| 18 জুন 2024
Categories
পাঠ প্রতিক্রিয়া সাহিত্য

উপন্যাস ত্রিধারা

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

এই সময়ের বাংলা ভ্রমণসাহিত্যে এক অতি পরিচিত ও জনপ্রিয় নাম ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় ।বহু পত্রপত্রিকাই তাঁর অনবদ্য লেখনীর গুনে মনোগ্রাহী হয়ে ওঠে পাঠকের কাছে।

এর আগে একটি উপন্যাসেও তাঁকে আমরা পেয়েছি। সেখানে পট শিল্পের প্রেক্ষিতে কলাবতীর কাহিনী শুনিয়েছিলেন তিনি।

গতবছর ধানসিঁড়ি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এই নতুন উপন্যাস ত্রিধারা, লেখিকার  সৃষ্টিশীলতার এক অপরিচিত দিক আমাদের সামনে তুলে ধরল।

আমার পছন্দের এক ইংরেজি সাহিত্যিক তাঁর গল্পের এক জাদুকরের সংলাপের মধ্যে দুঃখ করেছেন, আজকাল কল্পনাশক্তি আর আত্মবিশ্বাসের বড় অভাব চারদিকে। যার বেশ জোরালো কল্পনাশক্তি আছে , সে সহজেই একটা বিশাল ফায়ারব্রিদিং অ্যান্ড ফেরোশাস  জীবন্ত ড্রাগন ঝট করে তৈরি করে তোমার সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারবে। আমিই খাসা পারতাম । কিন্তু এখনকার জাদুকররা এমন প্যানপ্যানে আর ভীতু যে আগুনবেরোনো ড্রাগন ত দূরের কথা একটু ধোঁয়াও তৈরি করে উঠতে পারেনা।

তা ত্রিধারা উপন্যাসটি পড়ে মনে হল, এই লেখিকা কিন্তু অনায়াসেই একটি গর্জন করা ড্রাগনকে মাটিতে এনে দাঁড় করাতে পারবেন। জাদুদন্ড রেডি, জাদুকরী তাঁর সৃজনশক্তিকে ম্যাজিক তৈরি করার আদেশ দিয়েছেন।

হ্যাঁ। শব্দের রঙিন বুনন জাদুর মতই আচ্ছন্ন করে রাখে পাঠককে এই কাহিনীতে। নিয়ে যায় বাস্তব আর পরাবাস্তবের মাঝামাঝি এক আচ্ছন্ন দুনিয়ায়।

অথচ বাস্তব ছবিই আছে। নিখুঁত ডিটেলে। তিনটি প্রজন্মের নারী জীবনের টানা পোড়েন আঁকা হয়েছে এ উপন্যাসে। মেয়েদের সামাজিক পরিস্থিতি, তাদের স্বাধীন মানুষ হয়ে ওঠার লড়াই নথীবদ্ধ রয়েছে এ বইয়ের প্রতিটি পাতায়।

প্রথমেই কাহিনীর সূত্রপাত বৈষম্যের যুদ্ধক্ষেত্রে। লড়াইয়ের ময়দানে অনেকগুলি যুযুধান প্রতিপক্ষ । ফুটে উঠেছে লিঙ্গ বৈষম্যের লড়াই, বর্ণ বৈষম্যের সংগ্রাম, একটি মেয়ের মেয়েমানুষ থেকে শুধু মানুষ হয়ে ওঠার প্রাণপণ সাঁতার।

প্রতিকূলতা। কঠিন সমাজের ছবি। পাঠক পড়তে পড়তে রক্তাক্ত হবেন । প্রেমে  পড়ে যাবেন ত্রিধারার প্রথম নায়িকা যশোধরার । সেই সুকুমারবৃত্তিসম্পন্ন কিশোরীর বড় হবার রাস্তায় কত যে হার্ডল । তবু তার মধ্যে এক চিলতে আলোর ছটা ফুটে ওঠে যখন শত বাধাবিপত্তির মধ্যেও যশোধরার মা তার লেখাপড়া চালু রাখার ওপর জোর দেন । অন্দরমহলের বঞ্চনার আলপনায় এ যেন বিপ্লবের লুকোনো সিঁদুরের ফোঁটা । অবগুণ্ঠনের আড়ালে আড়ালে এ ভাবেই কি পরিবর্তনের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে রাখতে চায় নারী চিরকাল সব দেশে ?

যশোধরার বিবাহপরবর্তী জীবনের ছবিতে তীব্র রঙের টানে আঁকা তার অস্তিত্বের সংকট । আর পাঁচটা সাধারন মেয়ের মত সে একটা কথার বদলে দুটো কথা , বা আড়ালে শাশুড়িকে তিনটে গালি দিলে এ গল্প পড়া বুঝি অনেক সহজ হত পাঠকের পক্ষে । তার বদলে নতুন সংসারে খুশির হাওয়া আনতে তার আন্তরিক চেষ্টা আমাদের সজল করে তোলে । প্রবল পরাক্রমশালিনী শ্বশ্রূমাতার চাপে প্রতি মূহুর্তে এই অধ্যায়ে নিষ্পেষিত হয় ফুটে উঠতে চাওয়া একটি তরুন প্রাণের কুঁড়ি ।

এ যেন ভারি পাথরচাপা দিয়ে একটা ফুলন্ত লতাকে মেরে ফেলার সজীব উপাখ্যান। আর তার অকালমৃত্যুর বিষাদ সারা উপন্যাসেই এক ব্যাথার সুর জাগিয়ে রাখে ।

তবু , ভাল লাগার আবেশকে ফিরিয়ে এনেছেন লেখিকা ভ্রমণের হাত ধরে । ভ্রমণ কাহিনীর সুপটু লেখনশৈলী এ কাহিনীর মধ্যে দিয়ে আমাদের কত জায়গায় যে বেড়িয়ে নিয়ে এল দক্ষ গাইড হয়ে । বেনারস , ভীম বেটকা , খাজুরাহো , নর্মদা তটের রাজ্যগুলির আনাচকানাচ সব ।

একসময়ে “তপোভূমি নর্মদা” পড়ে যে রেবাতটকে জেনেছি , এক আধুনিক কলমে তাকে নিপুণ ভাবে চিত্রায়িত হতে দেখে মুগ্ধ হলাম । ঘুঘুয়া ন্যাশানাল ফসিল পার্ক এবং প্রতিটি বর্ণিত ভূখণ্ডের ভৌগোলিক বর্ণনার সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের বিবরণ এ বইয়ের মস্ত প্রাপ্তি ।

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের লেখনীর বৈশিষ্ট গবেষণাধর্মী তথ্যসমৃদ্ধ লেখা । এই উপন্যাসের পরিচ্ছদগুলির মধ্যেও সেই গুণ পাঠককে ঋদ্ধ করবে ।

তবে চমকিত হবার পালা সুরু হবে কাহিনীর মধ্যভাগে এসে ।

পাঠক মন থমকে দাঁড়িয়ে ভাবে , এত সাহস ?

জাদুকরী ইন্দিরা শুধু ফুল ফুটিয়েই ক্ষান্ত নন । তাঁর জাদুদণ্ড অগ্নিশিখা , বিদ্যুৎ, ঝঞ্ঝা  বজ্রপাতও নামিয়ে আনতে সক্ষম এই মাটির পৃথিবীতেই ।

অনায়াসে মধ্যম ধারার প্রধান চরিত্ররা জীবনযাপন সুরু করে সাহসী “থাকাথাকি” অর্থাৎ লিভিং টুগেদারের উচ্ছ্বাসে ।  বন্ধনহীন গ্রন্থিতে বাঁধা নায়ক নায়িকা কনডোম কেনা নিয়ে খুনসুটি চালায় , ডুবে যায় উদ্দাম আদরে । গান , সুর , রঙের সংগে , ঘর সাজানোর খুঁটিনাটির মধ্যেই বোনা হয়ে থাকে অনাবিল আদর করার আনন্দ । লেখিকার সাহসী অথচ রুচিশীল কলমকে কুর্নিশ জানাই ।

সে সাহস পা চালায় অন্তিম ধারায় ; কাহিনীর শেষ ভাগের সিঁড়িতেও । শরীরী ব্যঞ্জনার শিখরে ভীমবেটকার আদি রসের উৎসব তৃপ্তির শেষ বিন্দু ছোঁয় সতীচ্ছদ ছিন্ন হওয়া শীৎকারে । আদিপ্রকৃতি আদ্যাশক্তি নিজেকে মেলে ধরেন নবরসের সিংহাসনে।

সাহসের সঙ্গে জীবনের সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনাকে এঁকেছেন ইন্দিরা । এমনকি বাইসেক্সুয়ালিটীর মত স্পর্শকাতর বিষয়ের লক্ষ্মণরেখাকেও স্থির পায়ে টপকে গেছেন। শ্রদ্ধা রইল তাঁর জন্য ।

এ কাহিনীর গঠন শৈলী আর পাঁচটা উপন্যাসের চেয়ে একটু ভিন্ন ।বাস্তবের সংগে অলৌকিক যেন মিলেমিশে গেছে ভীমবেটকা গুহার প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারে ।লেখিকা প্রশ্নচিহ্ন এঁকেছেন সৃষ্টির নাভিমূলে । 

তিন প্রজন্মের তিন কন্যা যশোধরা , স্রগ্ধরা , ও শ্রীধারা সৃষ্টিশীলতা আর সমাজের সঙ্গে অবস্থানে বেশ কিছুটাই আলাদা । যশধরা ব্যথিত , সঙ্কুচিত । স্রগ্ধরা  “লিভিং টুগেদার” এর সাহসিকতায় দুঃসাহসী । শ্রীধারা রোম্যান্টিক প্রেমে আবার বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ হতে চাওয়া নারী ।

কিন্তু তিন জনেই একটি সূত্রে বাঁধা । মাতৃত্ব । এবং আশ্চর্য ভাবে তিন কন্যাই গর্ভে বীজ পেয়েছে ভীম বেটকার গুহা থেকে । কি ভাবে ?

সে রহস্য , রহস্যই রয়ে গেল ।

কিন্তু যা প্রকাশ্যে এল তা হল মাতৃশক্তির বিজয়কেতন । দূরে সরে যাওয়া ভীরু পুরুষকে অগ্রাহ্য করে শ্রীধারার “ সিংগল মাদার ” হয়ে এগিয়ে চলার সিদ্ধান্তকে স্যালুট না জানিয়ে পারি না ।

তিন মা তাদের কন্যাদের আদরের সংগে , গর্বের সংগে বড় করতে এগিয়ে এসেছেন এ গল্পে । আজকের পাঠক এ কাহিনীকে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে অভিনন্দন জানাবেন । 

এইখানে এক ফাঁকে জানাই , রবীন্দ্রনাথের কবিতার বাইরে স্রগ্ধরা শব্দটিকে আবার একবার পেয়ে ভাল লাগল। বাংলা লেখায় এ শব্দ বিশেষ পাওয়া যায়না বললেই চলে । 

সর্বোপরি তারামাসির জীবন্ত চরিত্রটি ইন্দিরার লেখনীর এক অপূর্ব সৃষ্টি যাকে পাঠক বহুকাল মনে রাখবেন ।

অভিযোগ একটিই , ভ্রমণকাহিনীতে অভ্যস্ত দক্ষ কলম মাঝেসাঝে উপন্যাসের মানবিক ঘাতপ্রতিঘাতকে ঢেকে ফেলছে । আশা করি লেখিকা পরবর্তী উপন্যাসে এই বিষয়ে সচেতন হবেন । 

সমস্ত জীবনকে নেড়ে ঘেঁটে , আর্থসামাজিক সব স্তরকে ছুঁয়েও উপন্যাসের অলংকার হিসেবে থেকে গেছে এক পরিচ্ছন্ন নান্দনিকতা , এক রুচিশীল পরিশীলন যা লেখিকার নিজস্ব অভিজ্ঞান ।

ত্রিধারা উপন্যাস পাঠককে জানায় – খাজুরাহো এক আশ্চর্য শিল্প , নিছক ইরোটিকা নয়, আর ইরোটিক আদর ও এক বিমূর্ত শিল্পের জীবন্ত রূপ ; যা শ্রীমতী ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় নামক শিল্পীর হাতে রামধনু রঙে ফুটে উঠেছে এ উপন্যাসে , অনায়াসে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত