চতুষ্পদ

 

 

এক।।


অনেকদিন পর ঘরের বাইরে পা রেখে আমার খুব ফুরফুরে লাগছে। একা একা বের হতে পারা, গলির মাথায় দোকানঘরের আড্ডা পেরিয়ে এমনকি তিন সাধুর মাঠ অব্দি চলে যেতে পারার মধ্যে যে একটা স্বাধীনতার ভাব থাকে সেটা বোধ হয় সবাই জানতেও পারে না। জানার জন্য বছরখানেক ঘরে বন্দি থাকতে হয়, অন্যের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করতে হয়। আমার মতো আর কেউ জানবে কী করে!


বের হতে পেরে আমার অবশ্য এসব ভাবতে ইচ্ছে করে না। আমি গা দুলিয়ে হেঁটে যাই। নানান ভঙ্গিতে পা ফেলি পাথরকুচি রাস্তায়। নিজেই নিজের কৌতুকে মিটিমিটি হাসতে থাকি। সারি সারি রেইনট্রির ফাঁকে রোদের ফিতেগুলো তিরতির করে কাঁপছে। আমি একটা রেইনট্রির শরীরে হেলান দিয়ে দাঁড়াই। আরাম আরাম রোদে ভাতঘুম পেয়ে যায় আমার। দূরে ‘বৈভ্রাজ’ একাবোকা দাঁড়িয়ে আছে। আমার বড় ভাল লাগে বৈভ্রাজের ঝুলবারান্দাটা দেখতে। এবারের শীতে প্রায় দিনই শালমুড়ি দিয়ে ওই বারান্দায় বসে গরম গরম চায়ের সাথে মটরশুঁটি ভাজা, ফুলুরি খেয়েছি।


এই যে আমি বেরিয়ে এসেছি ঘর থেকে, আর ফিরব না বলে,সবাই কত মন খারাপ করবে সেসব এখন মনে এলো না আমার। শুধু মিনু মাসীর তৈরি করা ফুলুরি কিংবা পাটিসাপটার জন্য, একরত্তি বিকেলগুলোর জন্যই মনটা দুম করে খারাপ হয়ে গেল। আমি কি স্বার্থপর? নাকি বোকা? ঘরের মানুষগুলোর জন্য শত চেষ্টা করেও এতটুকু টান কেন বোধ করি না আমি!


রেইনট্রির ছায়া বদলে গিয়ে মানুষ হয়ে যায়, কাঁধে হাত রেখে বলে-চলো এবার, আর ফেরার সময় নেই। আমি মাথা নেড়ে সায় দিই। আবার হাঁটতে থাকি। কতকাল এমন পথে পা রাখিনি আমি। গত একবছরের স্মৃতি বলতে চতুষ্পদ যন্ত্রটাই কেবল চোখে ভেসে উঠে। এর আগের সুস্থ সবল দিনগুলি যেন গতজন্মের আবছায়া ধূসর স্মৃতি। আমার গল্পটা নতুন করে শুরু হয়।  আমি একা নই , গল্পের চরিত্রেরা পিছু নেয় আমার।

 

অলস দিনগুলিতে মনে মনে গল্প লিখতাম আমি। ঘুমোবার আগে এটা একটা মজার খেলা ছিল। ইচ্ছে মতো গল্প ভাবতাম। যা-ইচ্ছে-তাই! মাঝেমাঝে ঘুম ভেঙ্গে ঠিক থৈ পেতাম না। ভাবনার স্রোত ধরে দুলতে দুলতে ঠিক কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি তার দিশ পেতে হিমশিম খেতে হতো।


জৈবযৌগের ক্লাসে অদিতি ম্যা’ম প্রতিদিন দাঁড় করিয়ে রাখতেন আমাকে। খুব একটা খারাপ ছাত্র ছিলাম না। তবু তখন আমার কী যেন হয়ে যেত! মাথায় কিছু ঢুকতো না, গলা শুকিয়ে আসতো। অদিতির শাড়ির টেম্পল পাড়, দোলনখোঁপা কিংবা ভ্রুসঙ্গমে একবিন্দু টিপ গল্পের নতুন এক একটা বাঙময় দৃশ্য তৈরি করতো। শুধু আমি হয়ে উঠতাম নির্বাক দর্শক।

 

আমরা যখন সেকেন্ড ইয়ার অদিতি গোলদারের তখন নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে। এক সপ্তাহ ছুটি কাটিয়ে কলেজে এসেছেন। হয়তো মধুচন্দ্রিমায় গিয়েছিলেন। ছেলেরা ফিসফাস করতো। ‘ঘাড়ে কিসের দাগ রে? কিসের!’ হেসে গড়াগড়ি দিত ওরা। এইসব ইঙ্গিতে কান লাল হয়ে যেতো আমার। গুরুজনকে নিয়ে কেউ এমন বলে? আমি বাঁধা দিতাম।

 

আমার আপত্তি শুনে ওরা আরো মজা পেত । ‘তুই প্রেমে পড়ছোস নি? ছ্যাঁক খাইছোস!’ মাথা গরম করে একদিন মারতে গিয়েছিলাম ওদের। পরিণাম খুব একটা ভাল হয়নি। উচ্ছৃঙ্খল আচরণের জন্য সবার বাড়িতে খবর দেয়া হলো। বাবা কলেজে এসে সবার সামনে আমার কান মলে দিয়েছিল।

 

এরপর আমি আর কলেজে যাইনি। শুরুতে সবাই ভেবেছে আমি লজ্জায় কলেজে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। অদিতি গোলদারের সাথে জড়িয়ে কিছু ছেলে আজেবাজে কথাও রটিয়েছিল। আমার তাতে অপমান লেগেছে। দু’দিন নিজের ঘর থেকে বের হইনি। তারপর এলো জ্বর, তেড়েফুঁড়ে। সেই যে বিছানায় পড়লাম আর উঠে দাঁড়াইনি। মাস পেরুলে বন্ধুরা দেখে গেছে আমাকে। এমনকি একদিন অদিতি গোলদারও এসেছিলেন। আমি ততদিনে হাসপাতালে ভর্তি,চলৎশক্তিহীন।


আমার গল্পেও অদিতি আসেন। আয়তচোখের কাজলরঙা দৃষ্টি মেলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন।


রসায়নটা আমি ঠিক বুঝি না..

এত ক্লাস কামাই করলে বুঝবে কী করে! তোমার কী হয়েছিল পল্লব?

ভাইরাস জ্বর

তাতে এমন পঙ্গু হয়ে যায় কেউ?

ডাক্তার বলেছে এক হাজারে একজনের এমন হতে পারে!

তুমি হাজারে একজন!

তুমিও অদিতি!


মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে অদিতি গোলদার আমাকে রসায়নের এক একটা অধ্যায় পড়াতে শুরু করেন। গল্পেও আমি বরাবরের মতো অন্যমনস্ক থাকি। বুনো লতাপাতার জংলা ঘ্রাণ নাকেমুখে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অদিতির পাশে হাঁটতে হাঁটতে এঁদোপুকুরে বাসি শালফুলের ভেসে যাওয়া দেখি আমি। অদিতির চুড়ির রিনিকি বাতাসে জলতরঙ্গ হয়ে বাজে। আমার আর রসায়নে মন দেয়া হয় না।

 

 

দুই।।

 

 

প্রথমবার ‘বৈভ্রাজ’ এর সামনে এসে দাঁড়াতেই আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। এই শহরতলিতে আমাদের এমন একটা বাড়ি আছে অনুমান করতে পারিনি। বাবা বহুবার চেয়েছে আমাদের সবাইকে নিয়ে এখানে বেড়াতে আসতে। কিন্তু সামনে পরীক্ষা, ক্লাস মিস হবে, বাসা ফাঁকা রেখে যাওয়া যাবে না ইত্যাদি শহুরে ব্যস্ততার অজুহাতে এত বছরেও আমরা আসতে পারিনি।


নেমপ্লেটে ‘বৈভ্রাজ’ নামটা আর রঙচটা দেয়ালের খসে পড়া পলেস্তারা আমার বুকটা আরো ভারী করে দিয়েছিল। হুইল চেয়ারের পেছনে ইন্দু ফিসফিস করে বলেছিল -পল্লব! তোমাদের বাড়িটা এত সুন্দর!


ইন্দু, ইন্দিরা গোমেজ তখনো আমার গল্পের আরেকটা চরিত্র হয়ে উঠেনি। ওকে আমার দেখাশোনার জন্য রাখা হয়েছিল। মা ছোট ভাইবোন দুটোকে নিয়ে এত ব্যস্ত থাকতো যে আমার যত্ন নেয়া তার পক্ষে অসম্ভব ছিল। ডাক্তাররা বলেছিল প্রতিদিন পায়ের ব্যায়াম করাতে হবে, শুয়ে থেকে থেকে যেন বুকে কফ জমে না যায় খেয়াল রাখতে হবে। স্নান,খাওয়া আর প্রাত্যহিক প্রয়োজনের জন্যও আমার কাউকে দরকার ছিল। শুরুতে দুয়েক মাসের জন্য রাখা হলেও ইন্দুর চাকরিটা পরে কিভাবে যেন স্থায়ী হয়ে গেলো।

 

অসুখটা যেন আমাকে বিষণ্ণ করে না দেয় তার জন্য হাওয়াবদলের পরামর্শ দিয়েছিল ডাক্তার। তবু তখুনিই আসা হলো না আমাদের। আমরা বৈভ্রাজে এলাম ডিসেম্বরে, মুন-বুনের স্কুলের ছুটিতে।

আমার অসুখটা ততদিনে সবাই মেনে নিয়েছে। নতুন জায়গায় মুন-বুন সারাদিন হুটোপুটি করে বেড়ায়। সপ্তাহে একবার করে চড়ুইভাতি, শালবনের জঙ্গলে বেড়াতে যাওয়া, মাছ ধরে জলের ধারে বসে সেই মাছ ভেজে খাওয়া এসব লেগেই রইলো।


আমার মনে হতো সবাই স্বাভাবিক গতিতে ছুটছে, শুধু আমার জীবনটাই একটা চর জাগা মৃত নদীর মতো থমকে গেছে। কেমন আছিস পল? দিনশেষে কেউ নরম স্বরে জানতে চাইলে ছিটকে সরে যেতাম আমি। সারাদিনের অন্যমনস্কতার ক্ষতিপূরণ দিতে এলেও সহজে তা গ্রহন করতে পারতাম না।


বৈভ্রাজের ছাদে বারবিকিউ পার্টি হতো। মসলার ঝাঁঝালো সুবাস এসে নাকমুখে হামলে পড়লেও আমি নির্বিকার বসে থাকতাম এককোণে। ইন্দুর হাতে কুরুশকাঁটা, সোডিয়াম বাতির টিমটিমে আলোয় কী করে সে মাফলার, টুপি বুনতো কেজানে! ‘এ শুধু গানের দিন’ গুনগুন করতে করতে প্রায়ই অন্যমনস্ক হয়ে পড়তো ইন্দু। হয়তো বারবিকিউর ঘ্রাণ, অন্তাক্ষরী, পিলোপাস সব মিলিয়ে পার্টির ফুর্তিটা ওকে ছুঁয়েই যেত। আমি বলতাম- তুমি যাও না ওদিকে,আমি বেশ আছি। আঙুলগুলো থেমে যেত ওর। উঠে এসে আমার গায়ের চাদরটাকে ভাল করে জড়িয়ে দিত ইন্দু।


ইন্দু বয়সে আমার বছর তিনেকের বড় হবে। নার্সের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে ও যে কেন আমার প্রায় আয়ার কাজটায় ঢুকে গেল জানেনা কেউ। ইন্দু বলতো ক্লিনিকের পরিবেশ নাকি খুব খারাপ ছিল। ওর ভাল লাগতো না। এটুকু বলেই কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তো সে। দ্রুতহাতে আমার কাপড় বদলে দিত, নয়তো ওষুধপত্রের বাকশো খুলে বসতো। ওর মুখটা তখন কেমন করুণ হয়ে উঠতো আমি ঠিক লক্ষ্য করতাম।


স্নানের পর চুল আঁচড়ে লোশন মাখাতে মাখাতে কিংবা সুগন্ধী পাউডারের রেণু ছড়িয়ে দিতে দিতে ইন্দু যেন রোজ আমাকে আদর করতো। ওর চোখে আমি যে কী ছিলাম তা ঠিক বোঝা মুশকিল। ওর জলপদ্ম মুখটা দু’হাতের আজলায় ভরে নিতে গেলে আমার মাথায় ঠোনা দিত, নয়তো গাল টিপে দিত।


খুব কমবয়সে বিয়ে হতেই আমার পেটে বাচ্চা এলো!

আগে বলোনি তো!

কী বলবো! সাতমাসের সময় ছেলেটা পেটের মধ্যেই মরে গেল..

মাঝেমাঝে মনে হয় সে ফিরে এসেছে!

তুমি কি পাগল?

পল, জানিস? তুই বোধ হয় আমার সেই ছেলে..


এসব কথায় আমার শরীরে কাঁটা দিত। তারপর হঠাৎ আসা ভালুকজ্বরে রাতভর প্রলাপ বকতাম আমি। পাশে জলপট্টি নিয়ে নির্ঘুম জাগতো ইন্দিরা গোমেজ।


মাঝেমাঝে শালবনের ছরার পাশ ঘেঁষে ইন্দুকে নিয়ে হেঁটে বেড়াতাম আমি। বিকেলের পড়ন্ত রোদে ইন্দুর সিঁথিটা ক্রমশ রক্তিম হয়ে উঠতো। নিটোল কপালে চুমু দিতে গেলে ইন্দু হেসে উঠতো। বিভ্রান্ত হয়ে পড়তাম আমি। হাসলে অদিতির চোখদুটোও কি এভাবে নেচে উঠতো?


তোর তো খুব সাহস রে!

কেন?

চার পায়ে হাঁটিস আবার প্রেম করতে চাস? মেয়ে দেখলেই ছোঁকছোঁক!


চার পায়ের কথা শুনে আমি তখুনিই একটা কুকুর হয়ে যেতাম। খুশিতে লেজ নাড়তে নাড়তে ইন্দুর পেছন পেছন ঘুরে বেড়াতাম।

শালবনের এই গল্পটার কথা কেন যেন ইন্দুকে কখনো বলতে পারিনি।


তিন।।


স্কুলের ছুটি শেষ হয়ে গেলে ছোট দুটোকে নিয়ে ওদের মা ফিরে গেল। আমি আর ইন্দু রয়ে গেলাম বৈভ্রাজে। ছুটির দিনগুলিতে বাবা শুক্র-শনিবার করে চলে আসত। মুন-বুন ফিরে যাওয়ার পর হঠাৎ করে বাবার অফিসেও ব্যস্ততা বেড়ে গেল। প্রায়দিনই ফোন করে কাঁচুমাচু হয়ে বলতো পরের সপ্তাহে অবশ্যই আসবে। কিছু লাগবে কিনা বারবার করে জানতে চাইতো।


আমি হাসিমুখে সব মেনে নিচ্ছিলাম। ভেবে দেখলাম সত্যিই তো, কতদিন পর ওরা একটু স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারছে! বাঁচুক। ব্যস্ত থাকুক নিজেদের নিয়ে। আমি বাবার প্রথম স্ত্রীর সন্তান, তার উপর পঙ্গু, অথর্ব। আর কতদিন আমাকে নিয়ে বিব্রত হবে লোকটা? এইসব ভেবে বহুদিন পর আমিও যেন আরাম করে ঘুমোতে পারলাম। বৈভ্রাজে আমার ভেতরের চারাগাছটা ততদিনে ডালপালা মেলতে শুরু করেছে।


তখনো জানতাম না এখানেই নয়নতারার দেখা মিলবে। মিনু মাসীর মেয়ে নয়নতারাকে দেখে প্রথমদিনই আমার মাথা ঘুরে গেল। দিন নেই রাত নেই শুধু ওকে ভাবতে লাগলাম। নয়নতারা তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী, আমি হুইল চেয়ারে বসা অস্থির প্রেমাতুর যুবক।


আমার গল্পে নয়নতারার একচ্ছত্র আধিপত্য। ওকে নিয়ে যখন ইচ্ছে তখন সমুদ্রে চলে যাই। নোনা হাওয়ায় ওর চুলগুলো সমুদ্রের ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ে চোখেমুখে। ওকে ছুঁয়ে দিতে গেলে বাঁধা দেয়। বলে -সত্যি করে বলো তোমার জীবনে আমিই প্রথম?


নয়নতারা জানে না অদিতি কিংবা ইন্দুর প্রতি আমার একটা শিশুসুলভ অভিমান আছে, আহ্লাদ আছে, আবদার আছে। ওদের ভালোবাসি, সমীহও করি। সেখানে রিরংসার লেশ নেই। কিন্তু নয়নতারার গল্পে আমি বারবার উদ্দাম প্রেমিক হয়ে যাই। গভীর আশ্লেষে,আদরে ব্যতিব্যস্ত করে রাখি ওকে। কড়ায় গন্ডায় সবটা বুঝে নিয়ে পরমুহূর্তেই ডাকাতের মতো হামলে পড়ি।


আমায় চুপচাপ দেখে নয়নতারা ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতে বসে।

ওকে বলি- তুমিই আদি তুমিই অন্ত!

 

মুহূর্তেই কলকল হাসি রঙিন কাঁচের মতো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ে আর নয়নতারা গাঙচিল হয়ে উড়ে যায় দূরে। এই গল্পে প্রগাঢ় ঢেউ নয়, আমাকে ডুবিয়ে দেয় অতল বিভ্রম।

 

নয়নতারা চোখেরতারা,

তোমায় বাসি ভালো।

থিরবিজুরি তন্বী,

আমার আঁধার ঘরের আলো।


ওকে নিয়ে এসব লিখলাম। গল্পে নয়, সত্যি সত্যি। এরপর আর মেলাতে পারিনি। তার আগেই ধরা পড়ে গেলাম সবার কাছে।

 

ছাদে সেদিন ফুরফুরে হাওয়া ছিল। কবিতাটা শুনিয়ে একবার ওর হাত ধরেছিলাম। নয়নতারা সাথেসাথে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে একছুটে পালিয়ে গেল। একটু পরেই ইন্দু এসে সপাটে চড় বসালো আমার গালে। মিনু মাসীও অশ্রাব্য ভাষায় কত কী বলে গেল। আমি দুলছিলাম একটু একটু করে, হুইলচেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে পারলে পালিয়ে যেতাম কোথাও।


বাবা পরদিন ফোন করে হিসহিস করে কথা বলছিল। আমি নিশ্চুপ শুনছিলাম। সেই কবে স্কুলের পরীক্ষায় অন্যের খাতা দেখে লিখেছিলাম, অংক স্যারের ক্লাসে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম, খেলতে গিয়ে আমার ধাক্কায় মুনের কপাল ফেটে গিয়েছিল কবে- সেইসব স্মৃতিচারণও হলো। ফোন রাখার আগে বললো- তুই মরিস নাই কেন সেদিন?


সত্যিই তো! প্রসবঘরে মায়ের ধনুকের মতো বেঁকে যাওয়া শরীরটা থেকে সেদিন বের হলাম কেন আমি? মায়ের সাথে আমারও মৃত্যু হতে পারতো না তখন? কপালগুণে কিংবা দোষে এমন বেঁচেবর্তে আছি! শুধু আমি জানি কত বিশ্রী এই চতুষ্পদের মতো বেঁচে থাকা!


আমার গল্পে মা আসে না কখনো। রাঙাচেলী আর চন্দনের টিপ পরা ছবিটা আমার টেবিলের ড্রয়ারে ছিল সবসময়। মায়ের স্মৃতি মানে এই একটাই ছবি। তবু মা আমার গল্পে আসলে কী এমন অশুদ্ধ হতো। তাকে নিয়ে ভাবতে গেলেই মাথা ঝিমঝিম, চোখ ঘুমঘুম হয়ে আসে। ভাবা হয়না আর।

 

দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর ইন্দু আমার ঘরে আঙ্গুর-আপেল, দই-পায়েস কিছু না কিছু রেখে যায়। আজকেও রেখে গেছে। নিয়মের ব্যতিক্রম করে না ইন্দু। অন্যদিন নিজ হাতে খাইয়ে যায়। আজ তা করেনি,আমার উপর রাগ করে আছে ইন্দু। তবু অযত্নও করছে না। ওর মনোযোগেই আজকাল আমার গায়ের জোরটা অল্প অল্প করে ফিরে আসছে। হুইল চেয়ার ঠেলে নিজেই এদিক ওদিক যেতে পারি।


চতুষ্পদ যন্ত্রটার চাকায় ভর দিয়ে এগিয়ে দেখি ফল কাটার ছুরিটা টেবিলেই রয়ে গেছে। হাতে নেয়া মাত্র ঝলকে উঠলো ফলাটা। কয়েক সেকেন্ড ঘোর লাগা চোখে ওকে দেখলাম। নতুন আর চকচকে। তারপর কতটা সময় পেরিয়ে গেল জানি না। ছুরিটা আমার বাঁহাতের কব্জিতে বসিয়ে দিয়ে সতর্ক হলাম। খুব যত্ন করে বসালাম যেন কিছুতেই লক্ষ্যচ্যুত না হয়। ধরে রাখলাম যতক্ষণ পর্যন্ত অনর্গল রক্তস্রোত মেঝেটাকে না ভাসায়, যতক্ষণ নিদারুণ ঘুম নেমে না আসে আমার নয়নতারায়।

 

তারপর সেই ঘুমন্ত আমি পলকা শরীরটাকে নিয়ে বৈভ্রাজের বাইরে বের হয়ে এলাম৷ তিনসাধুর মাঠ পেরিয়ে রেইনট্রির ছায়ার কাছে পৌঁছে গেলাম একসময়। হয়তো উড়ে উড়েই কিংবা হাওয়ার সমুদ্র সাঁতরে! নিজেকে কখনো এত হালকা লাগেনি। ধীরে ধীরে মাটির স্পর্শ নিলাম আমি আর হাঁটতে শুরু করলাম। আমার সঙ্গী হলো অদিতি, ইন্দু আর নয়নতারা।

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত