| 19 এপ্রিল 2024
Categories
কবিতা সাহিত্য

বর্ষণমুখর দিনে স্মৃতি-বিস্মৃতির একগুচ্ছ বৃষ্টির কবিতা

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট

বাংলার কবিগণ প্রত্যেকে বৃষ্টি নিয়ে একাধিক কবিতা লিখেছেন। বৃষ্টিকে কেউ রোমান্টিক, কেউ যন্ত্রণাদায়ক, কেউ উৎপীড়ক, কেউ অত্যন্ত আদরণীয় বলে মনে করেন। সব কিছুর পরও বৃষ্টি অত্যন্ত নান্দনিক ও রোমাঞ্চকর, এতে কোন সন্দেহ নেই। কবিগণ বৃষ্টিকে নিয়ে যত কবিতা লিখেছেন, অন্য কোন ঋতু নিয়ে এত বেশী কবিতা লেখেননি। বৃষ্টিতে প্রাণের গহীণে আনন্দের উৎসারণ ঘটে, দেদীপ্যমান হয়ে ওঠে অন্য এক অনুভূতি। বৃষ্টির ছোঁয়া হৃদয়কে করে প্রশমিত। স্বর্গীয় এক সুধাধারা নেমে আসে অন্তরে। আজকের আয়োজনে ইরাবতীর পাঠকদের জন্য থাকছে নানা রূপে দেখা বর্ষার একগুচ্ছ কবিতা।


 

 

 

এ ভরা বাদর মাহ ভাদর 

বিদ্যাপতি

এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।
এ ভরা বাদর                        মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর
ঝম্পি ঘন                        গরজন্তি সন্ততি
ভূবন ভরি বরিখিন্তিয়া।
কান্ত পাহুন                        কাম দারুণ
সঘন খরশর হন্তিয়া
কুশিল শত শত                        পাত-মোদিত
ময়ূর নাচত মাতিয়া।
মত্ত দাদুরী                        ডাকে ডাহুকী
ফাটি যাওত ছাতিয়া
তিমির দিগ্ভরি                        ঘোর যামিনী
অথির বিজুরিক পাঁতিয়া।
বিদ্যাপতি কহ                        কৈছে গোঙায়বি
হরি বিনে দিন রাতিয়া

 

 

সোনার তরী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খরপরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।

একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,
চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসীমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাতবেলা–
এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।

গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে,
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ভরা-পালে চলে যায়,
কোনো দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙে দু-ধারে–
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।

ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে,
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুশি তারে দাও,
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে।

যত চাও তত লও তরণী-‘পরে।
আর আছে?– আর নাই, দিয়েছি ভরে।
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে–
এখন আমারে লহ করুণা করে।

ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই– ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
শ্রাবণগগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি–
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।

বর্ষার কবিতা

সুকুমার রায়

কাগজ কলম লয়ে বসিয়াছি সদ্য,
আষাঢ়ে লিখিতে হবে বরষার পদ্য।
কি যে লিখি কি যে লিখি ভাবিয়া না পাই রে,
হতাশে বসিয়া তাই চেয়ে থাকি বাইরে।
সারাদিন ঘনঘটা কালো মেঘ আকাশে,
ভিজে ভিজে পৃথিবীর মুখ খানা ফ্যাকাশে।
বিনা কাজে ঘরে বাঁধা কেটে যায় বেলাটা,
মাটি হল ছেলেদের ফুটবল খেলাটা।
আপিসের বাবুদের মুখে নাই ফুর্তি,
ছাতা কাঁধে জুতা হাতে ভ্যাবাচ্যাকা মূর্তি।
কোনখানে হাটু জল কোথা ঘন কর্দম –
চলিতে পিছল পথে পড়ে লোকে হর্‌দম।
ব্যাঙেদের মহাসভা আহ্লাদে গদ্‌গদ্,
গান করে সারারাত অতিশয় বদ্‌খদ্।

 

 

 

 

বর্ষার প্রার্থনা

জসীমউদ্দীন

 

বেলা দ্বিপ্রহর ধু ধু বালুচর

ধূপেতে কলিজা ফাটে পিয়াসে কাতর

আল্লা মেঘ দে পানি দে ছায়া দেরে তুই।

আসমান হইল টুডা টুডা জমিন হৈল ফাডা

মেঘরাজা ঘুমাইয়া রইছে মেঘ দিব তাের কেডা।

আলের গােরু বাইন্দ্যা গিরস্থ মরে কাইন্দা

ঘরের রমণী কান্দে ডাইল খিচুড়ি রাইন্দা।

আমপাতা নড়ে চড়ে কাডল পাতা ঝরে

পানি পানি কইরা বিলে পানি-কাউরী মরে॥

ফাইট্যা ফাইট্যা রইছে যত খালা-বিলা-নদী

জলের লাইগা কাইন্দা মরে পংখী জলধি৷

কপােত-কপােতী কান্দে খােপেতে বসিয়া

শুকনা ফুলের কড়ি পড়ে ঝরিয়া ঝরিয়া।

 

 

 

 

 

শ্রাবণ-বন্যা 

সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

 

সংকীর্ণ দিগন্ত-চক্র; অবলুপ্ত নিকট গগনে;
পরিব্যাপ্ত পাংশুল সমতা;
অবিশ্রান্ত অবিরল বক্রধারা ঝরিছে সঘনে;
হাঁকে বজ্র বিস্মৃত মমতা;
প্লাবিত পথের পাশে আনত বঙ্কিম তরুবীথি
শিহরিছে প্রমত্ত ঝঞ্ঝায়; নিমজ্জিত প্রহরের বৃতি;
ভেদ নাই ঊষায় সন্ধ্যায়।
পথস্থ কুটিরদ্বারে ভয়ে পান্থ নিয়েছে আশ্রয়;
সিক্ত গাভী ছুটে চলে গোঠে;
কপোত কুলায় কাঁপে; দাদুরী নীরব হয়ে রয়;
পুষ্পবুকে অশ্রু ভ’রে ওঠে;
নিষিক্ত স্তব্ধতা ভেদি, প্রলয়ের হুংকার-রণনে,
পরিপ্লুত নদীর ককল্লোলে,
উন্মাদ শ্রাবণবন্যা ছুটে আসে ভৈরব নিঃস্বনে,
অবরুদ্ধ পরান-পল্বলে।

 

 

 

বর্ষা-বিদায়

 কাজী নজরুল ইসলাম

 

ওগো বাদলের পরী!
যাবে কোন্ দূরে ঘাটে বাঁধা তব কেতকী পাতার তরী!
ওগো ও ক্ষণিকায়, পুব-অভিসার ফুরাল কি আজ তব?
পহিল ভাদরে পড়িয়াছে মনে কোন্ দেশ অভিনব?
 
তোমার কপোল-পরশ না পেয়ে পাণ্ডুর কেয়া-রেণু/
তোমারে স্মরিয়া ভাদরের ভরা নদীতটে কাঁদে বেনু।
 
কুমারী ভীরু-বেদনা-বিধূর প্রণয়-অশ্র“ সম।
ঝরিছে শিশির-সিক্ত সেফালী নিশি-ভোরে অনুপম।
 
ওগো ও কাজল মেয়ে,
উদাস আকাশ ছলছল চোখ তব মুখে আছে চেয়ে।
কাশফুল সম শুভ্র ধবল রাশ রাশ শ্বেত মেঘে
তোমার তরীর উড়িতেছে পাল উদাস বাতাস লেগে।
 
ওগো জলের দেশের কন্যা। তব ও বিদায় পথে
কাননে কাননে কদম-কেশর ঝরিছে প্রভাত হ’তে।
তোমার আদরে মুকুলিতা হয়ে ঊঠিল যে বল্লরী
তরুর কণ্ঠ জড়াইয়া তারা কাঁদে নিশিদিন ভরি।’
 
‘বৌ-কথা-কও’ পাখি
উড়ে গেছে কোথা, বাতায়নে বৃথা বউ করে ডাকাডাকি।
চাঁপার গেলাস গিয়াছে ভাঙিয়া, পিয়াসী মধুপ এসে’
কাঁদিয়া কখন গিয়াছে উড়িয়া কমল-কুমদী দেশে।
 
তুমি চলে যাবে দূরে,
ভদরের নদী দুকূল ছাপায়ে কাঁদে ছলছল সুরে!
 
যাব যবে দূর হিম-গিরি শিল, ওগো বাদলের পরী
ব্যথা ক’রে বুক উঠিবে না কভু সেথা কাহারেও স্মরি?
সেথা নাই জল, কঠিন তুষার, নির্মম শুভ্রতা-
কে জানে কী ভাল বিধুর ব্যথা — না মধুর পবিত্রতা!
সেথা মহিমার ঊর্ধ্বে শিখরে নাই তরলতা হাসি,
সেথা যাও তব মুখের পায়ের বরষা-নূপুর খুলি,
চলিতে চকিতে চমকি’ উঠ না, কবরী উঠে না দুলি।
 
সেথা রবে তুমি ধেয়ান-মগ্না তাপসিনী অচপল,
তোমার আশায় কাঁদিবে ধারায় তেমনি “ফটিক-জল” 

বর্ষা-আবাহন
জীবনানন্দ দাশ

ওই যে পূর্ব তোরণ-আগে
দীপ্ত-নীলে, শুভ্র রাগে
প্রভাত রবি উঠল জেগে
দিব্য পরশ পেয়ে।

নাই গগনে মেঘের ছায়া
যেন স্বচ্ছ স্বর্গ ছায়া
ভূবনভরা মুক্ত মায়া
মুগ্ধ – হৃদয় চেয়ে।

অতীত নিশি গেছে চলে,
চির-বিদায়-বার্তা ব’লে,
কোন আঁধারের গভীর তলে
রেখে স্মৃতি-লেখা।

এস এস ওগো নবীন,
চলে গেছে জীর্ণ মলিন
আজকে তুমি মৃত্যু-বিহীন
মুক্ত-সীমা-রেখা।

 

 

 

ব্যাঙ
বুদ্ধদেব বসু
বর্ষায় ব্যাঙের ফুর্তি। বৃষ্টি শেষ, আকাশ নির্বাক ;
উচ্চকিত ঐকতানে শোনা গেল ব্যাঙেদের ডাক।
আদিম উল্লাসে বাজে উন্মুক্ত কণ্ঠের উচ্চ সুর।
আজ কোনো ভয় নেই– বিচ্ছেদের, ক্ষুধার মৃত্যুর।
ঘাস হ’ল ঘন মেঘ ; স্বচ্ছ জল জ’মে আছে মাঠে
উদ্ধত আনন্দগানে উত্সবের দ্বিপ্রহর কাটে।
স্পর্ষময় বর্ষা এল ; কী মসৃণ তরুণ কর্দম!
স্ফীতকণ্ঠ, বীতস্কন্ধ– সংগীতের শরীরী সপ্তম।
আহা কী চিক্কণ কান্তি মেঘস্নিগ্ধ হলুদে-সবুজে!
কাচ-স্বচ্ছ উর্ধ্ব দৃষ্টি চক্ষু যেন ঈশ্বরের খোঁজে
ধ্যানমগ্ন ঋষি-সম | বৃষ্টি শেষ, বেলা প’ড়ে আসে ;
গম্ভীর বন্দনাগান বেজে ওঠে স্তম্ভিত আকাশে।
উচ্চকিত উচ্চ সুর ক্ষীণ হ’লো ; দিন মরে ধুঁকে ;
অন্ধকার শতচ্ছিদ্র একচ্ছন্দা তন্দ্রা-আনা ডাকে।
মধ্যরাত্রে রুদ্ধদ্বার আমরা আরামে শয্যাশায়ী,
স্তব্ ধ পৃথিবীতে শুধু শোনা যায় একাকী উত্সাহী
একটি অক্লান্ত সুর ; নিগূড় মন্ত্রের শেষ শ্লোক —
নিঃসঙ্গ ব্যাঙের কণ্ঠে উত্সারিত — ক্রোক, ক্রোক, ক্রোক।

বৃষ্টিতে নিজের মুখ

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

অরণ্য, আকাশ, পাখি, অন্তহীন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে–
আকাশ, সমুদ্র, মাটি, অন্তহীন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে–
সমুদ্র, অরণ্য, পাখি, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে
যতই ঘোরাও, আমি কী নতুন দেখব জাদুকর?
যেন দূরদেশে কোন্‌ প্রভাতবেলায়
যেতে গিয়ে আবার ফিরেছি
আজন্ম নদীর ধারে, পরিচিত বৃষ্টির ভিতর।
যেন সব চেনা লাগে। ফুল, পাতা, কিউমুলাস মেঘের জানালা,
সটান সহজ বৃক্ষ, গ্রামের সুন্দরী, আর
নানাবিধ গম্বুজ মিনার।
যেন যত দৃশ্য দেখি আয়নার ভিতরে,
উদ্ভিদ, মানুষ, মেঘ, বিকেলবেলার নদী–
বৃষ্টির ভিতরে সব দেখা হয়, সব
নিজের মুখের মতো পরিচিত। আমি
এই পরিচিত দৃশ্য করবার দেখবে জাদুকর?
আয়নায় জলের স্রোত, অন্তহীন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে
উদ্ভিদ, মানুষ, মেঘ, অন্তহীন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে–
হাতের আমলকীমালা, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে
যতই ঘোরাই, আমি কী নতুন দেখব জাদুকর?
বৃষ্টির ভিতরে সব দেখি যেন, আমি
আজন্ম নদীর ধারে, প্রাচীন ছায়ায়
পাহাড়, গম্বুজ, মেঘ, গ্রামের বালিকা,
দেবালয়, নদীজলে বশংবদ দৃশ্যের গাগরি–
দেখে যাই, যেন সব বৃষ্টির ভিতরে দেখে যাই।
যখন প্রত্যকে আজ দ্বিতীয় স্বদেশে
চলেছে, তখনও দেখি আয়নার ভিতরে জলধারা
নেমেছে রক্তের মতো। যাবতীয় পুরানো দৃশ্যের
ললাটে রক্তের ধারা বহে যায়। আমি
পুরানো আয়নায় কাঁচ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে
নিজের রক্তাক্ত মুখ কত আর দেখব জাদুকর?

বৃষ্টি

অমিয় চক্রবর্তী

কেঁদেও পাবে না তাকে বর্ষার অজস্র জলধারে।
ফাল্গুন বিকেলে বৃষ্টি নামে।
শহরের পথে দ্রুত অন্ধকার।
লুটোয় পাথরে জল, হাওয়া তমস্বিনী;
আকাশে বিদ্যুৎজ্বলা বর্শা হানে
ইন্দ্রমেঘ;
কালো দিন গলির রাস্তায়।
কেঁদেও পাবে না তাকে অজস্র বর্ষার জলধারে।
নিবিষ্ট ক্রান্তির স্বর ঝরঝর বুকে
অবারিত।
চকিত গলির প্রান্তে লাল আভা দুরন্ত সিঁদুরে
পরায় মূহুর্ত টিপ,
নিভে যায় চোখে
কম্পিত নগরশীর্ষে বাড়ির জটিল বোবা রেখা।
বিরাম স্তম্ভিত লগ্ন ভেঙে
আবার ঘনায় জল।
বলে নাম, বলে নাম, অবিশ্রাম ঘুরে-ঘুরে হাওয়া
খুঁজেও পাবে না যাকে বর্ষায় অজস্র জলধারে।
আদিম বর্ষণ জল, হাওয়া, পৃথিবীর।
মত্ত দিন, মুগ্ধ ক্ষণ, প্রথম ঝঙ্কার
অবিরহ,
সেই সৃষ্টিক্ষণ
স্রোত:স্বনা
মৃত্তিকার সত্তা স্মৃতিহীনা
প্রশস্ত প্রচীর নামে নিবিড় সন্ধ্যায়,
এক আর্দ্র চৈতন্যের স্তব্ধ তটে।
ভেসে মুছে ধুয়ে ঢাকা সৃষ্টির আকাশে দৃষ্টিলোক।
কী বিহ্বল মাটি গাছ, দাঁড়ানো মানুষ দরজায়
গুহার আঁধারে চিত্র , ঝড়ে উতরোল
বারে-বারে পাওয়া, হাওয়া, হারানো নিরন্ত ফিরে-ফিরে-
ঘনমেঘলীন
কেঁদেও পাবে না যাকে বর্ষায় অজস্র জলধারে।

 

 

 

 

বর্ষা

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

কালো মেঘের ফিটন চ’ড়ে
কালীঘাটের বস্তিটাতেও বর্ষা এল।
সেখানে যত ছন্নছাড়া গলিরা ভিড় ক’রে
খিদের জ্বালায় হুগলি-গঙ্গাকেই
রোগা মায়ের স্তনের মতো কামড়ে ধ’রে
                        বেহুঁশ প’ড়ে আছে।

আষাঢ় এসে ভীষণ জোরে দুয়ারে দিল নাড়া—
শীর্ণ হাতে শিশুরা খোলে খিল॥

 

 

 

 

বৃষ্টি 

শঙ্খ ঘোষ

আমার দু:খের দিন তথাগত

আমার সুখের দিন ভাসমান

এমন বৃষ্টির দিন পথে পথে

আমার মৃত্যুর দিন মনে পড়ে।

আবার সুখের মাঠ জলভরা

আবার দু:খের ধান ভরে যায়

এমন বৃষ্টির দিন মনে পড়ে

আমার জন্মের কোনো শেষ নেই।

 

 

 

যদিও মেঘ চাই

প্রেমেন্দ্র মিত্র

 

হয়তো আকাশে শুধুই মেঘ চরাই,
কখনো বৃষ্টি কখনো আলো ছড়াই
            অথবা রং চড়াই ।
            তবুও ভেবো না ভেবো না
            যার যা খাজনা দেবো না ;
খেতের ফসল আমিও কেটেছি
            শূন্য নয় মরাই ।

যদিও বাঁধন না মেনে হই উধাও,
গরল যেমন তেমন চাখি সুধাও,
             কিংবা যা-কিছু দাও ।
             তবুও ভেবো না ভেবো না,
             মেলায় মুজরো নেবো না ;
দল-ছাড়া  ব’লে বদলেছি কি না
             ও-কথা মিছে শুধাও ।।

 

 

 

 

 

বৃষ্টি চিহ্নিত ভালবাসা 

আবুল হাসান

মনে আছে একবার বৃষ্টি নেমেছিলো?

একবার ডাউন ট্রেনের মত বৃষ্টি এসে থেমেছিল
আমাদের ইষ্টিশানে সারাদিন জল ডাকাতের মতো
উৎপাত শুরু করে দিয়েছিল তারা,
ছোটখাটো রাজনীতিকের মত পাড়ায় পাড়ায়
জুড়ে দিয়েছিল অথই স্লোগান।

তবু কেউ আমাদের কাদা ভেঙে যায়নি মিটিংয়ে
থিয়েটার পণ্ড হলো, এ বৃষ্টিতে সভা আর
তাসের আড্ডার লোক ফিরে এলো ঘরে ;
ব্যবসার হলো ক্ষতি, দারুণ দুর্দশা,

সারাদিন অমুক নিপাত যাক, অমুক জিন্দাবাদ
অমুকের ধ্বংস চাই বলে আর হাবিজাবি হলো না পাড়াটা।

ভদ্র শান্ত কেবল কয়েকটি গাছ বেফাঁস নারীর মত
চুল ঝাড়লো আঙিনায় হঠাত বাতাসে আর
পাশের বাড়িতে কোনো হারমোনিয়ামে শুধু উঠতি এক আগ্রহী গায়িকা
স্বরচিত মেঘমালা গাইলো তিনবার !

আর ক’টি চা’খোর মানুষ এলো
রেনকোট গায়ে চেপে চায়ের দোকানে ;
তাদের স্বভাবসিদ্ধ গলা থেকে শোনা গেল:
কী করি বলুন দেখি, দাঁত পড়ে যাচ্ছে, তবু মাইনেটা বাড়ছে না,
ডাক্তারের কাছে যাই তবু শুধু বাড়ছেই ক্রমাগত বাড়ছেই
হৃদরোগ, চোখের অসুখ !

একজন বেরসিক তার মধ্যে বলে উঠলো:
বৃষ্টি মানে বুঝলেন তো, অযথাই যানবাহন পয়সা খরচ !

একজন বাতের রোগী গলা কাশলো:
ওহে ছোকরা, নুন চায়ে লেবুর টুকরোটা একটু বড়ো করে দিও।

তাদের বিভিন্ন সব জীবনের খুটিনাটি দুঃখবোধ সমস্যায় তবু
সেদিন বৃষ্টিতে কিছু আসে যায়নি আমাদের
কেননা সেদিন সারাদিন বৃষ্টি পড়েছিলো,
সারাদিন আকাশের অন্ধকার বর্ষণের সানুনয় অনুরোধে
আমাদের পাশাপাশি শুয়ে থাকতে হয়েছিলো সারাদিন

আমাদের হৃদয়ে অক্ষরভরা উপন্যাস পড়তে হয়েছিলো।

 

 

স্টেশন ভাসিয়ে বৃষ্টি

শক্তি চট্টোপাধ্যায়

মনে পড়ে স্টেশন ভাসিয়ে বৃষ্টি রাজপথ ধ’রে ক্রমাগত
সাইকেল ঘন্টির মতো চলে গেছে, পথিক সাবধান…
শুধু স্বেচ্ছাচারী আমি, হাওয়া আর ভিক্ষুকের ঝুলি
যেতে-যেতে ফিরে চায়, কুড়োতে-কুড়োতে দেয় ফেলে
যেন তুমি, আলস্যে এলে না কাছে, নিছক সুদূর
হয়ে থাকলে নিরাত্মীয় ; কিন্তু কেন? কেন, তা জানো না।
মনে পড়বার জন্য? হবেও বা । স্বাধীনতাপ্রিয়
ব’লে কি আক্ষেপ? কিন্তু বন্দী হয়ে আমি ভালো আছি।
তবু কোনো খর রৌদ্রে, পাটকিলে কাকের চেরা ঠোঁটে
তৃষ্ণার চেহারা দেখে কষ্ট পাই, বুঝে নিতে পারি
জলের অভাবে নয়, কোন টক লালার কান্নায়
তার মর্মছেঁড়া ডাক; কাক যেন তোমারই প্রতীক
রূপে নয়, বরং স্বভাবে – মনে পড়ে, মনে পড়ে যায়
কোথায় বিমূঢ় হয়ে বসে আছো হাঁ-করা তৃষ্ণায়!

বর্ষা-স্বপন

শিবরাম চক্রবর্তী

 

ওগো সেদিন গগন পারে—
        পাগল মেঘে বাদল এল
        হেথায় কাহার খোঁজ সে পেল
                নেবে এল ধারার পথে
                        ধরার অভিসারে!
শ্রাবণ ধারার সুরে সুরে
কোন্ সে সুদূর বঁধুর পুরে
        পেতে কি ধন ফিলছিল মন
                সে কোনে জনার আশে—
                ঘন বাব্ লা বনের পাশে
                        ভরা পাগ্ লা নদীর ধারে!
আমি হঠাৎ পেলাম তারে
আমার আঁধার কুটীর-দ্বারে
একটী চাওয়াই ঘা দিল মোর
                        হৃদয়-তন্ত্রীটারে!
        ও তোর বিজলী-চমক্ চাওয়া
        সাথে বর্ষা মেঘের হাওয়া
                        মেঘকালো তার চুলে
        কোমল বাদল হাওয়া দুলে—
        তার ঐ বর্ষা বেশের রূপে
        কখন হারিয়ে গেলা চুপে
                কথা হয়নি কিছুই ভুলে!
        দেখি শূন্য ঘরের কাছে
        শুধু দাগ্ টী পায়ের আছে!
        ও সেই সিক্ত পায়ের ছাপে—
        বৃথাই পারণ আমার কাঁপে!
        কখন্ মিলিয়ে গেছে সে যে
                        ঘন শ্রাবণ প্লাবন ধারে!

 

 

 

মেঘবালিকার জন্য রূপকথা

জয় গোস্বামী

আমি যখন ছোট ছিলাম
খেলতে যেতাম মেঘের দলে
একদিন এক মেঘবালিকা
প্রশ্ন করলো কৌতুহলে

“এই ছেলেটা,
.                         নাম কি রে তোর?”
আমি বললাম,
.                          “ফুসমন্তর !”

মেঘবালিকা রেগেই আগুন,
“মিথ্যে কথা । নাম কি অমন
হয় কখনো ?”
.                      আমি বললাম,
“নিশ্চয়ই হয় । আগে আমার
গল্প শোনো ।”

সে বলল, “শুনবো না যা-
সেই তো রাণী, সেই তো রাজা
সেই তো একই ঢাল তলোয়ার
সেই তো একই রাজার কুমার
পক্ষিরাজে
শুনবো না আর ।
.                               ওসব বাজে ।”

আমি বললাম, “তোমার জন্য
নতুন ক’রে লিখব তবে ।”

সে বলল, “সত্যি লিখবি ?
বেশ তাহলে
মস্ত করে লিখতে হবে।
মনে থাকবে ?
লিখেই কিন্তু আমায় দিবি ।”
আমি বললাম, “তোমার জন্য
লিখতে পারি এক পৃথিবী ।”

লিখতে লিখতে লেখা যখন
সবে মাত্র দু-চার পাতা
হঠাৎ তখন ভুত চাপল
আমার মাথায়-

 

খুঁজতে খুঁজতে চলে গেলাম
ছোটবেলার মেঘের মাঠে
গিয়েই দেখি, চেনা মুখ তো
একটিও নেই এ-তল্লাটে

একজনকে মনে হল
ওরই মধ্যে অন্যরকম
এগিয়ে গিয়ে বলি তাকেই !
“তুমি কি সেই ? মেঘবালিকা
তুমি কি সেই ?”

সে বলেছে, “মনে তো নেই
আমার ওসব মনে তো নেই ।”
আমি বললাম, “তুমি আমায়
লেখার কথা বলেছিলে-”
সে বলল, “সঙ্গে আছে ?
ভাসিয়ে দাও গাঁয়ের ঝিলে !
আর হ্যাঁ, শোন-এখন আমি
মেঘ নই আর, সবাই এখন
বৃষ্টি বলে ডাকে আমায় ।”
বলেই হঠাৎ এক পশলায়-
চুল থেকে নখ- আমায় পুরো
ভিজিয়ে দিয়ে-
.                        অন্য অন্য
বৃষ্টি বাদল সঙ্গে নিয়ে
মিলিয়ে গেল খরস্রোতায়
মিলিয়ে গেল দূরে কোথায়
দূরে দূরে…।

“বৃষ্টি বলে ডাকে আমায়
বৃষ্টি বলে ডাকে আমায়-”
আপন মনে বলতে বলতে
আমিই কেবল বসে রইলাম
ভিজে একশা কাপড়জামায়
গাছের তলায়
.                         বসে রইলাম
বৃষ্টি নাকি মেঘের জন্য

এমন সময়
অন্য একটি বৃষ্টি আমায়
চিনতে পেরে বলল, “তাতে
মন খারাপের কি হয়েছে !
যাও ফিরে যাও-লেখ আবার ।
এখন পুরো বর্ষা চলছে
তাই আমরা সবাই এখন
নানান দেশে ভীষণ ব্যস্ত
তুমিও যাও, মন দাও গে
তোমার কাজে-
বর্ষা থেকে ফিরে আমরা
নিজেই যাব তোমার কাছে ।”

 

এক পৃথিবী লিখবো আমি
এক পৃথিবী লিখবো বলে
ঘর ছেড়ে সেই বেড়িয়ে গেলাম
ঘর ছেড়ে সেই ঘর বাঁধলাম
গহন বনে
সঙ্গী শুধু কাগজ কলম

একাই থাকব । একাই দুটো
ফুটিয়ে খাব—
.                    দু এক মুঠো
ধুলো বালি-যখন যারা
আসবে মনে
.                   তাদের লিখব
লিখেই যাব !

এক পৃথিবীর একশোরকম
স্বপ্ন দেখার
সাধ্য থাকবে যে-রূপকথার—
সে রূপকথা আমার একার ।

ঘাড় গুঁজে দিন
.                       লিখতে লিখতে
ঘাড় গুঁজে রাত
.                      লিখতে লিখতে
মুছেছে দিন—মুছেছে রাত
যখন আমার লেখবার হাত
অসাড় হল,
.                    মনে পড়ল
সাল কি তারিখ, বছর কি মাস
সেসব হিসেব
.                       আর ধরিনি
লেখার দিকে তাকিয়ে দেখি
এক পৃথিবী লিখব বলে
একটা খাতাও
.                       শেষ করিনি ।

সঙ্গে সঙ্গে ঝমঝমিয়ে
বৃষ্টি এল খাতার উপর
আজীবনের লেখার উপর
বৃষ্টি এল এই অরণ্যে
বাইরে তখন গাছের নিচে
নাচছে ময়ূর আনন্দিত
এ-গাছ ও-গাছ উড়ছে পাখি
বলছে পাখি, “এই অরণ্যে
কবির জন্যে আমরা থাকি ।”
বলছে ওরা, “কবির জন্য
আমরা কোথাও আমরা কোথাও
আমরা কোথাও হার মানিনি—”

কবি তখন কুটির থেকে
তাকিয়ে আছে অনেক দূরে
বনের পরে, মাঠের পরে
নদীর পরে
সেই যেখানে সারাজীবন
বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে,
সেই যেখানে কেউ যায়নি
কেউ যায় না কোনদিনই—
আজ সে কবি দেখতে পাচ্ছে
সেই দেশে সেই ঝরনাতলায়
এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ায়
সোনায় মোড়া মেঘহরিণী—
কিশোর বেলার সেই হরিণী।

 

 

 

 

বর্ষার কবিতা, প্রেমের কবিতা

মহাদেব সাহা

 

বৃষ্টির কথা থাক, বিরহের কথা বলি।
শুনাই দুজনে বিদ্যাপতির বিষণ্ন পদাবলী,
বর্ষার কথা থাক, বকুলের কথা বলি।
ঝরা বকুলেই ভরে রাখি এই প্রশস্ত অঞ্জলি।
আকাশের কথা থাক, হৃদয়ের কথা শুনি।
যদিও বিরহ তবু মিলনের স্বপ্নজালই বুনি,
অশ্রুর কথা থাক, আবেগের কথা শুনি-
সহস্র রাত কেটে যাক
দূর আকাশের তারা গুনিব।
গরিমার কথা থাক, বিনয়ের পাঠ ধরি।
কলহের কোনো কাজ নেই, কিছু করুণার গান করি।
বিদ্যার কথা থাক, প্রেমের কবিতা পড়ি।
চারদিকে এই জলধারা তবু সৃষ্টির দ্বীপ গড়ি।
এ বর্ষণ এ গর্জন
মুহম্মদ নূরুল হুদা

গনগনে চুল্লি যারা বসিয়েছে দরিয়ার বুকে
তারা কারা, তারা কারা?
এখানে এসেছে কেন? কেন তারা খাড়া?

দিন নেই রাত নেই কেন তারা খোঁড়ে?
খুঁড়তে খুঁড়তে তারা ফুঁড়ে আসে কোন সে পাতাল?
তাদের আগুনে কেন মৎস্যনাভি,
শেওলার সবুজিমা পোড়ে?

সামান্য ধীবর-গোত্র, আমাদেরও বুকে এসে লাগে সেই তাপ
স্রোতের তরঙ্গ-ভঙ্গে পলকেই পড়ে ফেলি সব মতলব;
মালো যদি ভ্রাত্য আমাদের, জন্মে জন্মে দিয়েছেন বর
জলদেব খোয়াজ খিজির; হিম্মতে রেখেছে বেঁধে জালোর কলব।

তরল অনল যদি খুঁড়ে নিতে চাও, দাও ন্যায্য দাম;
আমরা পাহারা দেই জলশস্য, মাছেদের ঘাম,
আমরা পাহারা দেই ঘাটে ঘাটে বদর মোকাম।

এ সমুদ্র বাষ্প-মেঘ; মেঘের বর্ষণে যদি সব একাকার,
জলপুত্র জলকন্যা, আমাদের অস্ত্রে জ্বলে জলের হুঙ্কার।

শুনে সেই হাঁক
ঘূর্ণিঝড়ে দৈত্যের ডানায়
আগুনে বর্ষণ নামে নীল দরিয়ায়;
এ বর্ষণ এ গর্জন
সূর্যোদয় সূর্যাস্তের সীমানা ছাড়ায়।

 

 

 

 

মেঘ বলল যাবি ?

শুভ দাশগুপ্ত

মেঘ বলল যাবি ?
অনেক দূরে গেরুয়া নদী
অনেক দূরের একলা পাহাড়
অনেক দূরের গহন সে বন
গেলেই দেখতে পাবি , যাবি?
জানলা দিয়ে মুখ ঝুকিয়ে
বলল সে মেঘ
যাবি ? আমার সঙ্গে যাবি ?
দিন ফুরিয়ে রাত ঘনাবে
রাত্রি গিয়ে সকাল হবে
নীল আকাশে উড়বে পাখি
গেলেই দেখতে পাবি ,যাবি ?
শ্রাবণ মাসের একলা দুপুর

মেঘ বলল যাবি? আমার সঙ্গে যাবি?

কেমন করে যাবরে মেঘ, কেমন করে যাব ,
নিয়ম বাঁধা জীবন আমার
নিয়ম ঘেরা এধার ওধার
কেমন করে নিয়ম ভেঙ্গে এ জীবন হারাব

কেমন করে যাবরে মেঘ কেমন করে যাব ?

মেঘ বলল দূরের মাঠে বৃষ্টি হয়ে ঝরব
সবুজ পাতায় পাতায় ভালবাসা হয়ে ঝরব
শান্ত নদীর বুকে আনব জলচ্শাসের প্রেম
ইচ্ছে মত বৃষ্টি হয়ে ভাঙব, ভেঙ্গে পরব

এই মেয়ে, তুই যাবি? আমার সঙ্গে যাবি?

যাব না মেঘ ,পারব নারে যেতে
আমার আছে কাজের বাঁধন ,
কাজেই থাকি মেতে
কেবল যখন ঘুমিয়ে পরি তখন আমি যাই
সীমার বাঁধন ডিঙিয়ে দৌড়ে একছুটে পালাই
তখন আমি যাই….
সবপনে আমার গেরুয়া নদী
সবপনে আমার সুনীল আকাশ
সবপনে আমার দূরের পাহাড়
সবকিছুকে পাই …
জাগরনের এই যে আমি ক্রীতদাসের মতন
জাগরনের এই যে আমি এবং আমার জীবন
কাজ অকাজের সুতোয় বোনা মুখোশ ঘেরা জীবন
তবুরে মেঘ যাব
একদিন ঠিক তোরই সঙ্গে
শ্রাবণ হাওয়ায় নতুন রঙ্গে
যাবরে মেঘ যাব
সেদিন আমি শিমুল পলাশ ভিজব বলে যাব
পাগল হাওয়ায় উতল ধারায়
আমায় খুঁজে পাব
যাবরে মেঘ যাব, যাবরে মেঘ যাব, যাবরে মেঘ যাব l

ছায়া
কামাল চৌধুরী

শরীরময় অশরীরী কোন ছায়াটা তোমায় দেব
কোথায় গেলে দেখতে পাবে পথের ধূলির অনুসরণ
বাতাসমুখী বৃষ্টি ফোঁটা শ্যামা পাখির বর্ষাতিতে
কোন বাউলের অধীর গলা নিশীথে সুর জাগানিয়া।

ভাগ করেছি নিজের ছায়া শরীরে আজ বিহঙ্গকাল
পালকখানি উড়িয়ে দিয়ে ভ‚ত মিশেছে ভবিষ্যতে
হাত পেতেছি বর্তমানে উপচে পড়ে তীর্থ-ভাষা
রাতবিরেতে পালের নেশা ভাসিয়ে রাখে কীর্তিনাশা।

 

 

 

 

বর্ষার চিঠি

শ্রীজাত

সোনা, তোমায় সাহস করে লিখছি। জানি বকবে
প্রিপারেশন হয়নি কিচ্ছু। বসছি না পার্ট টুতে
মাথার মধ্যে হাজারখানেক লাইন ঘুরছে, লাইন
এক্ষুনি খুব ইচ্ছে করছে তোমার সঙ্গে শুতে

চুল কেটে ফেলেছ? নাকি লম্বা বিনুনিটাই
এপাশ ওপাশ সময় জানায় পেন্ডুলামের মতো
দেখতে পাচ্ছি স্কুলের পথে রেলওয়ে ক্রসিং-এ
ব্যাগ ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছ শান্ত, অবনত

এখানে ঝড় হয়ে গেল কাল। জানলার কাচ ভেঙে
ছড়িয়ে পড়েছিল সবার নোংরা বিছানায়
তুলতে গিয়ে হাত কেটেছে। আমার না, অঞ্জনের
একেকজনের রক্ত আসে একেক ঝাপটায়

সবাই বলছে আজও নাকি দেদার হাঙ্গামা
বাসে আগুন, টিয়ার গ্যাস, দোকান ভাঙচুর
কিন্তু আমি কোনও আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি না
বৃষ্টি এসে টিনের ছাদে বাজাচ্ছে সন্তুর…

ঝালা চলছে। ঘোড়া যেমন সমুদ্রে দৌড়য়
ভেতর-ভেতর পাগল, কিন্তু সংলাপে পোশাকি…
তুমিই উড়ান দিও, আমার ওড়ার গল্প শেষ
পালক বেচি, আমিও এখন এই শহরের পাখি

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত