| 2 মার্চ 2024
Categories
গদ্য সাহিত্য

প্রাগের কবরখানা (সেমেট্রি অফ দ্য প্রাগ)

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

সদ্য প্রয়াত ইতালীয় লেখক উমবার্তো ইকোর ষষ্ঠ উপন্যাস ‘দ্য প্রাগ সেমেট্রি (ইল সিমিতেরো দি প্রাগা)’ ২০১০ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত হয় । এক বছরের মাথায় রবার্ট ডিক্সন বইটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন। ২০১২ সালে ইণ্ডিপেণ্ডেন্ট ফরেন ফিকশন প্রাইজের জন্য মনোনীত এই বইটিকে ‘দ্য নেম অফ দ্য রোজে’র পর ইকোর সেরা উপন্যাস বলে বিবেচিত।
আখ্যানের মূল চরিত্র হচ্ছেন সিমোন সিমোনিনি নামে এক ব্যক্তি যাকে লেখক ইকোর দাবি অনুযায়ীই বিশ্ব সাহিত্যেও ইতিহাসের অন্যতম প্রধান কয়েকটি সন্দেহবাতিকে ভোগা এবং অসুখী চরিত্রের একটি হিসেবে তিনি তৈরি করতে চেয়েছেন (গোটা উপন্যাসে সিমোনিনিই একমাত্র কাল্পনিক চরিত্র)। ১৮৩০ সালে তুরিনে সিমোনিনের জন্ম। তার শৈশবেই সে মাতৃহারা হয় এবং ঐক্যবদ্ধ ইতালীর জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে তার বাবা মারা যায় ১৮৪৮ সালে। তার পিতামহ এক প্রতিক্রিয়াশীল বৃদ্ধ যে জেসুইট শরণার্থীদের আশ্রয় দেয় এবং ইহুদিদের ঘৃণা করে- পিতামহের দাবি মতে ফরাসী বিপ্লবের পরিকল্পনা এসেছিল নাইটস টেম্পলার, ব্যাভারিয়ান ইল্যুমিনাতি, জ্যাকোবিন সমাজতন্ত্রী এবং সর্বোপরি ইহুদিদের মাথা থেকে। এহেন পিতামহের কাছে মানুষ হয় সিমোনিনি। 
সিমোনিনি  যৌবনে আইনের ছাত্র হন। পিতামহের মৃত্যুর পর এক অসৎ আইনজীবীর কাছে সে কাজ নেয় যে তাকে শেখায় দলিল জাল করার বিদ্যা। দলিল জাল করায় অর্জিত কুশলতার কারণে দ্রুতই সিমোনিনি পিয়েডমন্ট সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার নজওে পড়েন। ১৮৩০ সালে গ্যারিবল্ডি তার ‘সহস্র লাল শার্টে’র বাহিনী সহ সিসিলি আক্রমণ করলে সিমোনিনিকে পালের্মোতে পাঠানো হয় যেন সে গ্যারিবল্ডির আন্দোলন নিয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করতে পারে। এই কাজে গিয়ে সিমোনিনি আবিষ্কার করেন যে গ্যারিবল্ডির সহস্র লাল শার্টের যোদ্ধারা মূলত: ছাত্র, স্বাধীন কারিকর এবং ক্ষুদ্র নানা পেশাজীবী সম্প্রদায়ের মানুষ; এদের কেউই কৃষক নয়। সিসিলিয় কৃষকরা এই বাহিনীকে যে সাহায্য করছিল তা’ দেশপ্রেম নামের কোন উচ্চ ভাবনার সাথে সম্পর্কিত নয়। নিছকই শোষক ভূস্বামী এবং সরকারী প্রশাসকদের অত্যাচার থেকে বাঁচার প্রয়াস। সত্যি বলতে গ্যারিবল্ডির নিজেরই সমাজ বিপ্লবের কোন ইচ্ছা ছিল না এবং জোতদারদের সাথে দাংগারত কৃষকদের লড়াইয়ের এক পর্যায়ে গ্যারিবল্ডি উল্টো ভূস্বামীদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। পিয়েডমন্ট রাজ্য ইতালীর সংযুক্তিকরণকে সতর্কতার সাথে সমর্থন দিলেও ভেতরে ভেতরে তাদেও এই ভয় থাকে যে গ্যারিবল্পির খ্যাতি তাদের সম্রাট ভিত্তারিও ইমানুয়েলকে দ্রুতই ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ইকোর নায়ক এরপর ঘটনাপ্রবাহে আলেক্সান্দর দ্যুমা এবং ইতালীয় দেশপ্রেমিক নিনো বক্সিও এবং ইপ্পোলিটো নিয়েভোর সাথে দেখা করেন। সিমোনিনিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল নিয়েভোর কাছে থাকা নানা নথি-পত্র ধ্বংস করার জন্য। সেই নির্দেশ পালন করতে গিয়ে সিমোনিনি নিয়েভোর জাহাজ উড়িয়ে দেন। জাহাজের সবাই নিহত হন। আদেশ পালন করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করার জন্য সিমোনিনিকে পাঠানো হয় প্যারিসে।
প্যারিসে সিমোনিনি পৌঁছন ১৮৬১ সালে যেখানে গল্পের বাকি অংশটুকুর কাহিনী ডালপালা ছড়িয়েছে। প্যারিসে প্লাস মোবার্তের পাশে একটি পুরণো এবং সস্তা এ্যান্টিকসের দোকানের উপরে সিমোনিনি তার দলিল-পত্র জাল করার ব্যবসা খুলে বসে। ফরাসী গোয়েন্দা বাহিনীর জন্য দলিলপত্র জাল করা এবং আলোকচিত্র ঠিকঠাক করার কাজও তিনি শুরু করেন। পরবর্তী পঁয়ত্রিশ বছর তিনি তৃতীয় নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিপ্লবীদের জন্য নানা ফাঁদ ফাঁদেন এবং পারি কমিউনের যাবতীয় তথ্য গোয়েন্দা বিভাগকে পাচার করেন।
উপরোক্ত সব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিদিনের জীবন নির্বাহে যাবতীয় বিল পরিশোধে সিমোনিনি সক্ষমতা অর্জন করেন আর পারেন ভাল-মন্দ খাবার আগ্রহ মেটাতে। তবে একটি সম্মানজনক পেনশনের সাথে অবসর গ্রহণের তার ইচ্ছা ছিল। তিনি পরিকল্পনা করেন ‘প্রটোকলস অফ দ্য এল্ডার্স অফ জায়ন’ নামে একটি কুখ্যাত দলিল তৈরি করার যা দেখাবে যে কিভাবে ইহুদিরা বিশ্ব আধিপত্য করায়ত্ত্ব করার চেষ্টা চালাচ্ছে। আলেক্সান্দার দ্যুমার উপন্যাস জোসেফ বালসামো থেকে প্রথম এমন একটি ভাবনা মাথায় আসে তার, এবং তারপর একে একে ইউজিন স্যুয়ের লে মিস্ত্রেস দ্যু পিউপল, মরিস জলির ডায়ালগ ইন হেল বিট্যুইন মেকিয়াভেলি এ্যাণ্ড মন্টেস্কু এবং প্র“শিয়ান গোয়েন্দা হারম্যান গোয়েদশের উপন্যাস বিয়াররিতজ থেকে অনুপ্রাণিত হন।
 এই উপন্যাসের একটি বড় অংশই ১৮৯৭ সালে সিমোন সিমোনিনি কর্তৃক দিনপঞ্জি আকারে রচিত। সিমোনিনি এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দ্যাখেন তিনি তার স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন এবং বুঝতে পারেন যে ভয়ানক কিছু ঘটেছে। কিছুদিন আগে তিনি নিয়মিত যেখানে খেতে যেতেন সেই শে ম্যাগনি রেস্তোরাঁয় সালপেত্রিয়েহ হাসপাতালে অধ্যয়ণরত এক তরুণ ডাক্তারের সাথে তার পরিচয় হয়েছিল।  যুবকের নাম ‘ফ্রোইদ (অথবা এমন কিছু একটা’ বলে তার মনে পড়ে যাকে তিনি জীবনের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতাগুলো ভোলার জন্য কথা বলতে বলেছিলেন। দ্রুতই জীবনের সব স্মৃতি পুনরুদ্ধারের ভরসায় সিমোনিনি দিনপঞ্জি লেখার সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর প্রতিদিন নিজের জীবনের কাহিনী লম্বা সময় ধরে সিমোনিন লিখতে থাকেন। কখনো কখনো অত্যধিক পরিশ্রমের ক্লান্তি বা মদের আধিক্য থেকে ঘুমিয়ে পড়েন। প্রতিবারই জেগে ওঠার সময় আবিষ্কার করেন যে আবে দাল্লা পিক্লোলা নামে কেউ তার দিনপঞ্জিতে নতুন কিছু যোগ করেছে যে সিমোনিনির জীবন সম্পর্কে সত্যিই অনেক কিছু জানে। দাল্লা পিকোল্লার আবার পাল্লাদিসম, ফ্রিম্যাসোনারি, শয়তান উপসানা এবং ক্যাথলিক চার্চকে জড়িয়ে নিজেরই অনেক গল্প বলার আছে যেখানে জড়িত রয়েছে লিসিয়ুক্সের সন্ত থেরেসে, ইউলিয়ানা গ্লিংকা, পিওতর রাচোকোভস্কি, ডায়ানা ভোঘাম এবং উনিশ শতকের অন্যতম সেরা প্রতারক লিও টাক্সিলের মত চরিত্ররা। 
ইকোর নিজের মতে, ‘এই উপন্যাসের চরিত্ররা কেউই কাল্পনিক নয়। শুধুমাত্র মূল চরিত্রটি ছাড়া সবাই বাস্তবে বাস করতেন, এমনকি খোদ পিতামহের চরিত্রটি পর্যন্ত যিনি ছিলেন এ্যাবট বারুয়েলের কাছে নানা রহস্যময় বার্তা রচিয়তা যা আধুনিক যুগের এই ইহুদি-বিদ্বেষের জন্ম দিয়েছে।’
উনিশ শতক পরিপূর্ণ ছিল অসংখ্য দানবীয় এবং রহস্যজনক ঘটনায়: ইপ্পোলিটো নিয়েভোর রহস্যময় মৃত্যু, প্রটোকলস অফ দ্য এল্ডার্স অফ জায়ন নামে একটি ভুয়া দলিল যা হিটলারকে ইহুদি হত্যায় প্ররোচিত করে। 
ইকো উপন্যাসটি উনিশ শতকের আরো নানা গ্রন্থের সাথে মিশিয়েছেন। আলেক্সান্দর দ্যুমার উপন্যাস জোসেফ বালসামো (১৮৪৬)-র মতই এই উপন্যাসটিও ইন্টারটেক্স্যুয়ালিটিকে ধারণ করেছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত