৩০৪নং কেবিন (পর্ব-৬)

দুপুরে এন্টিবায়োটিকটা দেবার সময় আবার চ্যানেল জ্যামবেশ কয়েকবার ডিস্টিল ওয়াশে কাজ না হওয়ায় একটা ইনজেকসন দিয়ে চ্যানেল ক্লিয়ার করা হলএই একটি ওষুধ শরীরে যাবার সময় খুব কষ্ট হয়যদি বা সেটা সামলে নেওয়া যায়, তারপরের অবস্থা বেশ করুণচোখ জ্বালা করে, কোনোভাবেই ঘুম আসে নাএকটা আনচান ভাবঅস্থির লাগে এইসময় ইচ্ছে করে কোনো ঠান্ডা জিনিস খেতে

শুনে রিনাদি হেসেই অস্থির এত জ্বর নিয়ে ভরতি হলে, বুকে সর্দি বসে কী অবস্থা তোমার আর তুমি ঠান্ডা খাবে! বলিহারি শখ তোমার! 

রিনাদিকে বলে মেঘ, ঠান্ডা খাওয়ার সঙ্গে ঠান্ডা লাগার কোনো সম্পর্ক নেই

সে যাই বলো দিদি, ডাক্তার নাই বলবে

মেঘ কথা বাড়ায় না কত জ্বর নিয়ে ভরতি হয়েছিলাম মনে করার চেষ্টা করে১০১-০২-০৩ . . . মনে করতে পারছি না

শেষে তার কাছেই জানতে চায়, কত জ্বর নিয়ে ভরতি হয়েছিলাম তুমি জানো ? 

ওরে বাবা! আমার তো সেদিন জেনারেল ওয়ার্ডে ডিউটিসিস্টার বলল, একজন পেশেন্ট কেবিনে আসছে, শিগগিরই এসো রোজই তো কত পেশেন্ট আসে-যায়এত বছর ধরে দেখছিতাতে আর উতলা হবার কী আছে! ধীরে সুস্থে এলামড্রেস পালটে দেব বলে গায়ে হাত দিতে গিয়ে দেখি গা পুরো পুড়ে যাচ্ছে অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারলাম ১০৪ এর মতো জ্বর

রিনাদির কথা শুনে চমকে উঠল মেঘ এত জ্বর ছিল আমার? কবে এলো? কখন এলো? তার আগেই তো কম্পিউটারে  সোমার সঙ্গে কাজ করেছি রাত অবধি বসেবাড়ি ফিরে জ্বর এসছিলকিন্তু এতটা? 

রিনাদি আবার বলে, ড্রেস ছাড়াব কী! আগেই বরফ জল দিয়ে জলপট্টি, সিস্টার দিদিরা স্যালাইন শুরু করে দিলতোমার তো কোনো সেন্সই ছিল না

সেকি! সেন্স ছিল না? একটা কাটা কাটা টুকরো টুকরো ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে , শুয়ে আছি , গায়ে চাপা দিয়েজিয়া এসেছিল, কিছু বলছিল, তারপর. . . তারপর. . . না , মনে পড়ছে না

রিনাদি বলে, একটা কথা বলি দিদি, কিছু মনে কোরো না, তুমি প্রায় মরেই এসেছিলেখুব অত্যাচার করো নিজের উপর তাই না? 

মেঘ হাসে প্রায় মরে এসেছিলাম, আর এখনো বেঁচে আছে . . মজা লাগে কথাটায়হঠাৎই চিৎকার করে গান গাইতে ইচ্ছে করে-  ইচ্ছে ! –ইচ্ছে !/সেই তো ভাঙছে, সেই তো গড়ছে,/সেই তো দিচ্ছে নিচ্ছে।।/সেই তো আঘাত করছে তলায়, সেই তো বাঁধন ছিঁড়ে পালায়/বাঁধন পরতে সেই তো আবার ফিরছে।।

রিনাদি মেঘের হঠাৎ করে এত খুশির কারণ ধরতে পারে নাখালি বলে, তোমার তো মেয়ে আছে রোজ দেখি শুকনো মুখ করে আসেআমার সঙ্গে কত কথা বলেখুব ভালো মেয়েতোমার মতই ওর মুখের দিকে চেয়ে নিজের যত্ন নিও

রিনাদি চলে যায়

শ্রাবণী দি আসেআসা মাত্র মেঘ সারা ঘর জুড়ে মাছের আঁশটে গন্ধ পায় সে হাতে থম্বোকল লাগিয়ে বলে, আহারে কত ফুলে গেছে

মেঘ ভাবে এত আঁশটে গন্ধ কেন?  এ’কদিনে প্রতিটি আয়া, এ্যাটেনডেন্ট, সিস্টার, এমনকি ডায়েটিসিয়ান, সুইপার সবার গায়ের নানা গন্ধের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেছে সে

রাতের বেলা সিস্টার স্বপ্না দিদির গা দিয়ে ফগ পারফিউমের গন্ধ নাকে আসে ঠোঁটে পুরু লাল লিপস্টিক দেওয়া দিদি এসেই বলে, কেমন আছেন? 

আমি বলি, বাড়ি যাব

তিনি বলেন, বাড়ি তো যাবেই কিন্তু কোর্স টা কমপ্লিট করে না গেলে আবার রিভাইভ করবেইআমার মায়েরও হয়েছিল এমনজোর করে বাড়ি চলে গেল দুদিন বাদে আবার ভরতি করতে হলতখন সেরিব্রাল হয়ে গেল

তোমার বাড়িতে কে কে থাকেন? মেঘ জানতে চায়

শ্বশুর বাড়িতে শাশুড়ি, বরআর বাপের বাড়িতে মামাকে নিয়েই চিন্তা তারপরেই কথা ঘুরিয়ে বলে, তুমি পুরো কোর্স কমপ্লিট করে তবেই বাড়ি যাবেএই ওষুধটা বাড়িতে দেওয়া খুব কষ্টের

মেঘ মনে মনে বলে, সেতো রোজ টের পাচ্ছি এই ওষুধ দেবার পরই চ্যানেল জ্যামপ্রতিদিন আলাদা আলাদা জায়গায় চ্যানেল হচ্ছে একটু হেসে ঘাড় নাড়ে

একঘর সুন্দর গন্ধ ছড়িয়ে দিদি চলে যান

সিস্টার ঊষাদি আসেন হাসিমুখে জানতে চান, কেমন আছো ? 

মেঘ বলে, বেশ ভালো

বাঃতাহলে আর চিন্তা নেইএবার বাড়ি চলে যাবে

মেঘ ক্লান্ত স্বরে বলে, আপনারা তো আটকে রেখেছেন ভালোবেসেছাড়ছেনই না

ঊষাদি বলেন, ভালোবাসি কথাটা ঠিকআপনি ভালোবাসার মতোই কিন্তু তা বলে এখানে রেখে দিয়ে ভালবাসি বলতে চাই নাযত তাড়াতাড়ি ছাড়া পাওয়া যায় ততই মঙ্গল

ম্লান মুখে হাসে মেঘ ঊষাদির গায়ের নোনতা গন্ধ আর উষ্ণতা সে দূর থেকে টের পায় ঠিক যেমন পায় মৌমিতা নামে সিস্টারের মাতৃসুলভ গন্ধ২৩ বছরের মৌমিতার চোখ দুটো অজস্র কথা বলেপ্রেসার, টেম্পারেচার, পালসরেট মাপার পর চ্যানেল পরীক্ষা করে যখন বলে, ঠিকই তো আছোতখন ভীষণ মায়ের কথা মনে পড়ে

কিন্তু এই শ্রাবণীদির গায়ের গন্ধ কারোর সঙ্গে মেলে না

মেঘ গল্প করতে শুরু করে মন বলে, এ শুধু আয়া মাসি নয়অন্য কোনো কাজও করে

কথায় কথায় উঠে আসে , খড়দার বাসিন্দা সেবর মাছ বিক্রি করেযেদিন ভালো বিক্রি হয় না সেদিন সে আয়ার কাজ করে

মেঘের মনে পড়ে যায় মেছুনি আর ফুলওয়ালির গল্পটাসেই যে বিছানা পরিবর্তন করে তাদের ঘুম আসছিল নাতারপর মেছুনি তার মাছের ঝুড়ি আর ফুলওয়ালি তার ফুলের ঝুড়ি মাথার সামনে রেখে ঘুমিয়ে ছিল

তার গায়ের গন্ধে বমি আসে , উঠে গিয়ে বমি করে বার তিনেকতারপর চুপিচুপি সিস্টারকে বলে, আমি মাছ খাই না, ওনার গায়ে খুব মাছের গন্ধ

সিস্টার বুঝে যান মেঘের কথা শ্রাবণীদি চলে যায় আসে তনুশ্রীমুখে পানপরাগ মেঘ ভীষণ বকেরোগী দেখছ, আর নিজেই এসব খেয়ে নিজের ক্ষতি করছ! 

সে থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে আসে

মেঘ বলে, আমার ঘরে থাকতে হলে এসব খাবে না

সে মাথা নাড়েবিকেল থেকে তাকে আর দেখা যায় না

এই কদিনে কত অভিজ্ঞতা জড়ো হয় মেঘ দুপুরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সিস্টার সুজাতার মায়ের মশলা পেষাবার গন্ধ পায় চোখের সামনে দেখে উঠোন জুড়ে জিড়ে, ধনে, শুকনো লঙ্কা , হলুদ বিছানোরোদে শুকিয়ে ঝেড়ে বেছে মাসিমা মশলা পেষাচ্ছেন হামান দিস্তে দিয়ে

সুজাতা বলে, এই হালে মা মিক্সি নিয়েছেতাও বলে বলেবয়স হয়েছে তো, আর পারে! কিন্তু খুঁতখুঁত করে, মশলা নাকি মিক্সিতে ভালো গুঁড়ো হয় না

মেঘের মায়ের কথা মনে পড়ে মা হাতে শিল নোড়া দিয়ে ডাল বাটছে, বড়া হবেপোস্তর টেস্ট আসে না মিক্সিতে বাটলেঅতগুলো মানুষের রান্না হবে, মায়ের সেই হাতে বাটা কাপড়ে লেগে থাকা মশলার গন্ধ হঠাৎ করে নাকে ভেসে আসে

মেঘ চোখ বুজে সেই মাকে দেখতে পায় ওই তো লাল ছাপা শাড়ি, উঁচু করে খোপা বাঁধা মা উনুনে জ্বাল দিচ্ছে , চোখ জ্বলে যাচ্ছে ধোঁয়ায়মা ফুঁ দিয়ে দিয়ে আগুন বের করছে মেঘের ভীষণ ইচ্ছে করে ছুট্টে গিয়ে পিছন থেকে মাকে জড়িয়ে ধরতে আর তখনি সব দৃশ্য উধাও হয়ে যায়

রিনাদি বলে ওঠে, দিদি উঠে বসোডাক্তার বাবু এসেছেন

দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মেঘ ফিরে আসে এই ৩০৪ নং কেবিনে

 

 

 

 

 

 

 

.

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত