Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,brahmaputra-barak-er-golpo-malaykanti dey

ব্রহ্মপুত্র ও বরাকের গল্প: টান্টুপীরের মাগুর মাছ । মলয়কান্তি দে

Reading Time: 16 minutes

মায়ের কোলে বসে দেশ ছাড়ার কথা আমার কিছুই মনে নেই। ছোটবেলার কথা ভাবলে আমার কেবল  একটা জলকাদাময় উঠানের কথা মনে পড়ে। উঠানের তিনদিকে তিনটে প্রায় এক  মাপের ঘর। সব ঘরেই  মাটির মেঝে, বাঁশের বেড়া আর শণের চাল। সব ঘরেরই একপাশে লটকে আছে একটা একচালা রান্নাঘর। এরই একটাতে আমরা থাকি। মাঝে মাঝে দেখি আমি ওই কাদামাখা উঠানে ঘুরঘুর করছি, তারপর কেউ এসে আমাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। হাত পা  ধুইয়ে দিল। সেটা নিশ্চয়ই আমার ছোড়দি। কখনও দেখি মা উঠানে হাঁটছেন, মা’র পায়ে বেগনি রঙের আলতা। আলতা কি বেগনি রঙের হয়? আসলে সারাদিন জলকাদা ছেনে মা’র পায়ে, আঙুলের ফাঁকে হাজা হত। রাতে শোবার সময় বেগুনি রঙের ওষুধ লাগাতেন। সকালে আমি দেখতাম মা’র পায়ে বেগুনি আলতা। বাইরে কোথাও যেতে হলে মা ব্লাউজ পরতেন। অন্য সময় সেমিজ। ছোড়দি বলত, তুমি সেমিজ পর কেন? আগে তো ঘরেও ব্লাউজ পরতে। সেমিজ পরলে কেমন যেন দেখায়। মা কোনও উত্তর দিতেন না। আমি অবশ্য এ সব বুঝি না। মাকে যেমন দেখছি, মা তো তেমনই। আমার দেখা মা’র চোখের কোলে কালি জমে আছে, মুখে হাসি নেই। তাতে আমার কিছু যায়  আসে না। আমি জানি ওই মা’র কোলে আছে সমস্ত সুখ। কেবল একবার মুখ গুঁজে দিলেই হল। ব্লাউজ না সেমিজ তা দিয়ে আমার কী?  

মা’র গল্পে একজন বাবাকে পেতাম। একজন দীর্ঘদেহী, রাশভারী আর গম্ভীর মেজাজের বাবা। সবাই সেই বাবার মেজাজ বুঝে চলে। সেই বাবা কারও পরামর্শ নেন না, নিজের বুদ্ধিতে চলেন। গল্পের বাবার সঙ্গে কিন্তু আমার চোখে দেখা বাবার মিল নেই। আমার চোখে দেখা বাবা বাড়িওলার সাথে কথা বলার সময় কুঁজো হয়ে দাঁড়ান। মুখটা কেমন কাচুমাচু। মুখে একটা তোবড়ানো হাসি ফোটাবার চেষ্টা থাকে। অন্য সময় এই বাবার মুখে হাসি থাকে না। আমি কখনও কাছে গেলে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। আমি তাতেই ধন্য। বুঝতে পারি এটাই আমার বাবা। মা’র গল্পের বাবাটি অন্য কেউ হবে। মা’র মুখেই শুনেছি, বাবার ছিল গাড়ির ব্যবসা। যুদ্ধের সময় গাড়িগুলো সরকার রিকুইজিশন করেছিল, যুদ্ধ শেষ হবার পর সবগুলো গাড়ি ফেরত পান নি। টাকা পয়সাও পাননি। তখন থেকেই নাকি ব্যবসার হাল খারাপ। দেশভাগ নিয়ে সারা দেশ যখন উথাল পাতাল, আমার সেই গল্পের বাবার নাকি কোনও হেলদোল নেই। কখনও বলেন এই দেশভাগ টিঁকবে না। কখনও বলেন দেশ ভাগে আমাদের তো কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। খামোখা দেশ ছাড়ব কেন? আবার কখনও বলেন দেশ ছাড়তেই হবে মনে হচ্ছে। তারপরই আবার বলেন দেশ ছেড়ে যাব কোথায়? দেশে তবু কিছু একটা হলে পাঁচজনের কাছে গিয়ে বলতে পারব। দেশ ছাড়লে কে চিনবে আমাকে? শেষ পর্যন্ত যখন দেশ ছাড়লেন, তখন আমার বড়দির বিয়ে হয়ে গেছে, ছোড়দির বয়স আট আর আমি কোলের  শিশু। সাতচল্লিশের দেশভাগ তখন পঞ্চান্নয় পড়ে গেছে। বুঝতে পারি, আমার বাবা সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না।  হয়তো কিছুটা একরোখাও ছিলেন। গম্ভীর মেজাজের আড়ালে নিজের দোটানা লুকিয়ে রাখতেন।   

মা বলেন, সে কেমন দেশ ছাড়া বুঝে দেখ। বড় মেয়ে রইল পাকিস্তানে। আমার মা থাকলেন পাকিস্তানে। তোর কাকা থাকল পাকিস্তানে। তোর দুই পিসি পাকিস্তানে। আত্মীয়-স্বজনের অনেকেই পাকিস্তানে। এ দেশে থাকার মধ্যে আছে কেবল তোর বড়পিসি। তার বিয়ে হয়েছিল করিমগঞ্জে। আর আছে কয়েক ঘর দেশের মানুষ। এরা আমাদের আগেই চলে এসেছেন। মনে হচ্ছিল আমার আধখানা শরীর ওদেশে রেখে  বাকি আধখানা নিয়ে এদেশে চলে এসেছি। তারপর থেকে তো এই আধখানা হয়ে বেঁচে থাকা।  

এই ঘরে আমার ঠাকুমাও আছেন। উনি সারা দিন বিছানায় থাকেন। আমি কখনও উঁকি দিলে কেমন রাগ রাগ চোখে তাকান। আমি তার কাছে যাই না। মা আর ছোড়দিকে নিয়েই আমি ভালো আছি। একদিন সন্ধ্যার পর বিছানায় বসে বসে খেলছিলাম। কেমন একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে আসছিল। আমি বললাম, কী সুন্দর গন্ধ। মার মুখে হাসি ফুটলো। এ ভাবে মাকে হাসতে দেখি না কখনও। মা বললেন, এটা দেশের গন্ধ। রাতে বাড়ি ফিরে বাবা বললেন, তোমার গন্ধরাজ গাছে ফুল ফুটেছে মনে হচ্ছে। মা আবার হাসলেন। বাবারও মুখখানা খুব নরম দেখাল। দু’জনের মুখে কীসের যেন আলো পড়েছে। আমার খুব ভালো লাগছিল। ছোড়দির মুখে শুনেছি, দেশ ছাড়ার সময় মা নাকি আমাদের উঠানের গন্ধরাজের ঝাড় থেকে একটা ডাল কেটে সঙ্গে নিয়েছিলেন, যেখানেই যাবেন, গন্ধরাজের ডালটা পুঁতে দেবেন। ফুল ফুটলে দেশের গন্ধ পাবেন। পরদিন সকালে অন্য ভাড়াটেরা আমাদের গন্ধরাজের খুব তারিফ করল। তার এক বছরের মধ্যে আমার ভাইয়ের জন্ম। 

মাঝে মাঝে বিকেলে বাবা আমাকে নিয়ে বেরোতেন। রাস্তায় গিয়ে আমরা একটা কালো মোটরগাড়িতে উঠতাম। আরও দু’একজন থাকত। কোথায় যেতাম জানি না। একটা কোথাও নামতাম। বাবা আর অন্যরা চা খেতে খেতে গল্প করতেন। আমি দেখতাম সামনে শুধু জল আর জল, এত জল কোথা থেকে যে আসছে  আর কোথায় যে যাচ্ছে। বাবা বললেন এটা কুশিয়ারা নদী। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। মাকে এসে বলতাম সব। মা বলেছেন এটা আমাদেরই গাড়ি। বাবার গাড়ির ব্যবসার পুঁজি শেষ পর্যন্ত এই একটা কালো  মোটরগাড়িতে এসে ঠেকেছিল। 

ওই ঘরে আমরা ঠিক কতদিন ছিলাম জানিনা। একদিন দেখলাম আমাদের ঘরের জিনিসপত্র বাঁধা হচ্ছে। মা বললেন, আমরা বাসা পাল্টাব। বাসা পাল্টালে কী হয় জানি না, তবু আমার বেশ আনন্দ হল। বাঁধা-ছাঁদা শেষ  হতে মাকে দেখলাম উঠানের গন্ধরাজের ঝাড় থেকে একটা ডাল কেটে নিলেন। যত্ন করে রাখলেন ঘরে। অন্য জিনিষপত্রের সাথে ওই কাটা ডালটাও আমাদের সঙ্গে এল। বাসা পাল্টে আমরা যে বাসায় এসে উঠলাম, সেটাও দেখি আগের বাসারই মত। একই শণবাঁশের ঘর আর মাটির মেঝে, সঙ্গে একচালা রান্নাঘর।  উঠানে একই রকম জলকাদা। এখানেও ঘরের পাশে গন্ধরাজের ডাল লাগানো হল। গাছটা ডালপালা মেলল। কিন্তু ফুল ফোটার আগেই আবার বাসাবদল। প্রত্যেক বাসাবদলে অন্য জিনিসপত্রের বাঁধা-ছাঁদা তো আছেই, সঙ্গে আছে একটা গন্ধরাজের ডাল। আরেকটা জিনিষও খেয়াল করলাম। প্রত্যেকবার বাসাবদলের পর বাবা যেন একটু একটু করে খাটো হয়ে যাচ্ছেন। মাকে বলেওছিলাম কথাটা। মা বললেন, তুই লম্বা হচ্ছিস, তাই বাবাকে খাটো মনে হচ্ছে। 

এ ভাবে তিনবার বাসাবদলের পর আমার বয়স যখন আট, বাবা এক টুকরো জমি কিনে ঘর তুললেন। জলে ডোবা জমি, তাই সস্তা। আমাদের এই নিজের ঘরটাও শণবাঁশের, এটাতেও মাটির মেঝে, তবে ঘরটা আকারে বড়। দরজা জানালা কাঠের। রান্নাঘরটাও বড়। বড় শোবার ঘরে এক বিছানায় বাবা আর আমি, অন্য বিছানায় মা আর ভাই। মাঝারি ঘরটা ছোড়দির একার। আর রান্নাঘরের পাশে ছোট একটা ঘর ঠাকুমার। এই  বাড়িতেও, যথারীতি, গন্ধরাজের ডাল লাগানো  হল।  

এই বাড়িতে আসার কিছুদিন পর আমরা আমাদের কাকার বিয়েতে আমাদের বরযাত্রী গিয়েছিলাম। অস্পষ্ট মনে আছে, আমরা দু’ভাই সেই কালো মোটরগাড়ি চড়ে কোথাও গেছি। এক জায়গায় গাড়িটা থামল। সবাই বলছিল এটা সুতারকান্দি বর্ডার। সেখানে কী কী হল, তা বলতে পারব না। শুধু মনে আছে, কেউ একজন আমাদের সামনে দুটো মিষ্টির প্লেট ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, বরযাত্রীদের মিষ্টি না খাওয়ালে চলে? বরযাত্রী শব্দটাও সেই প্রথম শোনা। আমাদের বোঝার মধ্যে ছিল কেবল এই মিষ্টি খাওয়া। বড় হয়ে জেনেছি, কাকার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। কাকা থাকেন পাকিস্তানে, আমাদের দেশের বাড়িতে। বিয়েও হবে  পাকিস্তানে। কিন্তু বাবা অভিবাবক, বাবা এ দেশে। ঠাকুমাও এখানে। তাই কাকা বিয়ের আগে করিমগঞ্জে চলে এসেছেন, এখান থেকে গুরুজনদের আশীর্বাদ নিয়ে বিয়ে করতে যাবেন। আমরা কিন্তু বিয়ে খেতে পাকিস্তান যাব না। পাকিস্তান যেতে হলে ভিসা পাসপোর্টের ঝামেলা আছে। আমরা তাই বরযাত্রী সেজে  কেবল সুতারকান্দি বর্ডার পর্যন্ত যাব। দেশ ভেঙ্গে দু’ভাগ হয়ে গেছে, আমরা হয়ে গেছি আধখানা মানুষ, আমাদের বরযাত্রাও তাই অর্ধপথে সমাপ্ত। আমাদের বড়দি অবশ্য ছিলেন বিয়েতে। বিয়ের পর কাকা নতুন কাকীমাকে নিয়ে এসেছিলেন একবার। ওই কাকীমাকে সেই একবারই দেখেছি। বছর ঘুরতে খবর পেয়েছি, সন্তান প্রসবের সময় উনি মারা গেছেন। চার বছর পর কাকা যখন আবার বিয়ে করলেন, সেবার আর করিমগঞ্জে আসেন নি। ঠাকুমাও তখন বেঁচে নেই। এবারের বিয়েতেও বড়দিই একা আমাদের প্রতিনিধি।    

ঠাকুমা মারা গেলে মা বলেছিলেন তোর ঠাকুমা খুব পূণ্যবতী, নিজের ভিটেতে এসে মরলেন। ঠাকুমাকে নিয়ে ভালো কথা মা কমই বলতেন। ঠাকুমার শ্রাদ্ধে কাকা তো ছিলেনই, পিসিরাও ছিলেন। পাকিস্তানের দুই পিসিকে সেবার চিনলাম। পাকিস্তান শব্দটা আমাদের খুব চেনা। প্রায়ই আমাদের ঘরে কেউ কেউ আসেন পাকিস্তান থেকে। মা বলেন, ইনি তোদের পিসা, বা জ্যাঠা। বা কাকা মামা মেসো। এ ছাড়াও কেউ কেউ আসেন, যাদের পরিচয় হল দেশের লোক। পরে জেনেছি, দেশের লোক মানে হচ্ছে একই গ্রামের বা চেনা চৌহদ্দির লোক। দেশের লোক পেলে মা বাবার গল্প আর থামে না। আমরাও সেসব গল্প শুনতাম। শুনে মনে হত, এর সবই শুধু হারানোর গল্প। এ সব গল্প বলে আর শুনে সবাই কী এত আনন্দ পায় বুঝতাম না। দেশ ব্যাপারটা কেমন গুলিয়ে গিয়েছিল। দেশ বলতে কোনও সীমানা চিহ্নিত ভূখণ্ডের ছবি মনে আসত না। দেশ বলতে বুঝতাম কিছু হাসি-কান্নার অংশীদারিত্ব। এসব নিয়ে খুব বেশি ভাবাভাবির অবশ্য সময় নেই। স্কুলে ভর্তি হয়েছি। দুই ভাই আলাদা সময়ে পাঠশালায় যাই। ছোড়দি যায় হাইস্কুলে। বাড়িতে হাঁটু ঢাকা জামা পরে, স্কুলে যাবার সময় শাড়ি। 

পাকিস্তান থেকে মাঝে মাঝে বড়দি আসেন, জামাইবাবু আসেন। ভাগ্নে-ভাগ্নি আমাদেরই বয়সী। ওরা এলে আমাদের খুব মজা হয়। মাঝে মাঝে দিদিমা আসেন আলাদা আলাদা পুটুলিতে দু তিন রকমের চাল নিয়ে। একেক রকম চালের ভাতে একেক রকম স্বাদ। সবই নাকি নিজেদের খেতের। এর মধ্যে বিরন চাল থাকবেই।  কখনও সঙ্গে আনেন বাড়ির গাছের একটা কি দুটো পাকা আম। সেই আম টুকরো টুকরো করে কেটে সবাইকে দেওয়া হয়। সবাই খেয়ে বলে, ওই আমের নাকি স্বাদই আলাদা। আমরা আলাদা কিছু বুঝি না, তবু আমরাও বলি। মাকে প্রশ্ন করতাম, বাড়ির গাছের আম, তাহলে একটা দুটো কেন, বেশি আনতে পারেন। মা বলতেন, দিদিমা কত পথ ঘুরে আসেন তা জানিস? প্রথম দেশের বাড়ি থেকে সিলেট, তারপর সিলেট থেকে জকিগঞ্জ, তারপর জকিগঞ্জ থেকে টাউট ধরে নদী পার হয়ে এ পারে। ভারি বোঝা নিয়ে এত পথ কী করে আসবেন? দিদিমার পাসপোর্ট ছিল না। দিদিমা আসতেন চোরাই পথে। কাকার পাসপোর্ট ছিল, তবু কাকাও মাঝে মাঝে চোরাই পথে আসতেন। সেটা নাকি সহজ ছিল। তখন বাধানিষেধের কড়াকড়ি ছিল না।    

কাকা এলে আমরা দু’ভাই একটু বিপদে পড়তাম। আমরা দেখেছি, মা’র মত কাকাও বাবার সঙ্গে আপনি আপনি করে কথা বলেন। ছোড়দি মা-বাবাকে তুমি বলে, আমরাও সেটাই শিখেছি। আমরা ছোড়দিকেও তুমি বলি। বাইরের লোকের ক্ষেত্রে অবশ্য আমাদেরে শেখানো হয়েছে বড়দের সঙ্গে আপনি আজ্ঞে করে কথা বলতে। কিন্তু আমরা দু’ভাই নিজেদের মধ্যে তুই তোকারি করি। আশেপাশে সব বাড়িতে এ রকমই চলে। কিন্তু কাকা শুনলে রাগ করতেন। মাকে বলতেন, ছেলে দুটো কিন্তু আদব কায়দা শিখছে না বৌদি। কথাবার্তায় কোনও মান-মান্যতা নেই। মা অপরাধীর মত বলতেন, কী আর করা যায় বল, যে দেশের যে রীতি। কাকা গজগজ করতেন, এটা মোটেও ভালো রীতি নয়। তোমাদের দেশে তো জাত-ধর্মও বজায় রেখে চলা মুশকিল। এখানে শুনেছি হিন্দুরা নাকি মুর্গী খেতে আরম্ভ করেছে। আমাদের দেশে কিন্তু এসব নেই।  তার মানে কাকার দেশ পাকিস্তান, আর আমাদের দেশ ইণ্ডিয়া। আমাদের রীতি নীতি চলন বলন আলাদা।   

আমাদের গন্ধরাজ গাছটা ডালে পাতায় বাড়ছে শুধু। ফুল আর ফোটে না। মা বলেন, মাটি ভালো নয়। বাবা বললেন, এ পাড়ার এক বাড়িতে গন্ধরাজের ঝাড় দেখেছি। ফুলও ফোটে। যদি চাও তো ডাল এনে দেব। মা বললেন, সেটাতে কি আর দেশের গন্ধ পাব? একবার বন্যায় টানা দশবারো দিন জল ছিল উঠানে। গন্ধরাজ গাছটা সে বার মরে যায়। মাকে বললাম, তোমার দেশের স্মৃতি তো মরে গেল, আর দেশ দেশ করবে না। মা বললেন, কত বাড়িতে লাগিয়েছি এই গাছ। কোথাও ঠিকই বেঁচে আছে। গন্ধও ছড়াচ্ছে। এসব শুনতে আমার ভালো লাগত না। যে দেশ আমি দেখিনি, যে দেশ নিয়ে আমার কোনও অনুভূতি নেই, সেই দেশ নিয়ে এত আদিখ্যেতা আমার পছন্দ হত না। একটু রেগেই বলতাম, এত যে দেশ দেশ কর, কী ছিল তোমার দেশে? রাজা জমিদার ছিলে না। ওই সব মাঠভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ আর অঢেল দুধ দই ছানা মাখন, ওসব অন্যের গল্প। তোমাদের নয়। কেন ওসব নিয়ে হা-হুতাশ কর। মা একটু দমে গেলেন। তারপর বললেন, আসলে কী জানিস? দেশের আলো বাতাসটাও নিজের মনে হত। এখানে সব কিছুই কেমন পরের মনে হয়। 

গন্ধরাজ গাছটার মরে যাওয়া নিয়ে কিন্তু কোনও হাহাকার হল না। তখন আমাদের হাহাকারের অভাব নেই। দেশের গন্ধের চেয়ে তখন ভাতের গন্ধে আমরা বেশি উন্মনা হই, এবং গন্ধরাজ ফুলের কোনও ভূমিকা ছাড়াই আমাদের একটা বোনও জন্মালো। 

বাবা একদিন আমাদের কালো মোটরগাড়িটা চালিয়ে একেবারে বাড়ির সামনে চলে এলেন। বেড়ার গা ঘেঁষে এমন ভাবে গাড়িটা রাখা হল, দেখেই আমার কেমন মনে হল, এটা আর কোথাও যাবে না। মাকে  জিজ্ঞেস করলাম। মা বললেন, ওটার আয়ু শেষ। আমার একটু মন খারাপ হয়েছিল। গাড়িটার কাছে ঘুরঘুর করতাম। মাঝে মাঝে ড্রাইভিং সীটে বসে মুখে ব্রুম ব্রুম আওয়াজ তুলতাম। গাড়িটা আমাদের খেলনা হয়ে গেল। একদিন একজন লোক এসে গাড়ির পিছনের সীটটা খুলে নিয়ে গেল। ওটা নাকি বিক্রি হয়ে গেছে। তারপর একদিন সামনের সীটটা খুলে এনে ছোড়দির ঘরে রাখা হল। কেউ এলে বসবে। ইঞ্জিন বা অন্য কলকব্জা কিছুই বিক্রি হয়নি, কারণ ওই মডেলের গাড়ি তখন বাজারে নেই। গাড়িটা পড়ে পড়ে রোদ জল খেত। একদিন পুরোটাই ওজন দরে বিক্রি হয়ে গেল। আমরা তখন অনেক কিছু হারানোতে আর অনেক কিছু না পাওয়াতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। হারানো দেশের গল্প তখন কেমন অলীক রূপকথা মনে হত। কাকার চিঠি আসত। লিখতেন ওদের দেশেও জিনিষ পত্রের দাম বাড়ছে, রোজগার কমছে। আমি বুঝতাম দেশ মানে এখানে যা, ওখানেও তাই।

বাবা অন্য কাজে ঢুকেছেন। অন্যের ব্যবসা দেখাশোনা করেন। মাস গেলে মাইনে পান। কত পান জানি না, তবে বুঝতে পারি আমাদের টাকা পয়সার টানাটানি চলছে। বড় মাছ এখন কালে ভদ্রে আসে। একটা শার্ট ছিঁড়লে সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা আসে না। ছেঁড়া শার্ট পরেই ক’দিন কাটাতে হয়। অবস্থা যত খারাপ হয়, বাবা ততই কাকাকে দোষারোপ করেন। সবার কাছে অভিযোগ করেন, ভেবেছিলাম বুড়ো বয়সে ভাইটা এসে পাশে দাঁড়াবে। সে আর আসার নামই নেয়না। কী করে যে ছেলেমেয়ে মানুষ করি। 

বাবা কাকাকে এক ঘড়ির দোকানে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন ঘড়ি মেরামতির কাজ শেখার জন্য। আমাদের দেশ ছাড়ার সময় কাকার কাজ শেখা চলছে। তাই কাকাকে দেশের বাড়িতে রেখে আসা। বাবার ইচ্ছে ছিল কাজ শেখা হয়ে গেলে কাকা বাড়িঘর বিক্রি করে এদেশে চলে আসবেন, এখানে এসে ঘড়ির দোকান দিয়ে বসবেন। ছোটবেলা থেকে এসব শুনে শুনে আমরাও স্বপ্ন দেখতাম, একদিন কাকা চলে আসবেন, এখানে  কাকার দোকান হবে, আমাদের বাড়িঘর পাকা  হবে, আমাদের অবস্থা ভালো হবে, আমাদের সুদিন আসবে। আমরা সেই দিনটার অপেক্ষা করতাম। কিন্তু কাকার তরফে দেশ ছাড়ার কোনও উদ্যোগ চোখে পড়ত না।  ঘড়ির কাজ শিখে কিছু কিছু রোজগার হচ্ছে, নিজের দোকান দিতে পারেন নি, অন্যের দোকানেই কাজ করেন। একটু আধটু সুনাম হয়েছে। তাই কাজ পেতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু এ দেশে চলে আসার মত ঝুঁকি নিতে পারছেন না। কাকারও সংসার বেড়েছে, ছেলেমেয়ে হয়েছে। এক সময় আমরা বুঝে গেলাম, কাকা আর দেশ ছাড়বেন না। স্বপ্নটাকে আমরা ঝেড়ে ফেলে দিলাম। 

আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, ভারত পাকিস্তানে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, আমার স্কুলের বন্ধুরা বাড়িতে রেডিও শুনে এসে খুব উত্তেজিত হয়ে গল্প করে, ভারতের বোমারু বিমান পাকিস্তানের কোথায় কোথায় বোমা ফেলেছে। আমার তখন খালি মনে হত, আমাদের বোমা আমার কাকাদের উপর পড়বে না তো! কাউকে বলতে পারতাম না কথাটা। ওদের খুশিতেও যোগ দিতে পারতাম না। ওই যুদ্ধের পর দুই দেশের মধ্যে  যাওয়া আসা কমে যায়, বাধানিষেধ বাড়ে। তখন থেকে কাকা কমই আসেন। এলেও পাসপোর্ট করে আসেন। দিদিমার তো পাসপোর্ট ছিল না। দিদিমার আসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। বড়দিরা পুরো পরিবার তখন ভারতে এসে গেছেন। এত বড় একান্নবর্তী পরিবার এক সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা হয়নি বলে তারা চারদিকে ছিটকে পড়েছেন। বড়দি আছেন সরুপাথারে। এখন আর ঘন ঘন আসেন না।   

এই যে হঠাৎ করে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেল, এর ফলে কোথাও যেন সভ্য ভদ্র হয়ে থাকার দায় থেকে আমি মুক্তি পেলাম। বাড়ির কারও সময় নেই আমার উপর নজরদারি করার। সেই সুযোগে আমি মনের সুখে বখে যাচ্ছি। বন্ধুদের সঙ্গে মিশে বিড়ি খেতে শিখেছি। আমাকে বিড়ি খেতে দেখলে ভাই কেমন অবিশ্বাসের চোখে তাকায়। আমার অস্বস্তি হয়। বিড়ির টুকরো ফেলে দিই। বন্ধুরা সবাই হিন্দি সিনেমার  পোকা। ওদের মুখে নায়িকাদের বর্ণনা শুনি আর কল্পনায় তাদের শরীর ছানি। পড়াশোনায় মনোযোগ কমে গেছে। আগে ক্লাসে প্রথম দশ জনের মধ্যে থাকতাম, এখন টেনেটুনে পাশ করি। ছোড়দি প্রতি বছর মেট্রিক পরীক্ষা দেয় আর ফেল করে। বন্ধুদের ঠারেটোরে কথা থেকে বুঝি ছোড়দি কারও সাথে লুকিয়ে প্রেম করছে। কারও দিদি প্রেম করলে সেটা খুব লজ্জার কথা। লজ্জা এড়াতে বন্ধুদের সঙ্গ ছাড়ি, আরও একলা হয়ে পড়ি। ভিতরে একটা আক্রোশ টের পাই, কিন্তু কার উপরে সেটা ফলাব বুঝে পাই না। ছোড়দি একদিন আমাকে পড়াশোনা নিয়ে বকল। আমি যা কখনও করিনি, ছোড়দির মুখের ওপর যা মুখে আসে তাই বলে দিলাম। ছোড়দি টু শব্দ করল না। আমার উঁচু গলার কথা শুনে মা এসে ঘরে ঢুকেছিলেন। কিন্তু কাউকে কিচ্ছু না বলে চুপচাপ বেরিয়ে গেলেন। মাকে এই প্রথম বড় অক্ষম আর অসহায় মনে হল। 

এর ক’দিন পরেই এক ভোরে ছোড়দি বাড়ি থেকে পালিয়ে গেল। বাবা খোঁজ করতে বেরিয়ে কোথায় গিয়ে খুঁজবেন বুঝতে না পেরে বাবা ঘরে এসে গুম হয়ে বসে আছেন। মা বসে চোখের জল ফেলছেন। আমরা ভাই বোন কেউ কারও মুখের দিকে তাকাচ্ছি না। বেলা গড়িয়ে গেল। এক সময় মা উঠে গিয়ে রান্না বসালেন। আমরা চুপচাপ আলুসেদ্ধ ভাত খেয়ে উঠে পড়লাম। সন্ধ্যার পর রঞ্জনদার বাবা এসে বাবাকে খুব কথা শোনালেন। ছোড়দি নাকি রঞ্জনদার সঙ্গে পালিয়েছে। বাবা একটা কথাও বললেন না। শেষ পর্যন্ত একটা মিলমিশ হয়ে গেল। বাবা শুধু বললেন, দেশে থাকলে কখনই এটা হতে দিতেন না। রঞ্জনদারা নাকি দেশের সমাজে আমাদের কয়েক ইঞ্চি নিচুতে। আমি কিন্তু জানি, ছোড়দির একটা ভদ্রস্থ বিয়ে দেবার সঙ্গতি তখন বাবার নেই। 

এই ঘটনা আমাকে জোর ধাক্কা দিয়েছিল। একটা অপমানবোধ আমাকে তাড়িয়ে বেড়াত। পাড়ায় মুখ দেখাতে পারতাম না। চারদিক থেকে ছুটে আসা অপমানের তীরগুলো আমাকে অন্তর্মুখী করে তুলল। আমার ভেতরকার চাপা আক্রোশ থেকে একটা জেদ তৈরি হল। জোর করে নিজেকে বইয়ের পাতায় গুঁজে দিলাম। পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে মিশি না, অন্য বন্ধুও নেই। আমি দেখেছি স্কুলের ভালো ছেলেরা সময় কাটাতে পাব্লিক লাইব্রেরিতে যায়। আমিও যাওয়া শুরু করলাম। ধীরে ধীরে বইপত্রের এক বড় দুনিয়াতে ঢুকে গেলাম। স্কুলের শেষ পরীক্ষায় আমার মার্কস দেখে স্যাররাও চমকে গেলেন। 

একাত্তর সালে পূর্ব-পাকিস্তানে গণ্ডগোল শুরু হল। কাকারা তখন করিমগঞ্জে চলে এলেন এবং আমাদের বাসাতেই উঠলেন। আমি তখন কলেজে, আমার ভাই ক্লাস নাইনে আর বোন সেভেনে। এই কাকিমা আর খুড়তুতো ভাইবোনদেরে আমরা আগে দেখিনি। আমাদের ঘরখানা এখন অনেক লোকের কথায় গমগম করে। কচি গলার আওয়াজ শোনা যায় সারা দিন। কখনও ওদের ঘ্যানঘ্যানে বায়নার উত্তরে কাকিমার কড়া ধমক। আমরাও ছোট ছোট ভাইবোন পেয়ে বেশ আনন্দে আছি। সারাদিন ওদের পেছনে লাগি। ওদের মুখে, ওদের আলাদা উচ্চারণে নানা কথা কথা শুনি। কাকিমার কথাবার্তায় একটা গ্রাম্য সরলতা আছে।  উচ্চারণে একটা আলাদা টান আছে। আমরা মজা পাই। টাকাপয়সার ব্যবস্থা কী হচ্ছে জানি না। কাকা নিশ্চয়ই সাহায্য করছেন। আমরা দিব্যি একটা একান্নবর্তী পরিবারের স্বাদ পাচ্ছি। এক সময় এ রকমই একটা স্বপ্ন দেখতাম আমরা। মাঝে মাঝে নিজেকে প্রতারণা করে ভাবতে চেষ্টা করতাম, স্বপ্নটা বোধ হয় আকার পাচ্ছে। তারপর নিজেই বুঝতাম, এটা আসলে এক মৃত স্বপ্নের কঙ্কাল। স্বপ্নটা আর বেঁচে উঠবে না কোনও  দিন। এই ভরা সংসারের আয়ু বড়জোর কয়েক মাস। 

আমার  দিদিমার কথাটা একদিন কাকিমাই তুললেন। মাকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা গো দিদি, আপনার মা আছেন না, দেশে? মার খবর পেয়েছেন কিছু? কাকিমার কথা শুনে আমারও খেয়াল হল, এই গণ্ডগোলে  দিদিমার কথা তো আমরা ভাবিনি একবারও! আমাদের তো দুশ্চিন্তা হবার কথা ছিল। কাকিমার কথা শুনে আমি মার দিকে তাকালাম। মা অনেকক্ষণ কাকিমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেই তাকানোতে দৃষ্টি নেই। তারপর ছোট করে বললেন, জানি না। এই ছোট বাক্যটি একটা দীর্ঘ নীরবতাকে টেনে আনল। মার  দিকে তাকিয়ে আমার খারাপ লাগছিল। মা আমার দিদিমার একমাত্র সন্তান। দিদিমা দেশের বাড়িতে একা থাকেন। মার এক কাকা নিয়মিত চিঠি দিতেন। তার চিঠিতেই সবার খবরাখবর পাওয়া যেত। সেই দাদু মারা যাবার পর চিঠি লেখার আর কেউ ছিল না। মা বলতেন, এখন আর শুধু মরার খবর আসবে। এখন বোধহয় আমরা সেই খবরেরই অপেক্ষা করে আছি। 

কাকার সারাদিন কোনও কাজ নেই। কলেজ থেকে ফিরে কাকাকে কোনোদিন দেখি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন, কখনও চৌকিতে শুয়ে আছেন, কখনও রান্নাঘরে উঁকি দিচ্ছেন। আমি বুঝতে পারি কাকা আসলে কথা বলার কাউকে পাচ্ছেন না। বাবার সঙ্গে কথা বলার তো প্রশ্নই ওঠে না। কাকার বেশির ভাগ গল্প ছিল মা’র সঙ্গে। ছোটবেলা কাকা এলে দেখতাম, মা রান্নাঘরে বসে রান্না করছেন আর কাকা একটা জলচৌকি নিয়ে পাশে বসে গল্প করছেন। মা রান্না করতে করতে ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে কাকার কথা শুনছেন। এখন মাকে প্রায় পুরো সময়ের জন্য দখল করে নিয়েছেন কাকিমা। কাকা আর সেখানে তেমন ভিড়তে পারছেন না। দুপুরে ঘরে ফিরে দেখতাম কাকা একটা জলচৌকি নিয়ে উঠানে করবী গাছের তলায় বসে আছেন।  আমাকে দেখে যেন একটু হাঁফ ছাড়তেন। আমি এখন বড় হয়েছি, বাইরের জগতের খোঁজ খবর রাখি। রোজই আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, কী বাবাজী? নতুন খবর টবর কিছু আনলে? আমি অন্যদের কথাবার্তা থেকে যা শুনতাম তাই বলতাম। শরণার্থী আসা বন্ধ হয়েছে। বা খানসেনাদের হঠিয়ে মুক্তিফৌজ রাজশাহী দখল করেছে। বা ইন্দিরা গান্ধীকে আমেরিকা বিশেষ পাত্তা দিচ্ছে না। কাকা শুনতেন। তারপর নিজের মনেই বলতেন, কবে যে এর সুরাহা হবে আর কবে যে আমরা দেশে ফিরব। 

মাঝে মাঝে কাকা বেরোতেন। বড় পিসির বাড়ি যেতেন। এই শহরে যারা আমাদের দেশের মানুষ আছে, তাদের বাড়ি যেতেন। এ ছাড়া তখন করিমগঞ্জের রাস্তায় হাঁটলে সিলেটের অনেককেই পাওয়া যেত। কাকা তার অনেক চেনা লোক পেয়ে যেতেন। একদিন কী কারণে যেন কলেজ তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরে দেখলাম কাকা একজন অপরিচিত লোকের সঙ্গে কথা বলছেন। আমি ঘরে ঢুকতে ভদ্রলোক আমাকে দেখলেন। কাকা বললেন দাদার ছেলে। ভদ্রলোক খুব আগ্রহ নিয়ে তাকালেন আমার দিকে। বললেন, হরিপদবাবুর ছেলে? আমি তাকে প্রণাম করলাম। উনি মাথায় হাত রাখলেন। বললেন, তোমাকে বোধহয় দেখিনি। কাকা বললেন, কী করে দেখবেন। দাদা যখন দেশ ছাড়েন, ও তখন কোলের শিশু। একেকজন মানুষকে দেখলে খুব সদালাপী আর খোলা মনের মানুষ মনে হয়। এই ভদ্রলোককে দেখে আমার সে রকম মনে হচ্ছিল। আমি কীসে পড়ি জিজ্ঞেস করলেন। উনি  পাকিস্তানের লোক, সেটা বুঝতে পারছিলাম। আমাকে বললেন, এবার তো দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। এখন আর ওটা মুসলমানদের দেশ নয়, এখন হবে বাঙ্গালিদের দেশ। এখন তোমরাও তোমাদের নিজের দেশে ফিরে এসো। নিজের দেশ থাকতে, বাড়িঘর থাকতে কেন অন্য দেশে পড়ে থাকবে। আমি হাসলাম। বললাম, আমি তো অন্য কোনও দেশ চিনি না। আমার কাছে এটাই দেশ। ভদ্রলোক একটু সময় তাকিয়ে থেকে বললেন, এ তো দেখছি সেই টান্টুপীরের মাগুর মাছের মত ব্যাপার। 

কথাটা বুঝলাম না। কাকাও মনে হল বুঝতে পারেন নি। বললেন, কীসের মাগুর মাছ? টান্টু পীরের। নাম শুনেছ টান্টুপীরের? কাকা দু’ দিকে মাথা নাড়ালেন। ভদ্রলোক আমাদের সেই গাড়ির সীটে হেলান দিয়ে বলতে শুরু করলেন, আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে একটু দূরে এক পীরের মাজার আছে। টান্টুপীরের মাজার। এক সময় নাকি দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসত সেই পীরের থানে। হিন্দু মুসলমান সবাই। টান্টুপীরের নামে মানত করত। টান্টুপীরের ক্ষমতায় সবার খুব বিশ্বাস ছিল। আমি দেখিনি তাকে। আমার জন্মের আগেই মারা গেছেন। কিন্তু তার নামে একটা গল্প চালু আছে। গল্পটা হল, এক জেলে, একটা ডোবা ছেঁচে প্রচুর মাছ পেয়েছে। তার মধ্যে একটা মাগুর মাছ ছিল গড়পড়তার তুলনায় অনেক বড়। তুমি তো জানো, বেশি বড় হয়ে যাওয়া মাছগুলোকে লোকে দ্যাওলা বলে, নানা রকম গল্প বানায় সে রকম মাছ নিয়ে। এই মাগুর মাছটা দেখে জেলের বিশ্বাস হয়েছিল, এটা বোধ হয় দ্যাওলা। মাছটা নিয়ে কী করবে ভাবতে ভাবতে তার মনে হল, এটা পীরবাবাকে দিয়ে দিই। পীরবাবা যা ভালো বুঝবেন করবেন। মাছ দেখে পীর বাবা খুব খুশী, বললেন এটা জীইয়ে রাখ, এটাকে তুক করে জলে ছেড়ে দেব। পীরবাবার সাগরেদরা একটা মাটির হাড়িতে জল ঢেলে মাছটা জীইয়ে রেখে দিল। এদিকে পীরবাবার রান্না করত এক মহিলা, সে এসবের কিছুই জানে না। তার পায়ের ধাক্কা লেগে পাত্রটা উল্টে গেল। ঘরময় জল ছড়িয়ে পড়ল, আর সেই জলের মধ্যে খলবল করছে একটা রাক্ষুসে মাগুর মাছ। বেচারা একটু ঘাবড়ে গেল। মাছটা খলবলিয়ে সরে যাচ্ছে। মেয়েটা খালি হাতে এত বড় মাগুর মাছ ধরার সাহস পাচ্ছে না। সে তখন আগুপাছু না ভেবে কাটারি দিয়ে এক কোপে মাছটাকে দু’ ভাগ করে দিল। সবাই হায় হায় করে উঠল, আরে, করলি কী, করলি কী? পীর বাবা এটাকে জীইয়ে রাখতে বলেছিলেন, সর্বনাশ করে দিলি। পীরবাবার কাছে খবর গেল। তার দয়ার শরীর। সব শুনে  বললেন, কোনও চিন্তা নেই। ওই আলাদা টুকরো দুটো পুকুরে ছেড়ে দে। দু’ টুকরো হয়েও বেঁচে থাকবে। সেই টুকরোগুলো নাকি বেঁচে রইল। খালি বেঁচে থাকা নয়, সেগুলোর বংশবৃদ্ধিও হল। তবে সব মাগুরই নাকি আধখানা। কোনোটার মাথা আছে ল্যাজ নেই, কোনোটার ল্যাজা আছে, মুড়ো নেই।   

কথাটা বিশ্বাস হল না। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি নিজে দেখেছেন ওই মাগুর মাছ? উনি বললেন, দেখেছি। একবার কী এক কাজে ওদিকে গেছি। ভাবলাম এত শুনি এই মাগুর মাছের কথা, একবার দেখে আসি। গিয়ে দেখলাম কচুরিপানায় ঢাকা একটা পুকুর। চারদিকে বাঁশের বেড়া দিয়ে আটকানো। একদিকে একটু জায়গায় কচুরিপানা সরিয়ে রাখা। সেখানেই, বেড়ার বাইরে থেকে মাছ দেখতে হয়। জল এত কালো আর নোংরা যে চার আঙুল নীচে কী আছে ভালো করে দেখা যায় না। সেখানে মাঝে মাঝে একেকটা মাছ উঁকি দেয়। মাগুর মাছ বলে চেনা যায়। কিন্তু আস্ত মাছ দেখার উপায় নেই। কখনও একটা মাথা দেখা যাচ্ছে শুধু, কখনও শুধু একটা ল্যাজের ঝাপটা। আমি বললাম, একটা মাছ ধরে উপরে তুললেই তো দেখা যেত আস্ত না আধখানা। উনি বললেন, তার উপায় রাখেনি। ওই পুকুরে মাছ ধরা নিষেধ। আমি কাকার দিকে  তাকালাম। কাকার ভাবখানা ছিল, হলে হতেও পারে। কত কিছুই তো হয়। আমার মুখে হয়তো অবিশ্বাস ফুটে উঠেছিল। উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বিশ্বাস করার কিছুই নেই বাবা। পীরের পীরাকিতে কাটা মাছ বাঁচতে পারে না। আসলে পীরবাবার এন্তেকাল হবার পর মাজারে লোকসমাগম টিঁকিয়ে রাখতে তার সাগরেদরা ওই গল্প বানিয়েছিল। সেই জন্যেই বললাম, এই যে তোমাদের পরিবারটা আধখানা হয়ে এক ভাগ এ দেশে, এক ভাগ ও দেশে পড়ে আছে, এভাবে বাঁচা যায় না। এতদিন না হয় উপায় ছিল না। এবার যখন পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে, চলে এসো। মনে পড়ল, মা বলতেন, আমরা আধখানা হয়ে বেঁচে আছি। 

এ সব কথার উত্তর হয় না। তাছাড়া সদ্য পরিচিত একজন বয়স্ক লোকের সঙ্গে তর্কে জড়াবার ইচ্ছেও নেই। আমি তাই উঠে পড়লাম। রাতে কাকাকে জিজ্ঞেস করলাম, উনি কে। কাকা বললেন উনি সাজ্জাদ চৌধুরী, আওয়ামী লীগের একজন মাঝারি নেতা। এখন করিমগঞ্জেই তার কোন আত্মীয়-বাড়িতে আছেন। রাস্তায় দেখা হতে কাকা তাকে বাসায় নিয়ে এসেছেন। ভদ্রলোকের নামটা শোনার আগে আমি বুঝতে পারিনি উনি মুসলমান। সাজ্জাদ চৌধুরী এর পরেও এসেছেন। বাবার সঙ্গেও দেখা হয়েছে। এরপর কাকা যতদিন  ছিলেন, সাজ্জাদ চৌধুরীর সঙ্গেই সময় কাটাতেন। তার কাছে দেশের টাটকা খবর পাওয়া যেত।   

একদিন, সেদিন রবিবার বা অন্য কোনও ছুটির দিন ছিল, আমি বাড়িতে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কিছু পড়ছি। বাইরে কার গলা শুনতে পেলাম। তারপরই কাকিমা কেমন ভয় পাওয়া মুখে এসে রান্নাঘরে ঢুকলেন। মাকে বললেন, ও দিদি, মিলিটারির মত দেখতে একটা লোক ভাসুরঠাকুরকে খুঁজছে। আমার কী ভয় লেগেছে দেখে। কাকিমা ওই রকমই। কত কিছুতে যে ভয় পান। আমি বেরোলাম। আমার সঙ্গে মা-ও এলেন, মার  পেছন থেকে ভয়ে ভয়ে উঁকি দিচ্ছেন কাকিমা। আমি দেখলাম আধময়লা পাজামা পাঞ্জাবি পরা একজন লোক, কাকার বয়সী হবেন, কাঁধে একটা ঝোলা, মুখে বেশ বড় মাপের একখানা গোঁফ। গোঁফের দুই প্রান্ত ছুঁচলো। এই গোঁফের জন্যই লোকটি কাকিমার কাছে মিলিটারির মত। মা জিজ্ঞেস করলেন, কাকে খুঁজছেন, ভদ্রলোক একবার মাকে দেখলেন, তারপর মা’র আড়ালে প্রায় লুকিয়ে থাকা কাকীমাকে। এবার  কাকিমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুই সন্ধ্যা না? কাকিমা প্রথম আঁতকে উঠে বললেন, ও মাগো! তারপর হঠাৎই কেঁদে উঠলেন, ও দিদি, ইনি বোধহয় আমার দাদা গো। ভদ্রলোকের মুখে একটা স্বস্তি ফুটল। চিনতে পেরেছিস তা হলে। এরপর কাকিমার সে কী কান্না! মা বললেন আসুন, ঘরে এসে বসুন। ভদ্রলোক উঠে এলেন। আমি একটা চেয়ার এগিয়ে দিলাম। উনি বসলেন। কাকিমা এসে প্রণাম করলেন। তার কান্না থামছিল না। ভদ্রলোক বললেন, কাঁদছিস কেন। সেই কোন ছোটবেলায় দেখেছি। তবু তো ঠিক চিনতে পারলাম। তারপর গল্পে গল্পে জানলাম, কাকিমার এই দাদা পনেরো ষোল বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে আসাম চলে গিয়েছিলেন। নানা ঘাটের জল খেয়ে এক সময় রেলের চাকরি পান। এখন মরিয়ানিতে থাকেন। কার কাছে খবর পেয়েছেন কাকিমারা করিমগঞ্জে এসে উঠেছেন। বাবার নাম জেনে, লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে এসে হাজির হয়েছেন। ভাই-বোনের দেখা হল প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পর। কাকিমা আমাকে বাজারে পাঠিয়ে মাছ আনালেন। যত্ন করে দাদাকে খাওয়ালেন। দুপুরবেলা কাকা এলে কাকার সঙ্গেও দেখা হল। খাওয়া দাওয়া করে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে উনি উঠলেন। বললেন রাতের ট্রেনেই মরিয়ানি ফিরে যাবেন। মা বলেছিলেন রাতটা থেকে যেতে। বাবার সঙ্গেও দেখা হয়ে যেত। উনি জানালেন উনি রেলের কোন একটা ইউনিয়নের দায়িত্বে আছেন। সামনেই তাদের একটা কনফারেন্স আছে। থাকার উপায় নেই। কাকিমা কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, আর কী দেখব জীবনে? এক সময় চোখ মুছে দাদাকে বিদায় দিলেন। আমি শুধু ভাবছিলাম উনি থাকতে রাজী হলে ঘুমোবার কী ব্যবস্থা হত। 

পুজোর মাসেও সেবার টানা বৃষ্টি হচ্ছিল। ক’দিন ধরে মার খুব শরীর খারাপ। সারাক্ষণ একটা জ্বর-জ্বর ভাব। উঠে দাঁড়ালে মাথা ঘোরায়। সারা দিন শুয়েই কাটান। আগেও হয়তো শরীর খারাপ হত। ঘরের কাজকর্ম সামলাচ্ছেন বলে আমরা টের পেতাম না। এখন কাকিমা থাকায় শরীর সুযোগ পেয়ে শোধ নিচ্ছে। কাজকর্ম কাকিমাই সামলাচ্ছেন। সেদিন বৃষ্টি থেমে এক ফালি রোদ উঠেছে। বেলা এগারোটা হবে। কাকিমার মুখটা  সকাল থেকে কেমন থমথমে। ব্যস্ততার মধ্যেই একবার এসে মাকে ধরে ধরে উঠানে নিয়ে গিয়ে বসালেন। মার শরীরে খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। কোনও মতে কঁকিয়ে কঁকিয়ে গিয়ে উঠানে একটা জলচৌকিতে বসলেন। কাকীমাকে একবার বলতে শুনলাম, মা-গো, আমার বুক কাঁপছে। কি করে যে বলব কথাটা। আমি বুঝে গেলাম, নিশ্চয়ই দিদিমার কোনও খারাপ খবর এসেছে। মাকে খারাপ খবরটা  জানানো হবে, সেটা সামনে দাঁড়িয়ে দেখার সাহস পাচ্ছিলাম না। আমি ঘরে বসে কান খাড়া করে রেখেছি। একটা গোঙানোর শব্দ পেয়ে বেরোলাম। দেখলাম মা কাকিমার শরীরে মাথা এলিয়ে দিয়েছেন। ভেতর থেকে একটা কান্না উঠে আসছে, কিন্তু দুর্বল শরীরে সেই কান্না মুক্তি পাচ্ছে না। কাকাকে নাকি কেউ খবরটা দিয়েছে। বিস্তারিত  কিছুই জানা যায় নি। খানসেনার ভয়ে গ্রাম শুদ্ধ লোক পালাচ্ছিলেন। অশক্ত দিদিমার পক্ষে সবার সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে চলা সম্ভব ছিল না। পথেই কোথাও তার মৃত্যু ঘটে। ঠিক কবে, তাও জানা যায়নি। পুরুত ডেকে সংক্ষেপে পারলৌকিক কাজগুলো সারা হল। 

শরত হেমন্ত পার করে শীত এসে গেল। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সরাসরি যুদ্ধ লেগে গেল। আমাদের শহরে গিজগিজ করছে সেনাবাহিনীর লোক। পোস্ট অফিসের ঘাটে পাকিস্তানের দিকে তাক করে ট্যাঙ্ক বসানো হয়েছে। আমাদের উঠানেও ট্রেঞ্চ খোঁড়া হয়েছে। রাস্তায় বেরোলে যুদ্ধের হাতে গরম খবর পাই। মাঝে মাঝে পাকিস্তানের বোমারু বিমান করিমগঞ্জের আকাশে হানা দেয়। সাইরেন বাজলে সবাই গিয়ে ট্রেঞ্চে ঢুকে পড়ে। সীমান্তের ওপার থেকে গোলাগুলির আওয়াজ আসে। এক সময় যুদ্ধ শেষ হল। খবরে শোনা গেল পাকিস্তানের কম্যান্ডার ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হল। আমি এক সৌজন্য সফরের সঙ্গী হয়ে সিলেট গেলাম। রাস্তাঘাট তখনও বোমার আঘাতে ক্ষত বিক্ষত। ফিরে এসে কাকাকে খবর দিলাম, সুরমা নদীর ব্রিজ ভাঙ্গা, জোড়নৌকায় করে গাড়ি পারাপার হচ্ছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি কাকারা ফিরে গেলেন তাদের সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া বাংলাদেশে। 

মাঝে মাঝে কাকাদের চিঠি আসত। আমরাও চিঠি লিখতাম। কাকার আরও দুটো ছেলে হয়েছে। ওরাও বড় হয়েছে। কাকা-কাকিমা নেই। খুড়তুতো ভাইবোনদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। আমাদেরও বাবা-মা গত হয়েছেন। চিঠিপত্রের আদান প্রদান কমেছে। তার জায়গা নিয়েছে স্মার্টফোন। ফেসবুক আর ম্যাসেঞ্জারেই এখন যোগাযোগ। খুব দরকারে টেলিফোন। ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট ম্যাচ হলে আমার ভাইগুলো চুটিয়ে বাংলাদেশকে সাপোর্ট করে, আমরা ভারতকে। মাঝে মাঝে আমার মনে পড়ে সেই টান্টুপীরের মাগুর মাছের গল্পটা। আমি এখন গল্পটা বিশ্বাস করি। দেখতেই তো পাচ্ছি, টান্টুপীরের আধখানা হয়ে যাওয়া মাগুর মাছগুলো নিজ নিজ জলাশয়ে দিব্যি বেঁচে আছে। কালো আর নোংরা জলের মধ্যে কী অফুরন্ত প্রাণশক্তি নিয়ে খলবল করছে। 

 

     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>