বন্ধ দিনের গল্প 

 

নাস্তার টেবিলে কৌটো খোলার আওয়াজ। টুং টাং চিনি গোলানোর শব্দ। সুরুৎ সুরুৎ করে চা পান, সাথে দু’খানা টোস্ট। নাগরিক জীবনে ভোরের শুরুটা খটমটে শুকনো টোস্ট দিয়ে সারার অভ্যেসটা এখনো বর্তমান মাহতাবউদ্দিনের। এক সময় এ বাড়ির সবাই এক সাথে বসে খেতো; ডাইনিং টেবিলটাকে কেন্দ্র করে নিয়মিত জড়ো হতো সবাই। মাহতাব কম করে দু’বেলা সকাল-রাত ছেলেমেয়েদের চোখের মনিতে ব্রাকেট বন্দি করতেন, ডাইনিং টেবিলের সুবাদে। রুটিতে জেলি মাখাতে মাখাতে পরস্পর পরস্পরের সাথে মুখোর হয়ে উঠতো আলাপচারিতায়। সমসাময়িক রাজনীতির ঘটনা প্রবাহ নিয়ে, কার কি মত-অমত-দ্বিমত চুলচেরা বিশ্লেষণ চলতো খাওয়ার টেবিলে বসে। মতপার্থক্য বিতণ্ডায় রূপ নিতো মাঝেমধ্যেই। একটু আধটু কলহ না হলে কী চলে! যুক্তি প্রতিষ্ঠায় হৈচৈ তো আলোচনারই উপাদান। সে আলোচনায় সাহিত্য-খেলাধুলাও উঁকি দিতো। ধরুন এ দেশে গলফ খেলা ক’জন বোঝে! এর প্রয়োজনীয়তা অপ্রয়োজনীয়তা কতটুকু। অতবড় মাঠে ক’জন মিলেই বা খেলে। এরকম নানা বিতর্কের শুরু ছিল, শেষ ছিল না। প্রায় অসমাপ্ত বিতর্কে এক রকম কেটে যেত সময়। ঘরের আগের পরিবেশ মাহতাবের স্মৃতিকে ভোগায়। দু’পুরুষ আগেও মাটিতে চাদর বিছিয়ে একসাথে খেতে বসাটা ছিল এ বাড়ির রীতি। এখন ছুটির দিনের সকালে যে যার খেয়াল অনুযায়ী চলে, কেউ আবার অনেক বেলা অব্দি ঘুমায়। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা রুটিন। যে আগে উঠে সে নিজের রুমে বসেই চা পান সেরে নেয়। এক টেবিলে একসাথে বসার সংস্কৃতিটা কবে, কখন, উঠে গেছে মনে করতে পারে না মাহতাব। 
ঘরের এক কোনে গ্রামোফোন রেকর্ডার পুরনো ঐতিহ্যের শোভা বাঁড়ায়। গানটান শোনে না কেউ। এই তো সেই দিনের কথা, দাদু প্রায়ই শুনতেন- ‘জোছনা করেছে আড়ি। আসে না আমার বাড়ি। গলি দিয়ে চলে যায়- এখন গানটাই আর বাড়ি মুখো নেই, দরজা-কপাট পেরিয়ে চলে গেছে। টিভিতে নাটক সিনেমা হলে- দুঃখের দৃশ্যে বড় মেয়েটা মুখ লুকিয়ে কান্না করতো। পাছে কেউ না দেখে! এ নিয়ে আবার মুখ টিপে হাসতো সবাই। এখন নাটক দেখে এ বাড়িতে কেউ কাঁদে না। অভিব্যক্তিগুলো বদলে গেছে। হরহর করে কেউ কাঁদছে। বই পড়ে কাঁদছে। সিনেমা দেখে কাঁদছে। এমন আর সচরাচর চোখে পরে না। মানুষ খুব আমুদে আজকাল। কিছুতেই কাঁদে না। সর্বশেষ প্রশান্ত দা বলেছিলেন দেখিস একদিন মানুষ স্বাভাবিক কান্নাও ভূলে যাবে। প্রশান্তদা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে রাজনীতি করতেন। গ্লাসনস্ত, পেরেস্ত্রোইকার পর সব ছেড়ে দিলেন। দাদা আরো অনেক কথা বলেছিলেন। ল্যান্ড ফোনটা যতদিন ভালো ছিল তাঁর সাথে যোগাযোগটা ছিল জীবন্ত। ল্যান্ড ফোনটা অকেজো হওয়ার পর কথা হয় না বহুদিন। দু’বছর হয়ে গেলো ল্যান্ড ফোনটা খেলনার মতো পরে আছে। সবার হাতে হাতে ফোন। অতএব ল্যান্ড ফোনটার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। অথচ এই ফোনে এক সময় কথা হতো প্রশান্তদার সাথে। দাদার সাথে শেষ যে কথা হয়েছিল- কিছুটা মনে আছে। দাদা বলেছিলেন, দেখিস সব কিছু প্রাইভেট হয়ে যাবে যেমন, মানুষ ‘সারাজীবনের সঞ্চয় জটিল অসুখে পড়লে ক্লিনিকে দিয়ে আসবে। শিক্ষা টাকা দিয়ে কিনবে। পরিসেবা টাকা দিয়ে কিনবে। নিরাপত্তা টাকা দিয়ে কিনবে। সব কিছু প্রাইভেট হয়ে যাবে। 
প্রশান্তদার কাছে সে দিন জিজ্ঞেস করা হয় নি। হাসি-কান্না আবেগ অনুভূতি এগুলো তো প্রাইভেট এগুলো কিনবে কি করে? আজ বন্ধ দিনে বাড়িটাও যে বড্ড প্রাইভেট…।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত