| 16 এপ্রিল 2024
Categories
ইতিহাস

ইতিহাস: চার্লস স্টুয়ার্ট : এক কৃষ্ণভক্ত ইউরোপিয়ান

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

শনিবারের ‘এই সময়’ পেপারটা খুলেই চোখে পড়লো খবরটা।
“সাউথ পার্ক স্ট্রিট সমাধিক্ষেত্র থেকে খোয়া গেল চার্লস স্টুয়ার্টের সমাধির কারুকার্যে ব্যবহৃত কালো পাথরের তৈরি একটি পদ্মের মোটিফ।”

মা কে ডেকে বললাম, “দেখো মা, কি বাজে একটা চুরি হয়েছে এখানে। আমি কয়েকদিন আগেই তো গেছিলাম, তখনও ছিল।”
“হ্যাঁ… মনে পড়ছে… হিন্দু স্টুয়ার্টের সমাধি। তুই ফটো তুলেছিলি।” – মা বললো।
“ভীষণ সুন্দর এই সমাধিটা। মন্দির-মসজিদ-গির্জা, তিনটের আদল রয়েছে এই সমাধিতে… ” – আমি বললাম। “এটাকে দেখলে তোমার মনে হবে, এটা একটা ছোট পঞ্চরত্ন মন্দির। একটা সুন্দর আর্চ আছে সামনে। চারটে উড়িষ্যা রেখা দেউল, কেন্দ্রীয় গম্বুজকে ঘিরে রেখেছে। এই আর্চটার ঠিক মাঝামাঝি ছিল এই পদ্মফুলটা… আর গেলে দেখতে পাবো না…”

মা হাতের কাজটা সেরে, আমার পাশে বসলো। বললো – “এই লোকটা হিন্দুধর্মকে ভালোবেসে, নিজেকে অনেক বদলে ফেলেছিল রে… আমি জানি ওনার সম্পর্কে…”
“বলো না মা, আমিও জেনে নিই তোমার থেকে…” – আমি বললাম।

মা বলা শুরু করলো – “তখন সবে পলাশীর যুদ্ধ শেষ হয়েছে। বাংলার অধিকার নিয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। বাংলায় প্রচুর সেপাই নিয়োগ করেছিল এই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, যাদের মধ্যে ছিল প্রচুর ভারতীয় সেপাই। চার্লস স্টুয়ার্ট ছিলেন এই সেনাবাহিনীর এক উচ্চপদস্থ সেনানায়ক।

১৭৫৮ সালে জন্ম হয় এই আইরিশ সেনানায়কের। বাবা ছিলেন টমাস স্মিথ, আর মা ছিলেন এলিজাবেথ। তার যখন ১৯ বছর বয়স, তখন সেনাবাহিনীতে চাকরি নিয়ে, কলকাতায় চলে আসেন চার্লস। আমৃত্যু তিনি ভালোবেসে গেছেন এই দেশকে।

কৃষ্ণভক্তির রসে মজে গেছিলেন স্টুয়ার্ট। প্রতিদিন সকালে ধুতি, পাঞ্জাবি আর উত্তরীয় পরে, খালি পায়ে, কপালে রক্তচন্দনের টিকা লাগিয়ে, একটি কৃষ্ণবিগ্রহ নিয়ে গঙ্গাস্নানে যেতেন তিনি। পরম যত্ন করে, তিনি গোপালের স্নান করান, গা মোছেন, সেবা করেন। তৎকালীন সময়ে বহু বাঙালি লোকজন ইউরোপিয়ান আদব-কায়দা রপ্ত করছেন, অনেকে তো ধর্ম পরিবর্তন করছেন, আর এই সময়ে এক সাহেব, হিন্দুধর্মের জয়ধ্বজা বহন করছেন! এই ব্যপারটা সবাইকে খুবই অবাক করতো! এছাড়াও তিনি বিদেশি সিপাহিদের বলতেন, যাতে তারা দেশীয় পোশাক পড়েন, আর সেরকম বেশ-ভূষা করেন। তিনি সবসময় চেষ্টা এ, যাতে দেশি ও বিদেশি সিপাহিদের মধ্যে কোনো বৈষম্য না থাকে। এই সব কাজের জন্য, তাকে একবার সাসপেন্ড করা হলেও, ভারতীয় সিপাহিদের প্রবল জনপ্রিয়তার কারণে, তাকে ফিরিয়ে আনা হয়, আর প্রমোশন দিয়ে মেজর জেনারেল করা হয়।

নিয়মিত লিখতেন তিনি “দা টেলিগ্রাফ” কাগজে। ভারতীয় শাড়ি নিয়ে তিনি মন্তব্য করেছিলেন – “elegant, simple, sensible and sensual.”
হিন্দুদের বিচার নামের একটা আর্টিকেলে তিনি বলেছেন – “আমি আমার চারপাশে দেখি, হিন্দু পুরাণের বিশাল সমুদ্রের মধ্যে, আমি ধার্মিকতা আবিষ্কার করি… নৈতিকতা… এবং যতটা আমি আমার বিচারের উপর নির্ভর করতে পারি, এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, এবং নৈতিক আল্লাজিরির যথেষ্ট ব্যবস্থা যে বিশ্বের কখনও উৎপাদিত হয়েছে।”

আমি বলে উঠলাম – “খুবই রহস্যময় যে, একজন আইরিশ বংশোদ্ভূত হয়েও, তৎকালীন সময়ে কোণঠাসা হয়ে যাওয়া হিন্দুধর্মের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। সমগ্র ভারতবাসীর কাছে, এমনকি ইউরোপিয়ানদের কাছেও তিনি হিন্দু স্টুয়ার্ট নামে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। ১৮২৮ সালে ওনার মৃত্যুর পরে, কৃষ্ণভক্ত এই সাহেবকে তার প্রিয় গোপালের সাথেই সমাধিস্থ করা হয়, আর বানানো হয় এই সুন্দর স্মৃতিসৌধটি…”

“স্টুয়ার্ট কিন্তু একজন ইতিহাসপ্রেমী ছিলেন…” – মা বলতে শুরু করলো আবার। “প্রচুর প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করে, তার উড স্ট্রিটের বাড়িতে একটি দারুন সংগ্রহশালা বানান। কতো কষ্ট করে, তৎকালীন সময়ে তিনি এই জিনিসগুলো সংগ্রহ করেছিলেন, তা জাস্ট ভাবা যায় না! বর্তমানে এগুলো প্রদর্শিত হচ্ছে ব্রিটিশ মিউসিয়ামে।”

“আর আজকে দেখ, সবাই তো ওনাকে ভুলে তো গেছেই, সাথে ওনার কবর থেকেই জিনিস খুলে নিয়ে যাচ্ছে!” খুব দুঃখের সাথে, চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলে, উঠে পড়লো মা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত