শহর জীবন

 

শহরের এক কোণে থাকা হয় বটে। কিন্তু শহরটাকে তো কিছু হলেও চিনি। জন্মের পর থেকেই এই শহরটা চোখের সামনে। এতটুকু না চিনলে তো বড় অন্যায়। কার প্রতি? শহর,না আমার নিজের? তা জানিনা। তবে ঘরে বসে যে আর ভাল লাগে না তা বুঝি। একটা সময় প্রতিনিয়ত সকাল-সন্ধ্যা দৌড়োতে দৌড়েতে হাফ ধরে যেতো। কিন্তু এখন এই বন্দী জীবন কাটাতে কাটাতে মনে হয়, সেই কি ভাল ছিল না? বৈচিত্র্য ছিল জীবনে। প্রতিদিন ছিল নিত্য-নতুন। কোন না কোন নতুন মুহুর্ত জন্মের আশা ছিল। এখন তো একই সব। ঘুমোও, খাও, জিরোও! কাজ, সিনেমা, বই।

প্রতি রাত শেষ হলে একই রকম ভোর, একই রকম দিন। কোন হেরফের যে পাইনা। এরচেয়ে আমার ট্রাফিক ঠেলে শহর বেড়ানোও খুব ভাল। আমার প্রতিদিনের বাসে ওঠার প্রতিযোগীতা ভাল। বনানীর ট্রাফিকের সাথে রাস্তার পাশের নার্সারী, সেই কড়ই গাছ আর আকাশ দেখা ভাল। বিজয় স্মরণী একবারে পেরুনোর আনন্দ যে আবার কবে পাবো! সকাল নয়টার ক্লাস না ধরতে পেরে ক্যান্টিনের চা সিঙ্গারা খেতে বসে যেতাম একাই আবার ক্লাসের হুটহাট আড্ডা। সেই প্রথম বর্ষেরর ম্যাটারিয়ালস এর ম্যামের হাসিটা। এখনো যে ভাল লাগে। ক্লাস শেষ হতো একেকদিন একেক সময়। আর নিউমার্কেট, বলাকা সিনেমার ভিড় একেক দিন একেক রকম। নীলক্ষেতের ঠাসা ঠাসা পুরনো বইয়ের গন্ধ যে আর নাকে আসে না। ফেরার সময়টা খুব ট্রাফিকের। তবে সে সময় বান্ধবীর সাথে লুডুটা খুব জমতো। কয়েক দান খেলে আমরা বাসের ময়লা সিট গুলোয় হেলান দিয়ে এক ঘুমে বাড়ির কাছাকাছি পৌছে যেতাম।
মাঝে মাঝে, নীলক্ষেত থেকে হাঁটা দিতাম। টিএসসি বসে চা-আড্ডায় কখন সময় চলে যেতো কেউ টেরও পেতাম না। ছোট ছোট কয়েকটা বাচ্চা আসতো, আপু ফুল নিবেন? কখনো কখনো কিনেই ফেলতাম। ফুল যে খুব পছন্দ আমার। হাতে, মাথায় দিয়ে বসে থাকতাম। একদিন খুব বৃষ্টি। টিএসসির মাঠে সবাই ভিজে একাকার। কাকভেজা হয়ে ক্যাফেটেরিয়ার এক টাকার চা আর সিঙ্গাড়া খেতে খেতে ফ্যানের নিচে জামা শুকাচ্ছিলাম।
আবার কখনো উদ্যানে যেতাম। বসে থাকতাম। আড্ডা দিতাম। চারুকলা যেতাম। চারুকলার কাঠগোলাপের সাথে খুব সখ্য। কেন কি জানি। ওখান থেকে শাহবাগের দোতালা বাসের একদম সামনের দুটো সিট। বনানী ফ্লাইওভার দিয়ে যখন বাসটা এগুতো, বাতাসে চুল উড়তো। একপাশের রেললাইন ধরে আবার ট্রেনও ছুটে চলতো। একেকটা বিকেল ছিল নিকুঞ্জে আড্ডার বিকেল। চা, ফুচকা খেতে খেতে কখন সন্ধ্যা গড়াতো কারোর খেয়ালই থাকতোনা।

ধানমন্ডিতে প্রতি শুক্রবারের ছায়ানট। গত দুই বছর ধরে। আলাদা জগত যেনো! গানের সাথে মিশে যাওয়া। ছায়ানট শেষে আমরা খুব আড্ডা দিতাম। শংকরের চা আর চপ। একা থাকলে সোজা চলে যেতাম বেঙ্গল বই। সারাদিন বসে বই পড়ার মজাই আলাদা। মাঝে একদিন আমরা সিনেমায় গিয়েছিলাম। একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে বের হয়ে সোজা সরোবর। মালাই চা আর বৃষ্টি। এর তুলনা হয়?
আর একদিন বেইলি রোড ঘুরে এসেছিলাম। চিরচেনা স্কুলের সামনের রাস্তা দিয়ে রিক্সায় ঘুরছিলাম। বান্ধবী আমাকে ফুচকা খাওয়ালো, বই কিনে দিলো, আরো কত কি। কলেজের দিনগুলোয় কি কম করেছি এসব। স্মৃতির তো শেষ নেই।

একদিন পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে হেঁটেছি। কাচ্চি বোরহানি ফালুদা কি না খেয়েছি। রোদ উপেক্ষা করে গোলাপি প্রাসাদও দেখে এসেছিলাম একবার।
শহরের ট্রাফিক, ভিড়, চা, আড্ডা, গান, কাঠগোলাপ, বই আবার ফিরুক না। আমার শহরটা ফিরুক। কত শত মুহুর্ত আরো তৈরি হোক। এই বন্দী শহরটা একদিন মুক্ত হবে। শহরটার অলিগলিতে মুহুর্ত তৈরির কারখানায় আবার ফিরে যাবো। শহরটা মুক্ত হলে প্রাণভরে শুধু বাঁচবো…।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত