| 5 মার্চ 2024
Categories
পাঠ প্রতিক্রিয়া সাহিত্য

ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

সোহিনী

১৯২৭ সালের কলকাতা। আমহার্স্ট স্ট্রীটে অবস্থিত সিটি কলেজের রামমোহন হস্টেলের হিন্দু ছাত্ররা বায়না ধরে হস্টেলে সরস্বতী পুজো করতে দিতে হবে। সে সময়ে সিটি কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন হেরম্বচন্দ্র মৈত্র। কলেজের সংবিধান অনুসারে সরস্বতী পুজোর মতন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান করতে দেওয়া চলে না, এই কারণে কর্তৃপক্ষ হস্টেলে পুজো করার অনুমতি দিতে অস্বীকৃত হন। শুরু হয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ছাত্রবিক্ষোভ। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস এই বিক্ষোভে ছাত্রদের পক্ষে পূর্ণ সমর্থন দেন। বিরোধিতা করেন যাঁরা, তাদের মধ্যে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রমুখ। (প্রসঙ্গতঃ, এই ঘটনাটির সময়কালে দেশে হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থান সূচীত হয়েছে, যথাক্রমে ১৯১৫ ও ১৯২৫-এ ‘অখিল ভারত হিন্দু মহাসভা’ ও ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের’ জন্ম হয়েছে।)

ঐ একই বছরে, ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হন দেবব্রত ‘জর্জ’ বিশ্বাস। কিশোরগঞ্জের ব্রাহ্মপল্লীতে তাঁর বড়পিসীমার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতেন। এমন সময় ডাক এল কলকাতা থেকে।

“কলকাতার একজন বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতা (সুভাষ বোস) সব হিন্দু ছাত্রদের ওই কলেজ (সিটি কলেজ) ছেড়ে অন্যান্য কলেজে ভর্তি হবার নির্দেশ দিলেন। ফলে অনেকেই অন্যান্য কলেজে চলে যেতে আরম্ভ করল। সেই সময়ে কলকাতা ব্রাহ্মসমাজ থেকে দেশের সব ব্রাহ্ম ছাত্রছাত্রীদের সিটি কলেজে ভর্তি হয়ে কলেজটিকে টিকিয়ে রাখার আহ্বান জানানো হ’ল।” (উল্লেখ্য, এই ঘটনার জেরে ছাত্র সংখ্যা হ্রাসের ফলে কিছু নবীন অধ্যাপকের চাকরী চলে যায় – তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইংরাজী বিভাগের জীবনানন্দ দাশ। সে বছরই তাঁর প্রথম কবিতা সংকলন, ‘ঝরা পালক’ প্রকাশিত হয়েছে … চাকরী যাওয়ার পর কয়েক বছর তিনি বহু অর্থকষ্টের মধ্যে কাটান।)

যাইহোক, ১৯২৭ সালের শেষ বা ১৯২৮-এর গোড়ার দিকে ময়মনসিংহ কলেজ থেকে ট্রান্সফার নিয়ে সিটি কলেজে ভর্তি হলেন দেবব্রত বিশ্বাস। শুরু হ’ল তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায় … “৪৩ নং কর্নওয়ালিস স্ট্রীটে অবস্থিত অক্সফোর্ড মিশন হস্টেলে থাকবার জন্য একটা ঘর পেয়ে গেলাম। তখনকার দিনে ঘরভাড়া, দু’বেলা খাবার এবং একবেলা টিফিনের জন্য খরচ লাগত মাসে একুশ টাকা।”

তাঁর জীবনের এমনই অনেক ঘটনা এই আত্মজীবনীমূলক বইটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লিখেছেন দেবব্রত বিশ্বাস। কিশোরগঞ্জের এক গোঁড়া ব্রাহ্ম পরিবারে ১৯১১ সালে জন্ম হয় দেবব্রত বিশ্বাসের। বইটির গোড়ার অংশ পড়ে মনে হয় অঞ্চলটি হিন্দুপ্রধান ছিল, ব্রাহ্ম হওয়ার সুবাদে ছেলেবেলা থেকেই তাই সমাজের মূলস্রোত থেকে খানিকটা একঘরে, বা ‘ব্রাত্য’ ছিলেন। মা-পিসিমার মুখে মুখে শিখে ব্রহ্মসংগীত গাওয়ার অভ্যাস ছিল কিশোর বয়েস থেকেই। কলকাতায় এসেও স্বাভাবিকভাবেই তিনি শহরের ব্রাহ্ম সমাজে, বিশেষ করে সমাজের নানান সাংস্কৃতিক কাজকর্মে যুক্ত হয়ে যান।

২১১ নং কর্নওয়ালিস স্ট্রীটে ভাদ্রোৎসবের অনুষ্ঠানে প্রথম রবীন্দ্রনাথ-দর্শন ও তাঁর অসুস্থ ক্ষীণকন্ঠের ব্রহ্মসংগীত শ্রবণ পূর্বক প্রথম দিন থেকেই রবিঠাকুরের ব্যক্তিত্বে গুণমুগ্ধ হন দেবব্রত। ১৯২৮ থেকে শুরু করে কলকাতা শহরে অতিবাহিত প্রথম দশ-পনেরটি বছর বহু স্মরণীয় ঘটনা, আলাপ, বন্ধুত্বের সাক্ষী। বইটিতে সযত্নে, গভীর মমত্বের সঙ্গে সে অধ্যায়টির বর্ণনা করেছেন তিনি। মার্কাস স্কোয়ারের মেসবাড়িতে সন্তোষ সেনগুপ্তের সঙ্গে একই ঘরে থাকতেন এক সময়। ব্রহ্মসংগীত ও ‘রবিবাবুর গান’ (সেকালে ‘রবীন্দ্রসংগীত’ কথাটি প্রচলিত ছিল না) ছাড়াও হিমাংশু দত্ত, শচীন দেব বর্মণ, কে. এল. সাইগলের গান গাইতেন সভা, সমিতি, অনুষ্ঠান, ঘরোয়া আড্ডায়। ১৯৩৩-এ ইকনমিক্সে MA পাশ করে বিনা মাইনেতে হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স কোম্পানীতে চাকরিতে ঢোকেন (চাকরি পাকা হয়েছিল আরো বছর দুই পরে, যদিও মাইনে ছিল যৎসামান্য, তাই টিউশনি করে সে ঘাটতি পুষিয়ে নিতে হত); স্বাধীনতার পর, ১৯৫৬-এ, সমস্ত জীবনবীমা অফিসগুলির জাতীয়করণ হলে কোম্পানীর নাম হয় LIC (Life Insurance Corporation of India) – রিটায়ার করা অবধি ওখানেই চাকরি করেন। বইটি পড়লে বোঝা যায়, প্রফেশনালি নিজেকে ইনসিওরেন্স অফিসের কেরানী হিসেবেই পরিচয় দিতে চেয়েছেন, গায়ক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠা তাঁর কাছে নেহাতই coincidental, পরিকল্পনা করে কখনই তা ঘটেনি (প্রথাগত সঙ্গীত শিক্ষাও তাঁর জীবনে কখনো হয়নি)। LIC-তে থাকাকালীন সহকর্মীদের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল, এবং অফিসকর্মীদের ইউনিয়নে পরবর্তীকালে দলাদলি হয়ে চিড় ধরায় দেবব্রত গভীরভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন – সে অধ্যায়ের কথা বইটির “আমার কেরানী জীবন” পরিচ্ছেদে লিখেছেন।

“তখনকার দিনে ৪৬ ধর্মতলা স্ট্রীটের একটি বাড়ির চারতলার একটি ঘরে বামপন্থীদের একটি মিলনকেন্দ্র ছিল। ওখানে আমি সময় পেলে প্রায়ই যেতাম…অনেক নামজাদা বামপন্থী ইন্টেলেকচুয়্যালদের সঙ্গেও পরিচিত হবার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তাঁরা আমাকে যথেষ্ট ভালোবাসতেন ও স্নেহ করতেন। কিন্তু আমি তাঁদের কাছে বেশি ভিড়তাম না – ভিড়তে সাহসও পেতাম না। কারণ আমার মধ্যে সামান্য ইন্টেলেকচু্য়্যালিসম তখনও ছিল না, এখনও নেই।”- স্বভাবসিদ্ধ বিনম্র আটপৌরে স্মৃতিচারণায় দেবব্রত বিশ্বাস। সময়টা ১৯৩৯। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি তখন বেআইনি। তার কয়েক বছর আগে থেকেই ‘বাঁয়ের রাস্তা’য় হাঁটছেন দেবব্রত – বামপন্থী বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ থেকে শুরু করে গোপনে পার্টির কাজকর্ম করা, আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টির জন্য অর্থসংগ্রহ, গণনাট্য আন্দোলনে যুক্ত হওয়া, গণনাট্য সঙ্ঘের হয়ে গ্রামে গঞ্জে শহরে গণসংগীত গাওয়া… বিশ্বযুদ্ধের বছরগুলোয় আন্তর্জাতিক সমীকরণ-পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের আবহেও হতে থাকে দ্রুত পট-পরিবর্তন। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ, ১৯৪৬-এর ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা… IPTA ও বিজন ভট্টাচার্য্যের নেতৃত্বে মঞ্চস্থ হল নবান্ন নাটক। দেবব্রত তখন গণনাট্য সঙ্ঘের হয়ে কখনো বন্ধুবর জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের লেখা ‘নবজীবনের গান’ গাইছেন, কখনো অনুজপ্রতিম হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ‘মাউন্টব্যাটন মঙ্গলকাব্য’ গাইছেন, কখনো রক্তকরবীতে বিশুপাগলের ভূমিকায় অভিনয় ও গান করছেন।

এল ১৯৪৭, দেশভাগ। দেশভাগের প্রশ্নে ও কংগ্রেস সরকারের নেতৃত্বে ভারতের নবলব্ধ স্বাধীনতার প্রশ্নে কমিউনিস্ট পার্টি তখন জোশী ও রণদিভে গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত। রণদিভে’র মত ছিল, ব্রিটিশ শাসক চলে গিয়ে দেশের পুঁজিবাদী শ্রেণীর প্রতিনিধি কংগ্রেস পার্টির হাতে ক্ষমতার হস্তান্তর বুর্জোয়াশ্রেণীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার স্বপ্ন এনে দিলেও, বৃহত্তর জনগণের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে না – ফলে নেহরুর নীতি সমর্থন করা হবে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে যূপকাষ্ঠে বলি দেওয়ার নামান্তর। অন্যদিকে জোশী গোষ্ঠী ব্রিটিশ শাসনের অবসানে নেহরুর নেতৃত্বে আস্থা রেখে নয়া ভারত তথা নয়া গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা পত্তনের অভিলাষে কংগ্রেস সরকারকে সমর্থনের পক্ষে ছিলেন। জোশী গোষ্ঠীর প্রো-কংগ্রেস অবস্থান দেবব্রত মেনে নিতে পারেননি এবং এই নিয়ে কলকাতার কিছু বামপন্থী বন্ধুদের সঙ্গে (বিনয় রায়, নিরঞ্জন সেন প্রমুখ) তাঁর মতপার্থক্য ছিল।…”সেই সময় বোম্বাই শহরে কমিউনিস্ট পার্টির একটি গোপন মিটিং হয়েছিল। খবর পেয়ে পার্টির তখনকার সেক্রেটারী পি. সি. জোশীর অনুমতি নিয়ে সেই সভায় হাজির হলাম… ওখানে গিয়ে দেখি বিনয় এবং নিরঞ্জনও সেখানে বসে আছে। খুব সম্ভব বি. টি. রণদিভে সেই সভায় বক্তৃতা দিলেন। তিনি Support Nehru Govt. থিসিস্ টি যে ভুল তা প্রমাণ করার জন্য নানা মার্কসীয় দর্শনশাস্ত্র থেকে উদ্ধৃতি দিতে লাগলেন এবং কাউকে তাঁর বক্তব্যের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে শুনলাম না। কমরেড রণদিভে যখন তাঁর কথাগুলি বলে যাচ্ছিলেন তখন দেখলাম বিনয় ও নিরঞ্জন আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে নেড়ে মুচকি মুচকি হাসছিল। সেদিন থেকে কমিউনিস্ট পার্টি তাদের পথও বদলালেন।” … লেখক-বর্ণিত এই মিটিং-টি সম্ভবতঃ কলকাতায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেসের আগের ঘটনা। ১৯৪৮-এর ফেব্রুয়ারীতে কলকাতায় রণদিভে পার্টির নতুন সেক্রেটারী নির্বাচিত হন, ও পার্টি তখনকার মত ‘ইয়ে আজ়াদী ঝুটা হ্যায়’ রায় দিয়ে armed urban insurrection-এর পক্ষে কর্মসূচি গ্রহণ করে।

দেশভাগ দেবব্রতকে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছিল — “যে পূর্ববঙ্গের মাটিতে আমার জন্ম হয়েছিল, যে পূর্ববঙ্গে আমি শিশুকাল থেকে বড় হয়েছি, যে পূর্ববঙ্গে আমার নিজের ঘরবাড়ি আত্মীয়স্বজন রয়েছে, সেই পূর্ববঙ্গ এখন আর আমার স্বদেশ নয় – তা হয়ে গেল বিদেশ – এতে আমার মন একেবারে ভেঙে পড়েছে।” (উল্লেখ্য, ১৯৪৭-এর পর বেশ কয়েকবার লেখক সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেেশ যান ও পরিবার-পরিজন-বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মিলিত হন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামের প্রতি solidarity জানাতে তাঁর অনুরোধে সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর দু’টি গান রচনা করেন, ও লেখক সেগুলি রেকর্ড করেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর নিকট-পরিচিত কিছু মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে ভারত সরকারের প্রতিনিধি হয়ে গান গাইতে গিয়ে তাঁর intensely emotional, অম্লমধুর অভিজ্ঞতার বর্ণনা রয়েছে বইটির শেষ দিকে।)

এই টালমাটালের মধ্যেই HMV থেকে দেবব্রত বিশ্বাসের প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয় – কনক দাসের সঙ্গে দ্বৈতসংগীত। এরপর আরও কিছু একক ও দ্বৈত গানের রেকর্ড বের হয় অনিয়মিত ভাবে। ১৯৬১ সালে, দীর্ঘ কুড়ি বছর বাদে, হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানীর থেকে প্রকাশিত প্রথম রেকর্ডে ছিল রবিঠাকুরেরই দুটি গান – ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ ও ‘যেতে যেতে একলা পথে’।

১৯৬৪ সালে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড থেকে হিন্দুস্থান রেকর্ডিং কোম্পানীর কাছে একটি চিঠি আসে, সে চিঠিতে দেবব্রত বিশ্বাসের রেকর্ড করা দুটি গান (‘এসেছিলে তবু আস নাই’ ও ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’) সম্পর্কে মিউজিক বোর্ডের পরীক্ষকের আপত্তির কথা জানানো হয়। সেকালে রবীন্দ্রনাথের গানের রেকর্ড প্রকাশ করার আগে বিশ্বভারতী-নিয়োজিত অনুমোদকের ছাড়পত্রের প্রয়োজন হত। এক্ষেত্রে গানদুটিকে অনুমোদন করায় আপত্তির কারণ ছিল যথাক্রমে “uncalled for musical interludes…making the production awfully jarring and distorted” ও “awfully melodramatic voice productions. echo-chamber…. utterly spoiled the fine note combinations in the song”। বিষয়টি নিয়ে দেবব্রত বোর্ডের কর্তাব্যক্তি, পরীক্ষক, ও শান্তিদেব ঘোষের সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে মিউজিক বোর্ডের কাছে প্রতিষ্ঠিত করেন যে আপত্তিগুলি যথাযথ নয়; গানগুলিও পরবর্তীকালে অনুমোদন পায়। তবে এই ঘটনার পর থেকে দেবব্রত’র রেকর্ডিং ঘিরে বিশ্বভারতীর পরীক্ষকদের অযৌক্তিক ও অসংগত আপত্তি তোলার ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকে। যেমন, ট্রাডিশনাল যন্ত্রানুসঙ্গের (এস্রাজ, বাঁশি, সেতার, সারেঙ্গী, তানপুরা, বেহালা, দোতারা, একতারা, বাসবেহালা, অরগান, পাখোয়াজ, বাঁয়াতবলা, খোল, ঢোল ও মন্দিরা) ব্যবহার বা চিরাচরিত musical arrangement-এর বাইরে গিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করলেই তা মিউজিক বোর্ডের চোখে “excessive music accompaniment hampering sentiments of the song” হয়ে ওঠে, আবার গায়কীতে গতানুগতিকতার বাইরে পা রাখলে কখনো তা হয়ে ওঠে notation-ভঙ্গের অভিযোগ, কখনো বা অনুমোদিত লয় ভাঙার দোষে দুষ্ট। বিষয়টি নিয়ে এমন তিক্ততার সৃষ্টি হয় যে দেবব্রত রবিঠাকুরের গানের রেকর্ডিং করাই বন্ধ করে দেন।

রেকর্ডিং কোম্পানীর পীড়াপীড়িতে মিউজিক বোর্ডের কর্মকর্তাদের চিঠি ও নির্দেশিকার প্রত্যুত্তরে কয়েকটি দীর্ঘ পত্র লিখেছিলেন গায়ক। তার মধ্যে একটির থেকে সামান্য নমুনা উদ্ধৃত করছি:
“Formerly, in the matter of recording of Tagore songs, it was the function of the Music Board to check up whether there was any deviation from the printed notation. I have thoroughly gone through the works of Tagore and also listened to his speeches relating to this subject but nowhere in his writings I have found the Poet prescribing any limits to “music accompaniment” and also “tempo” for recording of his songs. As such, it occurs to me that the examiner of the Music Board has assumed the role of a “Dictator” and I am not aware since when this dictatorship was introduced in the Music Board.”

এরপর ১৯৭৪ সালে মিউজিক বোর্ডের তৎকালীন সেক্রেটারী নৃপেন্দ্রনাথ মিত্রকে লেখা কয়েকটি দীর্ঘ চিঠি বইটিতে রয়েছে, যেখানে গানে যন্ত্রানুসঙ্গের ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা; পাশ্চাত্য, বিশেষতঃ য়ুরোপীয় সংগীতের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে harmony’র ব্যবহার ও তার মধ্যে দিয়ে শ্রোতাদের emotion ও intellect-কে নাড়া দেওয়া নিয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের মতামত ও এই বিষয়ে তাঁর নিজের দর্শনের কথা লিখেছেন দেবব্রত। (এছাড়া শেষের দিকের লেখা ও চিঠিগুলিতে গান অনুমোদন করা নিয়ে মিউজিক বোর্ডের রাজনীতি, পক্ষপাতিত্ব, ও নাম-না-করে কিছু পরীক্ষকের professional jealousy’র উল্লেখও করেছেন গায়ক।) এই চিঠিগুলি, এবং পরবর্তীকালে তাঁর গানের একনিষ্ঠ ভক্ত ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গোলাম মুরশিদকে লেখা গান-বিষয়ক চিঠিগুলি অবশ্যপাঠ্য। নৃপেনবাবুকে লেখা প্রথম চিঠির শেষের কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি –

“একদা রবীন্দ্রনাথ নাকি বলেছিলেন তাঁর গানই নাকি টিকে থাকবে। কিন্তু “আমাদের মাতামহীর আমলের জীর্ণ কাঁথা দিয়ে ঘিরে রাখলে এবং পলতে করে ফোঁটা ফোঁটা নিয়মের বিধান খাইয়ে” রবীন্দ্রসংগীতকে টিকিয়ে রাখা যাবে এমন কথা রবীন্দ্রনাথ নিজেই ভাবতে এবং বলতে পারেননি। তিনি বরঞ্চ বলেছিলেন –“সুরকারের সুর বজায় রেখেও এক্সপ্রেশনের কমবেশী স্বাধীনতা চাইবার এক্তিয়ার গায়কের আছে।” তিনি বিশ্বাস করতেন বাংলায় গান যে উৎকর্ষ লাভ করবে সে তার আপন রাস্তাতেই করবে, কারও পাথরজমানো বাঁধা রাস্তায় করবে না। বলা বাহুল্য, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ গায়ককে এবং শ্রোতাকেও Expression-এর ব্যাপারে যে বিপুল সাহায্য করে তা শুধু অনুভূতির ব্যাপার–বিশ্লেষণ করে বোঝানো যায় না। পাশ্চাত্য সংগীত বা য়ুরোপীয় সংগীত সম্পূর্ণ বিদেশী — তাকে আয়ত্ত করতে গেলে অনেক বৎসরের সাধনার প্রয়োজন হয়–বুঝতে গেলেও তাই প্রয়োজন। মিউজিক বোর্ডের তালিকাভুক্ত বাদ্যযন্ত্রগুলি ব্যতীত অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র রেকর্ড করার সময় ব্যবহার করলেই Western Influenceএর উৎপাত এসে জুটবে এমন একটি অদ্ভুত ধারণার পেছনে কোনো দ্বিমত্তার পরিচয় আছে কিনা আমি জানি না। যাঁরা Western musicএর পন্ডিত, ব্যাপারটি তাঁদেরও বোধগম্য হবে না বলেই আমার বিশ্বাস।…এই ব্যাপারে যুক্তিহীন কতগুলি নিয়ম যতদিন বলবৎ থাকবে ততদিন নিজেকে দূরে সরিয়েই রাখব।”

মোটকথা বিশ্বভারতীর নিয়মের জাঁতাকলে পড়ে দেবব্রত বিশ্বাসের গায়কজীবন জর্জরিত হয়ে ওঠে। বইটির দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে এই অধ্যায়টির বিশদ বিবরণ ও বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড-হিন্দুস্থান রেকর্ডিং কোম্পানী-দেবব্রত বিশ্বাস ত্রিমুখী পত্রাঘাতের নিদর্শনগুলি হুবহু পেশ করা আছে। তাঁর গানকে ঘিরে যেমন পিউরিটানদের মধ্যে বিতর্ক ছিল প্রচুর, তিনি গান বন্ধ করে দেওয়ায় সাক্ষাৎকারপ্রার্থী পত্রপত্রিকার সাংবাদিকদের আনাগোনা ও ভক্তদের ভালবাসার অত্যাচারের কথা রয়েছে শেষ পরিচ্ছেদগুলিতে।

বইটি পড়ে ব্যক্তি দেবব্রত বিশ্বাসের যে পোর্ট্রেট’টি ফুটে ওঠে তা এক অন্তর্মুখী আত্মপ্রচারবিমুখ ইমোশনাল শিল্পীর, অতিসাধারণ অনাড়ম্বর জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত এক দরদী গায়কের। তাঁর নিজের বয়ান অনুযায়ী – অভিমান নয়, আত্মসম্মানবোধেই তাঁর কন্ঠরোধ করে তাঁকে তাঁর অসংখ্য গুণমুগ্ধ শ্রোতাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য করেছিল – মিউজিক বোর্ডের dictatorship-এর সামনে তিনি মাথা নোয়াননি। কিশোরগঞ্জে কৈশোরের দিনগুলিতে হিন্দু ছেলেদের কাছে ‘ম্লেচ্ছ’ বলে ব্রাত্য হওয়া থেকে শুরু হয়েছিল যে পথ চলা, দেশভাগের পর নিজ জন্মভূমে পরবাসী হয়ে এবং বিশ্বভারতীর দাক্ষিণ্যে আবার সেই ‘ম্লেচ্ছ’ (western-influenced) খেতাব পেয়ে মেইনস্ট্রীম গানের আসরে গলা ছেড়ে গান গাওয়ার অধিকারটিও খুইয়ে ‘আমার কথাটি ফুরলো, নটে গাছটি মুড়লো’র সঙ্গে সঙ্গে এই কেরানী-গায়ক-‘ব্রাত্যজনের’ বৃত্তটি সম্পূর্ণ হয়। বইটিতে গায়কের লেখনশৈলীটি তাঁর গায়কীর মতই একান্ত নিজস্ব স্টাইলে — খোলামেলা, বৈঠকী, informal, কিন্তু কোথায় যেন একটা বাঁধন আছে। লক্ষ্যণীয়, কোথাও তিনি অভিযুক্ত কারুর নাম নিয়ে ব্যক্তিগত শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেননি। যেন আড্ডার ছলে তক্তপোষে বসে বন্ধুবান্ধব পরিবেষ্টিত হয়ে জীবনের নানা গল্প বলে চলেছেন মজলিসি ঢঙে। বলাই বাহুল্য, গল্প বলার ভঙ্গীটি তরতাজা ও উপভোগ্য। উপরন্তু, বইটিতে দেবব্রত বিশ্বাসের বিতর্কিত ও ঘটনাবহুল জীবনের স্মৃতিচারণার পটভূমিকায় সমকালীন কলকাতার একটি অত্যন্ত ব্যক্তিগত সামাজিক-রাজনৈতিক আলেখ্য ধরা পড়েছে।

ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত। দেবব্রত বিশ্বাস। করুণা প্রকাশনী। মূল্য ৫০ টাকা।

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত