বর্ষাকে খুব দুঃখী বলে মনে হয়

Reading Time: 4 minutes

‘বন্ধুরা জানলা থেকে হাততালি দিয়ে প্রবল উৎসাহ দিত। বলত, এই দিকে বেশি বৃষ্টি… ওই দিকে বেশি বৃষ্টি। আর আমি সারা মাঠ ছুটে বেশি বৃষ্টি খুঁজে বেড়াতাম।’ ছেলেবেলার দিকে মন ফেরালেন অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়।


arpita-header
অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়
অঙ্কন: দেবাশীষ দেব।
বর্ষা এল। বর্ষা বড় খেয়ালি। কথার খেলাপ করে। তবুও বর্ষার ওপর বেশি ক্ষণ রাগ করা যায় না। রোদের ঝাঁঝে নাজেহাল যখন, ঠান্ডা বাতাস নিয়ে বর্ষা কাছে এসে দাঁড়ালেই ভুলে যাই তার খেয়ালিপনার অপরাধ। যে বর্ষা ভয়ঙ্কর হয়ে তালগোল পাকিয়ে দেয় জীবনের সহজ ছন্দ, তাকে ভাল লাগে না। তার কারণ, দারুণ ঝড়ে গাছপালা ভাঙে, পাখির বাসা ভাঙে। ফুটপাথে পলিথিনের ছাদগুলো অসহায়। মেঘের ঘনঘটায় আলো কমে গিয়ে ভণ্ডুল হয় আমার শ্যুটিং। অভিনেত্রী হিসেবে শ্যুটিং-এর ডেট পিছোলে কী মুশকিলে যে পড়ি! আমার পূর্ব নির্ধারিত সিডিউলে যেন বর্ষা ঢুকে যাচ্ছে। অসুবিধে শুধু অভিনেত্রী হিসেবে নয়। আমি যখন প্রডিউসার, শ্যুটিং পিছোলে আমার মাথায় যেন বাজ পড়ে। গোটা ইউনিট বসে ঝিমোয়। ঘণ্টা নষ্ট। বেলা নষ্ট। দিন নষ্ট। অর্থক্ষতির চূড়ান্ত। টেনশন বাড়ে। আর্টিস্টের ডেট পাওয়া যায় না। আরও অনেক কিছু সমস্যা থাকে। তবে কোনও জিনিসই শুধু ভাল হয় না। ভাল-মন্দ দুটো নিয়েই সে সম্পূর্ণ। তোমার আর দোষ কি বর্ষা! তুমিও তো সম্পূর্ণ হতে চাইবে! আমার ভাল লাগে বর্ষার সদ্য স্নান করে ওঠা স্নিগ্ধ পবিত্র রূপ। পিঠে খোলা চুল থেকে টপটপ জল ঝরছে। দু’খানি ভিজে আলতা-ধোয়া পা। সেই বর্ষাকে প্রণাম করতে ইচ্ছে করে।
বর্ষাকালে সময় পেলেই জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। জানলা খুলতেই গুড়িগুড়ি জলের ছাট মুখের ওপর। হাত বাড়িয়ে জল ধরি। যেন জল কোনও দিন ছুঁইনি। জলের ধারায় উল্টো দিকের বাড়িগুলো ঝাপসা লাগে। জানলার সার্সি বেয়ে, দেওয়াল বেয়ে, আলসে বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে বৃষ্টির জল। একটা ভো-কাট্টা ঘুড়ি তখনও টেলিফোনের তারে ঝুলছে। রাস্তার লাইটপোস্টের আলো বৃষ্টিধারায় ঝাপসা। গাড়ির হেডলাইটে মাঝে মাঝে ঝলসে উঠছে বৃষ্টির ভিজে শরীর। বৃষ্টিকে আমার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী বলে মনে হয়। রাতের বৃষ্টি আমার বেশি ভাল লাগে। কিন্তু রাতে না ঘুমিয়ে বেশি ক্ষণ জানলায় দাঁড়ানো যায় না। পরের দিন রুটিনমাফিক কাজ আছে। তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতে হবে!
আবার কখনও বর্ষার দিকে তাকিয়ে তাকে খুব দুঃখী বলে মনে হয়। আর মানুষকে নিষ্ঠুর লাগে। বর্ষার বুকের তলায় একটা ব্যথা সবসময় উঁচিয়ে থাকে কাঁদাবার জন্য। বর্ষা কাঁদে। আমরা বর্ষার রূপে মুগ্ধ হই। প্রেমে ভেসে যাই, কবিতা লিখি, গান করি, খিচুড়ি রাঁধি, ঝিমঝিম শব্দ নিয়ে ঘুমোতে যাই। মনে কেবল প্রশ্ন জাগে— বর্ষা নিজের জন্য কাঁদে, না অন্যের দুঃখে ব্যাকুল? উত্তর মেলে না। বলতে যখন বসেছি, বলি— এই খেয়ালি বর্ষা, দুঃখী বর্ষা, সুন্দরী বর্ষা আমার সবচেয়ে প্রিয় ঋতু। মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। সেই সময়ে বর্ষার আকাশে যত মেঘ জমত, আমার বুকের ভিতর তত গুড়গুড় করে জমে উঠত আনন্দ। নাচ, গান, সাঁতার, আবৃত্তি, টিউশন, স্কুল— গুচ্ছের রুটিনে ঠাসা ছিল আমার শৈশব। একমাত্র জোরে বৃষ্টি পড়লে ছুটি মিলত সেই সব একঘেয়েমি থেকে। সেই থেকে বর্ষাকে আমার ভালবাসা শুরু। মনে পড়ে, বৃষ্টির পর রাস্তায় কোথাও কোথাও জল জমে আছে। মায়ের হাত ধরে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বেছে বেছে সেই জমা জলেই ঝপাং করে পা ফেলতাম। সে যে কি পরম সুখ! বুক পর্যন্ত লাফিয়ে উঠত কাদাজল। জলের কণা ছিটকে যেত মুখে-চোখে। মা বকত। আমি দৌড়ে যেতাম আর একটা কাদাজলের দিকে। তখনও বুঝিনি, মানুষের পায়ের গোড়ায় এত কাদা মজুত থাকে, সারা জীবন ধরে শুধু টপকে যেতে হয়।
ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিলাম আমি। সেই সব দুষ্টুমির কথা লিখলে মোটা গল্পের বই হয়ে যাবে। বর্ষাকালে বৃষ্টি পড়ছে। আমি স্কুলে আছি। টিফিন টাইমে চুপিচুপি ছাতা না নিয়ে চলে যেতাম স্কুলের মাঠে। ক্লাসঘর থেকে মাঠটা দেখা যেত। বন্ধুরা জানলা থেকে হাততালি দিয়ে প্রবল উৎসাহ দিত। বলত— এই দিকে বেশি বৃষ্টি… ওই দিকে বেশি বৃষ্টি। আর আমি সারা মাঠ ছুটে বেশি বৃষ্টি খুঁজে বেড়াতাম। বেশির জন্য এই ছোট ছোট ছোটা, এক দিন জীবন জুড়ে ছোটা হয়ে দাঁড়ায়। ইতিমধ্যে দু’-এক জন পাজি বন্ধু দিদিমণিকে আমার নামে নালিশ জানিয়ে দিয়েছে। ব্যস, পেল্লায় ছাতা নিয়ে স্কুলের দারোয়ান মাঠে হাজির। হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে যেত দিদিমণির কাছে। উফ্, হাত দুটো কী শক্ত! খুব ব্যথা লাগত আমার। তাও কাঁদিনি। তখন থেকেই জেনে গিয়েছিলাম, কান্না মানে লজ্জা, হেরে যাওয়া। এখন বলি— কান্না বড় ব্যক্তিগত। কেবল দিদিমণির বকুনি জুটত আমার কপালে তা নয়, তার সঙ্গে জলদি একটা ছুটি পাওয়া যেত। ভিজে চুপচুপে জামা পরে দারোয়ানের হাত ধরে বাড়ি ফিরে আসতাম। পুরো বর্ষাকাল আমার গলা খারাপ। ডাক্তারের কাছে মায়ের ছোটাছুটি বাড়ত। গানের ক্লাস বন্ধ। আবৃত্তি শিকেয় উঠেছে। রেডিওতে রেকর্ডিং-এর ডেট পিছোতে হল। আর আমার তখন মনে মনে দারুণ গর্ববোধ হচ্ছে। বাবা-মাকে নাজেহাল করার জন্য নয়, কী চট করে একটা মুক্তি পেয়ে গেলাম! বেশ অনেক ক্ষণ পুতুলের সংসার গোছাতে পারব…ছোঁব না, দূর থেকে বৃষ্টি দেখব। তার সঙ্গে খিচুড়ি, ওমলেট, ঘি! বৃষ্টি থামলে কিছু ক্ষণ দিদার বাড়ি…বাজ পড়ার শব্দে ঘনঘন মাকে জড়িয়ে ধরা। উফ্, এর থেকে আনন্দ আর হয়! এখনও বর্ষার দিনে খিচুড়ি, ওমলেট, ঘি আমার প্রিয় মেনু। আমার ছেলে, ছেলের বাবা সবাই এই মেনু খুব পছন্দ করে। বর্ষায় কয়েকটা দিন ও সব ডায়েট-ফায়েট আর মানি না। সব শেষে বৃষ্টির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বলি— বড়বেলা খুব সহজে ভুলে যায় ছোটবেলার কথা, আমার ছেলেও বৃষ্টিতে ভিজতে চায়। আমি কিন্তু তাকে সমর্থন করি না। আমার মতো দুষ্টু নয় আমার ছেলে। ও খুব বাধ্য। তাই বৃষ্টিতে ভেজা আর ওর হয় না! তবু এই ভরা বাদলে বলতে ইচ্ছে করে, ভাল থেকো সকলে…ভাল থেকো বর্ষা…ভাল থেকো বর্ষা-ভেজা দিন…বর্ষা না-ভেজা দিন ভাল থেকো…

কৃতজ্ঞতা: এবিপি

           

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত