা দরজা খোলা মাত্র তুমি বিষন্ন গলায় বললে, হনা…
আমি আর থাকতে পারিনি, ছুট্টে এসে তোমার কোলে উঠে পড়লাম ।তখন আমি ক্লাস টু কি থ্রি ।
তোমার সঙ্গে সবসময় আমি থাকতাম । আজিমগঞ্জ, রামপুরহাট, তারাপীঠ, কিম্বা তোমার কোনো কনফারেন্স, সেমিনার, সবেতেই আমি তোমার সঙ্গী । একবার তারাপীঠ শ্মশানে তুমি ধ্যানে বসলে, আমি পাশে বসে, চারদিকে শেয়াল, কুকুর, মৃতদেহ পোড়ার গন্ধ চারপাশে ।আমার খুব ভয় করছিল ।কিন্তু তুমি পাশ থেকে উঠতে বারন করেছিলে।আর তোমাকে ছুঁতে মানা ছিল।আমি চুপ করে বসে দেখছিলাম তোমায় ।ক্রমশ শিবের মত তোমাকে দেখতে লাগলো।তোমার মুখের ওপর যেন কেউ আলো ফেলছে।হাজার হাজার পাওয়ারের সে আলো।আমি সব ভয় ভুলে তোমার দিকে তাকিয়েছিলাম।সেই মুহূর্তে তুমিই আমার রামকৃষ্ণ, তুমিই আমার বিবেকানন্দ, তুমিই শিব, তুমিই ঈশ্বর ।
তারপর থেকে আমার আর কখনো শ্মশানে যেতে ভয় করেনি।তুমি তো জানতে বাবা সেদিন থেকেই তুমিই আমার গুরু ।
আরো একদিন।দার্জিলিং থেকে ফুন্টশিলিং যাচ্ছি ।তোমার সঙ্গে পুলিশের কনভয়।দারুন বৃষ্টি ।পাহাড়ী রাস্তায় ধ্বস নেমেছে ।তীব্র গতিতে পাথর নেমে আসছে নিচে।তুমি গাড়ি থেকে নেমে এলে।পুলিশ নেমে এল তোমার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে ভেবে।তাদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তুমি ডাক দিলে মনা… আমি তখন একছুটে গাড়ি থেকে নেমে তোমার কাছে।তুমি সেই ভয়ানক পাহাড়ের গায়ে উঠে হাত বাড়িয়ে ডাকলে, উঠে আয়.. আমি কিছু না ভেবেই উঠে পড়লাম । মুহুর্তের জন্যেও ভাবিনি একটা পাথর গড়িয়ে পড়লে আমারা থাকব না আর।
বাবা তুমি কী ঈশ্বর ছিলে!
আমার জন্মের আগেই তুমি বুঝেছিলে কোনো এক খুঁত নিয়ে জন্মাব আমি, এও জানতে আমি মেয়েই হব, নামও ঠিক করেই নিয়েছিলে।তুমি বোধহয় জানতে নদীর মতোই বহমান হব আমি, পিছু টান কেবল তোমাতেই, মাঝে মাঝে মনে হয় তোমার জটা থেকেই বুঝি নেমে এসেছি আমি, তারপর বয়ে যাচ্ছি তোমার দেখানো, তোমার গন্ডী টানা সীমান্ত ধরে।এর বাইরে আমার কোথাও যাওয়ার ছিল না, যাওয়ার নেই ।আমি কেবল মুহুর্তের দাবীদার, বাকি সব তুমি, শুধুই তুমি।
কতবার চোখ বন্ধ করে দেখতে পেয়েছি দশম ফল্সের সেই দশ জলধারা থেকে নেমে আসা উত্তাল প্রবাহর ঠিক নিচে যে পাথর তার নিচে তুমি ধ্যানে বসে, তোমার মাথা বেয়ে নেমে আসছে জলরাশি।চারদিকে বহু অজানা নরনারীর চিৎকার-জয় শিব শম্ভু.. জয় ভোলানাথ…
আমি, মা, ভাইকাকু মুগ্ধ নয়নে কথা ভুলে দেখছি তোমা়য়…
বাবা তুমি ঠিক শিবের মত বসেছিলে।চারপাশ জুড়ে কেবল চন্দন আর ধূপের গন্ধ, তুমি আমার বাবা ছিলে না তখন, আমার ঈশ্বর হয়ে গেছিলে।
তুমি যখন কোনো অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে সামনে আমায় দেখলেই হাসতে শুরু করতে, সে হাসি বন্ধের জন্য ঠোঁট দাঁত দিয়ে চেপে ধরতে, তীব্র তীক্ষ্ণ সেই চাপে রক্ত গড়িয়ে পড়ত তোমার ঠোঁট বেয়ে, লোকে ভাবত তুমি নির্ঘাত পাগল, আর আমি বুঝতাম তুমি আমাকে দেখেই হাসছ। উঠে বেরিয়ে আসতাম অডিটোরিয়াম থেকে। তখন তোমার মত বক্তা এই পৃথিবীতে কেউ হতে পারত না। আমি দূর থেকে শুনতাম আর মুখস্থ করার ব্যর্থ চেষ্টা করতাম। তখন বুঝি নি, আমি কোনোদিনই তুমি হয়ে উঠতে পারব না ।
আজও আমি কেবল তোমার দেওয়া পালক মাথায় গুঁজে কাক থেকে ময়ূর সাজার প্রচেষ্টায় ।
তুমি কোনো দিন জানতে চাওনি কোন ক্লাসে পড়ি আমরা।খুব ছোট বেলায় একটা গ্লোব কিনে দিয়ে সেটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়ে বলেছিলে পৃথিবীর মানচিত্র রোজ বদলায়, ঠিক যেমন মানুষের মন, জীবনের গতিপথ একটু একটু করে বদলে যায় ।স্থল ভাগ টা দেখিয়ে আরো বলেছিলে, এইটুকু তো আমাদের বাসভূমি, তার মধ্যে এত জাতি, এত ভাষা, সংস্কৃতি,এত বিবাদ, বারবার নিয়ন্ত্রন রেখার বদল, যুগে যুগে যুদ্ধ,কিন্তু একটা অদ্ভুত জিনিস কি বলতো! সব জাতি আজও অন্বেষণ করছে তাদের আদি পুরুষ কিম্বা নারী কে? কেই বা স্রষ্টা এই জগতের?
তোমার কথার মানে কিছু বুঝতাম, কিছু ধোঁয়াটে লাগত।কিন্তু মনের মধ্যে অন্বেষণটা শুরু হয়ে গেছিল তখন থেকেই ।
তুমি বলতে, পৃথিবীকে জানতে হলে কুয়োর ব্যঙ হলে চলবে না।মনের দিগন্ত খুলে দিতে হবে ।তবেই আলো বাতাস জল পেয়ে ওগুলো ধীরে ধীরে প্রসারিত হবে, তারপর মহীরুহ হয়ে উঠবে, তখন তোর কাছে ঠাঁই নেবে কত নতুন প্রাণ।তারপর দূরের গাছটা দেখিয়ে বলতেন, ঠিক যেমন ওই গাছটায় আশ্রয় নিয়েছে পাখির দল, কাঠবিড়ালী ।
প্রথাগত পড়া কোনদিন পড়তে বলোনি।অথচ ছোট থেকেই দেশ বিদেশের বই, ঠাঁই পেয়েছিল আমাদের পড়ার জগতে, সেই মায়াবী জগতের হাতছানি বেড়ে গেছিল মার উৎসাহে।অবশ্য মার অভিধানে পড়ার ফাঁকি শব্দটা ছিল না।
ঘুম থেকে উঠেই তুমি বলতে, আজ প্রবল বৃষ্টি, তা না হলে তীব্র রোদ, এমনকি শীতের দিনে ঝড় তুফান ও আসতে পারে, স্কুল, আরো পরে কলেজ, যাওয়ার দরকার নেই ।মা বকতেন।তোমার আস্কারায় মেয়েগুলোর কিছু হবে না। তখন মুখ ম্লান করে বলতে, সারা পৃথিবীটাই যেখানে পাঠশালা সেখানে চারটে দেওয়াল আর দশ-কুড়ি টা বই আর নতুন কি শেখাবে?? তারপর বলতে, কিরে যাবি? যা নইলে মা দুঃখ পাবেন, ভাবটা এমন যেন মার জন্যই আমাদের স্কুল কলেজে যাওয়া, নইলে এটা আর এমন কি বিষয়!
একদিন প্রবল বৃষ্টির রাতে আমার আর বোনের ঘুম ভেঙে গেল, মনে হল তুমি নির্ঘাত বৃষ্টিতে ভিজছে, জানলা বন্ধ না করে।দুই বোন একসঙ্গে ছুটে গেলাম তোমার ঘরে, বিছানা জলে ভিজে, মশারির ভিতর তুমি চুপ করে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে, সে দৃষ্টি যেন সুদূরের দিকে। মশারি খুলে বাবা বলে ডাকতেই বললেন, কোন জন্ম থেকে কোন অজানা বিশ্ব হতে এই মেঘ বালক বালিকারা নেমে এসেছে আমাদের তৃষ্ণা মেটাতে, চল আজ ওদের সাথে দিন কাটাই।
আমাদের ঘুম উড়ে গেল সেই বর্ষন মুখরিত মেঘেদের দেশে, কবিতায়, গানে আমরা সারা রাত বৃষ্টি স্নাত হয়ে ভোর দেখলাম। তুমি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললে, একটা জীবন মানে একটা নতুন সূর্য ওঠা, একটা জীবন মানে একটা নতুন ফুল ফোটা।

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত