| 26 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
পাঠ প্রতিক্রিয়া সাহিত্য

পিপাসার জিনকোড: উড়ে যাবার মোরাকাবা

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

সব মিলে ১৫টি কবিতা নিয়ে সাদাত সায়েমের কবিতার বই পিপাসার জিনকোড ইবুক হিসাবে বের করেছে ভাঁটফুল প্রকাশন। বইটি ছোট, কিন্তু অনেকগুলো তৎপরতা এর চারদিকে জড়ো হয়েছে।

ইবুক, যদ্দূর জানি কেউ কেউ বিচ্ছিন্নভাবে বের করেছেন, কিন্তু ভাঁটফুল-এর প্রস্তুতি ভিন্ন। তাঁরা বাণিজ্যিক প্রকল্পে ইবুক করার উদ্যোগ নিয়েছেন।  বেশকিছু বই ইতোমধ্যে অবমুক্ত করেছেন, আরো কিছু বইয়ের কাজ চলছে। বইগুলো দেখতে নিটোল, নির্বাচন দূরপ্রসারী। খুব নিষ্ঠা নিয়ে বইগুলোর অলঙ্করণ করেছেন হিরন্ময় চন্দ।

কিছু বই বাঙলায় লেখা, কিছু তাদের ইংরেজি; পিপাসার জিনকোড বাঙলা ও ইংরেজিতে পিঠাপিঠি। নিশ্চয়ই তাঁদের পরিকল্পনা বাঙলা কবিতার আর্তি আন্তর্জাতিক পাঠক পরিসরে পৌঁছানো। ফলে এক মলাটের ভিতর ধ্বনি ও প্রতিধ্বনি, আলো আর আলোকবর্তিকা পুরে দিয়েছেন।

সাদাত সায়েম যে কবিতাগুলো লিখেছেন তাদের শিরোনাম: রাক্ষসদেশের গল্প। সুতী নদীর তীরে ফাগুন। পথ শহর ছেড়ে যাচ্ছে। পিপাসার জিনকোড। ভরা-কটাল চোখ। কাশফুলহীন শরৎ। শরতের পদাবলী। সুন্দরবনের পাঁচালি। কানাইঘাট।  মেঘমল্লার। কৈশোর। মিথুন। সমুদ্রদর্শন। যানজট।  ছবিটা আমার বোনের। জারিন তাসনিম কবিতাগুলোর ইংরেজি তর্জমা করেছেন এই নামে:  Tales Of Rakshas Land. Falgun, On The Bank Of Suti. A Path Leaving The City. Genecode Of Thirst. Flood-Tide Eyes. Autumn Without Kashful. The Autumn Verses. Narrative Of The Sundarbans. Kanaighat. Meghmallar. Adolescence.  Copulation.  Sea Viewing. Traffic Jam. That Photo Is Of My Sister.

সায়েম দাঁড়িয়ে আছেন ভিড়ের মাঝখানে নিরলে, সম্মিলিত ত্রস্ত হাহাকারের অধীনে, এখানেই তাঁর কবিতার নবীবৃত্তি; সবার ভাঙচুর, ক্ষরণ, স্মৃতিকীর্তন তাঁকে দিয়ে বয়ান করায় আখ্যানের বন্ধন ও সাহচর্য। তিরিশি কবিদের হাত ধরে বাঙলা কবিতায় যে গড়ন আসে সেখানে তাঁরা নিঃসঙ্গ, কিন্তু সাদাত সায়েমে আছে একাকিত্ব; ফলে পিপাসার জিনকোডে দেখি মানুষ এবং মানুষে, মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্কের নানামাত্রিক দাগ ও লেনদেন। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নয়, ভরসার ব্যাকুলতাই তাঁর মূল শক্তি। সায়েমের চলন মায়া মিশানো, অভিব্যক্তি স্মৃতি জাগানিয়া।

পিপাসার জিনকোড- এর প্রথম কবিতা- রাক্ষসদেশের গল্প। কবিতার কিছু অংশ এমন: একা একা হাঁটি/ ফেলে আসা গল্পের আঁকাবাঁকা মেঠো পথে; শুনি/ হালিমার মা বলে চলেছে সন্তর্পণে/ রাক্ষসদেশের কাহিনী অফুরান।

আখ্যানের অন্তর্গত মোকাম সামষ্টিকতা; এবং যখনই একজন কবি/ কবিয়াল একটি আখ্যান বর্ণনা করেন তখনই বুঝে উঠতে পারি- কবি উঠোনভর্তি, দুনিয়া ঠাসা মানুষের সঙ্গে তা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন- তিনি আর ভারি অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে একাএকা ভেঙে ভেঙে পড়ছেন না- তিনি বিষন্ন, কিন্তু আতঙ্কিত নন। সমষ্টির সঙ্গে একীভূত হবার সুরটি একান্তই সায়েমের নিজের। সাত দশকের কবিতায় সামষ্টিকতার যে কাঠামো ছিল- সায়েম তার থেকে আলাদা, ৮ বা ৯ দশকের কবিতায় নিজের মধ্যে, নিজস্ব প্রতিবিম্বের নিকটে ফিরে আসার যে অন্তর্মুখিনতা দেখি- পিপাসার জিনকোড সেদিক থেকেও পৃথক; তাঁর পয়ার সহজিয়া, চারণ কবির চিত্ত এখানে ধুলাসংবর্তী।

পিপাসার জিনকোড নামের মধ্যেই একটি নিঃসঙ্গ যৌথতার ইশারা আছে। গ্রাম এসে মিশেছে হয় ইস্টিশনের মোড়ে, নয় শহর এসে ব্রেইক কষেছে হরিণডাঙার পৈথানে; কিন্তু তাদের মধ্যে প্রাসঙ্গিক সখ্য গড়ে ওঠেনি। এই সখ্যটুকু গড়ে না ওঠার যে ক্ষরণ, পান থেকে চুন খসে নদীর জলে আগুন জ্বলে ওঠার  মর্সিয়া-ই সাদাত সায়েমের কবিতার জায়গা ও জমিন।

বড় আশার কথা- বাঙলা কবিতার এক অবিচল মুসাফিরানায় নিষ্ঠ, স্নাত কবি সাদাত সায়েম। পথচলার মাইলফলক আমরা দেখেছিলাম চর্যাপদে কী মায়ায় খোদাই করা আছে! কাহ্নপার পদ:

যে যে আইলা তে তে গেলা।/ অবনাগমনে কাহ্ন বিমনা ভইলা / কাহ্ন কহি গোই করিম নিবাস/জো মন গোঅর সো উয়াস।

প্রাথমিক পাঠে মনে হতে পারে, সায়েম নিসর্গের নুন চেখে দেখার এক ভ্রমণ পিপাসার্ত কবি। পটাপট সমীকরণ হতে পারে এমন: তিনি বুঝি রবার্ট ফ্রস্ট যে-মেজাজে নিউ হেম্পশায়ার ঘুরে দেখেন, অথবা ওয়াল্ট উইটমেন প্যাসেজ টু ইণ্ডিয়া লেখেন- সায়েম তেমনই প্রকৃতির মাধুরি অন্বেষাকারী এক পরিব্রাজক; কিন্তু আসলে এই কবি তাঁদের থেকে মৌলে ভিন্ন: অনেকটাই হয়তো সায়েমকে জীবনানন্দবীক্ষার সঙ্গে মিলানো যায়। সেখানেও তাঁকে আবার সম্পূর্ণভাবে মিশিয়ে দেয়া যায় না; কিছু হয়তো মোটিফের বুটকি আছে, মাঝেমধ্যে তার দাগ পরিস্কার- কিন্তু সম্পূর্ণ পরিচ্ছদে ঢাকা নন। ২টি জীবনানন্দ দাশ আর  ২টি সাদাত সায়েম পাশাপাশি পড়ে দেখা যাক।

পুকুরের পানা শ্যালা- আঁশটে গায়ের ঘ্রাণে / গিয়েছে জড়ায়ে;/ – এইসব স্বাদ;/ এ সব পেয়েছি আমি- বাতাসের মতন অবাধ/ রয়েছে জীবন, নক্ষত্রের তলে শুয়ে ঘুমায়েছে মন/ একদিন/ এইসব সাধ/ জানিয়াছি একদিন-  অবাধ- অগাধ;

জীবনানন্দ দাশ- বোধ : ধূসর পাণ্ডুলিপি।

একা-একা পথ হেঁটে এদের গভীর শান্তি হৃদয়ে/ করেছি অনুভব;/ তখন অনেক রাত- তখন অনেক তারা মনুমেন্ট মিনারের মাথা/ নির্জনে ঘিরেছে এসে;

জীবনানন্দ দাশ- পথ হাঁটা : বনলতা সেন।

সাদাত সায়েম এমন:

বহুদিন পর আবার/ দেখা হলো আমার সাথে আমার/  তবুও কী ভীষণ একাকী!/ সময় পিছন ফিরে বিগ বেঙের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। / হেডেসের মৃত্যুপুরীর সবক’টি দুয়ার/ ও মাইয়ু, মা, মাগো,/ ও বাজান, বাবা, বাবাগো!

ভরা-কটাল চোখ : পিপাসার জিনকোড।

সেদিন মেঘকে দেখলাম একটা ছইতোলা নৌকায়/ শহর পাড়ি দিচ্ছে, মুখে গাঢ় জন্মবেদনার রেখা/ ছলকে উঠলো হঠাৎ আমাকে দেখে শহরের রাস্তায়/ হাত নাড়লো মৃদু, শেষ হলো ক্ষণিকের দেখা-অদেখা। শুধু বৃষ্টি নামলো ঘটা করে আমার স্বপ্নের উঠোন জুড়ে।

পিপাসার জিনকোড : পিপাসার জিনকোড।

সাদাত সায়েমের প্রকৃতি দেখাদেখি, নিসর্গের পুষ্টিগুণ পরখ করে দেখার মানসের ভিতর খুব স্বাভাবিকভাবেই আরো কিছু সমগোত্রীয়, প্রতিবেশী কবির কথা চকিতে মনে পড়ে যায়। বাঙলা ভাষার কবিদের মধ্যে হয়তো নৈকট্য নয়, হয়তো বা আভিমুখ্যের নিবিড়তার কারণেই কখনো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কী জীবনানন্দ দাশ,  চকিতে একঝিলিক মনে পড়ে আবুল হাসান, বা আবিদ আজাদের কথা।

আবুল হাসান-এর রাজা যায় রাজা আসে কাব্যের বনভূমির ছায়া কবিতাটির কিছু অংশ মেলে দেখি:

আমাদের বাস চলতে লাগলো ক্রমাগত/ হঠাৎ এক জায়গায় এসে কী ভেবে যেন/ আমি ড্রাইভারকে বোললুম- রোক্কো- শহরের কাছের শহর/ নতুন নির্মিত

একটি সাঁকোর সামনে/ দেখলুম তিরতির কোরছে জল/ আমাদের মুখ সেখানে প্রতিফলিত হলো।

অন্যদিকে সাদাত সায়েম এভাবে বলেন:

লাবনী পয়েন্ট থেকে আমরা ক্রমাগত দক্ষিণে/ হেঁটে গেলাম, তবু সূর্য নোনাজলে ডুবে গেল/ আমাদের ভীষণ  কান্না পেল।

সমুদ্রদর্শন: পিপাসার জিনকোড।

পথচারী কবির সঙ্গে যে কোন নিসর্গনিষ্ঠ কবি’র, লেখকপ্রাণের, দার্শনিকতার মিলমিশাদ, পানচিনি হয় মোটামুটি ৪রকমভাবে:

প্রকৃতির প্রাঙ্গণে, নিসর্গের প্রাণে মানুষের আসা-যাওয়া, স্মৃতি- বিস্মৃতি ঘুরেঘুরে আসে, কিন্তু মানুষই শেষপর্যন্ত থেকে যায় প্রাধান্যে, নির্ধারকের আসনে। এক্ষেত্রে রবার্ট ফ্রস্টের মূল কবিতা Stopping by woods on a snowy evening, এবং শামসুর রাহমানের অনন্য অনুবাদে তার বাঙলা:

The woods are lovely, dark and deep,

But I have promises to keep

And miles to go before I sleep

And Miles to go before I sleep.

কাজল গভীর এ-বন মধুর লাগে,

কিন্তু আমার ঢের কাজ বাকী আছে

যেতে হবে দূর ঘুমিয়ে পড়ার আগে,

যেতে হবে দূর ঘুমিয়ে পড়ার আগে।

আরেক ধরনের প্রকৃতিনিষ্ঠা, নিসর্গ অবগাহন আছে যেখানে প্রকৃতি প্রাধান্যে, প্রকৃতি গ্রাহক; কবি বা দার্শনিক গৃহীত। এ-বেলায় মেরি ওলিভারের কথা পাড়া যায়, মিলিয়ে দেখা যায় সুইডিশ কবি ঈডিথ সোডারগ্রেন-এর মূল সুইডিশ থেকে এভারিল কারডির ইংরেজি তর্জমা Now it is fall -এর রওশন হাসানকৃত বাঙলা ভাষান্তর- এখন ঋতুবদলের দিন।

My head on my arm I fall asleep easily,

On my eyes a mother’s breath,

from her mouth to my heart:

Sleep child, and dream now the sun is gone.

মা বলছেন, ঘুমাও,আমার আত্মজা

এবং স্বপ্নের মাঝে প্রবেশ করো

এখন সূর্য ডুবে গিয়েছে।

দার্শনিক অধ্যাপক আর্নি ন্যাস-এর ডিপ ইকোলজি শব্দবন্ধ কয়েন করার কল্যাণে প্রকৃতির সকল প্রাণী অপ্রাণী সমান হিস্যার অধিকারে গৃহীত হয়। সাহিত্যে তারও একটি শাখা চিহ্নিত হয়ে ওঠে। জাফরান জাকিরকৃত লি পি’র চিং-টিং পর্বতের উপর জাজেন কবিতাটি এরকম:

The birds have vanished down the sky. Now the last cloud drains away. We sit together, the mountain and me, until only the mountains remain.

আকাশের বিস্তারে পাখিরা মিশে গেল। শেষ তবক মেঘও ঝরে নাই হয়ে যায়। আমরা- আমি আর পর্বত একে-অন্যে মিশে বসে আছি- গিরিমালা যতোক্ষণ আপনি জাহির।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে ব্যক্তির উন্মেষের ধ্যানে প্রকৃতির বিপুল পাঠে এক তৃতীয় নয়নের ঘনঘোর চাহনি দেখি:

দাঁড়াও মন অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড মাঝে / আনন্দ সভা ভবনে দাঁড়াও / বিপুল মহিমায় গগনে মহাসনে / বিরাজ করে বিশ্বরাজ / দাঁড়াও মন অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড মাঝে।

কবিতার মহান যজ্ঞে সাদাত সায়েম এখনো তাঁর অবস্থান ষোলআনা পাকা করেননি; উঠোনজুড়ে নামে তুমুল বৃষ্টির অঝোর ধারাপাত- তিনি হয়তো আকুল স্তব্ধতায় সেখানে নেয়ে ওঠেন, আবার বুঝি মাথাকোটা গাঙের ঢেউ তারই বিবাগী ঘরে এসে বিছিয়ে পড়ে। চন্দ্রপাওয়া মেঘের তলে লুটিয়ে পড়ে একটি দুঃখী লোকগীতির সুর!

রাজনৈতিক ঘেরাটোপে, সামাজিক শক্তির বিন্যাসে সাদাত সায়েমের অনির্দিষ্টতা-ই আপাতত সায়েমের গন্তব্য- তিনি উড়ে যান অন্তর্মুখী মোরাকাবায়, ঠোঁটে জীবনের তৃষ্ণা অন্ধকারের নূরে জ্বলেজ্বলে থাকে কনফারেন্স অব দি বার্ডের পাখিদের যেমন।

আমার বিবেচনায় এই বইয়ের কেন্দ্রীয় কবিতা: পথ শহর ছেড়ে যাচ্ছে। এই কবিতায় লেগে আছে কবির মনোলোকের ক্ষরণাভা ও টিপসই:

একটা পথ শহর থেকে বেরিয়ে সোজা/ হেঁটে যাচ্ছে মাথা নিচু করে; বুকে তার লেগে আছে ছেঁড়া খাম।

সায়েম কবিতার আলো-আঁধারির পুলসিরাতে ভারসাম্যের পরীক্ষা দিচ্ছেন, কিন্তু অগ্নিপরীক্ষা মোকাবেলা করেছেন অনুবাদক জেরিন তাসনিম।

মূল কবিতা ও তার ইংরেজি ভাষান্তর পিঠাপিঠি জুড়ে দেবার কারণে কিছু সুবিধা হয়েছে, আবার একই সঙ্গে  খটকাও খানিকটা লেগেছে বৈকি। অনুবাদের কাজটি অনেকটা প্রেম পর্যায়ের গান- যে দূরে থাকে কিন্তু প্রাণে থাকে নৈকট্যের ফানাফিল্লাহ; এখানে মূল বাঙলা কবিতার পাশাপাশি ইংরেজি রূপ নির্দিষ্ট করে দেবার ফলে অনেকটা প্রেমের বদলে বৈবাহিক সম্পর্কের বৃত্তাবদ্ধতা জারি থেকেছে। বাঙলা কবিতাটি পড়ার পর একজন পাঠকের মনে যে সংবেদের বাঙময়তা গড়ে ওঠে- কবিতার ইংরেজি অনুবাদকের সেক্ষেত্রে দায়িত্ব হয়ে পড়ে সেই অনুরণনটি হুবহু মোতায়েন করা- যা আসলে সম্ভব নয়। ভাষান্তরিত কবিতাটি মৌলিক কবিতার অনুবাদ হলেও তা সেই কবিতার রিপ্রিন্ট নয়- অন্য আরেকটি কবিতা। তারপরও আশার কথা এই- জেরিন তাসনিম দিব্যি নাছোড়বান্দা- চেষ্টার কসুর করেননি। অধীনতার সামগ্রিক চাপের মধ্যে থেকেও তিনি মাঝেমাঝেই সফলতার ঝিলিক দেখিয়েছেন। একটি কবিতা পাশাপাশি রেখে পাঠ করলেই তার সত্যতা মিলবে।

সমুদ্রদর্শন

জলধির একটা চিরকুটই যথেষ্ট ছিল/অথচ আকাশে উঠল মোহন চাঁদ/সাগর আছড়ে আছড়ে পড়ল চন্দ্রালোকে/সারারাত, নারকেল পাতা বুকে পিঠে মাখল

লাবনী পয়েন্ট থেকে আমরা ক্রমাগত দক্ষিণে/হেঁটে গেলাম, তবু সূর্য নোনাজলে ডুবে গেল/আমাদের ভীষণ কান্না পেল। শুধু নিঃসঙ্গ এক/জেলে জাল ফেলে সূর্যটাকে ধরতে চাইল

জোয়ারের জলে ভেসে আসল জীবনের কলধ্বনি/সমবেত আমরা নীলজলে ঝাপ দিলাম/জলতলে কান রেখে শুনলাম/দূরাগত কান্নার ধ্বনি/ ভাটার টানে আমাদের দুঃখকে ভেসে যেতে দিলাম।

Sea viewing

A small note from the sea was enough/ Yet a fascinating moon rose above the skies/ The sea waves broke on the shore in the moonlight/ The coconut leaves rubbed on its chest and/ back throughout the night/ Misty wind coming from afar.

We kept walking southwards from the Laboni Point/ Yet into the salty waters the sun did set,/ Bringing tears to our eyes. Just a solitary fisherman/ Tried to catch the sun with his net./

With the flow-tide came life’s music / Together we jumped into the blue water/ Our ears pressed against the current of underwater/ We listened to the distant sound of tears/ We watched the ebb taking away our sorrows.

বাঙলা একটি লোকগান আছে এমন-

কাষ্ঠে লোহায় পীরিত করে নৌকারে সাজাইয়া পরে

দুইয়ে মিলে যুক্তি করে শুকনাতে রবে না।

বাঙলা এবং ইংরেজিতে অনূদিত কবিতাগুলোর মধ্যে এমন একটি যুক্তি গড়ে ওঠার যে প্রত্যাশা জন্মায়- তা কখনো কখনো কার্যকর হয়েছে, মাঝেমধ্যে হয়নি। মূল সমুদ্রদর্শন কবিতাটির ভাষাবিন্যাস, চিত্রকল্পের ব্যবহারে যে কিছুটা অবিন্যস্ততা আছে ইংরেজি কবিতাটি তা অনেকখানিই পুষিয়ে দেয়।

আবার কখনো কখনো বাঙলা-ইংরেজি দু’টো কবিতা-ই বেশ ফুলেশস্যে ফলবতী হয়ে উঠেছে। নিচের কবিতাটি পড়ে দেখি।

কানাইঘাট

১.

এখানে স্তব্ধ-দিঘির তল থেকে/ উঠে আসে ঘুঘুর ডাক

— কানাইঘাট/ হৃদয়জুড়ে আনন্দের ফল্গুধারা

দু’চোখে তবু তার জল অবিরল

২.

গাড়িতে বসে আছি নিঃস্তব্ধ/ ধুকপুক ধুকপুক

— মোটরের হৃৎপিণ্ড/ দিগন্ত থেকে ভোরের সূর্য উঠে এসে/ আমার পাশে চুপ করে বসে

৩.

অন্ধকারে পাশাপাশি হাঁটি/ তার কাঁধে রাখি হাত

— মৃত্যুর/ সে তো আমার সহোদর/ তবু মাগি আরো একটা ভোর

Kanaighat

1.

Here, from the bottom of a quiet lake/ The cooing of the dove comes out/ —Kanaighat/

There’s a current of joy in its heart/ Yet there are constant tears in its eyes.

2.

I am sitting in silence in a car/ Vroom vroom/

– Heartbeat of the motor/ On the horizon comes up the dawn’s Sun/ And sits silently next to me.

3.

Side by side I walk/ On its shoulder a hand I keep/ – Death.

It’s my kin.

Yet I solicit another dawn.

জেরিন তাসনিম-এর মেধা, শ্রম আর নিষ্ঠা আরো শস্যবান হতে পারতো- তিনি যদি আরেকটু স্বাধীনতা নিতেন, ঝুঁকি নেবার ক্ষেত্রে আরো খানিকটা ডেসপারেট হতেন। পিপাসার জিনকোড নামটি একদম অক্ষরে-অক্ষরে Thirst Of Genecode করলে এটিকে আর কবিতার বই মনে হয় না- প্রাণিবিজ্ঞানের কোন একটি বিদ্যায়তনিক বই বলেই অনুমান জন্মায়। জটাচুলের ইংরেজি Tangled hair থেকে বাঙলা ভাষাভাষী পাঠক প্রচুর উদ্যমী হয়ে হয়তো বুঝেও ফেলতে পারেন, কিন্তু ইংরেজি ভাষাভাষীর কাছে টেঙ্গলড হেয়ার জটাচুল নয়; চুলে যখন প্যাঁচ লেগে থাকে, আর চিরুনি চালাতে বেশ বেগ পেতে হয়- সেটি টেঙ্গলড হেয়ার; জটাচুলকে বলে Dreadlocks.

মাত্র ১৫টি কবিতার শীর্ণকায় পিপাসার জিনকোডে প্রায় একটি নিস্তরঙ্গতা গড়ে উঠতে যাচ্ছিলো, এক মনোরম মনোটোনাস ক্লান্তি বুঝি বেড় দিয়ে আসছিলো, কিন্তু কবি সাদাত সায়েম জীবনের নানা রং ও পরতের ভিতর দিয়ে যাবার উন্মুখরতা জানেন, তাই তিনি একরৈখিকতা ভাঙতে আপনাআপনিই এগিয়ে আসেন:

মেঘমল্লার কবিতাটি মেঘমল্লার রাগের অনুকূলে  চিরচেনা পথে একরৈখিকভাবে বিন্যস্ত হয়ে উঠতে পারতো! কিন্তু কবি এখানে মেঘমল্লারকে তার অন্তর্লোকের নৈঃশব্দ্যে বর্ণনা করে গড়ে তুলেছেন বুঝি বসন্ত বাহার। মৃতদেহের শিথান ঘেঁষে একটি শিশু ঝলমলিয়ে হেসে উঠলে ঘনীভূত হয়ে ওঠে আরো বেদনার অসহায় লাল তরমুজের ফালি।

এবেলায় মেঘমল্লার থেকে কয়েকটি লাইন পড়ে দেখি:

একটি মেয়ে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিল/ কিছু হারানো সুর মেঘমেদুর/ আমাদের উঠোন জুড়ে নূপুরধ্বনি উঠল।

পিপাসার জিনকোডজুড়ে তার সমূহ লক্ষ্মণ আছে- নিষ্ঠার কাছে, নক্ষত্র রঙিন রঙে ও ধুলার মলিনতায়, জীবন সুন্দর পতনে  আর পল্লবে- সাদাত সায়েম তা জানেন।।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত